ঢাকা, বুধবার, ৪ মাঘ ১৪২৩, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

আহ! সেই সব পাতাঝরা দিন

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৭ ৩:০৭:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১৩ ৩:৩৭:০১ পিএম

(চকবাজার টু চায়না : পর্ব-২৮)

শান্তা মারিয়া : বেশ কয়েকদিন ধরেই শুনছি আমাদের মিডিয়া সেন্টারের একদম কাছেই নাকি একটি বিখ্যাত পার্ক আছে। নাম স্কাল্পচার পার্ক্। তখন আমি মাত্র বেইজিং গিয়েছি। একদিন ডিরেক্টরকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ‘এই তো খুব কাছে, অভিশংসক ভবনের উল্টো দিকেই।’ অভিশংসক শব্দটি শুনে একটু ঢোক গিললাম। আমি এখানে বিদেশী ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে চাকরি নিয়ে এসেছি। আমাকে যদি অভিশংসক শব্দটা অভিধান খুলে দেখতে হয় তাহলে তো মুশকিল। আমার চীনা সহকর্মীরা মাঝেমধ্যেই এমন অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন।

যাই হোক একদিন আমি আর থোংউ মানে রুমমেট নিনা গেলাম স্কাল্পচার পার্কে। তখন শরৎকাল। বেইজিংয়ের সবচেয়ে সুন্দর সময়। পাঁচ ইউয়ান দিয়ে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম্। বেশ বড় পার্ক। আমাদের রমনা পার্কের মতো বা তারচেযে কিছুটা বড় হবে। পার্কের মাঝখানে বড় একটি লেক। সেই লেকের উপর ঝুঁকে পড়ে জলের বুকে নিজেদের ছায়া দেখতে ব্যস্ত উইলো গাছগুলো। এই পার্কের আসল বিষয় হলো, এখানে রয়েছে অনেক অনেক ভাস্কর্য। প্রায় চল্লিশটি দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের তৈরি ১৮০টিরও বেশি ভাস্কর্য রয়েছে এই পার্কে। রুশ, চীনা, ফরাসী শিল্পীদের ভাস্কর্য যে কি অপূর্ব সুন্দর! মূর্ত-বিমূর্ত, ক্ল্যাসিকাল, উত্তর আধুনিক সব ধরনের ভাস্কর্যই রয়েছে এখানে। ছুটন্ত ঘোড়া, হাস্যমুখর শিশু, তিমি মাছ, বেহালাবাদক এমন অনেক ভাস্কর্য।

প্রথমদিন এই পার্কে গিয়েই এর প্রেমে পড়ে যাই। পরে অসংখ্যবার এই পার্কে গিয়েছি। গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এখানে নাচের আসর বসতো। সেখানে যোগ দিতাম প্রায়ই। পার্কের দারোয়ান আমাকে ও শিহাবকে চিনত। ফলে আমাদের আর টিকেটের প্রয়োজন হতো না। প্রায় প্রতি বিকেলেই অফিস শেষে এই পার্কে যেতাম একটু প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। শীতে এই পার্কের রূপ বদলে যেত। বরফজমা লেকের উপর দিয়ে চলতো স্কি করার পালা। বেইজিং থেকে যেদিন চলে আসি তার আগের সন্ধ্যাতেও গিয়েছিলাম পার্কে। গিয়েছিলাম আমার চেনা গাছ, লেক, ভাস্কর্য আর প্রিয় বেঞ্চটাকে বিদায় জানিয়ে আসতে। জানি না যদি আবার কোনো দিন সেখানে যাওয়া হয় তারা আমাকে চিনতে পারবে কি না।

শিজিংশানে আমাদের বাসস্থানের খুব কাছেই আরেকটি বিখ্যাত পার্ক ছিল। তার নাম পাচিয়াও অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। এটি বিশাল একটি থিম পার্ক। ডিজনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কপিরাইট নিয়ে এই পার্কের বেশ ঝামেলা হয়েছে। কারণ ডিজনির সিন্ডারেলার ক্যাসেলের মতো এখানে একটি রূপকথার ক্যাসেল রয়েছে। যাই হোক এই ক্যাসেল ছাড়াও এখানে রূপকথা ও গ্রিক মিথোলজির অনেক চরিত্র ও গল্প নিয়ে অনেক এলাকা ও রাইড রয়েছে। আমি আর শিহাব জানুয়ারির ভর শীতে একবার এই পার্কে গেলাম। বিশাল বড় এলাকা নিয়ে এই থিম পার্ক। দুর্দান্ত সব রাইড। রোলার কোস্টারই যে কত রকম। ছেলে বুড়ো সবাই চড়ছে এসব রাইডে। তবে অনেকগুলো রাইডে পাগল না হলে চড়ার কথা নয়, এমনই ভয়ংকর সেগুলো। নিরীহগোছের কয়েকটা রাইডে আমরা চড়লাম। সেসব রাইডে অবশ্য শিশুরা চড়ে। আমরাও শিশুদের সাথে মিশে মেতে উঠলাম শিশুসুলভ আনন্দে।

বেইজিং পার্কের শহর। ছোট-বড় প্রচুর পার্ক রয়েছে। সবগুলোই সুন্দর। আর প্রতিটি পার্কেই রয়েছে শিশুদের জন্য বিশেষ এলাকা। সেখানে অনেকগুলো রাইড থাকে। প্রতিটিতেই বিনে পয়সায় শিশুরা চড়তে পারে, সেইসঙ্গে বড়রাও। এসব পার্কে গেলে আমার দেশের শিশুদের জন্য আমার খুব কষ্ট হতো। কারণ এমন সুন্দরভাবে সময় কাটানোর অধিকার তো ওদেরও আছে। যাই হোক, বেইজিংয়ে বিশেষ বিখ্যাত হলো ছাওইয়াং পার্ক। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক মেলা বসেছিল। বাংলাদেশের একটি স্টলও ছিল সেখানে। ডিরেক্টর শিহাবকে বললেন, ওর অনুষ্ঠানের জন্য মেলাটির উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে এবং বাংলাদেশের স্টল মালিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে আসতে এবং ওই দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকবেন সেখানে, তারও একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে। সেই সঙ্গে বললেন, আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে। কারণ আমি তখন একেবারে নতুন মানুষ। বেইজিংয়ের কিছুই দেখিনি। বেশ কথা।

আমি এবং শিহাব বেশ ভোরবেলা রওনা হলাম। ব্যাংক হিসাব খোলা হয়নি বলে তখনও এক মাসের বেতন হয়নি। দেশ থেকে যা ডলার নিয়ে এসেছিলাম সেগুলো বাংলাদেশের কোনো এক ব্যক্তির কারণে খোয়া গেছে। সেটা আরেক কাহিনি। পরে কোনো সময় হয়তো তা বলা যাবে। আমার হাতে তখন একদম টাকা নেই। টাকা বাঁচানোর জন্য দিনে একবেলা খেয়ে থাকি। আমি আবার কিছুতেই কারও কাছ থেকে টাকা ধার নিতে রাজি নই। এটা আমার এক ধরনের জেদ। বোকামিও বলা চলে। দেখি না এভাবে আধপেটা খেয়ে কতদিন চলা যায়। কখনও তো না খেয়ে থাকিনি এর আগে। নতুন ধরনের অভিজ্ঞতাও তো হচ্ছে। জানি বেতন পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

সেদিন ভোরে রওনা হয়েছি শুধু একটুকরো পাউরুটি খেয়ে। শিহাব সাহেব আমাকে নিয়ে চললেন সাবওয়ে দিয়ে। শিজিংশান থেকে বেশ দূরে ছাওইয়াং। প্রায় ঘণ্টাখানেক সাবওয়েতে চলার পর স্টেশনে পৌঁছালাম। ডিরেক্টর বলে দিয়েছিলেন, সাবওয়ে স্টেশন থেকে নেমে বাকি পথটা ট্যাক্সি করে যেতে। কিন্তু শিহাবের ট্যাক্সি চড়ার ইচ্ছা নাই। উনি পার্কের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওনা হলেন। দূরত্ব? বাংলামোটর থেকে পুরানা পল্টন হবে।

হেঁটে হেঁটে রীতিমতো ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পৌঁছালাম পার্কের বিশালাকার ফটকে। বাঙালি একজন আগেই জানতেন আমরা আসছি। গেটপাশ দিয়ে নিয়ে গেলেন ভিতরে। এখানে বলে রাখি ছাওইয়াং হলো বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় আকারের পার্ক। এটা লম্বায় ২.৮ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ১.৫ কিলোমিটার। অবশ্য বেইজিং জু, সামার প্যালেস ইত্যাদি এর চেয়েও বড়। পার্কের অল্প একটু অংশ জুড়ে মেলা বসেছে। প্রথমেই গেলাম বাবরভাই বলে বেইজিংয়ে সুপরিচিত বাঙালি ভদ্রলোকের স্টলে। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে বেইজিং আছেন। ঢাকায় চারুকলার ছাত্র ছিলেন। এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। টুকটাক ব্যবসাও করেন। চীনা মেয়ে বিয়ে করেছেন। এক ছেলের বাবা। স্টলে বাংলাদেশের পোশাক, গয়না, টিপ, মেহেদি, পাটের তৈরি নানা রকম জিনিস বিক্রি করছেন। তেহারি বসিয়েছেন রাইস কুকারে। একটু পরই তৈরি হয়ে গেল। ফিরনি খাবারের বাটিতে ছোট্ট এক বাটি তেহারি দশ ইউয়ান। বাবর ভাই বিক্রি করছেন। চীনারা খাচ্ছে মজা করে।

বাবর সাহেবের স্ত্রী চীনা মেয়েদের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছেন এবং দশ ইউয়ান করে নিচ্ছেন। পাটের তৈরি ছোট্ ছোট পুতুল বিক্রি করছেন বাবর সাহেবের সুন্দরী শ্যালিকা, সেটারও দাম দশ ইউয়ান। বেশ কয়েকটা টিপের পাতা রয়েছে। স্টোনের তৈরি টিপ। আমাদের গাউছিয়াতে বিক্রি হয় সত্তর টাকা করে পাতা। এখানে একটি করে টিপ বিক্রি হচ্ছে। চীনা তরুণ ও তরুণীরা কপালে টিপ পরছেন। এটা বিক্রি করছেন বাবর সাহেবের শাশুড়ি। টিপের দাম দশ ইউয়ান প্রতি পিস। স্টলের অন্য কিছুর দাম জিজ্ঞাসা করা্র প্রয়োজন বোধ করলাম না। কারণ আমার ধারণা সব কিছুর দামই বোধহয় দশ ইউয়ান। হ-য-ব-র-ল এর দর্জির ফিতায় যেমন ২৬ ইঞ্চি ছাড়া আর কোনো দাগ ছিল না তেমনি বাবর সাহেবেরও বোধহয় দশ ইউয়ান ছাড়া অন্য কোনো ট্যাগ ছিল না। যাই হোক এদিকে ক্ষুধায় প্রাণ যায়। কিন্তু তেহারির বাটি নিঃশেষ। মানে আমাদের কপালে কিছু জোটার আগেই হাঁড়ি খালি।

শিহাবের ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ হলো। এবার মেলাটা একটু ঘুরে তারপর পার্ক দেখতে বের হলাম। প্রথম যেদিকে গেলাম সেখানে মজাদার সব রাইড। বিশাল এক ফেয়ার হুইল। এটা বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু ফেয়ার হুইল। আরও যে কি ভয়ংকর সব রাইড রয়েছে সেটা না দেখলে বোঝানো মুশকিল। বিশাল ও ভয়ংকর একটি রোলার কোস্টারও রয়েছে। চড়ার ইচ্ছা নেই, তবে দেখতে সত্যিই মজা লাগে। এরই মধ্যে দেখি খাবারের স্টলে আলুভাজা বিক্রি হচ্ছে। কাঠির মধ্যে পুরো আলুটা পাতলা চিপসের মতো করে পেঁচিয়ে ডুবো তেলে ভেজে তোলা হচ্ছে। শিহাব আর আমি দুজনে দুটি স্টিক কিনলাম। দামটা শিহাবই দিল। জীবনে এত স্বাদের খাবার খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল বলেই হয়তো এত মজা লেগেছিল খাবারটা।

ছাওইয়াং পার্কে বেশ অনেকক্ষণ ঘুরে এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে শিহাব সাহেব আমাকে নিয়ে সাবওয়ে স্টেশনের পথে হাঁটা দিলেন। কারণ বাস স্টপেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার সেই লম্বা পথ পাড়ি। আলুভাজা তো হজম হয়ে গেছে। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। একবার ভাবলাম বলি, ভাই কিছু খাবার খাওয়ান। কারণ আমার পকেট শূন্য। কিন্তু বলতে পারলাম না সংকোচে। হয়তো ভাববেন মহিলাটি তো বেজায় লোভী।

ছাওইয়াং পার্কে আবার আমরা গিয়েছিলাম পরের বছর শরৎ কালে। বেইজিং থেকে আমি চলে আসার এক সপ্তাহ আগে। সেদিন প্রায় পুরো পার্কটি ঘুরেছিলাম। অসাধারণ সুন্দর! বিশাল বড় লেক। সেই লেকের ধার দিয়ে হেঁটে বেড়াতে যেমন ভালো লেগেছিল তেমনি এর সবুজ মাঠে ঘাসের উপর বসে থাকতেও চমৎকার লেগেছিল। ছা্ওইয়াং পার্কে অনেকেই তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করে। অনেকে দড়ির দোলনায় দিব্যি শুয়ে থাকে গাছের ছায়ায়। আমিও এমন একটি দোলনায় বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে গাছের ছায়া, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শান্তি উপভোগ করেছি।

বেইজিং থেকে যখন চলে আসি তখন শরৎ কাল। পাতা ঝরার দিন চলছে। তেমনি ঝরা পাতার মতো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোও রেখে এসেছি বেইজিং শহরের বুকে। সময়ের হাওয়ায় সেগুলো উড়ে গেলেও স্মৃতিপটে তারা চির সবুজ হয়ে আছে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ জানুয়ারি ২০১৭/তারা