ঢাকা, বুধবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৪ মে ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

‘কোয়ালিটি প্রোডাক্ট নিশ্চিত করতে হবে’

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১০-১২ ৯:২৬:৫৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৯ ৫:৪০:৪২ পিএম

অধ্যবসায়ই সাফল্যের মূলমন্ত্র। কিছু ব্যক্তির সাফল্য বা অর্জন দেশকেও গর্বিত করে। তাদের একজন বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি দেশের বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন। ইস্ট-ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ, ইস্ট-ওয়েস্ট নার্সিং কলেজ, আইচি মেডিক্যাল কলেজ ও আপডেট ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি।

ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন দীর্ঘ ১০ বছর জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটিতে চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষায় তার কৃতিত্বের মধ্য দিয়ে দেশের সম্মান বাড়িয়েছেন। প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলোর অভিভাবক রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন দেশের মেডিক্যাল খাতের বিভিন্ন সমস্যা এবং তার সমাধানের উপায় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির প্রধান প্রতিবেদক হাসান মাহামুদ।

রাইজিংবিডি : দেশের বর্তমান মেডিক্যাল শিক্ষার প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন।
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : মেডিক্যাল হলো প্রমিজিং একটা সেক্টর। আমাদের দেশে ৬৭টি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ এবং ৩০টি পাবলিক মেডিক্যাল কলেজ আছে। আমি বলব না যে, ৬৭টা মেডিক্যাল কলেজেরই ক্লাস স্ট্যান্ডার্ড ভালো এবং তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে, অবশ্যই না। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কলেজে শিক্ষার মান ভালো। তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে। বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অনেক বিষয়ের শিক্ষক নেই। প্রাইভেট সেক্টরের টিচাররা সেখানে গিয়ে ক্লাশ নিচ্ছেন। এজন্য কোয়ালিটি এডুকেশনের প্রশ্নে এই জায়গায় আমাদের একটু দৃষ্টিপাত করা উচিত।

আমাদের দেশে এই মুহূর্তে যেসব স্টুডেন্ট মেডিক্যাল পড়ার জন্য ইন্টারেস্টেড, তাদের একটি বিরাট অংশ আসে মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে। উচ্চবিত্ত ফ্যামিলির ছেলেরা অনেকেই মেডিক্যালে পড়তে এখন আগ্রহী না। তারা অন্যান্য পেশাগুলোকে বেছে নেয়। আর আমার দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এই দুইটা গ্রুপ থেকে ছেলে-মেয়েরা আসে। সব স্তরের শিক্ষার্থীদের এই পেশায় আগ্রহী করতে পারলে উন্নতিটাও বিস্তৃত হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অবকাঠামো ডেভেলপ করা। পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন। তবে শিক্ষক রাতারাতি তৈরি করা যাবে না। এর জন্য যে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউশন আছে, যেমন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বিএমডিসি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ পুরনো কয়েকটা মেডিক্যাল কলেজ, সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের কিছু যদি যোগ করা যায় তাহলে প্রাইভেট সেক্টর দ্রুত সময়ে তাদের ম্যানপাওয়ার বাড়াতে পারবে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমাধান হবে।

রাইজিংবিডি : এখন ভর্তি পরীক্ষা মৌসুম চলছে। ভর্তি আবেদনে যে মার্ক চাওয়া হয়, তা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কতটা প্রযোজ্য বলে আপনি মনে করেন?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : গত বছর পর্যন্ত আমরা ২০১১ সালের ভর্তি নীতিমালার আলোকে ভর্তি করছিলাম। এ বছর হঠাৎ একটা বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বলা যায়, বড় পরিবর্তন। গত বছর পর্যন্ত এসএসসি ও এইচএসসি মিলে জিপিএ ৮ লাগত আবেদন করতে। এ বছর জিপিএ ৯ চাওয়া হয়েছে। জিপিএ ৯ মানে সেটা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মার্কস। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকান, তাদের আবেদন করতে অনেক কম মার্কস লাগে। সেখানে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মার্কস পেলে হয়। বিভিন্ন দেশ, যেমন: ভারত, নেপাল পাকিস্তান, মালদ্বীপ, এসব দেশ অ্যাভারেজ ৬০ পার্সেন্ট মার্কস পেলে তারা ভর্তি করে নেয়। আমাদের সেই হিসাবে সাধারণ ছেলেমেয়েদের জন্য কোটাটা একটু কঠিন। তবে সুসংবাদ যেটা সেটা হলো- ডে বাই ডে দেশের ৪ বা ৫ পাওয়া জিপিএর সংখ্যা বাড়ছে। তারই ধারবাহিকতায় জিপিএ ৯ কারার পরও এ বছর ৯০ হাজার ৪২০ জন ছেলে মেয়ে অ্যাপ্লাই করেছে মেডিক্যালে পড়ার জন্য।

রাইজিংবিডি : আমাদের বেসরকারি মেডিক্যালে সেক্টর কি সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : এই মুহূর্তে আমাদের দেশে প্রতিবছর এভারেজে পাঁচ হাজারের মতো ডাক্তার বের হয়ে আসছে। আমাদের এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২১ সাল নাগাদ বছরে ৬ হাজার ৭০০ ডাক্তার এবং ২ হাজার ৫০০ করে ডেন্টাল সার্জন তৈরি করতে হবে। তবে আমরা সেই পর্যায়ে যেতে পারিনি। এখনো স্বল্পতা রয়ে গেছে ১ হাজার ৭০০ এর মতো। ঠিক ডেন্টাল সার্জনের টার্গেট আড়াই হাজার হলেও ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ বেশি ডেন্টাল সার্জন তৈরি হচ্ছে না। এখানে আমাদের ৫০ পার্সেন্ট শর্ট। এ কারণে মেধাবী ছেলেমেয়ে যারা আছে, তাদেরকে বেশি করে টেকনিক্যাল এডুকেশন নিতে হবে। তাদের সে সুযোগ দেওয়া দরকার। তবে শুধু সুযোগ দিলেই হবে না, কোয়ালিটি মেইনটেইন করতে হবে। কোয়ালিটি মেনটেইন না করে যদি আমরা ডাক্তার বা ডেন্টিস্ট তৈরি করি, তাহলে এটা সমাজের আরেকটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য তাকে কোয়ালিটি এডুকেশন (মানসম্মত শিক্ষা) দিয়ে কোয়ালিটি প্রোডাক্ট নিশ্চিত করতে হবে।

রাইজিংবিডি : এই খাতের অর্থনৈতিক অবদান সম্পর্কে বলবেন?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : দেশে বর্তমানে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে প্রায় ৬০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৯ হাজার ৬৩৫ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। ১৩ হাজার ৭২০ জন নার্স। অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের স্টাফ, রিসিপশন, মার্কেটিং, আয়া, ওয়ার্ড বয়সহ ৩৩ হাজার ২৪০ জন। সবমিলিয়ে ৬০ হাজারের কাছাকাছি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। একই সঙ্গে, প্রায় ৩৫ হাজারের মতো রোগী আউটডোরে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। ইনডোরে বেসরকারি পর্যায়ে ২১ হাজার ২৫০ বেড আছে, যেখানে ১০ শতাংশ বেড হচ্ছে ফ্রি। ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ৭০০ রোগী গড়ে ভর্তি হচ্ছেন। এভাবে এটা সমাজের বিরাট কন্ট্রিবিউশনের সাথে প্রাইভেট মেডিক্যাল  ও ডেন্টাল জড়িত।

রাইজিংবিডি : বলেছিলেন, উচ্চবিত্তরা মেডিক্যাল শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী নয়। এর কারণ কী?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : মেডিক্যাল শিক্ষা অনেক সময়সাপেক্ষ। ইন্টার্নিসহ একজন শিক্ষার্থীর এমবিবিএস পাশ করতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে ৬ বছর। তারপর ২ থেকে ৩ বছর পর সরকার তাকে সুযোগ দিচ্ছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে ভর্তির জন্য। আর বর্তমানে এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি দ্বারা সমাজে ভালো চাকরি দিতে পারে না। এজন্য স্বাভাবিকভাবে তার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করার প্রশ্ন ওঠে। এফসিপিএস, এমডি, এসব ডিগ্রি নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে। এ ডিগ্রিগুলো পেতে তিন বছর পর আবার লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে, পাশ করতে হবে। যখন সে কোর্সে ঢুকল, এই কোর্সটা হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ বছর। এক চান্সে এই পাঁচ বছরে কোর্স শেষ করতে পারে, এমন লোকের সংখ্যা ১০ শতাংশও নেই। ৯০ শতাংশ ছেলে-মেয়েকেই পাঁচ বছরের জায়গায় সাত বছর সময় দিতে হয়। এভাবে একজন ডাক্তার স্পেশালিস্ট হওয়ার জন্য তার বয়স ৩৫ থেকে ৩৬ হয়ে যায়। তারপর তার জীবনে স্টাবলিশমেন্ট।

স্বাভাবিকভাবে যারা আর্থিকভাবে সলভেন্স (স্বচ্ছল), তারা এই দীর্ঘ পথে যেতে চান না। তারা বিবিএ, এমবিএর মতো ব্যবসায়িক লাইনে পড়াশুনা করছে। দেশের বাইরে গিয়ে একাউন্টিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্টে স্বল্পমেয়াদী কোর্স করে কর্মজীবনে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এটা মেডিক্যাল সেক্টরে সম্ভব না। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, যেভাবে এই খাতকে মূল্যায়ন করা দরকার, সেটা এ সমাজে নেই।

ডিগ্রি পাওয়ার পরপরই চিকিৎসকের কাছে রোগী চলে আসবে এরকম কোনো সিস্টেম আমাদের দেশে ডেভেলপ করে নাই। কারণ, আমাদের দেশে রেফারাল সিস্টেম নাই। একজন ডাক্তার সে যখন রোগীটা দেখবে স্বাভাবিক সাধারণ রোগগুলো দেখবে, ডায়াগনসিস করবে, ট্রিটমেন্ট দেবে। কিন্তু আমাদের দেশে সাধারণত মেন্টালিটি হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখানো। সর্দি-কাশির জন্যও একজন রোগী ডাক্তারের কাছে যাবে না। এজন্য ডাক্তার কোন রোগী পায় না। তার রোগী হয় না। স্বাভাবিকভাবে সমাজে তার দেওয়ার মতো কিছু থাকে না।

রাইজিংবিডি : বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচুর বিদেশি শিক্ষার্থী আসছে। বিশেষ করে চলতি শিক্ষাবর্ষে আপনাদের মেডিক্যালেই ৫০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে করণীয় কী?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : বাইরের স্টুডেন্ট সেসব প্রতিষ্ঠানকে পছন্দ করে, যেখানে অবকাঠামো ভালো, ভালো মানের শিক্ষক আছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ভালো। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে কিন্তু আপনি বাইরের স্টুডেন্ট দেখতে পাবেন না।

ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজে ১২০টি আসনে মেডিক্যাল স্টুডেন্ট ভর্তি করা হয়। এবারো ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৬০টি আসনে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে এখানে। এবার অন্য তিনটি মেডিক্যালে ৫০ শতাংশ বিদেশি স্টুডেন্ট ভর্তি হয়েছে। আমার মতে, এই সংখ্যা আরো বাড়ত, যদি ভিসা ব্যবস্থা আরো সহজ করা যেত। যেমন: আমাদের এখানে ট্যুরিস্ট বা অন এরাইভাল ভিসায় কোনো শিক্ষার্থী আসলে তাকে আর স্টুডেন্ট ভিসা দেওয়া হয় না। ভিসা প্রক্রিয়াও অনেক দীর্ঘ। এমনকি বাংলাদেশে স্টুডেন্ট ভিসা পেতে অন্যান্য দেশের তুলনায় কষ্ট বেশি। ভিসা ব্যবস্থা আরো সহজ করা গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো বাড়ত। বিষয়টি যেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখভাল করে, তাদের কাছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষার্থীদের তালিকাও থাকে। সুতরাং তারা আবেদন করলেই তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন। যেটা বর্তমানে অনেক বেশি কঠিন।

দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তে আসার একটি বিরাট অর্থনৈতিক অবদান আছে। একজন শিক্ষার্থী ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করে পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকা। আমি ব্যক্তিগতভাবে হিসাব করেছিলাম, শুধুমাত্র বাংলাদেশে মেডিক্যালে পড়ার ক্ষেত্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকার মতো বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে। গত শিক্ষাবর্ষে ৬০০ জনের বেশি বাইরের শিক্ষার্থী দেশে এসেছিল। মেডিক্যাল ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পড়তেও বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসছেন। এ খাতের বিরাট একটি সম্ভাবনা আছে। অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থী কিন্তু তাদের নিজেদের দেশে আমাদের অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করে। এ মার্কেটটাকে আরো বেশি বাড়ানো প্রয়োজন।

রাইজিংবিডি : রেফারেল সিস্টেম করার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিএমডিসিকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে দিতে পারে। যেমনটা ইংল্যান্ডে বা আশেপাশের উন্নত দেশে হয়। সেখানে শুরুতে রোগীকে একজন হাউজ চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। সে দেখে রেফার্ড করলে সিনিয়র একজন কনসালটেন্ট দেখতে পারবেন। সিনিয়র ডাক্তাররা সাধারণ রোগের চিকিৎসা জুনিয়র ডাক্তারদের রেফার্ড করে দিতে পারে। জুনিয়র ডাক্তাররা এ রোগীটাকে প্রথমে হ্যান্ডেল করবে। তারপরে প্রয়োজনে সে রেফার করবে সিনিয়র ডাক্তারের কাছে। যদি রোগটি কমপ্লিকেটেড হয় তাহলে।

এই পরিবর্তন দুইভাবে সম্ভব- আইন করে এবং মানসিকতা পরিবর্তন করে। এখানে সিনিয়র ডাক্তাররা সব স্তরের রোগী দেখেন। জুনিয়র ডাক্তাররা রোগী পায় না। এটা আইনের মাধ্যমে করা সম্ভব, পাশাপাশি মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে করা সম্ভব। ভূমিকা নিতে হবে বিএমডিসিকে।

রাইজিংবিডি : অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছিলেন। এখনো দেশের অনেক ইনস্টিটিউট অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে কি সরকারের কোনো কনট্রিবিউশন করা উচিত?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : সরকারের কন্ট্রিবিউশন প্রাইভেট সেক্টরে আসছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। এক্ষেত্রে ফাইনান্সিয়ারি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করে  না। তবে পরোক্ষভাবে সরকার চাইলে এটি করা যায়। এ জন্য অনেক বিদেশি দাতা সংস্থা আছে, যেমন: ডব্লিউএচও, ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক। তারা খুব স্বল্প সুদে বেসকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য করতে পারে। ১৫ শতাংশ ইন্টারেস্টে লোন নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান করা এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ইনকাম দিয়ে একদিকে ইন্টারেস্ট পরিশোধ করা, আরেকদিকে প্রতিষ্ঠান ডেভেলপ করা খুবই ডিফিকাল্ট। এজন্য আমার মনে হয়, এসব ক্ষেত্রে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। সরাসরি সহযোগিতা করার দরকার নাই। জাইকা ১ শতাংশ ইন্টারেস্টে লোন দিচ্ছে গার্মেন্টেসের জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকের মাধ্যমে যখন ঋণ বিতরণ করছে, তখন তা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ইন্টারেস্ট হচ্ছে। এভাবে যদি একটা ডেন্টাল কলেজের জন্য করে দেওয়া হয়, তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তাদের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবে। এ উদ্যোগ সরকারের তরফ থেকে হতে পারে। আরেকটা হচ্ছে, কিছু কিছু মালিক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করছে, অজ্ঞতার কারণে অথবা প্ল্যানিংয়ের অভাবে তারা অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারছে না। এক্সপেকটেড ওয়েতে তারা পারছেন না। সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের প্রাইভেট মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাদেরকে কিছু সহযোগিতা করি।

এ ছাড়া শিক্ষকস্বল্পতা আছে। আমরা ই-লার্নিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারি। একজন ভালো টিচার আমার প্রতিষ্ঠানে আছে, তার একটা লেকচার বিভিন্ন কলেজে যেখানে ভালো টিচার নাই বা এক্সপেরিয়েন্স টিচার নাই তাদের সহযোগিতা করতে পারি ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে। এভাবে কিছু কিছু আধুনিকায়নের মাধ্যমে সম্ভব। আমি মনে করি, নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স না দিয়ে যে প্রতিষ্ঠান অলরেডি লাইসেন্স পেয়েছে এদের নার্সিং করা।

রাইজিংবিডি : চিকিসৎকদের পাশাপাশি নার্সদের বিষয়টিও জড়িত। দেশে এখনো পর্যাপ্ত নার্স নেই। এ সংকট থেকে উত্তরণে করণীয় কী?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : আমাদের দেশে ৬১ হাজার ডাক্তার এবং ৩৫ হাজার নার্স আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একজন ডাক্তারের বিপরীতে ৩ জন নার্স থাকা দরকার। এই হিসাবে আমাদের ১ লাখ ৮০ হাজার নার্স থাকা উচিৎ। কিন্তু সে সংখ্যা মাত্র ৩৫ হাজার। নার্সদের এই অপ্রতুলতা চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নার্সের সংখ্যা কম থাকার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা দায়ী। নার্স পেশার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এক সময় ছিল না। তাই এই পেশা অনেকটাই অবহেলিত ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নার্সিং পেশার পদমর্যাদা বাড়িয়েছেন। তিনি নার্সিং পেশাকে সমাজে মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসাবে রূপ দিচ্ছেন। তাদের সেকেন্ড ক্লাস অফিসারের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এখন ছেলে-মেয়েরা নার্সিং পেশায় আসছেন। তবে পেশা গ্রহণের এই হার আরো বেশি প্রয়োজন। এ জন্য পেশার প্রতি আত্মনিবেদন বেশি থাকতে হবে, পেশাকে ভালোবেসে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলো বা কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতি আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে।

রাইজিংবিডি : দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদ মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মেডিক্যাল সংশ্লিষ্ট কাউকে জঙ্গিবাদে জড়িত হতে দেখা যায়নি। এর কারণ কী হতে পারে?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : প্রথমত, এই পেশায় সবাই সেবার ব্রত নিয়েই আসে। যখন তারা মেডিক্যালে ভর্তি হয়, তখন থেকে তাদের মধ্যে সহযোগিতা করার, সেবা করার মানসিকতা তৈরি হয়। তখন আর মানুষকে মেরে ফেলার মতো মানসিকতা তৈরি হয় না। যে কারণে এই পেশায় কেউ জঙ্গিবাদের মতো জঘন্য কাজে জড়িত নয় বলে আমি মনে করি। এমনকি ভবিষ্যতেও কাউকে দেখতে পাব না বলে আমার বিশ্বাস।

রাইজিংবিডি : ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ কী উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছিলেন?
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : সেবার মনোভাব নিয়েই আমি ২০০০ সালে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। ২০০৩ সালে ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ চালু হয়। এখন থেকে অলরেডি সাতটা ব্যাচ হয়ে বের হয়ে গেছে। আমার উদ্দেশ্য শুরু থেকেই ছিল কোয়ালিটি ডাক্তার তৈরি করা। নিজেদের তৈরি একজন ফিউচারে যেন আমার চিকিৎসক হতে পারে। আমি যদি আমার ডাক্তারের ওপর কনফিডেন্স না আনতে পারি, তাহলে আমার উদ্দেশ্য সফল হবে কীভাবে? মূলত কোয়ালিটি ডাক্তার তৈরির লক্ষ্যে আমার এ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।

রাইজিংবিডি : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন : রাইজিংবিডি ডটকমকেও ধন্যবাদ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৬/হাসান/রফিক

Walton Laptop