ঢাকা, শনিবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নায়িকা সংকটে, আতঙ্কে পরিচালক

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-০৬ ১২:৪৭:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-২৩ ১২:৪৮:০২ পিএম

রাহাত সাইফুল : পর্দায় সিনেমা দেখে অনেকেই নায়িকার প্রেমে পড়েন। অনেকেই প্রিয় নায়িকাকে দেখতে ছুটে যান প্রেক্ষাগৃহে। কেউ নায়িকার গ্ল্যামার দেখেন, কেউ  সাবলীল অভিনয়ে মুগ্ধ হন। কেউ আবার নায়িকাদের দেখে নিজেও নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। দর্শকদের আর্কষণ করার মোহনীয় ক্ষমতা থাকে নায়িকাদের। এক ফালি হাসি দিয়ে হাজারো দর্শকের হৃদয় জয় করতে পারেন তারা। দর্শক মনে করেন, নায়িকাদের বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের মতো মনটাও সুন্দর।

এখন ফেসবুক খুললেই অনেক মেয়ের ছবিতে চোখ আটকে যায়। বিভিন্ন স্টাইলে, নানা রং-বেরঙের পোশাক পরে তোলা ছবি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। শুধু তাই নয়, আরো রূপবতী দেখাতে এসব ছবি তারা সম্পাদনা করতেও পিছপা হন না। কেউ কেউ আবার দ্রুত আলোচনায় আসতে অশ্লীল ভঙ্গি ও পোশাক পরে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। এসব ছবি ও ভিডিওতে ‘দুষ্টু ছেলের দল’ হাজারো কমেন্টস করে। এতে আরো উচ্ছ্বসিত হয় ছবি অথবা ভিডিও প্রকাশকারী। দেখা যায়, এদের প্রত্যেকেই ফেসবুক আইডিতে অ্যাকট্রেস, ফিল্ম আর্টিস্ট, হিরোইন ইত্যাদি লিখে রাখেন। অথচ আদৌ এরা কোনোদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন কিনা সন্দেহ! তারা ভুলে যান ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে নায়িকা হওয়া যায় না। শাবানা, ববিতা, মৌসুমী, শাবনূর ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে নায়িকা হননি। নায়িকা হতে হলে কোয়ালিটি থাকা প্রয়োজন।

ফেসবুক কাঁপানো এসব রমণীদের মধ্যে কেউ কেউ একটি–দুটি সিনেমার মহরত করেই নায়িকা বনে গেছেন। বলা চলে ‘মহরত নায়িকা’। মহরত করেই সিনেমা শেষ। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও তাদের সিনেমার শুটিং হয় না। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, নায়িকা নিয়ে আউটডোরে গিয়ে কয়েক দিনের শুটিং করেই শেষ। সিনেমা আর মুক্তি পায় না। পাবে কীভাবে? শুটিংই তো শেষ হয় না। অথচ জিজ্ঞেস করলেই মুখস্থ বলে দেন- শুটিং হচ্ছে। খবর নিয়ে জানা গেছে, এসব সিনেমার শুটিং আর হবে না। কিন্তু এসব সিনেমার নায়িকা চরিত্রে যাদের নেয়া হয়েছে তারা সিনেমার কাজ না করলেও নিজেরা ঠিকই নায়িকা হয়ে গেছেন। বাস্তব জীবনেও এসেছে তাদের পরিবর্তন। সিনেমার মহরতের আগে তারা রিকশা অথবা সিএনজিতে বিএফডিসিতে আসতেন। এখন তারা দামি সব ব্র্যান্ডের গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। নায়িকা তকমা লাগিয়ে তারা দুদিন পরপর বিদেশ ভ্রমণে যান। কোনো কাজ না করেই এত টাকা কোথায় পান তকমা লাগানো এই নায়িকারা?

কিছুদিন পরপর তকমা লাগানো নায়িকারা ফেসবুক লাইভে এসে কু-রুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে শরীর প্রদর্শন করেন। অনেকেই এসব দেখে ছি ছি করেন। এসব ফেসবুক কাঁপানো নায়িকারা চলচ্চিত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন কারণেই মিটিং-সিটিং করেন। এমনকি চলচ্চিত্রের অনুষ্ঠানগুলোতেও তারা জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুক ভাসিয়ে দেন। স্বাভাবিক কারণেই বিদেশি বন্ধু ও দেশের কোটিপতি বন্ধুরা ধারণা করেন- এরা চলচ্চিত্রের নায়িকা। আর এই তকমা নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ান আর বিভিন্ন অবৈধ সুবিধা ভোগ করেন। সমাজের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও অনেককে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তখন খবরের শিরোনাম হয়- নায়িকা শাপলা (ছদ্মনাম) হোটেলে আটক অথবা অন্যকিছু। এতে করে চলচ্চিত্রাঙ্গনের বদনাম হয়। স্বাভাবিক কারণে খারাপ একটা মনোভাব তৈরি হয় এই অঙ্গনের মানুষদের নিয়ে। 

এত নায়িকা থাকা সত্ত্বেও ঢাকাই চলচ্চিত্র নায়িকা সংকটে ভুগছেন পরিচালকরা। চলচ্চিত্র নির্মাণে শাকিব খান, সাইমন, বাপ্পি, শুভদের বিপরীতে নায়িকা খুঁজে পান না নির্মাতারা। হয় তো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- কেন মাহি, পরী, ববি, বুবলী, ফারিয়া, থাকতে নায়িকা সংকট কেন? এমন ডজনখানেক নায়িকা থাকা সত্ত্বেও নায়িকা বাছাই করতে গিয়ে একজনকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে তা হলে কী এদের কোয়ালিটি নেই? এ সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি। মার্কেটে তার চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু তাকে কাজে নিতে চাইলেই প্রযোজকের ভাবতে হবে দশ লাখ টাকা ও ড্রেস। এত টাকা একজন শিল্পীর পেছনে লগ্নি করতে অনেক প্রযোজকই রাজি হতে চান না। অন্যদিকে শিডিউলসহ বিভিন্ন জটিলতা তো রয়েছেই।

এবার হালের ক্রেজ পরীমনি। যার রূপের প্রশংসায় ভাসছে চলচ্চিত্রাঙ্গন। কিন্তু তাকে নিয়েও কাজ করতে পারছেন না নির্মাতারা। কারণ পরীমনি গত দুই বছর ধরে খুব বেছে বেছে কাজ করছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ভালো কাজ না হলে কাজই করবেন না। যে কথা সেই কাজ। পরীর মনের মতো স্ক্রিপ্ট না থাকার কারণে তাকেও পাচ্ছেন না নির্মাতারা। শাকিব খানের বিপরীতে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে আলোচিত হয়েছেন শবনম বুবলী। যেখান থেকে আলোচনা সেখানেই আটকে আছেন এই চিত্রনায়িকা। শাকিব খানের গণ্ডি থেকে বেরুতে পারেননি তিনি। শাকিব খানের বাইরে অন্য কোনো নায়কের সঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়নি তাকে। শাকিব খানের শিডিউল ও বাজেটের কারণে মধ্যম বাজেটের সিনেমায় শাকিব খানকে নেয়া সম্ভব নয়। তাই বুবলীকেও নিতে পারছেন না তারা।

ইয়ামিন হক ববি। তিনিও খুব বেছে বেছে কাজ করছেন। হয় তো তার পছন্দের নির্মাতা নয়তো শাকিব খানের বিপরীতে তিনি কাজ করবেন। এর বাইরে তাকে নেওয়া সম্ভব নয়। এভাবেই কোনো না কোনো কারণে এ প্রজন্মের চিত্রনায়িকাদের নিয়ে কাজ করতে পারছেন না নির্মাতারা। তাই বাধ্য হয়ে ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরির নায়িকা অথবা ওপার বাংলা থেকে নায়িকা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। অনেক সময় নায়িকাদের খাম-খেয়ালিপনার কাছে হেরে যায় দেশের নির্মাতারা। শিডিউল ফাঁসানো, শুটিং সেটে দেরি করে আসা, নিজের পছন্দ মতো পোশাক ব্যবহার করা এমনকি শুটিং সেটে ৮-১০ জন লোক সঙ্গে নিয়ে শুটিং করাসহ বিভিন্নভাবে নির্মাতা ও প্রযোজকদের হেনস্তা করছেন দেশের কিছু নায়িকা। যে কারণে বলা যায়- নায়িকা আতঙ্কে রয়েছেন নির্মাতারা।

অপ্রিয় হলেও সত্যি বস্তাপঁচা দশটা সিনেমা নির্মাণ না করে একটি ভালো সিনেমা নির্মাণ করা অনেক ভালো। ভালো গল্প ও বাজেটের সিনেমায় মাহি, পরী, ববিদের নিয়ে কাজ করলে ঢাকাই চলচ্চিত্র সুদিন ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এছাড়া নতুন শিল্পীদের সুযোগ দিয়েও ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। পরিচালকদের সচেতনতার পাশাপাশি নায়িকাদেরও সহনশীল হওয়া জরুরি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জানুয়ারি ২০১৯/রাহাত/তারা

Walton Laptop