ঢাকা, সোমবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

পত্রমিতাদের করুণ মৃত্যু

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৪ ১:০৮:৩৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৪৭:৪২ পিএম

হাসান মাহামুদ : আজ থেকে ঠিক ১৪০ বছর আগে এই দিনে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক টমাস আলভা এডিসন ফোনোগ্রাম আবিষ্কার করেছিলেন। মজার বিষয় হচ্ছে, এডিসন মনে করেছিলেন তার এই যন্ত্রটি অফিসে ডিক্টেটিং মেশিন হিসেবে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু এটি বিনোদনের যন্ত্র হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এটি পরবর্তীকালে রেকর্ড প্লেয়ার হিসেবে পরিচিত পায় এবং ব্যবহৃত হতে থাকে। যদিও এর ব্যবহার এখন আর নেই বললেই চলে।

 

টমাস এডিসন খুব অল্প বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন। এডিসন নিজের নামে প্রায় এক হাজারেরও বেশি আবিষ্কারের পেটেন্ট করেছিলেন। তার গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে, বিদ্যুৎ বাতি, ফোনোগ্রাম এবং মোশন পিকচার ক্যামেরা বা চলচ্চিত্র ধারণের ক্যামেরা। এসবের মধ্যে ফোনোগ্রাম তিনি আবিষ্কার করেন ১৮৭৭ সালের ৪ জানুয়ারি। দশ বছর পর ১৮৮৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী বার্নিলার টিনফয়েল ফনোগ্রামকে কিছুটা উৎকর্ষ করে (মডিফাই) নাম দেন ‘গ্রামোফোন’।

 

যন্ত্রটি খুব অল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এটিকে ঘিরে ১৮৯৮ সালে জার্মানিতে গড়ে ওঠে বিশ্বের প্রথম গ্রামোফোন প্রতিষ্ঠান। কলকাতায় ১৯০৮ সালে এশিয়ার প্রথম কলের গানের কারখানা স্থাপিত হয়। পরে যন্ত্রটি আরো উন্নত করা হয়। পরে গ্রামোফোনের পরিবর্তে আসে ৪৫ আরপিএমের রেকর্ড প্লেয়ার। আশির দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তা আরো উন্নত হয়ে ছোট ফিতায় আসে টেপরেকর্ডার বা ক্যাসেট প্লেয়ার হয়ে। তারপরই আসে ভিসিআর-ভিডিও। পর্যায়ক্রমে আসে কমপ্যাক্ট ডিস্ক (সিডি), ডিজিটাল ভিডিও ডিস্ক (ডিভিডি)। আধুনিকতার দাপটে আজ এগুলোও ছিটকে পড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে মেমোরি কার্ড, আর মোবাইলের ভেতর সবকিছু ঢুকিয়ে দিয়েছেন প্রযুক্তিবিদরা। ফলে ধীরে ধীরে আজ বিলীন পণ্যের তালিকায় উঠেছে ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিআর, সিডি, ভিসিডি প্রভৃতি আধুনিক সরঞ্জাম।

 

ফোনোগ্রাম-এর মতো বাংলাদেশে প্রথম ডিজিটাল টেলিফোন ব্যবস্থাও চালু হয় ঠিক ৪ জানুয়ারি। তবে বছরটি ছিল ১৯৯০ সাল। সেই ডিজিটাল টেলিফোনও বাংলাদেশে আর ব্যবহৃত হয় না। ১৯৯২ সালে কার্ড ফোন চালু হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে দেশে চালু হয় মোবাইল। মোবাইলভিত্তিক যোগাযোগ আরো সহজতর এবং দ্রুতগামী হয়। মোবাইল বহুবিধ এবং অবাধ ব্যবহার আমাদের জীবনযাত্রা অনেক বেশি সহজ এবং সমৃদ্ধ করে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। বিনিময়ে কেড়েও নিয়েছে কিছু স্বকীয়তা, ঐতিহ্য। ফাউন্টেনপেন কলম, পেনফ্রেন্ড, পত্রমিতালী- এসব এখন ইতিহাসে পরিণত হয়ে গেছে। সরকারের শুধুমাত্র একটি মন্ত্রণালয়ের কারণেই বোধকরি আজও টিকে আছে শুধু ডাকবিভাগ। কিন্তু সেই রানার কিংবা ডাকপিয়ন এখন আর নেই। অবাক করার মতো বিষয় হলেও সত্যি যে, এখন দেশের প্রধান পোস্ট অফিসে সেলফী তোলা আর প্রিন্ট করার মেশিন বসেছে। ধীরে ধীরে এই যন্ত্র বসবে দেশের অন্যান্য পোস্ট অফিসেও।

 

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও মানুষ চিঠি লিখতো। নিয়মিত খোঁজখবর রাখার অন্যতম বাহন এবং নিজের অভিমান অনুভূতিগুলো ভালোবাসা ভালোলাগা মনের মতো করে প্রকাশ করার একমাত্র মাধ্যমও ছিল চিঠি। আইএসডি টেলিফোন সেবা চালুর আগে বিদেশে থাকা বাবা-ভাই বা স্বামীর কাছে চিঠি লেখেননি, এমন মানুষ খুব কম পাওয়া যাবে।  লোকাল চিঠি, বিদেশী চিঠি, সরকারি চিঠি হরেক রকমের চিঠির প্রচলন ছিল দেশে। এমনকি খুব প্রয়োজনে মানুষ বিয়ারিং চিঠিও পোস্ট করতো। বিয়ারিং চিঠি লেখার নিয়ম হলো- টাকা পয়সা ছাড়াই চিঠিটা বাকিতে যেকোনো খামে পোস্ট করে পাঠানো যাবে, তবে প্রাপককে দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে চিঠিটা পোস্টম্যানের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হতো।

 

একটি চিঠি যে একজন মানুষের জন্য কতটুকু আকাঙ্ক্ষিত তা যিনি এর সুফলভোগী তিনিই অনুভব করতে পারতেন। একজন চাকরিপ্রার্থীর কাছে একটি ইন্টারভিউ কার্ড পাওয়ার জন্য সেই পোস্ট অফিসের পোস্টম্যানের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা। তারপর সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে একটি সোনার হরিণখ্যাত চাকরি পেলে সেই চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার সে যে কী অপেক্ষা আনন্দ, আর না পাওয়ার কী বেদনা!

 

এখন মানুষ যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বন্ধু হয়। আগে এই চিঠির মাধ্যমে অপরিচিতরা বন্ধু হতো। চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে যে বন্ধুত্ব তৈরি হতো, তাকে ‘পত্রমিতালী’ বলা হতো। পত্রমিতালীর জন্য ছিল গাইড। সেখান থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে ছেলেমেয়েরা অজানা বন্ধুদের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখতো। সেই পত্রমিতালী এখন আর নেই। এমনকি নতুন প্রজন্মের কাছে পত্রমিতালী শব্দটি একেবারে নতুন এবং আনকোরা মনে হবে। কারণ ‘চিঠি’ এখন ‘ই-চিঠি’ আর ‘পত্রমিতালী’ এখন ‘নেট ফ্রেন্ড’ বা নেট বন্ধু হয়েছে। এখন প্রযুক্তির যুগ। বন্ধুত্ব গড়তে এখন আর পত্রমিতালীর গাইড খুঁজতে হয় না। কিংবা পত্রিকায় বন্ধু চেয়ে চিঠিও লিখতে হয় না। জায়গা এখন দখল করেছে মোবাইলের এসএমএস, ইন্টারনেটের ই-মেইল, ভয়েস চ্যাট ইত্যাদি। কিন্তু পত্রমিতালীর সেই আবেদন নেটবন্ধুদের মধ্যে কি আসলেই মিলে?

 

লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লেখা, কিংবা রাতে হারিকেনের আলোটা কমিয়ে পড়ার বইয়ের ফাঁকে নিয়ে চিঠি পড়ার সেসব আবেগ এখন আর অনুভূত হয় না। মিলবেও না কখনো। কারণ আমাদের বাবা-মায়েরা চিঠি লেখার শেষ প্রজন্ম হয়ে গেছেন। আমরা যারা এখন মাঝবয়সে আছি, আমরাও শেষ প্রজন্ম হিসেবে ফেসবুক-টুইটার চালাচ্ছি, যাদের বাবা-মায়েরা এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে না। একটি চিঠি লিখে আবার তার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মনটা আনচান করত। কারো ছেলে-মেয়ে, কিংবা বাবা-মা অথবা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চিঠি আদান প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অপরদিকে সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ চিঠি ছিল বাবা-মায়ের কাছে দেশ-বিদেশের দূরে থাকা সন্তান-সন্তুতির। প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে চিঠি আদান-প্রদান। কিন্তু এগুলো সবই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সেগুলোর ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

 

এই তো কয়েকদিন আগেও আমরা এই যুগে চিঠির শক্তি দেখেছি। স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী চিঠির গুরুত্ব দিয়ে একটি ছোট্ট বালককে উত্তর দিয়েছেন। চিঠিটি ছিল পটুয়াখালী জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ের শীর্ষেন্দু বিশ্বাস নামের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রের।  সে তার স্কুলে যাওয়ার পথে মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর উপর দিয়ে নৌকাডুবিসহ দুর্ভোগ-দুর্দশার কথা উল্লেখ করে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠিটি লিখে। মায়ের সহায়তায় তা ডাক বিভাগের মাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছিল। তারপর  প্রধানমন্ত্রী চিঠিটিকে আমলে নিয়ে সেই ছেলেকে পুনরায় ব্রিজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিঠির উত্তর দেন ডাক বিভাগের মাধ্যমে।

 

টেলিফোন ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধিত হওয়ার পর থেকে চিঠি লেখার চাহিদা কমতে শুরু করেছে। তার উপর এখন অতি সহজলভ্য সবার হাতে হাতে আধুনিক মোবাইল সেট ও ফোনের মাধ্যমে এসএমএস, এমএমএস, ইন্টারনেটের কল্যাণে ইমেইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিও মাধ্যমে এখন চাইলেই নিমিষে দেশ-বিদেশে আঙ্গুলের ইশারায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে। পত্রমিতালীরাও এখন আর নেই। কিন্তু আমরা আশা করতে চাই, চিঠির মতো এসব মেসেজিং সার্ভিসের কিংবা পত্রমিতালীর মতো নেট ফ্রেন্ডদের বন্ধুত্ব হবে। কিংবা শীর্ষেন্দুর মতো চিঠি না হোক, অন্তত অনলাইন ভার্সনে লেখাগুলোর শক্তি মঙ্গলসাধনের মতো বলিষ্ঠ হোক।

 

লেখক: সাংবাদিক

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জানুয়ারি ২০১৭/হাসান মাহামুদ/তারা