ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘জানম নিয়ন বালে বুজুয়া’

নজরুল মৃধা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-৩০ ১:০১:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-১৯ ৪:১৭:১৭ পিএম
‘জানম নিয়ন বালে বুজুয়া’
Voice Control HD Smart LED

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর: ‘জানম নিয়ন বালে বুজুয়া’ এর অর্থ হচ্ছে ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ কি বুঝি না’।  এটা রংপুরের আদিবাসি (ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি) দুলালি টুডুদের নিজস্ব ভাষা।

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানি পাড়া, কালু পাড়া ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের  ১৫শ পরিবারের প্রায় ৮ হাজার আদিবাসি সদস্য এই ভাষায় কথা বলে। দুলালি টুডু আরো বললেন, ‘অংকু বাজু হাজুয়া’ অর্থাৎ ‘পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীরা আমাদের কাছে আসেনা‘, ‘গিদরা পুনিয়া আদি কসট মোনইয়া’ অর্থাৎ ‘ছেলে মেয়ে নিয়ে কষ্টে আছি’।

দুলালি টুডুর জানেন না জন্মনিয়ন্ত্রণ কি এবং কি পদ্ধতি গ্রহণ করলে বাচ্চা হবে না, তাও তিনি জানেন না।

তিনি আরো জানালেন, ‘লাইগেশন’ ‘ভ্যাসেকটমি’ কি জিনিস তাও আমরা জানিনা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ  কাকে বলে বলতে পারবো না। বাচ্চা হওয়া বন্ধ হওয়ার জন্য পিল খাওয়া লাগে তাও জানি না। তাই তো একে একে ৬টা বাচ্চা হয়েছে। এর মধ্যে তিন ছেলে তিন মেয়ে। ঘন ঘন বাচ্চা হওয়ায় তাদের স্বাস্থ্যও খারাপ। তাদের বেশি লেখাপড়া করাতে পারি নাই।

এ প্রসঙ্গে দুলালি টুডুর স্বামী  জয়রাম এক্কা বললেন,  শুনেছি পরিবার পরিকল্পনার লোক আছে। কিন্তু তাকে আমাদের এলাকায় দেখিনি। সংসার বড় হওয়ায় খুব কষ্টে আছি। আবাদি কোন জমি নাই। অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাই। ছেলেমেয়েদের লেখা পড়া ও ভরণ পোষণ করছি খুব কষ্টে।

জয়রামের মত শান্তনি কিসকো নামের আরেক আদিবাসি জানালেন, তার দুই মেয়ে এক ছেলে। পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে তার কোন ধারণা  নেই।  আরেক আদিবাসি বাবু লাল কিসকুর ৩ ছেলে ২ মেয়ে। তিনিও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞ। তার মত ফিলিপ কেরকাটা, সুবাস এক্কাসহ অনেকেই জানালেন, তারা পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ভ্যাসেকটমি, লাইগেশনের কথা তারা কারো কাছে শোনেন নি। তাদের মত লোহানি পাড়া, কালু পাড়া ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের আট হাজার আদিবাসি সদস্যের পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেই। ফলে অদিবাসিদের প্রতিটি পরিবারে গড়ে ৫ থেকে ৬ জন করে সন্তান জন্ম নিচ্ছে। জন্ম নেওয়া এসব সন্তানদের অধিকাংশই অপুষ্টির শিকার। এদের মধ্যে অনেকেই প্রতিবন্ধি হিসেবে জন্ম গ্রহণ করছে। পরিবারে দুইয়ের অধিক সন্তান হওয়ায় লেখাপড়াও ঠিক মত হচ্ছে না। পরিকল্পিত পরিবার গড়ে তুলতে না পারার কারণে হাজারো সমস্যা দেখা দিয়েছে আদিবাসিদের মাঝে।

তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব নাকি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠ কর্মীদের অলসতা। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম মোহাম্মদ আহসানুল হক ডিউক চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি উদ্বেগজনক। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা আসলে তাদের কাছে যায় কি না এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। পাশাপাশি আদিবাসিরাও জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যাতে সচেতন হয় এজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ ঘনঘন সন্তান নিলে পুষ্টিহীনতাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।’

তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনী য়ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস দেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম অদিবাসিদের সচেনতার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের আরো উদ্যোগি হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে গিয়ে শুধু বলে আসলে হবে না।  আদিবাসিরা যাতে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে এর জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আদিবাসিদের জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের সুফল আদিবাসিরা এক সময় বুঝতে পারবে বলে আমি মনে করি।’

আদিবাসি পল্লীর প্রবীণ সদস্য ফিলিপ কেরকাটা বললেন, ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রচার প্রচারণা না থাকার কারণে আদিবাসিরা অধিক সন্তান জন্ম দিচ্ছে। ফলে পুষ্টিহীন জনসংখ্যা বেড়েই চলছে।

লোহানী পাড়া আদিবাসি পরিষদের সভাপতি  বাবুলাল কিসকোও অভিযোগ করে বললেন, সরকার জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এত প্রচার-প্রচারণা চালান। কিন্তু আদিবাসি পল্লীগুলোতে তাদের প্রচারণা নেই। ফলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আব্দুল হাই রুবেল বলেন, ‘বিষয়টি শুনলাম। এ বিষয়ে পরে জানাবো । ’

নোহালী পাড়া ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও উপজেলা আদিবাসি পরিষদের সভাপতি পাথরাজ কিরতি, উপজেলা সাধারণ সম্পাদক শ্যামল টুডু একই অভিযোগ করলেন।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অঞ্জুমানারা বেগম বলেন, ‘আদিবাসিরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে একটু কম বোঝে। আমাদের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। আদিবাসিদের মধ্যে সচেনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে জন্মের হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।




রাইজিংবিডি/রংপুর/৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ইং/নজরুল মৃধা/টিপু

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge