ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

পাখির বাসা, শিল্পের কাণ্ডকারখানা ও পাতালপুরীর সমাধি

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১০ ৬:২৫:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-১০ ৬:২৫:৩২ পিএম
অলিম্পিক স্টেডিয়ামের সামনে আমি ও সুবর্ণা

(চকবাজার টু চায়না : পর্ব-২৪)

শান্তা মারিয়া : মনে করুন আপনি তেজগাঁও শিল্প এলাকা দিয়ে যাচ্ছেন। বড় বড় টিনশেড ভবন। কারখানার বাড়ি। কিন্তু সেই কারখানা-বাড়ির সামনে চমৎকার এক ভাস্কর্য। কৌতূহলী হয়ে একটু সামনে গিয়ে উঁকি দিলেন। ওমা! ভেতরে শিল্প কারখানা নয় বরং শিল্প নিয়ে কাণ্ডকারখানা চলছে। হ্যাঁ বেইজিংয়ের ৭৯৮ আর্ট জোনে গেলে এমনটাই মনে হবে আপনার। চীনা সহকর্মী সুবর্ণা তার চলুন বেড়িয়ে আসি অনুষ্ঠানের জন্য সহ-উপস্থাপক আমাকে নিয়ে গেলেন বেইজিংয়ের ছাওইয়াং ডিসট্রিক্টের এক জায়গায়। সেদিন সঙ্গে ছিলেন দুই সহকর্মী সুবর্ণা আর প্রকাশ।

 

প্রকাশ একটি ভিডিও অনুষ্ঠান বানাচ্ছিলেন আমাদের নিয়ে। প্রথমে মনে হলো কী ব্যাপার কারখানায় নিয়ে যাচ্ছে কেন?

সুবর্ণাই বুঝিয়ে বললেন বিষয়টা। এক সময় এই এলাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্প কারখানা ছিল। ঠিক আমাদের তেজগাঁও শিল্প এলাকার মতোই। পরে দূষণ ও যানজট রোধ করার জন্য এই শিল্প কারখানাগুলো স্থানান্তরিত করা হয় শহরের বাইরে। বিশাল একটা এলাকা তার টিনশেড কারখানা ভবনগুলোসহ শূন্য পড়ে থাকে। বড় বড় কারখানা ভবন সব খালি! রীতিমতো ভূতুড়ে অবস্থা। এরই মধ্যে একদিন এক শিল্পী একটি কারখানা ভবনে স্থাপন করলেন তার স্টুডিও। কারখানার বিরাট শেডের নিচে পুরো ভবনের ডেকোরেশন অন্য রকম করে ফেললেন তিনি। ফলে শিল্প কারখানার জায়গায় শিল্পের আনাগোনা শুরু হলো সেখানে। তার সাফল্যের পথ ধরে ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন শিল্পী একেকটি কারখানা ভবনে নিজেদের স্টুডিও স্থাপন করেন। কয়েকটি বুটিক হাউজ তাদের কারখানা ও শোরুম এখানে নিয়ে আসে। এখন পুরো এলাকাটি ‘আর্ট জোন’ নামে খ্যাতি পেয়েছে। বিভিন্ন স্টুডিওর সামনে পথের ধারে ধারে শোভা পাচ্ছে আধুনিক শিল্পকলার প্রতীক সব ভাস্কর্য।

 

বিভিন্ন স্টুডিওতে চলছে চিত্র প্রদর্শনী। বেশ দর্শকের ভিড়। অনেকে ছবি কিনছেন। বেইজিংয়ের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই শিল্প-সাহিত্য-চিত্রকলার অনুরাগী। তারা ঘর সাজাতে ভালোবাসেন শিল্পীর আঁকা ছবি দিয়ে। এসব স্টুডিওতে ঘুরে মুগ্ধ হতে হয় আধুনিক চীনা শিল্পীদের শিল্প নৈপুণ্যে ও উৎকর্ষতায়।

এখানেই একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সারলাম। হঠাৎ দেখে মনে হয় কোনো কারখানার ক্যান্টিন। সেই আবহ ও মেজাজও রেখে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু একটু খেয়াল করলেই ধরা পড়ে এমনকি বসার চেয়ার বেঞ্চিতেও রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া। আধুনিক শিল্পপ্রেমী বেইজিংয়ের একটি অসাধারণ জায়গা এই আর্ট জোন।

 

শিল্পের কাণ্ডকারখানা

 

শিল্পীদের আড্ডাখানার খুব কাছেই হলো পাখির বাসা। মানে চীন অলিম্পিকের সময়কার বিখ্যাত স্টেডিয়াম বার্ডস নেস্ট। সে সময় যার অপূর্ব শোভায় মুগ্ধ হয়েছিল জগতবাসী। এটি চীনের জাতীয় স্টেডিয়াম। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘেরা জায়গা। আশি হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে এখানে বসে ক্রীড়ানুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন। বেইজিং অলিম্পিকের সময় এখানে একসঙ্গে ৯১ হাজার মানুষ আসন নিয়েছিল। শুধু বিশালত্বের জন্যই নয় এর অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। পাখির বাসা দূর থেকে দেখে মুগ্ধ হলাম। কাছে গিয়ে ভেতরে ঢুকে ভয় হলো যে হারিয়ে যাব না তো?

পুরো স্টেডিয়াম ঘোরার সময় হয়নি। কিছুক্ষণ ঘুরেই বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম তিনজনই। কাছাকাছি মানে আধ কিলোমিটার হেঁটে গেলাম ম্যাকডোনাল্ডসে। জম্পেস খাওয়া সঙ্গে মন মাতানো আইসক্রিম। ক্লান্তি পালাতে পথ পায় না।

 

তরতাজা হয়ে ফের বের হলাম আমরা। বার্ডস নেস্টের কাছে অলিম্পিকের সাঁতারের স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামটির স্থাপত্য এমন যে দেখে মনে হয় জলের বুদ্বুদ দিয়ে পুরোটা তৈরি। দারুণ সুন্দর!এরপর অলিম্পিক পার্ক। এমনিতেই বেইজিংয়ের পার্ক মানেই এলাহি কারবার। আর অলিম্পিক পার্ক যে তার মধ্যে সেরা হবে সে তো বোঝাই যায়। এটি যে কত বিশাল এর আয়তনেই বোঝা যায়। আয়তন ১১.৫৯ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফরেস্ট পার্ক বলে আরও একটি পার্ক রয়েছে। অসাধারণ সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ এই পার্কের। ভেতরে রয়েছে জলাশয়, ভাস্কর্য আর বিরল প্রজাতির কিছু উদ্ভিদ।

এই পার্ককে বলা হয় শহরের ফুসফুস। পুরো বেইজিং শহরের দুষণ দূর করতে এই একটি পার্কই যথেষ্ট।

বেইজিংয়ের আরেকটি দুর্দান্ত জায়গা হলো মিং টমব। মিং সম্রাটদের সমাধি রয়েছে এখানে।

মিং টমব বিষযে ট্রাভেল চায়না, ট্রিপ অ্যাডভাইজারসহ অনেক সাইটেই বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এটা শহরের বাইরে ৪২ কিলোমিটার দূরে। বাসে বা ট্রেনে চড়ে যেতে হয়। পাতালিং গ্রেটওয়ালে যাবার পথেই নাকি এই সমাধি।

 

পাতাল সমাধির প্রবেশ পথের সামনে

 

শরতের এক সুন্দর সকালে আমি আর শিহাব রওনা দিলাম মিংটমব দেখার উদ্দেশ্যে। প্রথমে সাবওয়ে ধরে শেষ প্রান্ত। তারপর বাস ধরতে হবে। সাবওয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই এক দল ট্যাক্সি চালকের খপ্পরে পড়লাম্ । থ্যাকেসি থ্যাকেসি বলে রীতিমতো প্রতিযোগিতা। তারা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল এদিকে কোনো বাস যায় না। কিন্তু বললেই আমরা তা শুনব কেন?  আমরা বাসে চড়ে মঙ্গল গ্রহে যাওয়া পাবলিক।

ওদের আওতা থেকে বেরিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করতেই বাস স্টপেজের খোঁজ পাওয়া গেল। কুং কুংছিছ মানে পাবলিক বাসে চড়ে বসলাম। তবে সেটি ছিল ভুল বাস। এভাবে তিনবার ভুল বাস টপকে শেষ অবধি সঠিক বাসে চড়ে পৌঁছে গেলাম সম্রাটের সমাধিতে।

 

বিশাল এলাকা নিয়ে এই সমাধি। ১৪২০ সালে মিং সম্রাট ইয়াংলিনিজের সমাধির জন্য এই পাহাড়ি উপত্যকায় নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তিতে মিং বংশের আরও প্রায় ১৩ জন সম্রাট এই এলাকায় সমাধিস্থ হন। অনেকগুলো পৃথক সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। বেশ দূরে দূরে এগুলোর অবস্থান। বাইরে থেকে দেখলে একেকটি সমাধি ক্ষেত্র রাজপ্রাসাদের মতো। আর আছে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি হাঁটা পথ। এই পথকে বলা হয় আত্মার পথ। এই পথে বিশাল বিশাল সব মূর্তি রয়েছে। মূর্তিগুলো চীনা মিথোলজি অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির প্রতীক। আমি একটি সমাধি ক্ষেত্রের ভেতরে নেমেছিলাম। বাইরে প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে মাটির নিচে প্রায় ছ-সাত তলা নামার পর পৌঁছানো যায় মূল সমাধিতে। মাটির ছ’সাততলা নিচে পাতালপুরীর প্রাসাদ।

 

সেখানে বিশাল বিশাল কক্ষে রয়েছেন সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, বিশিষ্ট রাজপুরুষরা। পাতালপুরীতে এমন প্রাসাদ কীভাবে তৈরি করা সম্ভব হলো ভাবতে অবাক লাগে। শুধু সম্রাটের সমাধি নয়, এখানে রয়েছে আরও অনেক স্মারক বস্তু। রাজ পরিবারের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম সামগ্রী। সমাধি ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে চোখে পড়ে বিশাল এলাকাজুড়ে গাছগাছালি। নানা রকম দেবমূর্তি, ভাস্কর্য । সন্দেহ নেই অতীব সুন্দর! তবে সব কিছুর উপর যেন মৃত্যুর ছোঁয়া লেগে আছে। থমথমে পরিবেশ। অবশ্য এটা আমার কল্পনাও হতে পারে।

 

রাজ শাসনামলে এই সমাধি ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। এগুলো এক সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই চলে গিয়েছিল।

বিংশ শতাব্দিতে নয়া চীন প্রতিষ্ঠার পর এখানে প্রত্নতাত্বিক খনন কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর খনন কাজ চলার পর এক সময় এগুলো সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়।

স্থাপত্যবিদ্যায় ও ভাস্কর্যে মধ্য যুগের চীন যে কী অভাবনীয় উন্নতি করেছিল এই সমাধি ক্ষেত্রগুলো তার অনন্য নিদর্শন।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা