ঢাকা, বুধবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ জুন ২০১৭
Risingbd
ঈদ মোবারক
সর্বশেষ:

বীমা বিধি পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি : ফারজানা চৌধুরী

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-০৮-২৩ ৬:৩৯:১৮ পিএম     ||     আপডেট: -০০০১-১১-৩০ ১২:০০:০০ এএম

দেশে বীমা শিল্পের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরী। তিনি বীমা খাতের সঙ্গে যুক্ত আছেন দীর্ঘদিন ধরে এবং এই খাতে একজন সফল নির্বাহী। বীমা শিল্পের অবস্থা সম্পর্কে জানতে রাইজিংবিডি ডটকম সম্প্রতি তার মুখোমুখি হয়। তিনি এই শিল্পের সম্ভাবনা ও উন্নয়ন এবং এখানে বিরাজমান সমস্যা নিরসনের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তার সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হলোঃ

 

রাইজিংবিডি : বাংলাদেশে বর্তমানে বীমা শিল্পের পরিস্থিতি কি?

ফারজানা চৌধুরী : আমাদের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম লোক বীমার আওতায় আছে। আমাদের জিডিপি-তে বীমা শিল্পের অবদান ১ শতাংশেরও কম। এর মানে হচ্ছে যে, বীমা খাতের সম্ভাবনা অপরিসীম। গত এক দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রির পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ বীমার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন এবং বিভিন্ন বীমা পলিসির গুরুত্ব সম্পর্কে তারা অবগত আছেন।

 

রাইজিংবিডি : সম্প্রতিক সময়ে বলা হচ্ছে যে, বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাবে নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে বেশি খরচ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

ফারজানা চৌধুরী : হ্যাঁ, এটা সত্যি যে ১৯৫৮ সালের বীমা বিধিতে নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে ব্যয় এখন বেড়ে গেছে। এমনকি আমাদের নিজেদের খরচও উল্লেখিত বরাদ্দ পরিমানের চেয়ে বেশি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এটাও বিবেচনা করা উচিত যে, ৫৮ বছর আগের নির্দেশনা এখন কতটা যুক্তিসঙ্গত। কারণ, সময়ের সাথে সাথে অনেক পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে এখন সময় এসেছে ১৯৫৮ সালের বীমা বিধি সংশোধন করার, যাতে বীমা কোম্পানিগুলো আরো ভালোভাবে তাদের কর্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

 

রাইজিংবিডি : আপনার মতে বীমা খাতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধির কারণ কি?

ফারজানা চৌধুরী : আমি আগেই বলেছি যে, ১৯৫৮ সালের চেয়ে এখনকার বাজার অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে, যা এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অন্যান্য কারণগুলো হলোঃ

 

১৯৫৮ সালের সাথে এখনকার তুলনা করলে দেখা যায়, মূদ্রাস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ, যাতায়াত, বিজ্ঞাপন, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদির খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে  ৩০০০ গুণ পর্যন্তও বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি ২০০৫ সালে বীমা রেজিস্ট্রেশন ফি ১৩৩% বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

১৯৯১ সালে সরকার প্রায় সব খরচের উপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপ করেছে। এর ফলে এটি আমাদের ব্যয়ের খাতে যুক্ত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যখন ১৯৫৮ সালে বীমা বিধি জারি করা হয়, তখন এতে মূসকের কোন বিধান ছিল না। আমাদের যদি ভ্যাট দিতে না হতো, তাহলে আমরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে সক্ষম হতাম।

 

যদিও খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেন্ট্রাল রেটিং কমিটি (সিআরসি) বিভিন্ন শিল্পের জন্য প্রিমিয়াম হার হ্রাস করেছে। বাজারে এখন ৪৫ টি সাধারণ বীমা কোম্পানি আছে।  যেহেতু আমাদের বীমা শিল্পের আকার তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট, কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেক তীব্ৰ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে দক্ষ জনবল আকর্ষণ, নিয়োগ ও তাদের ধরে রাখার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।

 

আমরা গ্রিন ডেল্টায় সবসময় দক্ষ বীমা পেশাদার গড়ার উপর জোর দিয়ে থাকি। এই কারণে আমরা প্রায়শই আমাদের কর্মচারীদের দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পাঠিয়ে থাকি। এতে যদিও আমাদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু আমরা যোগ্যতাসম্পন্ন এবং দক্ষ পেশাদার জনবল তৈরি করতে সক্ষম  হয়েছি।

 

এ ছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বীমা কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ কারণেও বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যয় অনেকাংশে বেড়ে গেছে।

 

রাইজিংবিডি : আপনি এই ব্যয় বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি দিতে পারবেন?

ফারজানা চৌধুরী : দেখুন, এটা বলা হয়ে থাকে যে, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় একটি কোম্পানির ক্লায়েন্টদের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ এবং বীমার দাবি পরিশোধ করার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। গ্রীন ডেল্টা জন্মলগ্ন থেকেই এর শেয়ারহোল্ডারদের উল্লেখযোগ্য হারে লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়েছে। গত ২০ বছরে আমরা গড়ে ৩৭% লভ্যাংশ দিয়েছি, যেটি বীমা শিল্পে আগে কখনো দেখা যায়নি। এটি আমাদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। আমরা এই প্রবণতা আগামী দিনেও অব্যাহত রাখার আশা রাখছি।

 

সবসময় দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির জন্য গ্রীন ডেল্টা  বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। আমাদের ক্লায়েন্টরা আমাদের দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার উপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট এবং আমরা এ কারণে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসিত হয়েছি। আমরা বাংলাদেশের বীমা খাতের কিছু বৃহত্তম দাবি সাফল্যের সাথে নিষ্পত্তি করতে পেরেছি।

 

শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ পরিশোধ, গ্রাহকদের দাবি মেটানো এবং সরকারের সমস্ত প্রাসঙ্গিক ট্যাক্স পরিশোধ সত্ত্বেও আমাদের মোট সম্পদ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আমাদের কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতার নিদর্শন।

 

আমরা বিভিন্ন আর্থিক সূচকের (EPS), P/E Ratio, Book Value Per Share, Market Value Per Share etc.) নিরিখে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছি। আমাদের available solvency margin প্রয়োজনীয় required solvency margin এর তুলনায় অনেক বেশী। এটি আমাদের গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ করার ক্ষমতা প্রমাণ করে। গ্রীন ডেল্টা দেশের সব বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ক্রেডিট রেটিংয়ে শীর্ষে আছে। বাংলাদেশে আমরাই একমাত্র বীমা কোম্পানি যারা পরপর দুই বছর স্বনামধন্য ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি দ্বারা `AAA ক্রেডিটরেটিং` অর্জন করেছি। দেশের স্বনামধন্য অডিট ফার্মকে দিয়ে আমাদের বার্ষিক অডিট করিয়ে থাকি।

 

উপরোক্ত বিষয়ের আলোকে এটাই প্রতীয়মান যে, যদিও আমাদের খরচ ১৯৫৮ সালের বীমা বিধির চেয়ে বেশী ছিল কিন্তু আমরা আমাদের সমস্ত মূল্যবান অংশীদারদের অঙ্গীকার / দায়ভার পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। এটি আমাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং সুশাসনের ব্যাপারটি দৃশ্যগোচর করে।

 

রাইজিংবিডি : আপনার মতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এই সমস্যা মোকাবেলায় কী ভূমিকা পালন করতে পারে?

ফারজানা চৌধুরী : বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে বীমা শিল্পে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে বীমা কোম্পানিগুলো সাফল্যের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। আমরা মনে করি, এখন একটি উপযুক্ত সময় এসেছে ১৯৫৮ সালের বীমা বিধি নিয়েই কিছু করার।

 

ইতিমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে যে, গত ৫৮ বছরে সব প্রাসঙ্গিক বিষয় এত বদলে গেছে, ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সেই নির্ধারিত পরিমান এখন অনেকটাই অযৌক্তিক। উপরন্তু, বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় ব্যাংকগুলোর থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

 

তা ছাড়া, বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সিলিং নিজ নিজ কোম্পানির স্বচ্ছলতার প্রান্তিকের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা করা উচিত। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি একটি নেতৃস্থানীয় কোম্পানি আর অপেক্ষাকৃত একটি ছোট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সিলিং এক হতে পারে না।

 

সুতরাং, আমরা সমগ্র শিল্পের পক্ষ থেকে আইডিআরএ- কে  আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি উপরোক্ত বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার জন্য। এতে বীমা খাত অনেক উপকৃত হবে এবং এই শিল্পের সুনাম বাড়বে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ আগস্ট ২০১৬/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop