ঢাকা, শনিবার, ৭ মাঘ ১৪২৩, ২১ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে জীবন ও মৃত্যুর গল্পকথন

তাশরিক-ই-হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-০৪ ১:২৬:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৩৪:৩৪ পিএম

তাশরিক-ই-হাবিব : শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ আর তিনটি গল্প ‘কাঁটা’, ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা’ আর ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’- প্রভৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর ভাবনা, জিজ্ঞাসা ও শিল্পাভিব্যক্তি পরিস্ফুট। বলে নেয়া ভালো, বাংলাদেশের উপন্যাসের ভুবনে পুরাতন ঢাকার স্থানিক পটভূমিতে এই একটি ছাড়া আর কোনোটিতে বিষয়টি কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য হিসেবে সম্ভবত আসেনি। অন্যদিকে, যে তিনটি গল্পের উল্লেখ করা হলো, এগুলো পুরাতন ঢাকার পটভূমিতে রচিত এবং কোনোটিই মুক্তিযুদ্ধের পরিব্যাপ্তিতে শেষ না হয়ে কমবেশি গল্প লেখার কাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গকে তিনি সাংবাদিকসুলভ প্রামাণ্য বিবরণীতে অজস্র তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে গ্রন্থিত করতে চাননি। আবার, একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বিক্ষুব্ধ কালপর্বের লোমহর্ষক, অনিশ্চিত দিনরাতের বয়ান দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তা বাঙালির সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের গৌরবময় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে মর্যাদার দাবিদার। ফলে, বাঙালির জাতীয় জীবনের চরম সংকটময় পর্বের অভিঘাত যে তাঁকেও প্রভাবিত করেছিল, এর দৃষ্টান্ত রয়েছে এসব গল্প-উপন্যাসে।

 

তবে কথাসাহিত্যে তিনি যে জনপদ, মানুষ আর সামাজিক প্রতিবেশের মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে তোলেন চেনা-জানা দৃশ্যময় বাস্তব জগতের সমান্তরালে আরেক মনোবাস্তব জগত, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ নিছক ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবেই আবদ্ধ থাকে না। বরং সেই কথামালা পাঠ করে একুশ শতকের পাঠকেরাও যে চেতনার নিজস্ব ভূগোলে শাণিত হয়ে ওঠে, তাদের বোধ অনুরণিত হয় বাঙালিত্বের আত্মআবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষায়, একথা অস্বীকারের উপায় নেই। এসব লেখা পাঠ করলে তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জ্ঞাত পাঠকের পক্ষে মিলিয়ে নেয়া সম্ভব, তিনি কতটা নৈর্ব্যক্তিক অবস্থানে থেকে বাস্তব জীবনের সেই দুর্যোগময় পরিস্থিতির সঙ্গে শিল্পবোধ ও সাহিত্যভাবনাকে গ্রন্থিত করেছেন। এ লেখায় আমরা ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ সম্পর্কে দৃষ্টিপাত করতে পারি। এক সাক্ষাৎকারে গল্পটি সম্পর্কে তিনি বলেছেন-

 

‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের নিজস্ব একটা গতিশক্তি থাকে, দাবানলের মত, একবার শুরু হইলে এ নিজে নিজেই ছড়ায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাই ঘটেছিল। আমার প্রাথমিক পারিবারিক বিষয়গুলো গুছায়া নেয়ার পর, আমি ঢাকায় এসে একা বাস করছিলাম এবং পথ খুঁজছিলাম যুদ্ধে যাওয়ার। ... মহল্লায় বান্দর ... গল্পের আব্দলু হালিম কিন্তু আমার পরিচিত, ওর নাম আসলে কাঞ্চন, যুদ্ধ জয়ের পর ফেরার পথে বুড়িগঙ্গায় নৌকায় ডুবে খামাখা মরে যেতে পারলো, আমি পারলাম না! ... যুদ্ধের শুরুর দিকে ঢাকায় নয়াটোলাতে আমাদের বাসায় ছিলাম। ... দুই একদিন পরে, একটা পর্যায়ে আমরা বুঝলাম এখানে থাকা যাবে না, পরে জিঞ্জিরার দিকে চলে গেলাম। ... জিঞ্জিরার ম্যাসাকারের কথা আমি ভুলতে পারি না। আমার লেখায় বারবার জিঞ্জিরার কথা আসে।’

 

এ উদ্ধৃতিতে বিধৃত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন নৈরাজ্যিক প্রতিবেশে উদ্ভূত নারকীয় পরিস্থিতির অকপট উচ্চারণ। লেখকের ব্যক্তিঅভিজ্ঞতায় সন্নিহিত আবেগ ও সংবেদনা গল্পদেহে নিপুণভাবে সংযুক্ত হয়ে বিশেষ আবেদন সঞ্চারে যে সমর্থ, এর সাক্ষ্য রয়েছে গল্পটিতে। এতে পুরাতন ঢাকার পরিসরে লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন বিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে মহল্লাবাসীর পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা ও সহনশীলতা, ঔদার্য ও ত্যাগস্বীকার, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার অনিবার্যতায় প্রিয়জনকে হারানোর বিভীষিকাময় প্রতিচিত্র অঙ্কনের সমান্তরালে আব্দুল হালিম ও ঝর্ণার প্রণয়ভাবনার মর্মান্তিক, নিষ্করুণ বৃত্তান্ত উপস্থাপনায় অনুধ্যানী। বস্তুত, মুক্তিযুদ্ধের আবহে স্বদেশপ্রেম ও নর-নারীর হৃদয়াবেগ এ গল্পে সমান্তরাল বিন্যাসে ভাষ্যরূপ পেয়েছে। গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের দুর্যোগপূর্ণ পরিপ্রেক্ষিতে পুরাতন ঢাকার বাসিন্দাদের বিপর্যস্ত ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার, যার অপ্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক মৃত্যু ভূতের গলির মহল্লাবাসীকে পরবর্তীকালেও বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় পাকসেনাদের নির্মম তাণ্ডবের ভয়াবহতায় তাদের জীবনের চরম সংকটময় মুহূর্তগুলোকে।

 

সেইসঙ্গে সন্তানহারা জননীর করুণ বিলাপ ও হাহাকারের সুরে তাদের চেতনালোকে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে স্বাধীনতার বিনিময়ে প্রিয়জনকে হারানোর মর্মন্তুদ যন্ত্রণার অন্তরালে সক্রিয় বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের বজ্রকঠিন সংকল্প বাস্তবায়নের দুরন্ত অভিলাষ। উনিশশ একাত্তর সালের মার্চের প্রথমদিকেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ফলে অচিরেই পাকসেনাদের সামরিক হামলার সম্মুখীন হয় ঢাকা শহর। রাতে কার্ফু জারিকৃত অবস্থায় নয়াবাজারের কাঠের গোলায় অগ্নিসংযোগ ও টিপু সুলতান রোডে ছুটে যাওয়া ভারি মিলিটারি গাড়ির চাকার গোঙানিতে পুরাতন ঢাকা হারায় জনজীবনের স্বাভাবিক স্পন্দন। সেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মহল্লাবাসীর সংকট ঘনীভূত হয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের একপর্যায়ে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার মায়ের অশ্রুসিক্ত কান্না ও শোকার্ত বিলাপের ঘটনায়। এরপর অতিক্রান্ত হয় বহু বছর, তবু মহল্লাবাসীর মনোভূমিতে আব্দুল হালিমের ভাস্বর অবস্থান মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার বলিষ্ঠ মানসিকতার স্বতঃস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশের অনন্যতায় অটুট থাকে। পরিণামে সে হয়ে ওঠে মহল্লাবাসীর গর্ব ও আত্মত্যাগের অনবদ্য দৃষ্টান্ত।

 

পঁচিশে মার্চের কালোরাতের নির্মম হত্যাযজ্ঞে যখন বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ ও প্রাণ বাঁচানোর অসহায় প্রচেষ্টা পাকবাহিনীর হামলায় পরাজিত হয়, তখন এর প্রতিকারে ভূতের গলির মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। কারণ এ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তারা ছিল বিভ্রান্ত। এ পর্যায়ে তারা সর্বাগ্রে শরণাপন্ন হয় আব্দুল হালিমের। কেননা সে ইতোমধ্যেই সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে যুদ্ধের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে পাক শত্রুর বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী অবস্থানকে সুচিহ্নিত করতে পেরেছিল। পরদিন ভোরে আজানের ধ্বনিতে মহল্লাবাসীর ঘুম না ভাঙার মূলেও রয়েছে বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে পাক হানাদারদের রোষানল উপেক্ষা করার অন্তর্তাগিদ। এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাদের কার্ফুর আদেশ উপেক্ষা করে জিঞ্জিরা ও নবাবগঞ্জে পলায়ন ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না। এ পর্যায়ে প্রতিবেশী আবু হায়দারের উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণী কন্যা হাসিনা আকতার ঝর্ণার প্রতি আব্দুল হালিমের প্রেমসিক্ত ভালোলাগার স্ফূরণ ঘটে চরাইলে তার খালার বাড়িতে উভয় পরিবারের আশ্রয় গ্রহণের ঘটনায়।

 

ঝর্ণার মায়ের প্রতি আব্দুল হালিমের জিঞ্জিরায় যাওয়ার প্রস্তাব দানের অন্তরালে সংগুপ্ত ছিল ঝর্ণার প্রতি তার প্রেমসিক্ত সম্মোহন। চরাইল গ্রামে পৌঁছবার আগেই পাকসেনাদের আগ্রাসনে ঝর্ণাকে নির্যাতিত হতে হয়। তবে এ পর্যায়ে নিজের সম্ভ্রম ও প্রাণ বিসর্জনের বিনিময়ে সে আব্দুল হালিমকে তাদের কবল থেকে রক্ষায় সমর্থ হয়। প্রেমিকার রক্তাক্ত দেহ কোলে নিয়ে শোক ও বেদনায় অভিভূত আব্দুল হালিম জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই ফিরে আসে মহল্লায়। কারণ, বাঙালির মুক্তি অর্জনের লালিত স্বপ্নে তার ভূমিকা নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধার, যে শত্রুকবলিত দেশকে স্বাধীন করতে প্রাণের মায়া, প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের হৃদয়স্নাত ভালোবাসাকে বিসর্জনের বিনিময়ে কঠোর সংকল্প বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

ঘটনাক্রমে, এক রাতে ঝর্ণার বাবা আবু হায়দারের বাড়িতে রাত্রিযাপনকালে সে চুল বাঁধার জন্য ঝর্ণার লাল সার্টিনের একটি ফিতা পায়, যা তার চেতনালোকে প্রতিভাত হয় প্রেমিকাকে হারানোর অন্তর্যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের প্রতীকরূপে। জিঞ্জিরা থেকে মহল্লায় অধিবাসীদের প্রত্যাবর্তনের পর তাদের আচরণ ও মনোভঙ্গিতে সম্প্রসারিত হয় নিরাপত্তাহীনতাজাত চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। এরপর মহল্লায়  মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতাজনিত ঘটনাসমূহ প্রচারিত হয়, যা আব্দুল হালিমকে অনুপ্রাণিত করে। এক বর্ষণমুখর রাতে নিরুদ্দেশযাত্রার আগে সে তার মায়ের কাছে চিরকুটে বিষয়টি জানায়। ফলে মহল্লাবাসীর মনে এ আশাবাদের সঞ্চার ঘটে, সে হয়ত রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইরত।  দুই মাস পর তার মৃত্যুসংবাদ বহনকারী অজ্ঞাত পরিচয়ধারী যুবকের মারফত মহল্লাবাসী অবগত হয়, কামরাঙ্গির চরের ভেতর বুড়িগঙ্গার তীরে অপেক্ষমান নৌকায় উঠতে গিয়ে পা পিছলে নদীগর্ভে তার সলিল সমাধি ঘটেছে। সময়ের ব্যবধানে একদিন আকস্মিকভাবে কাগজে মোড়ানো লাল ফিতাটি আবিষ্কারের পর তার মা আমেনা বেগম অনুধাবন করে ঝর্ণার প্রতি তার ছেলের ভালোবাসার বৃত্তান্ত। তাই তার ফিরে আসার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে ক্লান্ত সেই জননীর বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে ছেলের প্রতি অগাধ মমত্ববোধ ও বাৎসল্যের স্রোত পুনঃপুন সঞ্চারিত হয়। কিন্তু তার অপেক্ষার পালা সাঙ্গ হয় ছেলের প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে তার মৃত্যুর সংবাদ শোনার মাধ্যমে।

 

এরপর ঝর্ণার লাল ফিতাটি সেই নারীর অশান্ত চিত্তে হয়ে ওঠে প্রিয়তম পুত্র ও তার দয়িতাকে হারানোর বেদনায় হৃদয়ে জাগ্রত হাহাকারের একমাত্র স্মারক। তবে কয়েক যুগের ব্যবধানে তার মনোলোকে সেটি শোকের পরিবর্তে মাতৃহৃদয়ে জাগ্রত কোমল প্রশান্তির স্মৃতিচিহ্ন হয়ে ওঠে। তখন ঝাড়ুদারনি নিমফল দাসীর বালিকা কন্যা আলতাজবার চুলে গ্রন্থিত সেই ফিতার মাধ্যমে পরিস্ফুট হয়, আমেনা বেগমের অশান্ত চিত্তে বিরাজমান বেদনা ও শোকের জায়গা দখল করেছে বাৎসল্য ও ভালোবাসা। তবু তার বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে বার্ধক্যজনিত ক্লান্তি ও সন্তান হারানোর প্রবল অন্তর্দাহের অবসান ঘটে না। এরই পরিণতিতে মৃত্যুর অপেক্ষায় নিঃসঙ্গ সেই বৃদ্ধার ‘জীবন হয়তো নিঃশেষ হয়ে আসে, হয়তো শীতর পূর্বেকার অশত্থের পাতার মত বিবর্ণ হয়ে ওঠে এবং ঝরে পড়ার প্রান্তে উপনীত হয়ে হিমেল হাওয়ায় ঝিরঝির করে কাঁপে।’ ব্যক্তিক অনুভবের সমান্তরালে সমষ্টিমানুষের বিচিত্র জীবনস্পন্দনের জয়গানে মুখরিত ভূতের গলির বাসিন্দাদের বৃত্তান্ত উপস্থাপনে এ গল্পে লেখকের অসামান্যতা অবলীলায় পাঠকের অভিজ্ঞতায় ভিন্ন সংবেদনার অনুরণন ঘটায়।

 

এ গল্পে শহীদুল জহির মুক্তিযুদ্ধের সমান্তরালে পুরাতন ঢাকার যূথবদ্ধ জনজীবনের প্রাত্যহিকতাকে টুকরো টুকরো দৃশ্যের সমাহারে গ্রন্থিত করেছেন, যেখানে একজোড়া বানরের আকস্মিক উপস্থিতিতে তাদের অভ্যস্ত-বাধাধরা দিনযাপনে ছন্দপতন ঘটে। অথচ আমরা এতক্ষণ ধরে এ জনপদের যে আখ্যান পাঠ করি, তাতে ঠিক এর বিপরীত প্রতিচিত্রই বিধৃত হয়েছে, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের স্পন্দনটুকুও একাত্তরের সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোতে অনুপস্থিত ছিল! এই যে বিপ্রতীপ দুই পরিমণ্ডল পুরাতন ঢাকার জনজীবনের সঙ্গে একাত্ম করে তোলার অভীপ্সা, যার এক পাল্লায় মুক্তিযুদ্ধ আর অন্যটিতে সেই বানর দম্পতির কর্মকাণ্ড; উভয়ের ভারসাম্যপূর্ণ সমাবেশ ঘটাতে পারা জহিরের শিল্পকুশলতার পরিচায়ক। এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে অজস্র গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে, হচ্ছে। তবু, শহীদুল জহির যে নিরীক্ষা আর ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাকে আঁকড়ে ধরে, গতানুগতিকতা আর পুনরাবৃত্তিকে এড়িয়ে প্রাতিস্বিকতার পথে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে চেয়েছেন, গল্পটিতে রূপায়িত মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র এরই নিদর্শন।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জানুয়ারি ২০১৭/তারা