ঢাকা, শুক্রবার, ৫ বৈশাখ ১৪২৬, ১৯ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আমাদের স্বপ্নগুলো আরো উজ্জ্বল হোক

মো. আমিরুল ইসলাম প্রামাণিক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-০১ ৬:২১:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০২ ১১:৫৬:২৮ এএম

|| মো. আমিরুল ইসলাম প্রামাণিক ||

জড়দেহ, প্রাণশক্তি ও বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মন- এই তিনের সমন্বয়ে মানুষের চৈতন্যময় ব্যক্তি-সত্তা গঠিত। মস্তিষ্ক ও মনের উপর, মানুষের আত্মা যে যে বিষয়গুলো অধিকার করে তা হচ্ছে- সুখ, দুঃখ, আবেগ-অনুভূতি, উদ্বেগ আর ভয়। এসবের সাথে মন ও আত্মার মিতালি হলেই স্বপ্নের সৃষ্টি হয়। মানুষ ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখেন। অবশ্য ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালাম কিন্তু বলেছেন অন্য কথা। তিনি বলেছেন- জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখা যায়। তাঁর মতে, মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন এবং অন্যদের মতে, ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্ন দু'টোই মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। ভালো আর মন্দ স্বপ্নের সাথে মানুষের মন ও আত্মার নিবিড়তম সম্পর্ক আছে। স্বপ্ন মানব জীবনের অংশ। সৃষ্টিজগতে মানুষই কেবল স্বপ্ন দেখেন। অন্য জীবরা তা দেখে না। স্বপ্নের নানা দিক নিয়ে নানা মনীষীর এবং নানা ধর্মের ভিন্ন-অভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।

প্রথমেই আসা যাক, স্বপ্নের প্রকারভেদ বিষয়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্ন তিন প্রকার। এক. মানুষ মনে মনে সারাদিন যা কল্পনা করেন তার প্রভাবে ঘুমের মধ্যে ভালো-মন্দ কিছু দেখেন, যাকে অলীক স্বপ্ন বলে; দুই. শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্রভাবে স্বপ্ন দেখা, যা সচরাচর ভীতিকর হয়ে থাকে, একে কুস্বপ্ন বলে; এবং তিন. মহান আল্লাহ তা’আলার তরফ থেকে ইশারা বা কোনরূপ বার্তা, যার ভালো এবং খারাপ দু’টোই হতে পারে। স্বপ্ন নবুওয়তেরও একটি অংশ। নবী ও রাসূলদের কাছে জিব্রাইল (আ.) যেমন সরাসরি ওহী নিয়ে আসতেন, তেমনি স্বপ্নের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁদের কাছে প্রত্যাদেশ পাঠাতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দিন যত এগুতে থাকবে, কিয়ামত তত নিকটে হবে, মুমিনদের স্বপ্নগুলো ততই মিথ্যা থেকে দূরে থাকবে। ঈমানদারদের স্বপ্ন হলো- নবুওয়তের ৪৬ ভাগের ১ ভাগ। (বর্ণনায়: বুখারি ও মুসলিম)। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের মধ্যে যিনি যত বেশি সত্যবাদী হবেন তাঁর স্বপ্ন তত বেশি সত্যে পরিণত হবে। যিনি যত বেশি সততা ও সত্যবাদিতার চর্চা করবেন তিনি তত বেশি সত্য স্বপ্ন দেখতে পাবেন। সুতরাং স্বপ্নের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য এখানেই বুঝতে পারা যায়।

স্বপ্নের সাথে মন ও আত্মার সম্পর্ক যেমন, ঠিক তেমনি পরিবেশ-পরিস্থিতি, বয়স, কর্মভেদের সাথেও স্বপ্নের সম্পর্ক আছে। ছোট্ট শিশুরা যেমন স্বপ্ন দেখে, প্রবীণরা তেমন দেখেন না। আবার যুবকরা যে স্বপ্ন দেখে, যুবতীরা একই রকম দেখেন না। স্বপ্ন দেখার নির্ধারিত সীমা-পরিসীমা নেই। মানুষ সম্ভবত কল্পনার থেকেও বেশি স্বপ্ন দেখেন। তাই এ নিয়ে বিজ্ঞানেও সৃষ্টি হয়েছে একটি শাখা। যার নাম ‘স্বপ্নবিজ্ঞান’, ইংরেজিতে বলা হয় ‘Oneirology’। এ সম্পর্কে একেক জনের মূল্যায়ন একেক রকম। অনেকে বলেছেন যে, মানুষ কারণে-অকারণে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন না দেখলে মানুষ বাঁচতেই পারেন না, জীবন গড়তেও স্বপ্ন দেখা চাই।

মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকেন ততক্ষণ তাঁর মন ও আত্মা এটা করবো, সেটা করবো, ওটা করতে হবে এমনটা ভাবেন। এসবও এক ধরনের স্বপ্নই। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধরনের স্বপ্নগুলো আসলে এরকম। আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি তখন আমাদের মনের এবং আত্মার তেমন কোন কাজ থাকে না। এই সুযোগে আত্মা তখন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মনের সাথে সংযোগ রেখে পৃথিবীর যেখানে খুশি সেখানে বিচরণ করে। নানা স্থানে ঘুরতে ঘুরতে যেখানে গিয়ে নতুন কিংবা পুরনো স্মৃতিগুলোকে খুঁজে পায় ঐগুলি সংগ্রহ করে মনের কাছে পাঠায়। ঠিক স্যাটেলাইট আর টিভি’র সাথে সম্পর্ক যেমন, মন এবং আত্মার সম্পর্কটাও তেমনই। এভাবে আত্মার প্রেরিত দৃশ্যাবলী মন তখন রোমন্থন হতে থাকে। এগুলিই মনের মাঝে তখন খেয়াল, স্বপ্ন দর্শন ইত্যাদিতে রূপ নেয়। আর তৃতীয় ধরনের যে স্বপ্নগুলো আমরা দেখি তা হঠাৎ করে মহান আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে সতর্কবাণীরূপে প্রেরিত হয়।

ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আত্মা ঐসব বিষয়ই মনের কাছে পাঠায়, যা মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে সেসব ভেবে থাকেন। অর্থাৎ যাঁর চিন্তা-ভাবনা যেমন, তাঁদের স্বপ্নগুলিও তেমন বলা যেতে পারে। তবে, মস্তিষ্ক ও তাতে থাকা স্নায়ুমন্ডল এবং সারাদেহে ছড়িয়ে থাকা স্নায়ুতে যদি কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে, তাহলে স্বপ্নগুলোকে পরিষ্কারভাবে অবলোকন করা যায় না। কানেকশন ল্যুজ থাকলে যেমন টিভি’র শব্দ ও দৃশ্যাবলী আমরা ভালোভাবে শুনতে ও দেখতে পাই না, ঠিক তেমন আর কী। সুখময় স্বপ্ন দেখতে হলে স্বপ্নদ্রষ্টার মন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুমন্ডলী ত্রুটিমুক্ত হওয়া চাই। তা না হলে সুখস্বপ্ন ধরা দেবে না।

এবার আসি মনীষীরা স্বপ্ন নিয়ে কে কী বলেছেন। মনীষীরা বলছেন, মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়েন তখন তাঁর দেহ শিথিল হয়ে যায়, কেবল অক্ষিগোলক তখন দ্রুত নড়াচড়া করে, ঐ অবস্থায় মানুষ অবচেতন মনে স্বপ্ন দেখেন। তাঁরা আরো বলছেন যে, মানুষ তাঁর পুরনো অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো স্মৃতি কল্পনায় নিয়ে আসেন এবং তারপর তা জোড়া দিয়ে কিংবা পরিবর্তন করে অবচেতন মনে নানা সম্ভব-অসম্ভব ঘটনায় রূপ দিয়ে থাকেন। জার্মানির বিখ্যাত স্নায়ুবিশারদ বলছেন যে, স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশ। গ্রীক এবং রোমান যুগে মানুষ বিশ্বাস করতেন যে, স্বপ্নগুলি এক বা একাধিক দেবতার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বার্তা অথবা মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসা বার্তা যা প্রধানত ভবিষ্যত বাণী হিসেবে পরিগণিত। গ্রীকরা আবার বিশ্বাস করতেন যে, ঘুমের সময় আত্মা দেহত্যাগ করে। গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বিশ্বাস করতেন যে, স্বপ্ন হলো শারীরিক কার্যকলাপ। তিনি মনে করতেন যে, স্বপ্ন রোগের বিশ্লেষণ এবং কোন ধরনের রোগ হতে পারে তার জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। আধুনিক যুগে স্বপ্নকে অবচেতন মনের একটি সংযোগ হিসেবে দেখা হয়। প্রাণবন্ত ও সুখময় স্বপ্নগুলোকে আর্শীবাদ এবং দুঃখময় ও খারাপ স্বপ্নগুলোকে অভিশাপ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ এবং তারও আগে ভারতীয়রা মনে করতেন যে, স্বপ্নের দু’টি দিক আছে। প্রথমটি হচ্ছে- মানুষের মনের ভেতরের ইচ্ছার নিছক অভিব্যক্তি এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঘুমের সময় আত্মা দেহত্যাগ করে এবং জেগে উঠার আগ পর্যন্ত ঐটি দ্বারা দেহ পরিচালিত হয়। অর্থাৎ দেহত্যাগকারী আত্মা যেখানে যেখানে যেমনভাবে ঘুরে বেড়ায় তাই মনে প্রতিফলিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্র্যাটিসের দেয়া তত্ত্ব ছিল এরকম: ‘দিনের বেলা মানুষের আত্মা স্বপ্ন সংক্রান্ত চিত্র গ্রহণ করে এবং রাতের বেলা পূর্ণাঙ্গ একটি ছবিতে রূপদান করে।’

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্নকে কীভাবে দেখা হয় বিষয়টি নিয়ে এবার আলোচনা করা যাক। হিব্রুরা বিশ্বাস করতেন যে, স্বপ্ন ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রাপ্ত ধ্বনি। ভালো স্বপ্নকে তাঁরা ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রাপ্ত স্বপ্ন বলতেন এবং খারাপ স্বপ্নগুলোকে তাঁরা মন্দ আত্মা থেকে প্রাপ্ত স্বপ্ন বলতেন। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ স্বপ্নের মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে কথা বলতে পারে। মুসলমানরা এখনও বিশ্বাস করেন যে, আমাদের শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এবং অন্যান্য নবী-রাসূলগণ স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে প্রত্যাদেশ লাভ করতেন। আর সেই অনুযায়ী মানব জাতিকে দিক-নির্দেশনা দিতেন। হিন্দু ধর্ম বলছে যে, স্বপ্নের তিনটি অবস্থা। তার একটি অবস্থা হচ্ছে মানুষের আত্মা তাঁর জীবদ্দশায় অভিজ্ঞতা লাভ করে। আর অন্য দু’টি হচ্ছে জাগ্রত এবং ঘুমন্ত অবস্থা। ধর্মীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যাবে যে, প্রায় অনেক ধর্মেই নবী ও রাসূলগণ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে থেকে স্বপ্নে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন। স্বপ্নের মাধ্যমে গুপ্তধন পাওয়া এবং নানা রোগের ওষুধের সন্ধান (বিশেষত গাছ-গাছড়ার) লোকমুখে অনেক শুনেছি। দিনাজপুর জেলার তাজপুর গ্রামের এক সময়কার রাজা, রাজা রামনাথ স্বপ্ন দর্শনের ফলেই কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দীঘি খনন করেছেন। এ সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই জানি।

এদিকে, অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে, ‘তাঁদের স্বপ্নগুলি অর্থপূর্ণ এবং লুক্কায়িত সত্য প্রকাশ করে।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৭৪ শতাংশ ভারতীয়, দক্ষিণ কোরিয়ানদের ৬৫ শতাংশ এবং ৫৬ শতাংশ আমেরিকানরা তাঁদের স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে অবচেতন মনের বিশ্বাস এবং অপূরণ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্বপ্নের নানা ধরন আছে। দিবাস্বপ্ন, হেলুসিনেশন, দুঃস্বপ্ন, রাতের স্বপ্ন, সুখস্বপ্ন ইত্যাদি। ক্যালভিন হেলের মতে, ৮ শতাংশ নর-নারী যৌন বিষয়ে স্বপ্ন দেখেন। তিনি প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে তা থেকে স্বপ্ন নিয়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। আরেকটি বিষয়ে আমি কিছু ধারণা পেয়েছি। আর তা হলো- প্রায় সোয়া দু’শ বছর আগে মানুষের সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ে বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং হোমিওপ্যাথিক জনক ব্যাপক গবেষণা এবং সুস্থদেহে মানুষকে নানা ভেষজ খাইয়ে স্বপ্ন বিষয়ে নানা তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। যা থেকে মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন সে সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং শারীরিক অবস্থাই ফুটে উঠেছে বলে তিনি তাঁর মত প্রদান করেছেন। যেমন- অনেক শিশু আছে যাঁরা বড়ই একগুঁয়ে, কেবল কাঁদে, কিছুতেই শান্ত হয় না। ঘুমের মধ্যে কথা বলে। এসব শিশুরা আকস্মিক দুর্ঘটনা, উঁচু থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। অনেকেই আবার মধ্যরাতে জীবিত পদার্থের স্বপ্ন কিংবা কেউ যেন গলা বুক চেপে ধরেছে এমন মনে করে, তাতে দম বন্ধের মত হয়, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। অনেক শিশু আছে যাদের চোখে ঘুম থাকে না, চোখ বুজলেই ভীতিকর মূর্তি বা স্বপ্ন দেখে, একটু শব্দে চমকে উঠে, সমস্ত রাত জেগে থাকে। তাঁরা মূলত মৃত কিছু বা মৃতব্যক্তিদের স্বপ্ন দেখে। জেগে উঠার পরও তাদের স্বপ্ন নিরন্তর চলতে থাকে।

এদিকে, বড়দের মধ্যে যাঁরা একটুতেই শপথ করেন, গালিগালাজ করেন, স্মরণশক্তি কম, বিমর্ষ ও উদাস থাকেন এবং যাঁদের মনে দু’টি ইচ্ছা কাজ করে, একটি করতে বলে, অন্যটি নিষেধ করে, হাঁটার সময় মনে করেন যেন পেছনে পেছনে কেউ আসছে- এমনটি যাঁদের ক্ষেত্রে ঘটে তাঁরা মূলতঃ ঘুমের মধ্যে আগুন, মৃত ব্যক্তি ও শ্মশানের স্বপ্ন, কে যেন বলছে তিনি মারা যাবেন, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন ইত্যাদি ধরনের স্বপ্ন দেখেন। আবার যাঁরা সর্বদা নিজের রোগ-ব্যাধি ও অবস্থার কথা বলেন, কথাবার্তার জন্য একজন লোককে পাশে চান, নিজের মৃত্যুর তারিখ বলে দেন তাঁরা স্বপ্নে জীব-জন্তু, সাপ ইত্যাদি দেখে থাকেন। আবার যাঁরা ভবিষ্যতের জন্য মনে মনে নানা প্রকার চিন্তা ও কল্পনা করেন, যার জন্য তাঁদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে তাঁরা মূলত ঘুমাতে ঘুমাতে ভয় পেয়ে হঠাৎ জেগে উঠেন। আরো আছে, যাঁরা একলা থাকতে পছন্দ করেন, তাঁকে কেউ বিষ খাওয়াবে, বিক্রি করে দেবে, তাঁকে নিয়ে কেউ সন্দেহ করছেন এমনসব ভাবেন তাঁরা সচরাচর ভয়োৎপাদক স্বপ্ন দেখে থাকেন। যেমন- মূর্তি, বিশালাকার দৈত্য-দানব ইত্যাদি। এসব দেখে ঘুমের মধ্যে তাঁরা চিৎকার করে কেঁদে উঠেন, ভয় পেয়ে জাগে উঠেন, হাত পা কাঁপে। এদিকে আবার, যাঁদের ঘুমের উপক্রমে বা ঘুম ভাঙ্গলেই মানসিক ও রোগলক্ষণ বাড়ে, ঘুমাতে ঘুমাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আর তাতে চিৎকার করে উঠেন তাঁরা আগুন, অগ্নিশিখা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি নিয়ে স্বপ্নে দেখেন। আবার যাঁরা সর্বদা বিমর্ষ থাকেন, একটুতেই কাঁদেন, সান্ত্বনা দিলে কান্না আরো বাড়িয়ে দেন তাঁরা ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানা থেকে উঠে উঠেন। মনে করেন যে, ঘরে চোর-ডাকাত ঢুকে পড়েছে। ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। স্বপ্ন সত্য বলে মনে করেন। শত্রু-দস্যু সব দেখেন। শারীরিক শ্রম, পরিশ্রম, ব্যবসা ইত্যাদির স্বপ্ন দেখেন। জেগে উঠার পরও তাঁদের স্বপ্নগুলো নিরন্তর চলতে থাকে। অন্যদিকে, যাঁরা সব সময় বিমর্ষ থাকেন, ধর্ম বিষয়ে কথা বলেন কিংবা নির্জ্জনে বসে ভাবেন, লিখতে বানান অথবা শব্দ ভুল করেন, শব্দের অর্থ মনে করতে পারেন না তাঁরা স্বপ্নকালে হাসেন। আবার যাঁরা একটুতেই রেগে যান, খিটমিটে স্বভাব, অত্যন্ত সতর্ক থাকেন, হিংসুটে ও কলহপ্রিয় তাঁদের স্বপ্নাবস্থায় গতি, শ্বাস-প্রশ্বাস ও বাকরোধ (যাকে বোবায় ধরা বলে) হয়ে যায়। বড়দের অনেকে ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপার- দিনের বেলা ভুলে যান। যে সমস্ত ব্যাপার স্মরণে থাকে না, তাই নিয়ে তিনি রাতে স্বপ্নে দেখেন। কারো কারো হাত থেকে জিনিসপত্র পড়ে যায় অর্থাৎ অসাবধানী তাঁরা আবার শূন্যপথে উড়ার স্বপ্ন দেখেন ইত্যাদি। অনেকে ভয়ানক বা মৃত ব্যক্তিদেরকে স্বপ্নে দেখেন, সদাই মনে করেন যে, পাগল হয়ে যাবেন, অনবরত মাথা নাড়েন ও ভুল বকেন। মৃত্যুভয়, একা থাকতে পারেন না, হিংস্র জন্ত-জানোয়ারের আক্রমণের ভয় করেন, সেজন্য পালানোর চেষ্টা করেন। চোখ বুজলেই ভীতিকর কোন দৃশ্য দেখেন, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখেন, ঘুমাতে পারেন না। সাপের স্বপ্ন দেখেন, দম বন্ধ হয়ে যায়, কেউ আবার ভূতের ভয় পান কিন্তু ভূতের ভয়ে পালান না বরং ভূতের সাথে কথা বলেন। কেউ ভূত-প্রেতের ভয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠেন। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান বলছেন যে, এসব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিক দুরবস্থার পরিচয় বহন করে। শোক-দুঃখ, মানসিক আঘাত, কোন কাজে ব্যর্থতা, প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথা, মনের খেয়াল, শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা ইত্যাদি থেকে এসব হয়ে থাকে।

আসলেই স্বপ্নগুলো মানুষের মানসিক অবস্থার পরিচয় জানিয়ে দেয়। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঠিক মানসিক দিক থেকে কোন পর্যায়ে আছেন। অর্থাৎ তিনি মানসিকভাবে সুস্থ কী অসুস্থ তা জানা যায় স্বপ্নগুলোর মাধ্যমে। স্বপ্ন দেখার সাথে বংশগতির একটা সম্পর্ক আছে। আছে ব্যক্তিত্বের সম্পর্কও। যিনি মনের দিক থেকে দুর্বল তিনি ভয়ংকর ধরনের স্বপ্ন দেখবেন এটাই স্বাভাবিক। খারাপ ধরনের স্বপ্ন দেখার ব্যাপারে ধর্মীয়ভাবে একটা পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আর তা হলো- খারাপ স্বপ্ন দেখার পর প্রথমত বাম পাশে ফিরে তিনবার থুতু নিক্ষেপ করতে হবে (থুতু বের না করে) এবং দ্বিতীয়ত, শয়তান থেকে মহান আল্লাহ তা’আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। তৃতীয়ত, এ ধরনের স্বপ্নের বিষয়বস্তু অন্য কাউকে জানানো যাবে না। এই তিনটা শর্ত পূরণ করলে ঐসব খারাপ স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হয় না বলে জেনেছি। আর যাঁরা নিজেরাই অপেক্ষাকৃত ভয়ংকর ধরনের তাঁরা বীভৎস ধরনের স্বপ্ন দেখবেন এবং তাতে তাঁরা মজাও পাবেন এটাই স্বাভাবিক। তাঁদের কাছে খারাপ আর ভালো স্বপ্ন বলে কিছু নেই। এদিকে, যাঁরা অপেক্ষাকৃত সাহসী কিন্তু সত্যবাদী তাঁরা অধিকাংশই সুখস্বপ্ন দেখেন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ যথার্থই বলেছেন যে, “যদি কোন মানুষকে চিনতে হয় তাহলে তার স্বপ্নকে জান।’ তাঁর এই উক্তি মতে, স্বপ্ন প্রত্যেক মানুষের প্রকৃত স্বরূপকে উন্মোচিত করে, মানুষে মানুষের পার্থক্য নির্ণয় সহজ করে দেয়। যেমন- কেউ যদি অস্বাভাবিক কিছু হওয়ার অথবা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন (কোটিপতি হওয়া কিংবা বিলাসবহুল বাড়ি/গাড়ি মালিক হওয়া ইত্যাদি) যা তাঁর আর তাঁর স্বপ্নের মধ্যে স্পষ্টত পার্থক্য সৃষ্টি করে তাহলে তা থেকে যে কেউ তাঁর সম্বন্ধে একটা ধারণা পাবেন যে, তিনি আর যাই হোক না কেন, আদর্শবান কেউ নন। তাঁর দ্বারা যে কোন ধরনের খারাপ কাজ করা সম্ভব। যুগ যুগ ধরে অনেকের সাথে মেলামেশা করেও প্রায়শঃই ঐ মানুষটিকে চিনতে আমাদের ভুল হয়। কিন্তু উপরের পন্থায় যদি কোন মানুষের স্বপ্ন আগেভাগেই জানা যায় তাহলে খুব সহজেই তাঁর সম্পর্কে একটা চিত্র আপনার মানসপটে ভেসে উঠবে। আর তা থেকে আপনি ঐ মানুষটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়বেন নাকি তাঁর থেকে দূরে থাকবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজতর হবে।

বেশ ক’বছর আগে আমি একজন প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর একটি বই পড়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, আমি তাতে পড়েছিলাম যে, আমাদের দেখা স্বপ্নগুলোর সাথে নাকি পরকালীন সুখ-শান্তি এবং আজাব ও শাস্তির অনেক মিল আছে। সত্যি বলতে কী আমরা যখন বীভৎস ধরনের স্বপ্ন দেখি তখন প্রায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাই, শিহরিত হই, ঘর্মাক্ত হয়ে যাই। আবার যখন সুখস্বপ্ন দেখি তখন কিন্তু সবাই আনন্দিত হই, খোশ মেজাজে থাকি। এর রেশ কিন্তু অনেকটা সময় থেকে যায়। অথচ স্বপ্নদ্রষ্টার সাথে গায়ে গা লাগিয়ে ঘুমালেও তা কিন্তু কাছে থাকা কোন ব্যক্তি সেসব স্বপ্নের কোন কিছু টের পান না। ঘুমের মধ্যে যেহেতু এমনসব দেখা যায় তাহলে চিরনিদ্রায় গেলেও যে এমনসব হতে পারে সেটা বিশ্বাস করতে দোষের কী! অর্থাৎ স্বল্পনিদ্রায় যদি বীভৎস্য কিছু দেখি তাহলে চিরনিদ্রায় যে আরো বীভৎস্য কিছু দেখা সম্ভব সেটা বোধহয় বিস্তারিতভাবে ভেঙ্গে বলার প্রয়োজন নেই। মানুষ মারা গেলে আমরা সব ধর্মের মানুষই মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি ও মঙ্গল কামনা করি। জীবিত অবস্থায় যেহেতু আত্মাই ভালো এবং খারাপ ধরনের স্বপ্ন দেখে সেহেতু মৃত অবস্থায়ও ঐ আত্মা ভালো এবং খারাপ স্বপ্ন দেখবে এবং একই রকমের অনুভূতি হবে এটা মেনে নেয়া পরকালীন প্রশান্তির জন্য মঙ্গলজনক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge