ঢাকা, শনিবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৪, ২২ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

টেকনাফে আনসার হত্যা ও অস্ত্র লুটের নেপথ্যে

: রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০১-১১ ১:৪৮:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-১১ ৬:৫১:২৭ পিএম
আনসার ক্যাম্পে হামলার অন্যতম আসামী খায়রুলসহ ৩জনকে গ্রেফতার করা হয়

সুজাউদ্দিন রুবেল, কক্সবাজার : গত বছরের ১২ মে গভীর রাতে টেকনাফে আনসার ক্যাম্পে যেভাবে হত্যা ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে তার বর্ণনা দিলেন র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক আশেকুর রহমান।

রাতে টেকনাফের নয়াপাড়ার আনসার ক্যাম্পে অধিকাংশ আনসার সদস্য যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনই মুখোশ পরা ১৪ জনের একটি দল সরাসরি হামলায় অংশ নেয়। ক্যাম্পের বাইরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে ৪ জন। হামলার আগে তারা ক্যাম্পের পশ্চিমে পাহাড়ের কাছে অবস্থান নেয়। হামলাকারীদের মধ্যে নুরুল আলম ও বড় খায়রুল আমিন দা দিয়ে আনসার ক্যাম্পের বেষ্টনি কেটে ভেতরে প্রবেশ করে এবং বাকীরা তাদের অনুসরণ করে। তারা আনসার ক্যাম্পের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর কর্তব্যরত আনসার সদস্য অজিত বড়ুয়ার হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে। এরপর ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে ঘুমন্ত অন্যান্য আনসার সদস্যদেরকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে।

এ সময় আনসার ক্যাম্প কমান্ডার পিসি আলী হোসেন অস্ত্রাগারের চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দৌড়ে পালাতে চাইলে নুরুল আলম তাকে গুলি করে। পরে তারা অস্ত্র ও গুলি লুট করে দ্রুত ক্যাম্প ত্যাগ করে। লুট করা অস্ত্র ও গুলি তারা বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের গহীন অরণ্যে লুকিয়ে ফেলে। আর নিজেরা আত্মগোপনে চলে যায়।

মঙ্গলবার কক্সবাজারের কুতুপালংয়ের শরনার্থী শিবির সংলগ্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তারকৃত ৩ জনের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এইসব তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক।

গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জনই মিয়ানমারের নাগরিক। তারা হলেন কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পের ডি ব্লকের ২ নং কক্ষের বাসিন্দা মৃত মোস্তাফিজের পুত্র খায়রুল আমীন প্রকাশ ওরফে বড় খায়রুল আমিন (৩২), এ ব্লকের বাসিন্দা নেছার আহমদের পুত্র মাস্টার আবুল কালাম আজাদ (৪৬) ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরনার্থী ক্যাম্পের এইচ ব্লকের ৩ নং কক্ষের বাসিন্দা সুলতান আহমদের ছেলে হাসান আহমেদ (৩০)। তারা সকলে আনসার ক্যাম্পে হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব অভিযানে তুমব্রুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রশস্ত্র


র‌্যাব কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক আশেকুর রহমান বলেন, ‘নয়াপাড়া আনসার ক্যাম্পে তারা হামলা করার পূর্বে বেশ কয়েকবার হামলার প্রস্তুতি নিয়েও ব্যর্থ হয়। ফলে প্রতিনিয়ত তারা আনসার ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রহরীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। হামলার দিন আনুমানিক রাত ১১ টার দিকে তারা ক্যাম্পের পশ্চিম পাহাড়ের কাছে অবস্থান নেয়। এই দলটি মূলত অস্ত্র লুট করার উদ্দ্যেশে আনসার ক্যাম্পে হামলা করেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল লুট করা অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের অস্ত্র ভান্ডার বৃদ্ধি করে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করা এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের কাছে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করা। আইন-শৃংখলা বাহিনীর ক্রমাগত অভিযানের ফলে বেশ কয়েকদিন তারা গা ঢাকা দেয়। পরবর্তীতে তারা পুনরায় অস্ত্র ও গুলি বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করে সর্বশেষে ঘুমধুম এলাকায় রাখে।’

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হওয়া ৩ মিয়ানমার নাগরিক র‌্যাবকে আরও জানিয়েছেন, তাদের একটি ২০/২৫ জনের সংঘবদ্ধ দল  বিগত ৫/৬ বছর যাবৎ টেকনাফের শ্যামলাপুর, বাহারছড়া, লেদা ও কক্সবাজারে উখিয়া, কুতুপালং এলাকায় ডাকাতি এবং অপহরণ করে আসছিল। ২০১৫ সালে আব্দুল হাফেজ এর নেতৃত্বে ওই দলের কয়েকজন সদস্য আটক আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় আনসারদের সাথে সংঘর্ষ হয়। হামলার ঘটনায় আব্দুল হাফেজ আনসার সদস্যদের গুলিতে নিহত হয় এবং ওই ঘটনায় র‌্যাবের হাতে আটক রফিক ডাকাতও আহত হয়েছিল। রফিকসহ ৫ জনকে গত বছরের ৩০ জুন গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

তখন গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছিল. টেকনাফের আনসার ব্যারাকে হামলার পর লুট করা অস্ত্রগুলো ৩টি বস্তায় ভরে নিয়ে যায় মিয়ানমারের নাগরিক আব্দুর রাজ্জাক, খায়রুল আমিন ও নুর আলম। আব্দুর রাজ্জাক জঙ্গী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গে জড়িত এবং পেশাদার অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে অর্থের লোভ দেখিয়ে আনসার ক্যাম্পে হামলার জন্য ১৫ থেকে ১৭ জন সন্ত্রাসীকে একত্রিত করে। এ রকম একাধিক গ্রুপের অধীনে একেকজন একেকভাবে আনসার ক্যাম্পে হামলায় অংশ নেয়। হামলাকারীরা সকলে সকলকে চিনতো না। আনসার ব্যরাকে হামলায় জড়িত থাকার সন্দেহে নুরুল আবছার (২২) নামে এক ব্যক্তিকে গত বছরের ৩০ মে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন সে আদালতের কাছে ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১২ মে দিবাগত রাত ২টায় টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অবস্থিত আনসার ব্যারাকে হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা ২টি এসএমজি, ৫টি চাইনিজ রাইফেল, ৪টি শর্টগান ও ৬৭০ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে আনসার কমান্ডার আলী হোসেনকে। ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শী ও আনসার সদস্য আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে ৩০/৩৫ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামী করে টেকনাফ থানায় মামলা দায়ের করেন।

এখন আনসার ক্যাম্প থেকে লুট করা অস্ত্রের সন্ধানে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় র‌্যাবের ‘সার্চ অপারেশন’ চলছে। মঙ্গলবার পরিচালিত অপারশনে মোট ১০ অস্ত্র ও ২১৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি অস্ত্র (একটি এসএমজি, দুইটি এমটু, দুইটি সেভেন পয়েন্ট সিক্সটি মিলিমিটার রাইফেল) ও ১৮৯ রাউন্ড গুলি টেকনাফের আনসার ক্যাম্পে হামলা ও ক্যাম্প কমান্ডারকে হত্যার পর লুট করা হয়েছিল। বাকি ৫টি দেশীয় তৈরি অস্ত্র (একটি বিদেশি পিস্তল, একটি বন্দুক, ৩টি ওয়ান শ্যুটার গান) ও ২৮ রাউন্ড গুলি ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা’ ব্যবহার করতো।

আনসার ক্যাম্প থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের সন্ধানে পাহাড়ি এলাকায় আরও দুই দিন টানা ‘সার্চ অপারেশন’ চলবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমদ।

 

 

রাইজিংবিডি/ কক্সবাজার/১১ জানুয়ারি ২০১৭/রুবেল/টিপু

Walton Laptop