ঢাকা, শুক্রবার, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২০ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

বৈদেশিক ঋণ আমাদের সত্যিই কি প্রয়োজন !

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২৮ ৬:১২:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-২৮ ৬:১২:৩০ পিএম

হাসান মাহামুদ : একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় দেশটির ঋণ এবং অনুদান গ্রহণের হিসেব থেকে। উন্নত দেশ বা উন্নত দেশের কাতারে সামিল হওয়ার দৌড়ে যেসব দেশ রয়েছে, তারা এখন আর অনুদান গ্রহণ করে না। ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশও গত কয়েক বছর ধরে অনুদানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরাও এখন ঋণকেই প্রাধান্য দেই। এটি একটি উন্নত এবং উৎকৃষ্ট দেশের উদাহরণ।

 

আরেকটি ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে আমরা দেখছি বৈদেশিক ঋণ এবং সাহায্যের পরিমাণও কমছে। এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে- আমরা স্বনির্ভরতার দিকে যাচ্ছি, স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে রয়েছি। অর্থাৎ আমরা এখন নিজেদের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থ নিজেরাই সংস্থান করতে পারছি। এর অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে একনেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থব্যয়ের প্রাক্কলন দেখলেও তা আন্দাজ করা যায়।

 

অবশ্য এখনো আমরা সম্পূর্ণভাবে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবে আমরা সত্যি বিদেশি ঋণ ও সাহায্য নির্ভরতা কাটিয়ে উঠে স্বনির্ভরতার দিকে যাচ্ছি কিনা তা নিয়ে ভিন্ন পর্যালোচনা প্রয়োজন। এই নিবন্ধে সে বিষয়টিতেই আলোকপাত করা হবে।

 

এক সময়, বিশেষ করে ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে আমাদের উন্নয়ন ব্যয়ের ৮০ শতাংশই বিদেশি সাহায্য ও ঋণের মাধ্যমে মেটানো হতো। কিন্তু বর্তমানে আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদেশি ঋণ ও সাহায্যের পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে। রেভিনিউ বাজেটে যে উদ্বৃত্ত অংশ থাকে তা বিনিয়োগ করা যাচ্ছে। আমাদের এখনকার রাজস্ব আহরণের গল্প করতে গেলে, তা রূপকথার মতো শোনা যাবে অনেক দেশের কাছে। তবুও কেন আমরা অনুদান এবং ঋণ নেওয়া অব্যাহত রেখেছি, সেটাই এখন মুখ্য আলোচনার বিষয়।

 

এই তো কিছুদিন আগেও বাংলাদেশকে বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশ। এই বিশেষণটি কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে পাওয়া কোনো আখ্যা নয়। খেয়ালী একজন মানুষ বলে দিলেন বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন দেশ’, আর দাতাদের কাছে এই শব্দটিকে আমরাও বিক্রি শুরু করেছিলাম। ফলাফল, বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন দেশ’। খারাপ লাগার বিষয় হচ্ছে, দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাংকের কাছে শব্দটি বেশি উচ্চারিত হয়েছে। তবে মাথাপিছু আয় বাড়ার প্রেক্ষিতে আমরা এই অভিশপ্ত বিশেষণটি থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমরা এখন বৃহৎ এই দাতাগোষ্ঠীকে ফেরত দিতে পারি। তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি, তারাও পেয়েছে।

 

আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দেশে সঞ্চয়ের তুলনায় বিনিয়োগের ফারাকটা এখনো অনেক বেশি। প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন। কারণ, এগুলো সাধারণত ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ প্রজেক্ট।

 

‘ক্যাপিটাল আউটপুট রেশিও’ নামে অর্থনীতিতে একটি টার্ম আছে। এর মূল কথা- কত পরিমাণ বিনিয়োগে আউটপুট কতটা বাড়বে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বর্তমানে যে পর্যায়ে তাকে আরো ত্বরান্বিত করতে হলে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ধরে নিতে হবে, সাড়ে ৪ টাকা বিনিয়োগে এক টাকা আউটপুট বাড়বে। আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছি তাতে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কম করে হলেও ৩০/৩২ শতাংশ বিনিয়োগ আবশ্যক। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগের হার এখনো ২৫ শতাংশ। বাকি ৫/৬ শতাংশ বিনিয়োগে ফারাক আমাদের বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ দ্বারা মেটাতে হচ্ছে। আমাদের হাতে বেশকিছু বিকল্পও রয়েছে। যেমন- পুঁজিবাজার, রাজস্ব প্রভৃতি।  আমাদের সৌভাগ্য যে, আমাদের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ কম। পুঁজিবাজারের এসব অর্থ আমাদের উন্নয়ন কাজের জন্য ভাল একটি ‘অল্টারনেটিভ’ হতে পারে।

 

সঞ্চয় বাড়ানোর পাশাপাশি রেমিটেন্সের উপর জোর দেওয়া যেতে পারে আরো। এমনিতেই রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে আরো সহজতর ও সমৃদ্ধ করতে পারলে, তৃণমূলেও মাথাপিছু আয় বাড়ানো সম্ভব। এভাবে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারলে আমাদের সঞ্চয়ও বৃদ্ধি পাবে। তাহলে আমরা আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে অগ্রসর হতে পারবো। সঞ্চয় বৃদ্ধি পেলে বিদেশি সাহায্য নির্ভরতা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো। সেই অবস্থায় যেতে যে ৪/৫ শতাংশ বিনিয়োগ ফারাক রয়েছে, তাও পূরণ করা আমাদের দ্বারা সম্ভব। এরপর দাতাদের ঋণ কিংবা অনুদান আসলেই প্রয়োজন থাকবে কী না, তা খুব সহজেই অনুমেয়।

 

আমরা জানি সঞ্চয়ের মাধ্যমেই বিনিয়োগ হয়। কত বিনিয়োগ করবেন তার উপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কত হবে। সে ক্ষেত্রে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি টার্গেট করতে পারি। এজন্য কত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে তার হিসেব করা যেতে পারে।

 

যে সব দেশকে আমরা উন্নত দেশ হিসেবে জানি তারা সবাই এক পর্যায়ে বিদেশি ঋণ ও সাহায্য গ্রহণ করেছে। আমরা সেই পর্যায়ের ঋণ নেওয়া অব্যাহত রাখতে পারি। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশটি ঠিক একইভাবে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে।

 

এখানে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। সাহায্যের টাকা যে শুধু গরিব দেশই গ্রহণ করে তা নয়, অনেক ধনী দেশ যেমন বাহামাস, ইসরাইল, সিঙ্গাপুর ও বিভিন্ন দেশও সাহায্য নিয়ে থাকে। তাদের ভাষায় একে অফিসিয়াল এসিস্টেন্স (ওএ) বলা হয়। অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট এসিস্টেন্স ও অফিসিয়াল এসিস্টেন্সের পাশাপাশি অনেক স্বতন্ত্র স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও গরিব, ধনী উভয় ধরনের দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করে থাকে, আর তাদের মাধ্যমে আসা সাহায্যকে প্রাইভেট ভলান্টারি এসিস্টেন্স (পিভিএ) বলা হয়। আমরাও পর্যায়ক্রমে এই অফিসিয়াল এসিস্টেন্স বা প্রাইভেট ভলান্টারি এসিস্টেন্সের দিকে হাঁটতে পারি।

 

একেবারে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈদেশিক সাহায্যের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে বর্ণনা করে নিবন্ধটি শেষ করছি। আমরা আমেরিকা, জাপান ও ফ্রান্স- এই বড় তিন দেশ ও তাদের ছাড়কৃত সাহায্যের দিকে তাকালে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য দেখতে পাব। আমেরিকান সাহায্যের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে যায় গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে। ফ্রান্স তার সাহায্যের অধিকাংশই পাঠায় তাদের পুরনো কলোনিতে। আর জাপান তাদেরকেই সাহায্য করে, যারা তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বহাল রাখে। তাদের এই ধরনের আচরণ হয়ত কৌশলগত দিক থেকে তাদের উপকৃত করছে। কিন্তু যেসব দেশ সাহায্য নিচ্ছে তাদের কতটুকু উপকার হচ্ছে, এটা এখন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সর্ম্পকের যুগে ভাবার সময় চলে এসেছে। আর নরডিক দেশগুলো গণতন্ত্র, দারিদ্র বিমোচন ও জবাবদিহিতার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে সাহায্যের ক্ষেত্রে। যদিও তা আমেরিকার মত মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক না। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করাই যদি বৈদেশিক সাহায্যের মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাইলে এই ধরনের নীতি ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতা বাংলাদেশসহ অন্যান্য সমপর্যায়ের দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সহায়ক নয় বলেই আমরা ভেবে নিতে পারি। কারণ ঠাণ্ডা যুদ্ধের আগে ও পরে বৈদেশিক সাহায্যের গতি প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এটা অন্তত এখন আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

 

লেখক: সাংবাদিক।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ ডিসেম্বর ২০১৬/হাসান মাহামুদ/শাহনেওয়াজ