ঢাকা, সোমবার, ৮ ফাল্গুন ১৪২৩, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

জসিমের বত্রিশ আইটেমের চা

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১০ ৮:২২:৪৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-০৫ ৯:২৩:৫০ পিএম

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : কেউ পান করছেন পাঁচ মিশালী চা, কেউ পান করছেন পুদিনা পাতার চা, কেউ মরিচের চা, কেউ তেঁতুল চা- যার যা পছন্দ। চায়ের দোকানের সামনে নানান বয়সী, নানান পেশাজীবী মানুষের জটলা। বেচা বিক্রিও বেশ ভালো।

দোকানের পাশে বড় সাইনবোর্ডে লেখা ‘জসিমের জটিল চায়ের দোকান’। সঙ্গে আছে হরেক রকম চায়ের নাম ও মূল্য তালিকা। এটি রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেল গেটের জসিমের জটিল চা ষ্টোরের দৃশ্যপট। দোকান মালিক রফিক তার ছোট ভাই জসিমের নামে নামকরণ করেছেন এই চা স্টোরের।

চায়ের সঙ্গে রফিকের (৩২) জীবনের গল্প যেন মিশে আছে গভীরভাবে। আট ভাই-বোনের দরিদ্র পরিবারে জন্মেছে বলে রফিকের স্কুলের বারান্দায় যাওয়া হয়নি কখনো। শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের একটি চায়ের দোকানে কাজ করে। সেখানে কোনো বেতন পেতেন না, কাজ করতেন ভাত কাপড়ের বিনিময়ে। ভাগ্য বদলের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমান রফিকের পুরো পরিবার। বাবা ফরিদ শেখ তখন গুলিস্তানের ফুটপাতে কাপড় বিক্রি শুরু করেন, আর রফিক চাকরি নেন একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে। ফ্যাক্টরির বন্দী জীবনে রফিকের মন বসেনি। অনেকটা ভালোবাসার টানেই ফেরেন পুরোনো পেশায়- চা বিক্রিতে।

১৫ বছর আগে মাত্র ১৫ হাজার টাকা পুজিঁ নিয়ে গেন্ডারিয়া রেল গেটের টং দোকানে চা বিক্রি শুরু করেন রফিক। পুঁজির টাকাটা ছিল কিছু বাবার দেওয়া, কিছু নিজের জমানো ও কিস্তিতে লোন নিয়ে। প্রথম দিকে মালামাল বলতে ছিল কেতলি, চা-বিস্কুট আর সিগারেট। ক্রেতার চাহিদা সামলাতে ছোট ভাই জসিম দোকানে সহযোগিতা করত।  আস্তে আস্তে বিক্রি বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে দোকানের আয়তন। পরবর্তীতে গেন্ডারিয়া রেল স্টেশন প্ল্যাটফর্মে সে একটি দোকান ভাড়া নেয়।

স্টেশনে দিন দিন বাড়তে থাকে চায়ের দোকান। বিক্রিতে প্রতিযোগিতাও বাড়ে। ফলে চিন্তিত হয়ে পড়েন রফিক, জসিম দুই ভাই। ছয় বছর আগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও ক্রেতা ধরে রাখতে নতুন কিছু করার কথা ভাবেন জসিম। শুরু করেন নতুন আইটেমের চা আর ভিন্ন স্বাদের চমক। জসিম জানান, রকমারি চায়ের শুরুটা ৮ আইটেম দিয়ে: মরিচ চা, তেঁতুল চা, জলপাই চা, আদা চা, তুলসী চা, গ্রিন টি, পাঁচ মিশালী চা, লেবু চা।

এই রকমারি চায়ের চমকে হঠাৎ করে দোকানে বিক্রি বেড়ে যায়। দূর থেকে কৌতূহলী মানুষেরা ভিড় করতে থাকেন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চা পান করতে। মানুষের চাহিদা দেখে রফিক-জসিম চায়ে যোগ করতে থাকেন নতুন নতুন আইটেম। খরচের কথা বিবেচনা করে চায়ের দাম নির্ধারণ করেন ৬ থেকে ২০ টাকা। রফিক জানান, সাইনবোর্ডে ২৬ রকম চায়ের তালিকা দেওয়া থাকলেও ৩২ আইটেমের চা তৈরি করেন তারা। উল্লেখযোগ্য চায়ের মধ্যে রয়েছে- কালো জিরা চা, মাল্টোভা চা, খেজুরের চা, মধুর চা, রসুন চা, বিট চা, দুধ-আদা চা, কফি চা।

নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম সুমন। তিনি প্রায়ই ট্রেনে অথবা ৪০ টাকার গাড়ি ভাড়া দিয়ে গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনে নানা স্বাদের চা পান করতে আসেন। তিনি বলেন, ‘তুলসী, পাঁচ মিশালী ও গুড় চা আমার সবচেয়ে প্রিয়। বেশ সুস্বাদু ও মজাদার এই চা।’

গেন্ডারিয়ার ওষুধ ব্যবসায়ী মুন্না খান (৪৬) বলেন, ‘একদিন তুলসি চা খেতে মন চাইলো, একদিন গুড় চা খেতে ইচ্ছে হলো, একদিন জিরা চা খেতে ইচ্ছা করলো, যখন যে চা খেতে ইচ্ছা করে এ দোকানে চা খেতে চলে আসি।’ বর্তমানে এই রকমারি চা দেখে, জসিমের জটিল চায়ের দোকানের আদলে রাজধানীর লালবাগ, টিএসসি, জুরাইন, খিলগাঁওয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আইটেমের চায়ের দোকান। এসব দোকানে আট-দশ আইটেমের বেশি চা পাওয়া যায় না।

স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেও অনেকে জসিমের রকমারি চা পান করতে আসেন। তেমনই একজন গেন্ডারিয়ার ব্যবসায়ী আবু হোসেন (৪৮)। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে আমি নিয়মিত তেঁতুল চা খেতে আসি। তেঁতুল চা প্রেশারের রোগীদের জন্য উপকারী।’

গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনে গিয়েছেন অথচ জটিল চায়ের দোকানের চা পান করেননি, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। সরকারি বড় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নামি-দামি অনেকেই এখন এই দোকানের ভিন্ন স্বাদের চায়ের দারুণ ভক্ত। দোকানটি খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। সকাল থেকে দুপুর পর্য়ন্ত দোকানে সময় দেন রফিক। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত সময় দেন জসিম। বর্তমানে এই দোকান থেকে তাদের মাসিক গড় আয় হয় ৩০ হাজার টাকা। ভবিষ্যতে শহরের দিকে পজিশন মতো দোকান পেলে রকমারি চা হাউজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন রফিক।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৭/ফিরোজ/তারা