ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ম্যাজেস্টিকের আন্ডার পাস ও সেই বাঁশিওয়ালা

: রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-২২ ৬:৩৬:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:২০:৪৬ পিএম

ফেরদৌস জামান : শহরের প্রাণকেন্দ্র ম্যাজেস্টিক। কোনো না কোনো কাজে দু’চার দিন পরপরই ওদিকটায় যাওয়া পড়ে। যাতায়াতের পথে এমন কিছু জিনিস দেখি, যা আমার জীবনে প্রথম দেখা। এই যেমন ফ্লাইওভার, আন্ডার পাস, দীর্ঘাকায় জোড়া লাগানো বাস, পাবলিক বাসের মহিলা কন্ডাক্টর এবং আরও অনেক কিছু। ফ্লাইওভার দেখে ইচ্ছা হয়েছিল একবার এপার থেকে ওপার হেঁটে পার হই!

 

 

 

দৃষ্টিনন্দন ফ্লাইওভারগুলি দেখে সহসা মনে হয় না এক্ষুণি ভেঙে পড়বে। দু’পাশের রেলিং দেখে মনে হবে না, এই বুঝি স্লাব খুলে পড়ল মাথার উপর! মাথায় সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা রেখে তৈরি সেগুলো; নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের জন্য নয়। নিচে ফাঁকা জায়গাগুলোতে রিকশার গ্যারেজ, ময়লার ভাগাড় বা ঝুপড়ি গড়ে ওঠেনি। সে স্থান উপরের মতোই সমানভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। পাবলিক বাস প্রাদেশিক সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাসে পা রাখলেই এত টাকা দিতে হবে বা সুযোগে যার নিকট যেমন ভাড়া আদায় করা যায়, এ সমস্ত জোচ্চুরি মানসিকতা সেখানে চোখে পড়েনি। প্রতিটি রুট বা গন্তব্যের জন্য রয়েছে আলাদা রং ও ধরণের বাস। লাইনে দাঁড়িয়ে শৃঙ্খলা মেনে বাসে আরোহণ করার উদাহরণ প্রত্যক্ষ করার জন্য ইয়োরোপ-আমেরিকা যাওয়ার দরকার নেই ব্যাঙ্গালুরুই যথেষ্ট। প্রতিটি ক্ষেত্রে লাইন অনুসরণ করতে গিয়ে তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না। দশজন দাঁড়িয়ে আছে দেখেও সুযোগ বুঝে পেছেন থেকে অন্যদের টপকে কেউ সামনে গিয়ে হাজির হবে না। অধিকাংশ বাসের কন্ডাক্টর নারী, খাকি রং এর নির্দিষ্ট পোশাক এবং প্রত্যেকের কাঁধ থেকে কোমরে ঝুলানো টিকিট ও টাকা রাখার ব্যাগ। যাত্রীদের সাথে সুন্দর ব্যবহার দেখে সহজেই অনুমান করা যায় তারা কতটা আন্তরিক।

 

ঢাকা সিটির একজন নাগরিকের নিকট এই বিষয়টি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যতুল্য হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। মনে আছে দুই-আড়াই বছর আগে জীবনে মাত্র একবার ঢাকার গাবতলীর আন্ডার পাস ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েছিল। প্রবেশ করতে গিয়ে নাকে এক বিরাট ধাক্কা খেয়ে পেছনের দিকে ছুটে বেড়িয়ে আসতে বাধ্য  হয়েছিলাম! নয়তো ইতিহাসের দ্বিতীয় অন্ধকূপ ট্র্যাজেডির শিকার হতে চলছিলাম প্রায়।

 

 

অথচ, আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগেও ম্যাজেস্টিকের আন্ডার পাস পারাপারকারী প্রতিটি মানুষের হৃদয় ভরে উঠত সুরের মূর্ছনায়। কেউ হয়ত তাকিয়ে দেখারও সময় পেত না, কোথায় থেকে ভেসে আসে এমন মাধুর্য সুরধারা। কিন্তু প্রত্যেকের মনোযোগ থাকত ঐ সুরের সর্বশেষ রেশ পর্যন্ত। কেউ আবার সামনে বিছানো কাপড়ের টুকরোয় ফেলে যেত দু’চার রুপি-আধুলী। একদিন ঘুম থেকে জেগে লক্ষ করি, কল এসেছে প্রায় গোটা দশেক। ফোন সাইলেন্ট করে রাখার কারণে পেরিয়ে গেছে এক ঘণ্টা। সাথে সাথে কল ব্যাক করে এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পাই, অতি সত্বর ম্যাজেস্টিকে পৌঁছতে পারলে মূল্য ছাড়ে বিশ্বখ্যাত উডল্যান্ড ব্র্যান্ডের বেশ কিছু ডিজাইনের জুতা ও চামড়াজাত দ্রব্য পাওয়া যাবে। দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ি, ঠিক সময় মত ম্যাজেস্টিক পৌঁছে একজনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম গন্তব্যে যাওয়ার সঠিক উপায়। মূল্য ছাড়ে জুতা কিনতে হবে, সময় মেলাতে না পাড়লে এই সুযোগ আবার কবে আসবে কে জানে! নির্দেশনা মত কিছু দূর হেঁটে প্রবেশ করতে হল অত্যাধুনিক আন্ডার পাসের ভেতর।

 

 

আন্ডার পাস দিয়ে সার্বক্ষণিক বহু মানুষের যাতায়াত, অথচ আশ্চর্য রকমের নীরবতা। কী সেই নীরবতার রহস্য? কানে ভেসে আসে বাঁশির সুর, কিন্তু কোথা থেকে আসে? কয়েক কদম এগিয়ে লক্ষ করি, এই ব্যস্ত জায়গায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে কালো কুচকুচে একজন মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধী, পা দুটো অচল, চোখও দেখে না। নিকটে গিয়ে যা দেখি তাতে আরও বিস্মিত হতে হলো। শুধু পা আর চোখই নয় মুখেও প্রতিবন্ধকতা, বাঁশি বাজছে নাকের সাহায্যে! দোমড়ানো মোচড়ানো দুটি হাতে কোনো মতে বাঁশি চেপে ধরে বাজিয়ে যাচ্ছেন অসাধারণ সব সুর। বিকলাঙ্গ বংশি বাদক আপন খেয়ালে বাজিয়ে যাচ্ছে তার মনের মাধুরী দিয়ে। কে বলে সে প্রতিবন্ধী, সে কি জয় করেনি তার সমস্ত দুঃখ, কষ্ট আর গ্লানি? সাধনা আর সামর্থের সবটুকু দিয়ে সে কি পরাজিত করেনি প্রকৃতির এমন অবিচার? প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত দেখিয়ে দিচ্ছে যান্ত্রিক মহানগর ব্যাঙ্গালুরুর ব্যস্ততম সময়েও তার অসাধারণ শিল্পী প্রতিভা ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে দিতে পারে। নীরব নিস্তব্ধতার মায়াবি আবরণে ঢেকে দিতে পারে ম্যাজেস্টিকের আন্ডার পাস।

 

 

উডল্যান্ডের জুতা কেনার চিন্তা কখন কোন দিক দিয়ে মাথা থেকে বিদায় নিয়েছিল বুঝতে পারিনি। বাঁশির সম্মোহনি যাদু ভুলিয়ে দিয়েছে সমস্ত কিছু। অমনি হুড়মুড় করে বেজে উঠল বেরশিক মোবাইল ফোন। শিল্পীর সাধনায় সামান্যতম ব্যাঘাত না ঘটিয়ে সরে পরলাম। পরোবর্তীতে যত বার ওদিকে গিয়েছি মনের মধ্যে প্রতীক্ষা কাজ করেছে, কখন পৌঁছব ম্যাজেস্টিকের আন্ডার পাসে! আজ বহু দিন পর মনে পড়ছে সেই অপূর্ণ বাসনার কথা। প্রতিদিনই ভাবতাম আজ বংশিবাদকের সাথে কথা বলব, জানতে চাইব তার আক্ষেপ ও না পাওয়ার কথা। কারণ করুণ সুরগুলিতে খেলে যেত এক হৃদয় ভাঙ্গা জিজ্ঞাসা। কী এবং কার নিকট সেই জিজ্ঞাসা? শুধু কি নিয়তি নাকি হারিয়ে যাওয়া কোন চরিত্র? যতদিন ভেবেছি, আজ কথা না বলে নড়ছি না, ব্যর্থ হয়েছি গুণে গুণে প্রতিদিনই। বাঁশি নিয়ে তার ক্রমাগত ধ্যান ভেঙ্গে একটি বারের জন্যও কথা বলার সুযোগ করে নিতে পারিনি। জানি না বংশিবাদক আজও সেখানে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজায় কিনা? জিজ্ঞাসা আর আক্ষেপগুলি হৃদয়ে চেপে বিদায় নিয়েছে চিরতরে, ভার মুক্ত করেছে প্রকৃতি এবং সবাইকে!

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা

Walton
 
   
Marcel