ঢাকা, বুধবার, ৪ মাঘ ১৪২৩, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:
চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন

গ্রাম সাংবাদিকতার শিক্ষক

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৯ ৮:০৯:০৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৩৩:১৩ পিএম

|| রফিকুল ইসলাম মন্টু ||

মোনাজাতউদ্দিন। সৎ, নির্ভীক, নিষ্ঠাবান এবং কঠোর পরিশ্রমী এক সাংবাদিকের নাম। যাঁর পরিচিতি ‘চারণ সাংবাদিক’ হিসেবে। তাঁর খবরের ক্ষেত্র ছিল গ্রাম। অভাব-অনটন থেকে শুরু করে, সংকট-সম্ভাবনা আর দুর্নীতি অনিয়মের খবর প্রকাশের আলোয় নিয়ে এসেছেন তিনি। প্রত্যন্ত অজপাড়াগাঁয়ের খবর ধাক্কা দিয়েছে কেন্দ্রে। গ্রামের খবরকে ঘিরে তাঁর উপলব্ধি জাতীয় খবরের গন্ডি ছুঁয়েছে। উত্তরের গ্রামীণ জনপদের সেই খেটে খাওয়া মানুষের খবরও জায়গা করে নিয়েছে জাতীয় পত্রিকার প্রথম পাতায়; জাতীয় খবরের পাশে। খবরের গভীর অনুসন্ধান, অতি সহজ-সরল উপস্থাপন, পাঠকের বোধগম্য শব্দ আর বাক্য গঠনে বিশেষ পারদর্শিতায় মোনাজাতউদ্দিনের ঠাঁই হয়েছে পাঠক মনে। শুধু চোখের দেখা নয়, দেখার চোখ দিয়ে দেখেছেন তিনি। উপলব্ধি করেছেন অতি দরদ দিয়ে। আর তাই তাঁর নিবিড় শব্দ-বুনন পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে। তাঁর বলপয়েন্টের ডগা থেকে নিউজপ্রিন্ট কাগজে এক একটি সংবাদ জীবন্ত হয়ে উঠতো। খবরের নেশায় গ্রামীণ জনপদের মাঠ-ঘাট চষে বেড়ানো প্রথিতযশা এই সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহকালেই অকালে প্রাণ হারান।

 

তিনি সাংবাদিক, তিনি সাংবাদিকতার শিক্ষক। শুধু গ্রামের সাংবাদিক নয়, সকল স্তরের সাংবাদিকদেরই শেখার রয়েছে তাঁর কাছ থেকে। মোনাজাতউদ্দিনের শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন, সংবাদ-নির্মাণের পরিকল্পনা, এমনকি তথ্য সংগ্রহের কৌশল- সবকিছু থেকেই আমরা প্রতিনিয়ত শিখছি। শব্দ এবং বাক্যের ব্যবহার পাঠককে ঘটনার কাছে নিয়ে যেতো। কোন মানুষ সম্পর্কে বলতে গেলে মূল বিষয়ের বাইরে অসাধারণ একটা বিবরণ থাকতো, যাতে পাঠক সংবাদ পড়তে আগ্রহী হতেন। তাঁর সংবাদে ব্যবহৃত কিছু শব্দ যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কিছু শব্দ-বাক্য সংবাদকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। লেখাতেই ফুটে ওঠে কতটা গভীর উপলব্ধি দিয়ে দেখেছেন তিনি। এখানেই দেখার চোখের বিশেষত্ব। সাধারণভাবে আমরা চোখ দিয়ে দেখি। দেখার চোখ আমাদের নেই বললেই চলে। আর এখনকার সাংবাদিকতায় দেখার চোখের খুব বেশি প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় না। গণমাধ্যম চায় তরতাজা গরম খবর। এর অধিকাংশই চলমান ঘটনা নির্ভর। দেখার চোখ দিয়ে দেখার সময় কোথায়?

 

গ্রাম সমাজের আসল চেহারা পাঠকের সামনে তুলে এনে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক ভিন্নধারা যুক্ত করেছেন মোনাজাতউদ্দিন। কঠোর পরিশ্রম, প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতা অতিক্রমের ভেতর দিয়ে সারাক্ষণ কাজের মনোনিবেশ করেছেন তিনি। গ্রামীণ সমাজ-জীবনের অভ্যন্তরের ক্ষত তুলে ধরেছেন শহরের চশমা আঁটা পাঠকের সামনে। প্রশাসনের ঘাপলা, সরকারি বরাদ্দ বিতরণে অনিয়ম, সুবিধাভোগীর দাপট, ভূমিহীন মানুষের জীবনের লড়াই, খেয়ে-না খেয়ে জীবন অতিবাহিত করা মানুষের অধিকার-সবই নিপুণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন খবরে। তৎকালীন সংবাদের পাঠকেরা তাঁর একটি খবরের জন্য অপেক্ষা করতেন। পাঠকের চিন্তায় কাজ করতো, কাল সকালে মোনাজাতউদ্দিন নতুন কী নিয়ে আসছেন! শুধু সংবাদ লেখার মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকতেন না। সংবাদের পেছনের গল্পগুলোও তিনি জানাতেন পাঠকদের। এক একটি সংবাদ তৈরির পেছনেও যেন রয়েছে বড় বড় গল্প। দিনের পর দিন অপেক্ষা একটি নতুন তথ্যের জন্যে। মোনাজাতউদ্দিনের লেখা ‘সংবাদ নেপথ্য’ ও ‘পথ থেকে পথে’ বাইয়ে এমন অনেক গল্পের বিবরণ রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহে কতটা কৌশলী হওয়া যায়, কত ধরণের বিকল্প অবলম্বন করা যায়, তা আমরা জানতে পারি এইসব বই থেকে।

 

পেশাগত জীবনে সত্য প্রকাশে কখনো আপোস করেননি মোনাজাতউদ্দিন। কোন ঘটনা ঘটলে, তা যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, প্রকাশ করতেই হবে। সরকারি বরাদ্দ, ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের খবর, কালোবাজারির খবর লিখতে গিয়ে কোন পরিচিতজনের বিরুদ্ধেই হয়তো কলম ধরতে হয়েছে। যে ভাবেই হোক, কৌশলে সেই সংবাদ প্রকাশ করেছেন। কখনো সংবাদ প্রকাশের পর নিজেই কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। কিন্তু সত্য প্রকাশে কোন কার্পণ্য করেননি। শত বাঁধা অতিক্রম করেও সত্যের সন্ধানে ছুটেছেন অবিরাম। নিজের পত্রিকার অর্থায়নকারীর বিরুদ্ধে খবর লিখতেও তাঁর হাত কাঁপেনি। ১৯৭২ সালে রংপুর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক রংপুর’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। পাবনার এক ব্যবসায়ী এই পত্রিকার অর্থ-জোগানদাতা। কয়েকজন তরুণ রিপোর্টার নিয়ে চলছিল এই পত্রিকা। প্রকাশের পর থেকেই তরতাজা খবরে হটকেকের মত বিক্রি হতে লাগলো পত্রিকাটি। একবার কালোবাজারিদের ৮০ বস্তা চিনি গায়েবের খবর এলো। পত্রিকার অর্থ-জোগানদাতা ব্যক্তিটি নিজেই চিনি গায়েবের হোতা। মোনাজাতউদ্দিন নিজেই অতি কৌশলে এই খবরটি তৈরি করেছিলেন। গভীর রাতে যখন পত্রিকায় খবর ছাপা হচ্ছে তখন প্রেসে হাজির অর্থ-জোগানদাতা নিজেই। এসে বলেন, ‘আমার টাকায় পত্রিকা বেরোয়, সেই পত্রিকায় আমারই বিরুদ্ধে খবর ছাপা হবে? আপনি পাগল নাকি?’

 

জবাবে মোনাজাতউদ্দিন বলেছিলেন, ‘শান্ত হোন। এ খবর ছাপা হবে। ঘটনা সত্য। আমি নিজে লিখেছি।’ খবরটি চাপা দেওয়ার জন্য অর্থ-জোগানদাতা প্রথমে রাগান্বিত হন। পরে নরম সুরে অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে টাকার প্রস্তাব দিয়ে বসেন। এক হাজার, দুই হাজার। কিন্তু মোনাজাতউদ্দিন অনড়। শেষ পর্যন্ত মেয়ের দিব্যি দেওয়ার পর মোনাজাতউদ্দিন আবেগতাড়িত হয়ে মেশিনম্যানকে ম্যাটার নামাতে বলেন।

 

অনিয়ম-দুর্নীতি আর সমাজের নানান অসঙ্গতি নিয়ে প্রতিবেদন লিখে বহুবার সংশ্লিষ্টদের চাপের মুখেও পড়েছেন মোনাজাতউদ্দিন। তবে অভিযোগ পেলে সত্যটা তুলে ধরেছেন তিনি। সোজাসাপ্টা বলে ফেলেছেন সব কথা। কার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেটা তার কাছে কোন বিষয় ছিল না। বিবেচনায় ছিল ঘটনাটি সত্য কিনা। দৈনিক সংবাদ-এ ‘সরেজমিন প্রতিবেদন-নাচোল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন :

 

‘‘জমি জালিয়াতির ঘটনা চলছে নাচোলে। ধনী ও প্রভাবশালীরা বিভিন্ন পন্থায় বাগিয়ে নিচ্ছে সরকারি খাসজমি ও পুকুর। বেহাত হয়ে যাচ্ছে ঘোষিত ‘শত্রু সম্পত্তি’। এ অভিযোগ করেছেন রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক; এমনকি অভিযোগ করা হয়েছে উপজেলা প্রশাসন থেকেও। তাদের অভিযোগের সুর শুনে মনে হয়েছে, ব্যাপারটা তাদের চোখের সামনে ঘটছে, অথচ তারা সবাই বড় অসহায়। উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের ফাইলে জমা হয়ে আছে এ সংক্রান্ত শতাধিক অভিযোগপত্র, সাধারণ দরখাস্ত, কিন্তু এর একটিরও কোনো ব্যবস্থা তিনি আজ পর্যন্ত নিতে পারেননি। ফাইলবন্দি হয়ে আছে বহু কৃষকের ফরিয়াদ।’’      

 

শুধুমাত্র বর্ণনা দিয়ে পাঠককে ঘটনার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জাদুকর ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। এই বর্ণনা থেকে পাঠক তথ্য পেতে পারে। খবরটি পড়তে উৎসাহিত হয়ে উঠতে পারে। জাদুকরী বর্ণনাই যেন গ্রামের নিরন্ন, অপুষ্টিতে ভোগা, কঙ্কালসার মানুষদের সেই সাদামাটা খবরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হতো। ‘শাহা আলম ও মজিবরের কাহিনী’ নামক বইয়ের কয়েকটি লাইন থেকে বাক্য গঠনের বিশেষত্ব ফুটে ওঠে। এক জায়গায় লিখেছেন :

 

‘‘ফিরোজা বেগমের মাথায় বাসন-কোসন ঠাসা একটা চটের বস্তা। কোথাও ফাটা, কড়াইয়ের কান কিংবা পাতিলের গোটা গোটা কালো তলা ঠেলে বেরিয়েছে। বস্তার কোন অংশে সুতলির ত্যাড়াব্যাড়া সেলাই। মহিলার আরেক হাতে কাঁথা কাপড়ের বোচকা। বিবর্ণ আগোছালো শাড়ি। হাতাফাটা ব্লাউজ। রগফোলা কবজিতে এক টুকরো সবুজ সুতো পেঁচানো। গলা ও বাহুতে একগুচ্ছ করে তাবিজ।’’

 

পাঠক হিসাবে এই কয়েকটি লাইন পড়লেই একটা চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফিরোজা বেগম কীভাবে যাচ্ছেন, তা খুব সহজেই অনুভব করতে পারেন পাঠক। এ সবই মোনাজাতউদ্দিনের গভীর উপলব্ধির ফসল। যে কোন প্রতিবেদনই বলে দেবে সাংবাদিক ঘটনার কতটা গভীরে গিয়েছেন, কতটা উপলব্ধি করেছেন।

 

নগর সাংবাদিকতাকে টেক্কা দিয়ে গ্রাম-সাংবাদিকতাকে নগরে পৌঁছে দিয়েছেন মোনাজাতউদ্দিন। তিনি দেখিয়েছেন শহরের চেয়েও অনেক বড় খবর থাকতে পারে প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রামীণ খবরের শেকড়ে দৃষ্টি ছিল তাঁর। আর কোনভাবেই সেটা একদিনে হয়নি। প্রতিটি খবরের পেছনে তিনি সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন প্রচুর। উত্তরবঙ্গের বেশকিছু গ্রামের ওপর সিরিজ প্রতিবেদন লিখেছেন তিনি। আবার সেগুলোর ফলোআপও করেছেন। ছোট ছোট খবর; কিন্তু খুবই ধারালো। মোনাজাতউদ্দিনের গ্রাম সিরিজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কানসোনার মুখ’। এটি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার একটি গ্রাম। এই গ্রামের সিরিজে যেসব প্রতিবেদন ছিল তা হলো ‘কাজলরেখা ও তার শিশুশিক্ষা’, ‘অবহেলার এক শিকার : আনোয়ার বেগম’, ‘সোহরাব-মজনুর কাহিনী’, ‘অসহায় একজন রেজিয়া’, ‘পাশাপাশি দুই চিত্র’, ‘দুঃখিনী মা : দুঃখের মুখ’, ‘দুই ভাই, কেউ কেনে কেউ বেচে’, ‘আফরোজা ও শাহানার কথা’, ‘দুঃখে পোড়া মানুষটি’, ‘মোস্তফা-রাবেয়ার সংবাদ’, ‘ক্ষুদ্র কৃষকের ভূমিকায়’, ‘কল্যাণহীন বর্তমানের ওরা দু’জন’, ‘বর্গাচাষী আজাহার’, ‘আমেনা খাতুনের অভিযোগ-আক্ষেপ কে শোনে?’ ‘আনোয়ার হোসেন’, ‘একজন শিক্ষক : নিজের অঙ্কই যার মেলে না’, ‘ক্ষেতমজুরি করেও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে’, ‘বেকারত্বের হতাশায় গ্রামের ক’জন যুবক’। প্রতিবেদনের ভেতরে না গেলেও শিরোনামগুলো দেখেও মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়, গ্রামের প্রায় সকল বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে, তারই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এসব প্রতিবেদন।

 

গ্রামের খবর অনুসন্ধানে গেলে মোনাজাতউদ্দিনের সামনে থেকে কোনকিছুই এগিয়ে যেতে পারেনি। নিখুঁত দৃষ্টিতে খুঁটিনাটি সব বিষয় উঠে এসেছে তার প্রতিবেদনে। এই গ্রামের প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রেও তা ছিল। আবার ফলোআপ প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও একইভাবে পরিকল্পনা করতেন। প্রতিবেদন প্রকাশের চার বছর পরে মোনাজাতউদ্দিন আবার গিয়েছিলেন কালাসোনা গ্রামে প্রতিবেদন তৈরি করতে। ফলোআপ লিখতে গিয়ে ‘সেই প্রাইমারি স্কুল’ শিরোনামের খবরের একস্থানে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন :

 

‘‘কালাসোনায় ৪ বছরে চোখে পড়বার মতো উন্নয়নের মধ্যে বিদ্যুতের আগমন ছাড়াও গ্রামের প্রাইমারী স্কুলটি আধাপাকা হয়েছে। ইট-সিমেন্টের দেয়াল, ওপরে নতুন টিনের চাল। ... স্কুল ভবনটি নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত হয়েছে নিন্মমানের সামগ্রী। তবুও গ্রামের লোকজন খুশি যে, অনেক দাবির পর স্কুলটি শেষ পর্যন্ত আধাপাকা তো হলো! ... স্কুলটি কিন্তু সহজ ও স্বাভাবিকভাবে পাকা হয়নি। সাড়ে ৫ হাজার টাকা সেলামি দিতে হয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস, ফেসিলিটিজ ডিপার্টমেন্ট ও উপজেলা প্রশাসনের একশ্রেণীর কর্মকর্তাকে। গ্রামবাসী জানালেন, ঘুষ দিতে আমরা বাধ্য হই, কেননা তারা সোজাসুজি বলে দিয়েছে, টাকা না দিলে হাজার চেষ্টা করলেও কাজ হবে না।’’

 

গ্রাম-জীবনের কত বিষয়ের দিকে চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের নজর পড়তো, তা বলে শেষ করার নয়। গ্রামের মানুষের জীবনের পরিবর্তন, কতটা সংগ্রাম করে মানুষেরা বেঁচে আছেন, তা তুলে নিয়ে আসতেন খবরে। শহুরে জীবনের পরিবর্তনের ঢেউ গ্রাম-জীবনে কতটা পৌঁছেছে, তারও বিবরণ থাকতো প্রতিবেদনে। ‘প্রাত্যহিক জীবন’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন :

 

‘‘প্রত্যন্ত গ্রাম করতকান্দিতে দু’একটা পরিবারে টুথপেস্ট-ব্রাশ গেছে, গেছে সুগন্ধি তেল-সাবান, আধুনিক বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী; কিন্তু অধিকাংশ পরিবারে প্রাত্যহিক জীবনযাপন পদ্ধতি রয়ে গেছে অনেক বছরের পুরনো। এখনও এ গ্রামের মহিলারা কাঠ-কয়লা কিংবা ছাই দিয়ে দাঁত মাজে, মাথার চুল পরিষ্কার করে আঠালো এক ধরণের ‘ক্ষার’ দিয়ে। এই ক্ষার তৈরি হয় কলাগাছের বাকল পুড়িয়ে। ক্ষার ব্যবহৃত হয় কাথা-কাপড় ধোয়ার কাজেও। ... কিছু নতুন প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করে করতকান্দির মেয়েরা যা স্থানীয়ভাবে তৈরি। যেমন, তারা কপালে দেওয়ার ‘ফোঁটা’ (টিপ) তৈরি করে কালো রঙের গাভীর দুধ, কেশুর গাছের রস, রান্নাঘরের ঝুলকালি এবং কালোবরণ মহিলার (মাতা) স্তনের দুধ একত্রে মিশিয়ে। এসব উপকরণ একত্রে মেশালে এক রকমের কালো রঙ তৈরি হয়, এই রঙ মেয়েরা বিশেষ করে কিশোরী-যুবতীরা কপালে ফোঁটা দেয়। একে বলে ‘সোহাগ ফোটা’। চালের গুঁড়ার সাথে সাদা পুঁইয়ের রস মেশালে একর রকম রঙ তৈরি হয়, তা দিয়ে বাড়ির আঙিনায় কিংবা দেয়ালে আলপনা আঁকে মেয়েরা। মাথার চুল পাতলা হতে শুরু করলে কেউ খৈল দেয়, কেউ দুর্বাঘাস বেটে দেয়।’’

 

বিষয়গুলো খুবই ছোট, কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। গ্রামের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাপন থেকে শুরু করে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বেকার যুবকদের অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দুর্নীতির সব বিষয়ে কলম ধরেছেন মোনাজাতউদ্দিন। শুধু যে অফিসের এসাইনমেন্ট করেছেন তা নয়, প্রতিবেদন লেখার জন্য নিজেরই একটা পরিকল্পনা থাকতো। অফিসের এসাইনমেন্ট অনুযায়ী সংবাদ প্রতিবেদন লেখার পর তিনি নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতেন। আর অফিস থেকে কোন প্রতিবেদন কিংবা ছবি চেয়ে পাঠালে তা কখনোই মিস করতেন না মোনাজাতউদ্দিন। খবর সংগ্রহ, লেখা এবং প্রেরণের ক্ষেত্রে মোনাজাতউদ্দিনের অভিধানে ‘না’ শব্দটি ছিল না। এবং এটাই ছিল তার সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ। তাঁর সাথে অন্যান্য পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকেরা না পারলেও তাঁকে পারতেই হবে। সাংবাদিকতা জীবনে বহুবার অনেক সংকটের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে বার্তাকক্ষে খবরের প্যাকেট পৌঁছে দিয়েছেন। তাই তো মোনাজাতউদ্দিনের মুখেই এমন কথা শোভা পায় ‘কোন এসাইনমেন্টে আমি জীবনে কখনো ব্যর্থ হইনি।’ 

 

প্রতিবেদন তৈরিতে পূর্ব-পরিকল্পনা যে কতটা জরুরি, তা মোনাজাতউদ্দিনের প্রতিবেদনগুলো পড়লে সহজেই অনুমান করা যায়। গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এই সাংবাদিকের প্রতিবেদন পরিকল্পনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই পরিকল্পনায় আগেই ঠিক করে নিতেন তার কী চাই? কোন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সরেজমিনে যেতে হবে, কাদের সাক্ষাতকার নেওয়া হবে, কী কী ছবি লাগবে, সবকিছুই থাকতো এসব পরিকল্পনায়। আবার কোন কোন প্রতিবেদন তৈরির জন্য পরিকল্পনার আগেও মাঠ ঘুরে আসতেন, যাতে পরিকল্পনাটা সঠিকভাবে করা যায়। এভাবে কঠোর প্ররিশ্রমে নির্মিত হয়েছে এক একটি শক্তিশালী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের পরিকল্পনা তৈরি প্রসঙ্গে জানা যায়, মোনাজাতউদ্দিনের ‘কানসোনার মুখ’ গ্রন্থ থেকে। এই বইয়ের সূচনায় কানসোনা গ্রামের ওপর প্রতিবেদনের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন :

 

‘‘সহকর্মী মলয় ভৌমিকের বাড়ি কানসোনা। অনেকদিন থেকে তার মুখে শুনি সেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষজন আছে, যাদের সংগ্রামী জীবন-কথা লেখা যায়। আমার খসড়া পরিকল্পনা তৈরি হয় এভাবে যে, ঐ গ্রামের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে নিয়ে সচিত্র সিরিজ প্রতিবেদন লিখবো। রাজশাহীতে বসে খসড়া পরিকল্পনার প্রাথমিক ছক তৈরি হয় মলয় ভৌমিকের সহযোগিতায়। ... কানসোনা গ্রামে গিয়ে আমার পূর্ববর্তী পরিকল্পনা পাল্টে যায়। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে নিয়ে নয়, প্রতিবেদন লিখবো গ্রামের কয়েকটি ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন এবং পরিবার সদস্যদের জীবন সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে। গ্রামের যুবকদের সহায়তায় এক সপ্তাহের মধ্যে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ছবি তোলার কাজ শেষ হয়। ... মোট ৫০টি প্রতিবেদন লিখি ওই গ্রামের ওপর। তা থেকে বাছাই করে ১৯টি প্রতিবেদন ‘সংবাদ’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।’’

 

গ্রামের খবর নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদন ছাড়াও মোনাজাতউদ্দিন উত্তরবঙ্গের নানান বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখেছেন দৈনিক সংবাদে। এতে উঠে এসেছে উত্তরের গ্রামের সমাজ-জীবনের চিত্র। গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষকের ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চিকিৎসার বেহাল দশা, যুবকের স্বপ্ন, সমস্যা-সম্ভাবনা, শিল্প-সংস্কৃতি, এমনকি রঙলেপা গ্রামীণ সমাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বহুমূখী অনিয়মের কাহিনী উঠে এসেছে তাঁর প্রতিবেদনে। ‘উত্তরের পাঁচালী’ নামের ধারাবাহিক প্রতিবেদন পড়েছি দৈনিক সংবাদে। উত্তরের পাঁচালীতে মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন :

 

‘‘সত্যি অদ্ভুত সুন্দর দীপনারায়নের হাতের কাজ। একটা চাকু, নিজহাতে বানানো মোটা তুলি, একটা কলমের বাট। আর কিছু মাটি, কিছু রঙ। এসব দিয়েই দীপনারায়নের হাতে রূপ পায় নয়নভোলা ফুলদানি, ছাইদানি, কুপি, ধূপদানি, মূর্তি। নানান আকার নানান রঙ। দেখলাম নিজের ওই হাত দু’টি দিয়ে ‘টি-সেট’ পর্যন্ত বানিয়েছে দীপনারায়ন।... রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর- উত্তরাঞ্চলের সব জায়গাতেই কমবেশি যাচ্ছে আজকাল তার জিনিস।’’      

 

সরেজমিন আর অনুসন্ধানী ধারায় কাজ করেছেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। প্রতিনিয়ত শিখতেন। শেখা থেকে লিখতেন। তরুণ বয়সে একবার সঠিক তথ্যটি না জেনে খবর লেখার মাশুল দিতে হয়েছিল তাঁকে। লোকমুখে শোনা খবর পত্রিকায় প্রকাশ করায় মস্তবড় এক কাণ্ড ঘটে যায়। ভুল খবর লেখার দায় পড়ে মোনাজাতউদ্দিনের ঘাড়ে। ‘সংবাদ নেপথ্য’ নামক গ্রন্থে এগুলো লিখেছেন তিনি। গল্পটা ছিল এরকম, রংপুর সংবাদদাতা হিসেবে তখন দৈনিক আজাদে কাজ করেন মোনাজাতউদ্দিন। একদিন সিদ্দিক হোসেন ওরফে ভ্যাবলা নামের পানের দোকানদার নিসবেতগঞ্জের কৃষক আবু তাহেরের দাঁড়িতে মৌমাছি চাক বেঁধেছে বলে খবর দেয়। মোনাজাতউদ্দিন চমকপ্রদ খবরটির গুরুত্ব ও পাঠকপ্রিয়তা অনুমান করে সত্যতা যাচাই ছাড়াই দ্রুত অফিসে প্রেরণ করেন। সংবাদটি গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। অন্য সংবাদপত্রের সাংবাদিকগণ অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারেন, দাঁড়িতে মৌচাক তো দূরের কথা, ওই এলাকায় আবু তাহের নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই। সেই থেকে না দেখে, না জেনে কোনো বিষয়ে লিখতেন না তিনি। কোনো প্রতিবেদন লেখার জন্য পরিকল্পনা তৈরি, প্রয়োজনীয় সব তথ্য হাতে নিয়ে লেখা শুরুর বিষয়গুলো মোনাজাতউদ্দিন নিজে থেকেই শিখেছেন। এবং এ বিষয়ে তিনি বেশ পারদর্শী। 

   

ছোটবেলা থেকে সংগঠন করার ঝোঁক ছিল চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের। বাল্যকালে মুকুলফৌজের কর্মী হিসাবে যোগদানের মধ্য দিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। আর সংবাদকর্মে যাত্রা শুরু হয় ‘বগুড়া বুলেটিন’-এ লেখালেখির মধ্য দিয়ে। পর্যায়ক্রমে লেখালেখির চর্চা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ১৯৬২ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আওয়াজ’-এর স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে উত্তরাঞ্চলের সংবাদ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন ‘দৈনিক আজাদ’-এ। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে নিজের সম্পাদনায় রংপুর থেকে বের করেন ‘দৈনিক রংপুর’। এক সময় ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এ কাজ করেছেন। তৎকালীন বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক সংবাদ’-এ কাজ করার প্রবল ইচ্ছা ছিল মোনাজাতউদ্দিনের। এজন্য বহুদিন ধরে চেষ্টাও করছিলেন। অবশেষে ১৯৭৬ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’-এর উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত টানা কুড়ি বছর সেখানেই কাজ করেন তিনি। সে কারণে মোনাজাতউদ্দিনের জীবনের সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের মজুরি বৈষম্য এখনকার মত সেকালেও ছিল। ৪ জুন ১৯৭৬ তারিখে ‘দৈনিক সংবাদ’ থেকে পাওয়া নিয়োগপত্রে উত্তরাঞ্চলীয় স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে মোনাজাতউদ্দিনের বেতন ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। বহুমূখী টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে ‘দৈনিক সংবাদ’-এ কুড়িটি বছর অতিবাহিত করেছেন তিনি। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি ‘নিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকায় সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। একই বছর ২৯ ডিসেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন। 

 

গ্রাম সাংবাদিকতায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই সাংবাদিক আপদমস্তক সৃজনশীল মানুষ ছিলেন। শুধু সংবাদ লেখায় নয়, তাঁর সৃজনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকার প্রচ্ছদ অংকনে, কবিতা-ছড়া লেখায়, নাটক লেখায়। এমনকি পরিকল্পনা অনুযায়ী গুছিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অসাধারণ সুন্দর হাতের লেখার অধিকারী ছিলেন। মোনাজাতউদ্দিন রেডিও বাংলাদেশ রংপুর কেন্দ্রের তালিকাভূক্ত নাট্যকার, গীতিকার ও কথক ছিলেন। মঞ্চ নাটকের রচয়িতা হিসাবেও তাঁর সুনাম রয়েছে। শুধু রংপুরের মঞ্চে নয়, ঢাকার মঞ্চেও উঠে এসেছে তাঁর লেখা নাটক।

 

একজন দক্ষ গ্রাম সাংবাদিক হিসাবে মোনাজাতউদ্দিনের খ্যাতি দেশজোড়া। কখনো দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়েছে তাঁর সুনাম। সারাজীবনে কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে অনেক। সংবর্ধনা পেয়েছেন, পুরস্কার পেয়েছেন, পদক পেয়েছেন, ফেলোশীপ পেয়েছেন এমনকি মরণোত্তর একুশে পদকও পেয়েছেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : দিনাজপুর নাট্য সমিতি কর্তৃক সংবর্ধনা ১৯৭৭; জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক ১৯৮৪; আলোর সন্ধানে পত্রিকা কর্তৃক সংবর্ধনা ১৯৮৫; ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব বগুড়া কর্তৃক সম্মাননা সার্টিফিকেট প্রদান ১৯৮৬; ফিলিপস পুরস্কার ১৩৯৩ (বাংলা); ইনষ্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ পুরস্কার ১৯৮৭; রংপুর পদাতিক নাট্যগোষ্ঠী কর্তৃক গুণীজন সংবর্ধনা ১৯৮৮; বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার ১৯৯০; লেখনীর মাধ্যমে প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রত্যক্ষ ও জনপ্রিয় করার দুরূহ প্রচেষ্টা চালানোর জন্য সমাজ ও প্রযুক্তি বিষয়ক পত্রিকা কারিগর সম্মাননা পদক ১৯৯০; অশোকা ফেলোশীপ (অবৈতনিক) লাভ ১৯৯৫; রংপুর জেলা সমিতি, ঢাকা, গুণীজন সংবর্ধনা, ১৯৯৫; ওয়াশিংটনে পদ্মার ঢেউ বাংলা সম্প্রচার কেন্দ্র সম্মাননা প্রদান নাগরিক নাট্যগোষ্ঠী পুরস্কার, রংপুর ১৯৯৬; লালমনিরহাট ফাউন্ডেশন ও উন্নয়ন সমিতি স্বর্নপদক ১৯৯৬; রংপুর জেলা প্রশাসন গুনীজন সংবর্ধনা পদক ১৯৯৭; একুশে পদক ১৯৯৭; রুমা স্মৃতি পদক, খুলনা ১৯৯৮।

 

ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে নির্মোহ মানুষ ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। সত্য গোপণের বিনিময়ে অন্য কোন লোভ কখনোই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বাংলাদেশের গ্রাম সাংবাদিকতায় নতুন ধারা সৃষ্টিকারী এই সাংবাদিকের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুরের গঙ্গাচড়ার হারাগাছের মরনিয়া গ্রামে। আর সাংবাদিকতার অঙ্গণে বিপুল শূন্যতা সৃষ্টি করে সবার মাঝে থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। বাবার নাম মৌলভী আলিমউদ্দিন আহমদ। মা মতিজান নেছা। স্ত্রী নাসিমা আখতার ইতি। তিন ছেলেমেয়ের বাবা ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। দুই মেয়ে চৈতী আর সিঁথি ডাক্তার। আর একমাত্র ছেলে সুবর্ণ বুয়েটে অধ্যায়নকালে প্রাণ হারিয়েছেন। খবর সংগ্রহের নেশায় উত্তরের পথ থেকে পথে ছুটেছেন মোনাজাতউদ্দিন। একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিদিনই পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন নতুন নতুন বিষয় নিয়ে। রঙলেপা সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন নেপথ্যের পচাগলা সমাজের চিত্র। তাঁর সংবাদ উপস্থাপনায় পাঠক কখনো মাথা নিচু করেছেন, আবার কখনো বা প্রতিবাদী হয়েছেন। এই ভিন্নধর্মী সাংবাদিকতার কারণে ব্যক্তিগত জীবনে মোনাজাতউদ্দিনকে অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়েছে। অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন মাঠে, পথে-প্রান্তরে, উত্তরের এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। কখনো নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহের কাজ, আবার কখনো অফিসের এসাইনমেন্ট। মাসে ৫ দিনও নিজের বাসা রংপুরের ধাপলেনে অবস্থান করতে পারেননি তিনি।

‘দৈনিক সংবাদ’ ছেড়ে ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’-এ যোগদানের বছর ঘুরতে পারেনি। এপ্রিলে যোগদান ডিসেম্বরে প্রয়াণ। কেউ প্রত্যাশা করেনি, এই সময়ে তার প্রস্থান ঘটবে। একজন জীবনবাদী, আশা নির্ভর, প্রাণবন্ত, উচ্ছল মানুষ এভাবে চিরবিদায় নেবেন, তা কারও কল্পনায় ছিল না। শেষ সময়ে মোনাজাতউদ্দিনকেই কীভাবে যেন মৃত্যুচেতনা আচ্ছন্ন করেছিল। সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমে শেষ জীবনে এসে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন নিন্ম-রক্তচাপ ও গ্যাস্ট্রিকে। মৃত্যুর মাত্র তিনদিন আগে ২৬ ডিসেম্বর রংপুর প্রেসক্লাবে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর ডাক্তার তাকে কয়েকদিন বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু জনকণ্ঠ অফিস থেকে এসাইনমেন্ট পেয়ে তিনি আর বিশ্রাম নিতে পারেননি। গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার যমুনা নদীতে কালাসোনা ড্রেজিং পয়েন্টে দু’টি নৌকাডুবি হয়েছে। ড্রেজিং পয়েন্টের খোঁজ নিতে এসাইনমেন্ট দেওয়া হয় মোনাজাতউদ্দিনকে। এসাইনমেন্ট পেয়ে তিনি বিশ্রামের চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলেন। ২৭ ডিসেম্বর সকালেই ছুটে যান সেখানে। গাইবান্ধা থেকেই ঘটনাস্থলের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। ২৯ ডিসেম্বর (১৯৯৫) বিকেলে ফেরির ছাদ থেকে পড়ে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যু ঘটে। রংপুর শহরের মুন্সিপাড়া কবরস্থানে শুয়ে আছেন সারা জাগানো এই গ্রাম সাংবাদিক।     

 

চিরাচরিত নিয়মে তাঁর প্রস্তান ঘটেছে। তবুও তিনি আছেন আমাদের মাঝে। প্রতিবছর ২৯ ডিসেম্বর এলে তাঁর উদ্দেশ্যে কিছু কথামালা রচিত হয়। আলোচনা সভার আয়োজন হয়। তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করা হয়। এটা এক ধরণের স্মরণ। অন্যভাবে বললে বলা যায়, মোনাজাতউদ্দিন তাঁর লেখনির মাধ্যমে বেঁচে আছেন পাঠকের মনে। হাজারো পাঠক তাঁর শূন্যতা অনুভব করেন। অনুসারী আর সংবাদকর্মীদের মাঝে তিনি বেঁচে আছেন শিক্ষক হিসেবে। জীবদ্দশায় তিনি শিখিয়েছেন। প্রয়াণের পরেও তাঁর লেখা বইপত্র, আর সংবাদগুলো আমাদের বার বার সেই ধারায় নিয়ে যায়। হয়তো প্রতিবেদন লেখার আরও অনেক পরিকল্পনা ছিল তাঁর। নিষ্ঠুর নিয়তি সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। মোনাজাতউদ্দিন আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তাঁর শতেক অনুসারী বেঁচে আছেন। তারাই হয়তো গ্রাম সাংবাদিকতার সেই আদর্শ সমুন্নত রাখতে এগিয়ে আসবেন।    

 

লেখক : উপকূল-সন্ধানী সাংবাদিক, ১৯৯৮ সালে চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা