ঢাকা, বুধবার, ৪ মাঘ ১৪২৩, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

ছায়া শিক্ষা এবং সহায়ক বা অনুশীলন বই

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৫ ২:৪৫:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৪৭:০১ পিএম

মাছুম বিল্লাহ : আমরা আগে যখন পাসপোর্ট করতে দিতাম, সেই পাসপোর্ট হাতে পেতে কয়েকমাস সময় লেগে যেত। পরে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, লেখালেখি ও কর্তৃপক্ষের বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরে এখন একটি পাসপোর্ট পেতে সময় কম লাগে। এর মূল কারণ কী?

 

অনেকে মনে করেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় পুলিশকে খুশি করতে পারলে দ্রুত পাসপোর্ট পেতে সুবিধা হয়। এখন কোন সচেতন এবং শিক্ষিত ব্যক্তির  বিষয়টি যদি গায়ে লাগে এবং তিনি যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান তাহলে কী ঘটবে? কর্তৃপক্ষ বলবেন, এই অভিযোগ আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন তাহলে পুলিশের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ একটি জানা এবং প্রচলতি বিষয় সবাই যেন না জানার ভান করেন। এই ভান করা ব্যাপারটি ঘটে আমাদের বিভিন্ন জায়গায়।

 

শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘নোট গাইড পড়া এবং কোচিং করা’ ব্যাপার দুটোর ক্ষেত্রেও একটি ভান করা ব্যাপার চলছে। দেশব্যাপী প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীর স্কুলগুলোতে নোট, গাইড আর কোচিং চলছে পুরোদমে। কিন্তু আমরা যখন সভা-সেমিনার করি তখন এমন ভাব দেখাই যে, এগুলো অবৈধ, সবাই এটি করে না। কিছু কিছু শিক্ষক প্রাইভেট কোচিং করাচ্চেন এবং কিছু কিছু শিক্ষার্থী অবৈধ নোট, গাইড পড়ছে। আসলে কোচিং ও নোট, গাইড কোথা থেকে এসেছে? আমাদের এনসিটিবির বই যদি প্রকৃত শিক্ষার্থীবান্ধব হতো, শিক্ষার্থীদের চাহিদা যদি তাতে মিটে যেত, তাহলে তো নোট, গাইডের পসার এত বিস্তৃত হতো না। একই ভাবে বলা যায়, যারা শিক্ষকতায় আসেন তাদের এক বিশাল অংশ বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসেন। পেশায় তাদের  ডেডিকেশন খুব একটা থাকে না। তাছাড়া শিক্ষকদের প্রশ্ন হচ্ছে চিকিৎসকরা সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি করেন, তারপরও প্রাইভেট প্রাকটিস করেন, দেদার টাকা কামান। তাহলে শিক্ষকরা দোষ করল কোথায়? নাকি শিক্ষকরা অবহেলার পাত্র যে, ডাক্তার চাকরি করলেও প্রাইভেট প্রাকটিস করাতে পারবেন, কিন্তু শিক্ষক পারবেন না। এই বৈষম্য কেন? এর জবার কী? কে দেবে এর উত্তর?

 

শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো বিষয়টি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, এটি এখন সবার চোখেই দৃষ্টিকটু এবং সকল নৈতিকতার বিরুদ্ধে চলে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে এখন ৩২ হাজার কোটি টাকার কোচিং-বাণিজ্য চলছে। এত বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য হঠাৎ করে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা খুব সহজ নয়। আবার বিষয়টির জন্য শুধু যে সরকার একা দায়ী তাও নয়। তবে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এই কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষা আইনের যে খসড়া মন্ত্রণালয় ওয়েবসাইটে দিয়েছিল তাতে বলা ছিল, কেউ প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং করালে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। সেই অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, চাইলেই কোচিং-টিউশন হঠাৎ করে বন্ধ হবে না বা করা যাবে না। তাই এটি কীভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করা যায়, সে জন্যই নীতিমালা বা বিধিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। আমাদের অধিকাংশ ক্লাসরুম আকর্ষণীয় নয়, শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। একটি ক্লাসে গাদাগাদি করে ৮০ কিংবা ৯০ এমনকি শতাধিক শিক্ষার্থী বসে। সেই ক্লাসে কীভাবে আমরা আশা করব যে, একজন শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি করাবেন। সম্ভব নয় বিধায় জন্ম নিয়েছে প্রাইভেট কোচিং।

 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাকেন্দ্রিক, ফলকেন্দ্রিক, জ্ঞানার্জনকেন্দ্রিক নয়। ফল ভালো করার জন্য বিভিন্ন ধরনের টেকনিক বের করছেন বিভিন্ন শিক্ষক। এই টেকনিক বের করা শিক্ষকদের বাণিজ্যিকীরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে কোচিং সেন্টার। ব্যবসা ভালো দেখে তাতে যুক্ত হযেছে মেধাবী কিছু শিক্ষার্থী বেকার যুবক-যুবতী এবং ব্যবসায়ী মনোভাবের কিছু লোক। এগুলো দূর করা যেত যদি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি উন্নত মানের হতো। কিন্তু মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে চলছে নানা পরীক্ষা-নিরিক্ষা, নানা মতামত, কথা ও আলোচনা ।সৃজনশীলতার কথা বলে বলে মূল্যায়ন পদ্ধতি আমরা এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছি যে, শিক্ষকগণ প্রশ্ন তৈরি করা ভুলে গেছেন। একই ধরনের প্রশ্ন বছরের পর বছর আসতে থাকে বোর্ড পরীক্ষায়, এক বোর্ডের প্রশ্ন অন্য বোর্ডে, এক বছরের প্রশ্ন পরবর্তী বছর কিংবা তার পরের বছরই সেট করা হয়। সেখানে নোট গাইডের দোষ কী? শিক্ষার্থীরা নোট পড়ুক, গাইড পড়ুক, বই পড়ুক, যেখান থেকেই পড়ুক না কেন পরীক্ষা পদ্ধতিতে যদি আমরা সত্যিকারের পবির্তন নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে এসব নিয়ে আর অযথা চিন্তা করার প্রয়োজন ছিল না। কারণ শিক্ষার্থীকে নিজ থেকেই লিখতে হবে, উত্তর করতে হবে। পড়ার ক্ষেত্র ও সূত্র থাকবে অবারিত। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সৃত্র থেকে জ্ঞান আহরণ করবে। তাদের জ্ঞান ও জানার পরিধি ও গভীরতা জানার জন্য সুচতুরভাবে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে। মুল্যায়ণ পদ্ধতি হতে হবে অত্যন্ত উৎকৃষ্টমানের। এটি করতে পারলে নোট আর গাইড নিয়ে এত চিন্তা ও চিৎকার ও ঘটা করে বন্ধ করার কথা বলতে হতো না। এখানেই সকলের সম্মিলিত ভূমিকা ও প্রয়াস দরকার কীভাবে আমরা একটি উন্নত মানের এবং প্রকৃত সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারি।

 

কোচিং, প্রাইভেট বন্ধ না করে চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রাইভেট টিউশনিসহ ছায়া শিক্ষা বা শ্যাডো এডুকেশন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও তদারকের জন্য সরকার আলাদা নীতিমালা বা বিধি প্রণয়ন করবে। ছায়া শিক্ষা বলতে সরকারি বা স্বীকৃতি পাওয়া বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে কোনো ব্যক্তি বা শিক্ষকের উদ্যোগ একাধিক শিক্ষার্থীকে কোন প্রতিষ্ঠানে বা কোন নির্দিষ্ট স্থানে অর্থের বিনিমিয়ে পাঠদান কার্যক্রমকে বোঝাবে। কোন ছায়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সরকার বন্ধের উদ্যোগ নেবে। অনুমোদন নিয়ে সহায়ক পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের সুযোগ রাখেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মতামতের জন্য দেওয়া খসড়ায় বলা হয়েছিল সহায়ক বই প্রকাশে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদন লাগবে। এই বিধান বাদ দিতে প্রকাশকেরা আন্দোলন করে আসছেন। চূড়ান্ত খসড়ায় ‘সহায়ক পুস্তক’ প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই বিষয়টি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন নোট, গাইডের বিকল্প। খসড়ায় বলা হয়েছে, কোন প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কেবল ‘সহায়ক পুস্তক’ বা ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবেন। কিন্তু কোন ধরনের নোট বই, গাইড কিংবা  নকল মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ ও বাজারজাত করা যাবে না।

 

এ বিষয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘ যেসব কারণে ছাত্রছাত্রীরা কোচিং, প্রাইভেট টিউশন করতে যায়, সেগুলো দূর করতে হবে। আর এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উপযুক্ত ও চমৎকার বই প্রণয়ন করা। পাঠ্যবই পড়েই যাতে একজন শিক্ষার্থী সবকিছু বুঝতে ও জানতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণও জরুরি। অবকাঠামো বাড়াতে হবে।’ এটিই আসল কথা। এনসিটিবি  তাড়াহুড়ো করে যে বই প্রণয়ন করে তাতে যেমন ভুল থাকে, তেমন কাগজও খুব ভালো মানের নয়। তারপরও প্রচুর অলোচনা বা মুল্যায়ন পদ্ধতির ওপর বিশদভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা বাজারে প্রচলিত বই পড়ে। এনসিটিবির বই ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে কোন বিষয়কে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হয় শিক্ষার্থীদের সামনে। যে কাজটি করা সম্ভব হয় না আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষকদের দ্বারা। কারণ আমাদের সকলেরই জানা। এটি আমাদের দেশের এক বাস্তবতা, এটিকে আমরা কীভাবে অস্বীকার করবো? কীভাবে আমরা দেখেও না দেখার ভান করবো? নোট গাইডের ব্যাপারটি হয়েছে এমন যে, এই নিবন্ধের শুরুতে যেমন বলেছি পুলিশ ভেরিফিকেশনের কথা। কেউ যদি সাহস করে বলে যে, আমার কাছে সে ঘুষ চেয়েছে। তখন কর্তৃপক্ষ বলে, এ জাতীয় প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকারান্তরে এর অর্থাৎ বিষয়টিকে উৎসাহিত করা। নইলে যার কাছে ঘুষ চাওয়া হলো তাকেই কেন ঘটনা প্রমাণ করতে হবে? ঘটনা প্রমাণের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। তারা এ কাজে কতটুকু আগ্রহী প্রশ্নটা সেখানে।

 

দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজধানী কিংবা সব শহরের বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা নোট, গাইড পড়ছে। এটা বাস্তবতা। আমরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করে হঠাৎ হঠাৎ এর বিরুদ্ধে দাঁড়াব এবং ভাব দেখাবো যে, নোট ছাড়াই শিক্ষার্থীরা সবকিছু পারে, তা হয় না। ব্যাপারটি উন্মুক্ত থাকাই ভালো। দেশের হাতে গোনা কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানকার কিছু শিক্ষক হয়তো বা সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন, প্রশ্ন করতে পারেন, শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহকে জাগ্রত করতে পারেন, টেক্সট বইয়ের সাহায্য নিয়ে নিজেই অনেক কিছু পড়াতে পারেন তার মেধা, বুদ্ধি, জ্ঞান দিয়ে। কিন্তু দেশের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে হাজার হাজার শিক্ষক রয়েছেন তাদের শিক্ষকতা করার যোগ্যতা কি আমরা পরিমাপ করতে পেরেছি? পারিনি। তাহলে হঠাৎ করে কীভাবে আশা করি, সবাই উন্নত মানের শিক্ষক হয়ে যাবেন, শিক্ষার্থীরা সঠিক উপায়ে জ্ঞানার্জন করবে। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে মান যাই হোক, গ্রাম এলাকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এসব সহায়ক বইয়ের সাহায্য নিয়েই পড়ছে ও পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা সেই বই পড়ে পাবলিক পরীক্ষায় পাসও করছে। এই বাস্তবতা আমাদের হঠাৎ আবেগের দ্বারা দূর করা সম্ভব নয়। পরিশেষে আবারও বলতে চাই, উন্নত মানের মূল্যায়ন পদ্ধতির দিকে আমাদের আরও নজর দিতে হবে। তাহলে বিষয়টি নিয়ে এভাবে চিন্তা করতে হবে না ।

 

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ জানুয়ারি ২০১৭/তারা