ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ভাস্কর্যকে ধারণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি: হামিদুজ্জামান খান

মোহাম্মদ আসাদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-১৬ ৬:১০:৩৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-০৭ ১২:৩০:২০ পিএম
ভাস্কর্যকে ধারণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি: হামিদুজ্জামান খান
Voice Control HD Smart LED

হামিদুজ্জামান খান। দেশীয় ভাস্কর্য শিল্পে তার অবদান অসামান্য। পাশাপাশি চিত্রকলাতেও রযেছে সমান দক্ষতা। পড়াশোনার বিষয় চিত্রকলা হলেও উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন ভাস্কর্য নির্মাণে। ফলে তিনি ভাস্কর্য ও চিত্রকলা দুই মাধ্যমেই কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত এই শিল্পীর ৩৬টি একক প্রদর্শনী হয়েছে। সেখানেও তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। পেয়েছেন শিল্পকলা পুরস্কারসহ একুশে পদক। বহুমাত্রিক এই শিল্পীর আরেকটি একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে রাজধানীর অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে। প্রদর্শনী সামনে রেখে শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আসাদ

মোহাম্মদ আসাদ: আপনি তো কিশোরগঞ্জে বড় হয়েছেন। সেখান থেকে এসে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার গল্পটি শুনতে চাই।
হামিদুজ্জামান খান: কিশোরগঞ্জের গচিহাটি গ্রামে আমার জন্ম। আমি গ্রামে বড় হয়েছি। এসএসসি পাশ করেছি ১৯৬২ সালে। বাবার চিন্তা ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবেন। কারণ তিনিও ডাক্তার ছিলেন। তো এইচএসসিতে ভর্তি হলাম ভৈরবে। আমার ছবি আঁকার প্রতি ঝোক ছিল। কিছু দিন ক্লাস করার পর আর ভালো লাগল না। একদিন বাড়ি ফিরে গেলাম। বললাম, আমি ওখানে পড়তে চাই না। আমি খোঁজখবর নিয়েছি ঢাকাতে চারুকলা আছে। আমাকে সেখানে নিয়ে যান। জয়নুল আবেদিন স্যার তখন চারুকলার প্রধান। আমার বিশ্বাস ছিল তার কাছে একবার যেতে পারলে ভর্তি হতে পারব। বাবা সম্মতি দিলেন। ঢাকা এসে শন্তিনগরে আবেদিন স্যারের বাসায় গেলাম। পরিচয় দিলাম। বাড়ি কিশোরগঞ্জ শুনে স্যার খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি ছবি আঁকো? সাহস করে কিছু ড্রইং দেখালাম। দেখে বললেন, তুমি তো দেরি করে ফেলেছ। দুই মাস হলো ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে। আচ্ছা চারুকলা যাও। গিয়ে বলবে, জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনিই আমার ইন্টারভিউ নিয়েছেন। আমাকে ভর্তি করতে বলেছেন। খুব খুশি মনে আব্বার সঙ্গেই চারুকলায় গেলাম। আবেদিন স্যারের কথা বলার পর আমাকে সরাসরি ক্লাশে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। এভাবেই শুরুটা হয়ে গেল।

মোহাম্মদ আসাদ: আপনার ছাত্রজীবন কেমন ছিল?
হামিদুজ্জামান খান: ক্লাসে গিয়ে দেখি সবাই খুব স্মার্ট। সুন্দর ড্রইং করে। পেন্সিলে সুন্দর সুন্দর লাইন দেয়। আমি তো পেন্সিল ধরতেই জানি না। তবুও ক্লাশ শুরু করলাম। স্যাররা শুধু বলে আউটডোরে স্কেচ করতে। বাইরে যেতাম, স্কেচ করতাম। তারপর বড় একটা ছুটিতে বাড়ি গেলাম। বাড়িতে গিয়ে একটা ছোট্ট স্কেচিং টুল কিনলাম। তার ওপর বসে স্কেচ করি। যেখানেই গিয়ে স্কেচ করি মানুষ জমে যায়। গ্রামগঞ্জের মানুষ মনে করে আমি কি যেন হয়ে গেছি! আমার লজ্জা লাগত না। তখন চারুকলার সাইনবোর্ড পরে গেছে তো! মানুষের মধ্যে বসেই আঁকতাম। ছুটি শেষে আবার ক্লাশ শুরু হলো। আমি বাড়িতে থাকাকালীন কয়েকশ স্কেচ করেছিলাম। ফিরে এসে দেখলাম, এত স্কেচ কেউ করেনি। সবাই দুই-চারটা, দশটা দেখাচ্ছে। যেহেতু অনেক করেছি, আমার একটা লাইনও বের হয়েছে। প্রথম বর্ষে পরীক্ষা দিলাম। দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতেই ছিলেন হাশেম খান স্যার। মোস্তফা মনোয়ার স্যারের সাঙ্গেও দেখা হলো। স্যার ছিলেন খুবই লাইভ। একদিন দেখেই বললেন- কী করো? বললাম, ওয়াটার কালার করছি। স্কেচ খাতা নিয়ে তুলির মাথা দিয়ে টেনে টেনে একটা ফিগার বানিয়ে ফেললেন। পান খেতে খেতে, কথা বলতে বলতে সুন্দর একটা ছবি আঁকা হয়ে গেল। স্যার বললেন, বাইরে গিয়ে কাজ করবে। আমি তখন প্রচুর কাজ করতাম। কালিদাস ছিল আমার ক্লাসমেট। হলে একসঙ্গে থাকি। জিজ্ঞেস করি, কালিদাস কয়টা ছবি এঁকেছ? ও বলে, বেশি আঁকিনি। পরে দেখি প্রচুর ছবি এঁকেছে। আমিও তাই। এভাবে আমাদের মধ্যে কাজের প্রতিযোগিতা হতো। এই কাজগুলো করতে করতে ওয়াটার কালারটা বুঝে গেলাম। আমি আমার মতো করেই আঁকতাম। আনোয়ারুল হক স্যার ধরে ধরে শেখাতেন। একাডেমিক রীতির বাইরে যেতেন না। আমি ওসব কিছু মানতাম না।



মোহাম্মদ আসাদ: চারুকলায় মজার কোনো স্মৃতি?
হামিদুজ্জামান খান: দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষে একটা প্রদর্শনী হলো। সেখানে সবাই ছবি দিয়েছে। আমিও দিয়েছি। আমাকে বলেছিল ছবিগুলো ফ্রেম করে দিতে। টাকা কোথায় পাবো? ফলে ওরকমই জমা দিয়েছিলাম। পরে দেখি ছবিগুলো সব ফ্রেম করা। বললাম, কে ফ্রেম করল? শুনলাম আবেদিন স্যার গ্রাফিক ডিজাইনের যে খোলা ফ্রম পরে ছিল সেগুলো দিয়েই ফ্রেম তৈরি করে নিতে বলেছে। পরে দেখি ছবিগুলো বিক্রিও হয়েছে! কিন্তু কে কিনল? পরে দেখি, এগুলো আবেদিন স্যার কিনেছেন। আমার ওয়াটার কালার ভালো-এজন্যই নাকি স্যার কিনেছিলেন। একদিন শফিকুল আমিন স্যার ডাকলেন। আমি তো ভয় পেয়েছি! আমরা আবেদিন স্যারকে কখনও প্রিন্সিপালের রুমে দেখিনি। তিনি এসে আলাদা একটা সোফায় বসতেন। আমি মনে করতাম, শফিকুল আমিনই প্রিন্সিপাল। আবেদিন স্যার কারো ধার ধারতেন না। টুলে বসে থাকতেন। কখনও ছাত্রদের কাজ দেখতেন, না হলে একটু দেখিয়ে দিতেন। কলেজটাকে সাজিয়ে রাখতেন। ভিজিটর এলে তাদের ঘুরিয়ে দেখাতেন। যাই হোক, শফিকুল আমিন স্যার বললেন, আপনাকে আবেদিন সাহেব ডেকেছেন। দুরুদুরু বুকে স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, জামাকাপড় কি এইগুলাই পরো? আরো জামাকাপড় আছে না? বললাম, আছে স্যার। শুনে বললেন, কালকে পরিষ্কার ড্রেস পরে আসবে। তোমার যে ছবিগুলো কিনেছি, তার থেকে একটা ছবি বার্মার রাষ্ট্রপতি নেউইন আসছেন, তাকে দেব। পরদিন সেভাবেই গেলাম। স্যার বললেন, তোমার ছবি তুমি দাও। আমি প্রেসিডেন্টের হাতে ছবিটা তুলে দিলাম। এভাবে আবেদিন স্যার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।

মোহাম্মদ আসাদ: আপনি ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে পাশ করেছেন। ভাস্কর্যে এলেন কীভাবে?
হামিদুজ্জামান খান: আমাদের সময় কিন্তু ভাস্কর্য বিভাগ ছিল না। এই বিষয়ই ছিল না। তো পেইন্টিংটা নিলাম। আমরা কিবরিয়া স্যারকে পেয়েছি। বাসেত স্যার ছিল আমাদের ক্লাশ টিচার। আমিনুল ইসলাম স্যার ছিল তখন। রাজ্জাক স্যার তখন ভাস্কর্য শুরু করেছেন মাত্র। অল্পঅল্প করে ভাস্কর্যের কাজ করতেন। আমি ১৯৬৭ সালে বড় এক্সিডেন্ট করলাম। অনেক দিন হাসপাতালে ছিলাম। আবেদিন স্যার খুব চেষ্টা করেছিলেন আমাকে ভালো করার জন্য। ভালো হয়ে এসে আমি পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট খুব ভালো করিনি এক্সিডেন্টের কারণে। আমার সব এলোমেলো হয়ে গেল। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়ে দিলো-  আরো চিকিৎসা করাতে হবে ইংল্যান্ড গিয়ে। প্লাস্টিক সার্জারি করতে হবে। আমার মাথায় স্কাল্প ছিল না। জায়গাটা নড়ত। আবেদিন স্যার আমাকে বাইরে পাঠাতে অনেক চেষ্টা করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন, তুমি এডিনবার্গ যাবে। সেখানে গিয়ে চিকিৎসা করবে। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। স্যার আমার ছবি দিয়ে একটা প্রদর্শনী করলেন চট্টগ্রাম ক্লাবের গ্যালারিতে। সব ছবি বিক্রি হয়ে গেল। স্যার সবাইকে বলেছিলেন, ছবিগুলো কিনে নাও, ওর টাকার দরকার। আমি এখান থেকে অনেক টাকা পেলাম। ইংল্যান্ড যাওয়ার জন্য জাহাজের ফ্রি টিকেটও পেয়ে গেলাম। ওখানে হাসপাতালে অপারেশন করার পর আমি ভালো হয়ে গেলাম। ডাক্তার বলল, তুমি যাবে না, এক মাস থাক। আমরা তোমাকে ওয়াচ করব। ব্রেইনের ব্যাপার, ওরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমি একমাস ঘুরে ঘুরে ইংল্যান্ড দেখলাম। ওখানে জাদুঘর দেখলাম। লন্ডনেও গেলাম। তারপর যখন বিল দিতে গেলাম। ওরা বলল, তোমার টাকা দিতে হবে না।  আমার কাছে তখন অনেক টাকা। তখন পাঁচ টাকায় এক পাউন্ড। আমি লন্ডনে চার মাস থেকে গেলাম। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অনেক ভাস্কর্য আছে। রোমান ভাস্কর্য, গ্রীক ভাস্কর্য, পৃথিবীর বড় বড় ভাস্কর্য সেখানে এনে রাখা হয়েছে। আমি সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। একদিন বাসে চেপে চলে গিয়েছিলাম শেক্সপিয়ারের বাড়ি। ততদিনে  ইংরেজিও বলতে পারি। আসার সময় বিমানে আসব। বললাম আমি যদি প্যারিসে হোল্ড করতে চাই পারব? বলল হ্যাঁ, পারবে। প্যারিসে দুই সপ্তাহ থাকার মতো ব্যবস্থা করে দিলো। রশীদ স্যারকে ফোন দিলাম- স্যার প্যারিস যাচ্ছি, এখানে তো আমার কেউ নেই। খুবই ভাষা সমস্যা। স্যার বললেন, চিন্তা করো না। তোমাকে বিমানবন্দর থেকে আমার শ্বশুর নিয়ে আসবে। ফলে দুশ্চিন্তামুক্ত হলাম। সেখানে আমি ম্যাপ দেখে গাইড ধরে ঘুরেছি। ল্যভে গিয়েছি। সেখানে ঢোকার আগে দেখি সমসাময়িক আর্টের ওপর বড় একটা প্রদর্শনী চলছে। বিশাল বড় বড় কাজ। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি দেখে! আমার ভাস্কর্যের চিন্তা এখান থেকেই। আইফেল টাওয়ার দেখে ভাবলাম, ভাস্কর্যের অনেক পাওয়ার। অনেক বছর টিকে থাকে। এই ভাস্কর্য দেখে আমার মনে অনেক চিন্তা এলো। এরপর ইতালীতে ছিলাম আরও ১৫ দিন। সেখান থেকে সোজা বাড়ি। এবার আমি একজন ভিন্ন মানুষ।



মোহাম্মদ আসাদ: চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করলেন কবে থেকে?
হামিদুজ্জামান খান: বিদেশ থেকে ফিরে এসে ভাবলাম ভাস্কর্য করব। রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে দেখা করলাম। স্যার সায় দিলেন। আমি কাজ শুরু করলাম ১৯৬৯ সালে। ছয়-সাত মাস কার করার পর একদিন আবেদিন স্যার ডাকলেন। স্যার বললেন, তুমি রাজ্জাকের সঙ্গে চাকরি করো। আমি সাহস পাচ্ছিলাম না। স্যার বললেন, তুমি দরখাস্ত কর। রাজ্জাক স্যারও খুশি হলেন। ১৯৭১ সালে চাকরি শুরু করলাম।  যুদ্ধ লেগে গেল। সে সময় ঢাকায় ছিলাম। ইন্ডিয়ায় স্কলারশিপ পেলাম।  স্কলারশিপের ইন্টারভিউ দিতে গেছি সচিবালয়ে। গিয়ে দেখি আবেদিন স্যার চলে আসছেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, স্যার আপনি চলে যাচ্ছেন! ইন্টারভিউ কে নেবে? স্যার বললেন, আমি লিখে দিয়ে এসেছি। এরা তো আমারই ছাত্র। কে কে যাওয়ার যোগ্য আমি জানি। এই হচ্ছে জয়নুল আবেদিন। ইন্ডিয়ার বরোদায় দুই বছরের মাস্টার্স শেষ করলাম ১৯৭৫ সালে। ফিরে এলাম দেশে। ততদিনে আবেদিন স্যার মারা গেছেন। বরোদায় থাকাকালীন বড় একটা ঘটনা ঘটে। ওদের ২৫ বছর পরপর বড় একটা প্রদর্শনী হয়। আমি লাকি সে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছি। সেখানে আমার তিনটি কাজ নির্বাচিত হয়। প্রদর্শনী হয়েছে মুম্বাই। আমি যাইনি সেখানে। পরে গ্যালারি থেকে ফোন করে জানাল- এফ এম হোসেন তোমার কাজ খুব পছন্দ করেছে। চলে এসো। আমি গেলাম। আমি হোসনকে বললাম, আমার কাজ পছন্দ হলো কেন? আমার কাজটা ছিল একটা ফিগার, একটা কাপড়ে শুইয়ে দেয়া। বলল, তুমি যে শুইয়ে দিয়েছ এটাই ছিল ব্যতিক্রম। তখনও ভাস্কর্য নিচে ফেলে দেয়নি কেউ। তুমি এই উপ-মহাদেশের ধারা ভাঙছ। এখানে ভাস্কর্য ফেলে দেয়ার মতো শক্তি কারো নাই। আমার খুব প্রশংসা করল। আমার ভাস্কর্য নিয়ে লেখালেখি হলো। আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ল। এই সময় ভাস্কর্যকে ধারণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।

মোহাম্মদ আসাদ: আপনার কাজে মুক্তিযুদ্ধের প্রাধান্য থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে বারবার ফিরে আসে কেন?
হামিদুজ্জামান খান: একাত্তরে আমি লাশ দেখেছি। নয়মাস ভয়ের মধ্যে ছিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাইনি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা দেখেছি। সেই অনুভূতি আমার ভাস্কর্যে আনার চেষ্টা করলাম। দুইবছর শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই কাজ করেছি।  মুক্তিযোদ্ধাদের বেধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রিকশায় লাশ পরে আছে। একটা লাশ কুকুর খাচ্ছে- এগুলো আমার চোখে দেখা। দৃশ্যগুলো ভাস্কর্যে ধরার চেষ্টা করছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম ভাস্কর্য করলাম বর্ধমান হাউজ সংস্কারের সময়। এটা এখন বাংলা একাডেমি। ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটির প্রধান ফটকের ডান পাশে একটি মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব। এটা আমার প্রথম দিকের কাজ। রিয়াল ফিগারের এক মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চারপাশে ফ্রেমে কিছু মুখ। এরপর খোলা স্পেসকে ইন্টারেস্টিং করার জন্য অনেক কাজ করেছি। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে অনেকগুলো কাজ করেছি।

আরেকটি বড় কাজ আছে আশুগঞ্জ সার কারখানায়। এটা ৮৮ সালে করা। ৫০ ফুট উঁচু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’ করেছি ১৯৮৯ সালে। সংশপ্তকের আধুনিক ফর্ম হচ্ছে ইউটিসি ভবনের সামনের ভাস্কর্যটি। একই রকম আরেকটি কাজ করেছি মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে। একটু অন্য মেটেরিয়াল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ফর্ম এনেছি সেখানে।

মোহাম্মদ আসাদ: এই অগুনিত ভাস্কর্য করেছেন এর মধ্যে প্রথম ভাস্কর্য কোনটি?
হামিদুজ্জামান খান: আমার জীবনের প্রথম ভাস্কর্য একটা স্পেস ইন্টারেস্টিং করার জন্য। বঙ্গভবনের ভিতরে মূল ভবনের সামনে একটি ফোয়ারার মাঝে একটি ভাস্কর্য করতে হবে। সেখানে তৈরি করলাম পাখি পরিবার। আশির দশকে করা এই কাজটি ইউনিক। তখন কিন্তু এই দেশে ভাস্কর্য তেমন শুরু হয়নি। মন্ত্রীরাও এটা দেখে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এটাকে তুলে ফেলার চিন্তাও করা হয়েছিল। উদ্বোধনের দিন অনেক বিদেশি কূটনীতিক এলেন। তারা কিন্তু শিল্পরসিক। খুব প্রশংসা পেল আমার কাজ। ফলে ভাস্কর্যটি টিকে গেল। পরে অবশ্য বঙ্গভবন কর্তৃপক্ষ আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল।



মোহাম্মদ আসাদ: আপনি তো অনেক বাড়ি ও কমার্শিয়াল স্পেসে ভাস্কর্য করেন, সে সম্পর্কে একটু জানতে চাচ্ছি।
হামিদুজ্জামান খান: প্রকৌশলী রফিক আজমের করা কয়েকটা বাড়িতে আমি প্রথম ভাস্কর্য করেছি । রফিক আজম, পলাশ এদের একটা দল আছে। এরা সাবই ভালো কাজ করে। রফিক আজম আমাকে পুরো বাড়িই দিয়েছিল। বলেছে আপনার যেখানে খুশি সেখানে ভাস্কর্য বসান। আমি খালি স্পেসগুলো পূরণ করার জন্য নানান জায়গায় ভাস্কর্য বসিয়েছি। ধরো, একটা খালি জায়গা বা দেয়াল। একেবারে খা খা করে। ভাস্কর্য দিয়ে স্পেসটাকে ইন্টারেস্টিং করা যায়। ঘরের ভেতরের দেয়ালে ছবি টানানো যায়। বাইরের স্পেসে ভাস্কর্যই আদর্শ। বিশ্ব ব্যাংকের অফিসে পাঁচটা বড় কাজ আছে আমার। আমেরিকায় বিশ্ব ব্যাংক অফিসে আমার কাজ আছে। তাই ওরা সরাসরি এখানেও কাজগুলো আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। বিশ্ব ব্যাংক ভবনের ভিতর ৬৫ মিটার লাম্বা একটি ভাস্কর্য ওপরের ভিম থেকে নিচে ঝুলিয়ে দিয়েছি।  তাও নিচে থেকে ১২/১৩ ফিট ওপরে। ভাস্কর্যটা ঝুলে আছে। এটা ব্রোঞ্জ, কপার ও স্টিনলেস স্টিল দিয়ে গড়া। গ্রামীণ সেন্টারেও বড় একটা কাজ আছে।

মোহাম্মদ আসাদ: ভাস্করদের কোন বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত?
হামিদুজ্জামান খান: এদেশে কিন্তু অনেক ভালো ভাস্কর্য হয়েছে। অপরাজেয় বাংলা, জাগ্রত চৌরঙ্গী, সাবাস বাংলাদেশ, শংসপ্তক বা পাখি পরিবার পরিকল্পিতভাবে করা। ভাস্কর্য ভিজুয়াল আর্টওয়ার্ক। এটির একটি স্থায়ী রূপ আছে। ভাস্করদের উচিত আরও চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করা। যেহেতু এটা দীর্ঘদিন থাকবে। হাজারো লোকের চোখে পরবে। আমি যখন কাজ বসাব তখন কারো মুখ ধরে রাখতে পারব না। এটা তখন সাধারণের হয়ে যায়। তখন সাধারণ যা কিছু বলবে এখানে কিছু করার নাই।  আবার যারা কাজটা করাচ্ছেন, তাদের একটা লেভেল চিন্তা করা উচিত। একটা নিয়ম, বিজ্ঞজনদের একটা কমিটির মাধ্যমে কাজটা করানো উচিত। শিল্পীরও উচিত হবে কাজটা মানসম্মতভাবে করা। ভাস্কর্য হচ্ছে তোমার ভীত থেকে যেটা আসবে। এখানে আমি আমার মতো করে ফিগারকে যে কোনো দিকে নিয়ে যেতে পারছি। এখানে কিন্তু শিল্পীর অসীম ক্ষমতা। আর আধুনিকতা যুগের দাবি। শিল্পীকে এই শক্তিটাই ব্যবহার করতে হয় শিল্পকর্মে। যে পারে তার কাজ আলাদা করে চেনা যায়। ফিগারেটিভ ভাস্কর্যের বড় একটি সমস্যা সামনে না গেলে কিছু বোঝা যায় না।  পিছনে গেলে তুমি কিছুই দেখতে পারছ না। ভাস্কর্য আমরা আট দিক থেকে দেখতে পারি।  ভাস্কর্যকে সব দিক দিয়েই ইন্টারেস্টিং করে গড়তে হবে। ভাস্কর্য একেবারে ফ্রি ফর্ম হতে হবে। যে কোন দিক থেকে দেখে  ভালো লাগতে হবে। সারা পৃথিবীতে এখন ফর্ম নিয়ে কাজ হচ্ছে।  

মোহাম্মদ আসাদ: এবারে প্রদর্শনী কী কী কাজ নিয়ে?
হামিদুজ্জামান খান: এখানে ১৩০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শীত হবে। তার মধ্যে আছে একটি পেইন্টিং যা ৫২ ফুট চওড়া। আর উচ্চতায় ছয় ফুট। প্রায় তিনটি দেয়ালে ছবিটি টানানো হবে। একফুট বাই একফুট জলরঙের কাজ থাককে ১০০টি। ১০টি ভিন্ন ধারার ভস্কর্য। বাকিগুলো ক্যানভাসে। আশাকরি এবারের প্রদর্শনী শিল্পরসিকদের মন জয় করতে পারব।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ নভেম্বর ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge