ঢাকা, শনিবার, ১০ আষাঢ় ১৪২৪, ২৪ জুন ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বেড়েছে বয়স কমেনি ভালোবাসা

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৬ ৪:৪০:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৭ ১২:৪৯:১৬ পিএম

আরিফ সাওন : ২৪ থেকে ২৫ বছর আগে, তবে ঠিক কবে তা মনে নেই। সে সময় শফিকুল ইসলাম শফিককে বিয়ে করেন আলেয়া বেগম। এখন শফিকের বয়স ষাটের কাছাকাছি। বিয়ের আগে থেকেই শফিকুলের ডান হাত অকেজো। কিছু করতে পারেন না। ডান পা আর ডান হাত অবশ দেখেও আলেয়া তাকে বিয়ে করেন।

 

আনুমানিক সেই ২৫ বছর আগে বিয়ের পর তাদের তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। সন্তানরা এখন বড় হয়েছে। যে যার মত রোজগার করতে পারে। কিন্তু কেউ তাদের কাছে নেই। শারীরিকভাবে অক্ষম বাবার খোঁজও তারা রাখেন না। কিন্তু আলেয়া বেগম, তিনি স্বামীকে ফেলে কোথাও যান নি। বিয়ের সময় কম বয়সে স্বামীর প্রতি তার যতটুকু ভালোবাসা ছিলো আজো ঠিক তেমনি আছে; ভালোবাসা কমেনি এতটুকু।

 

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টা। হাইকোর্টের মাজার গেটের ফুটপাত। সেখানে নেই দামি ডাইনিং টেবিল। টেবিলে সাজানো নেই ভিন্ন স্বাদের অনেক রকম খাবার। নেই ভালো গ্লাস-প্লেট। ইট বালির শক্ত রাস্তার উপর বসেই শীতে জুবুথুবু হয়ে এক প্লেটে ভাত খাচ্ছিলেন শফিক ও আলেয়া বেগম। ফুটপাতই তাদের আয়েশী ডাইনিং টেবিল। পানি খাওয়ার জন্য রয়েছে নীল রঙ্গের প্লাস্টিকের গ্লাস। শফিক ভাত খাচ্ছিলেন বাঁ হাত দিয়ে। কনকনে শীতের রাত হলেও তাদের গায়ে ছিলো সামান্য শীত বস্ত্র।

 

শফিকুল জানান, এক প্লেট খাবারের দাম ৩৫ টাকা। প্রতি বার দুজনে এক প্লেট খাবার ভাগ করে খান। কারণ দুই প্লেট খেতে গেলে টাকা দ্বিগুন লাগে। সেই টাকা তারা কোথায় পাবেন। তারা তো ভিক্ষা করে সামান্য যা পান, তাতে কখনো কখনো না খেয়েও থাকতে হয়। শফিকুল আরো জানান, তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ার মাড্ডালি গ্রামের হাজীপাড়ায়। বছর তিনেক হলো ঢাকায় এসেছেন। বিয়ের কয়েক বছর আগে টাইফয়েডে জ্বর হয়ে তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। আজো ভালো হয় নি।

 

আলেয়া বেগম জানান, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেমেয়েরা জিঞ্জিরার ওপারে থাকে। আর তারা স্বামী-স্ত্রী থাকেন হাইকোর্টের ফুটপাতে। বড় ছেলে ওমর ফারুকের বয়স ২১ থেকে ২২ বছর। মেজো ছেলে ফয়সালের বয়স ১৮ বছর, আর মেয়ে মুক্তার বয়স ১৬ বছর। ছেলেমেয়েরা যে যার মত কাজ করে খায়। তারা মায়ের তো দূরের কথা, প্রতিবন্ধী বাবারও খোঁজ রাখে না। আর তার তো স্বামী। স্বামীকে তো আর তিনি ফেলে দিতে পারেন না। যাকে জেনে-শুনে বিয়ে করেছেন তাকে কীভাবে ফেলে যাবেন! স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসার কমতি নেই। আর এ ভালোবাসা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবে।

 

 

কথা বলার এক পর্যায়ে আলেয়া বলেন, ‘লেইহা কী করবেন, চাইয়া খাই, হে অচল, সায়াজ্য দেবেন’?

 

হাত-পা অকেজো দেখেও শফিকুলকে বিয়ে করলেন কেন এমন জিজ্ঞাসায় তিনি বলেন, ‘সবাই যদি ভালো লয়, তাইলে খারাপ লইবো কে’? তিনি বুঝাতে চান সবাই যদি ভালো দেখে বিয়ে করেন, তাহলে অসহায় শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদের কী হবে? তিনি আরো জানান, সারাজীবন একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েই শফিকুলকে বিয়ে করেন। স্বামী অক্ষম। তাই বলে তাকে কখনোই তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন না। আর কোনো দিন করবেনও না। ক্ষুধা লাগলেও স্বামীকে রেখে কখনো একা খান না। সবসময় একসাথে খাবার খান। শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামীকে তিনি কখনো বোঝা মনে করেন না।

 

তারা যার কাছ থেকে খাবার কিনে খাচ্ছিলেন তার নাম জাহানারা। বাড়ি ফরিদপুরে। স্বামী বেশ আগে মারা গেছে। ছেলে নেই। এক মেয়ে। তাকে বিয়ে দিয়েছেন। সেই মেয়ের এক ছেলে এক মেয়ে। জাহানার থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকায়। জীবিকার জন্য রাজধানীর একটি হোটেলে কাজ করেন। সেখান থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জনের খাবার নিয়ে আসেন হাইকোর্টের গেটের সামনে বিক্রির জন্য। খাবার বিক্রির পর তিনি বাসায় ফেরেন। এতে প্রতিদিন তার দুইশ টাকার মত আয় হয়।  

 

৩৫ টাকায় দুই জনকে কী কী খাওয়ালেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ টাকা ভাত। আর ৩০ টাকায় মাছ ও রুইমাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘন্ট ডাল। তারা দুই জন প্রতিদিন আমার এখান থেকে খায়। আমি একবছর ধরে এখানে ভাত বিক্রি করি।

 

জাহানারা জানান, রাস্তার পাশে এমন অনেকেই খাবার বিক্রি করে। এসব বিক্রেতারা গরুর মাংস দিয়ে ভাত ৫০ টাকা, মুরগির মাংস দিয়ে ৩৫ টাকা আর মাছ দিয়ে ভাত ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। যাদের কাছ থেকে খাবার কিনে খায় শফিকুল ও আলেয়ার মত মানুষগুলো। ছিন্নমূল এসব মানুষের থাকা রাস্তায়, খাওয়াও রাস্তায়। রাস্তা ছাড়া তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের ভালোবাসাটাও ওই রাস্তার মতো; যার কোনো শেষ নেই। এমনকি তাদের অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও সেই ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যায় না।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/ ৬ জানুারি ২০১৭/আরিফ সাওন/তারা

Walton Laptop