ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সুনসান দুপুরে আরজদুয়ারে

সিয়াম সারোয়ার জামিল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১৭ ২:৩১:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:২৩:৪০ পিএম

সিয়াম সারোয়ার জামিল : বরিশালের বুক চিরে বয়ে গেছে কীর্তনখোলা। সেই কীর্তনখোলা ঘিরেই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জীবিকা। ওয়াটারবাস, লঞ্চ, ইষ্টিমার, ট্রলার, বাহারি নৌকা সবই চলে রাত-ভোর। কীর্তনখোলার ভয়ঙ্কর ঢেউয়ে দোল খায় যেন দুপাড়ের মানুষের জীবন। ভাঙ্গনের হুমকিতে পড়ে আছে নিভৃত এক মায়াবী গ্রাম লামচরি। পাখি ডাকা সবুজে ঢাকা এই গ্রাম নদী ভাঙ্গনে প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। এলাকার পাকা রাস্তার অনেকটাই এখন নদী গর্ভে| যুগ যুগ ধরে এমন ভাঙ্গা গড়ার সঙ্গেই লড়ছে এ গ্রামের মানুষ। অসম্ভব সুন্দর এ গ্রামের মাতুব্বর বাড়িতেই জন্মেছিলেন এক স্বশিক্ষিত দার্শনিক, মানবতাবাদী, চিন্তাবিদ, লেখক- আরজ আলী মাতুব্বর। 

 

লামচরি গ্রামটি বরিশাল সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। ভোরবেলা রওনা দিয়েছিলাম। সঙ্গে ফাহিম, দিব্য আর প্রমথেশদা। পুরোটা ইজি বাইকে যাওয়া যায় না। দশ কিলোমিটার যাওয়ার পরেই থেমে যেতে হয়। নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে রাস্তা। একসময় পিচঢালা পথ ছিল। বালিময় পথে দশ মিনিট হেঁটে এগিয়ে গিয়ে সিএনজিচালিত গাড়িতে করে আরো কিছুদূর যেতে হয়। তারপর বাঁশের ব্রিজের সামনেই চালক থামিয়ে দেন গাড়ি। দেখিয়ে দেন পথ। ভাড়া পরিশোধ করে বাঁশের সাঁকো ধরে কিছুদূর এগিয়ে ডানে তাকাতেই চোখে পড়ে আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি। আরজ আলীর নিজ হাতে গড়া পাঠাগার। জ্ঞানের আলোতে গ্রামবাসীকে আলোকিত করতেই গড়েছিলেন এ প্রতিষ্ঠান। 

 

আরজের স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে, গ্রামবাসীর মাঝে জ্ঞানের আলো কতটুকু পৌঁছেছে তা দেখতেই মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর লামচরিতে এলাম। ছোট্ট একতলা পাঠাগার ভবনে কক্ষের সংখ্যা তিনটি। সামনেই ফলকে লেখা ‘আরজ মঞ্জিল’। আরজ আলী মাতুব্বরের নাতি শামীম এখন পাঠাগারের সম্পাদক। খুলে দেখান সবকিছু আমাদের। প্রথমটি পাঠকক্ষ। পাঠকক্ষসংলগ্ন অন্য কক্ষ দুটির একটিতে রয়েছে আরজ আলী মাতুব্বরের ব্যবহূত কিছু জিনিসপত্র। ঠিক তার পাশের কক্ষটির ভেতরেই রয়েছে আরজ আলী মাতুব্বরের সংগৃহীত বইপত্র। বহু কাঙ্ক্ষিত সেই কক্ষের ভেতর প্রবেশ করলাম আমরা। তিনটি তাকে খুবই অযত্নে রাখা কিছু বইয়ের ধূলিধূসর অস্তিত্ব। 

 

 

মনের মধ্যে ঝড়, এমন অযত্ন কেন আরজের এ প্রতিষ্ঠানটির? তবে কি আরজকে ভুলে গেছে লামচরি মানুষ? অথচ এ গ্রামের জন্যই তো তার সমস্ত সংগ্রাম ছিল। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে শুরু করা আরজের আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের অপমৃত্যুর আশঙ্কায় বিচলিত হই আমরা। কথা হয়, আরজ আলী মাতুব্বরের নাতি শামীম মাতুব্বরের সঙ্গে। পাঠাগার সংস্কারের জন্য সরকার থেকে কিছু টাকা পেয়েছেন বটে। কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল। যে টাকা পেয়েছেন তাতে নতুন ঘর নির্মাণ হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে একটা গেট নির্মাণ হয়েছে, তবে একেবারে অবহেলার সঙ্গে। দেখলঅম খুলে পড়েছে কয়েক জায়গার টাইলস।

 

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানলাম, আশপাশে কয়েকটি মাদ্রাসা থাকলেও বাড়েনি স্কুলের সংখ্যা। আশা ভরসা সেই লামচরি স্কুল। উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে যেতে হয় বরিশাল শহরে। সেজন্যে নৌপথ, স্থলপথ মিলিয়ে পাড়ি দিতে হয় ১৫ কিলোমিটার। দুপুর গড়িয়েছে। পেট চো চো করছে। ফিরতে হবে। স্থলপথের বিকল্পের কথা জিজ্ঞেস করতেই শামীম মাতুব্বর জানালেন, দশ মিনিট হাঁটা পথের পর ঘাট আছে। বাজার পার হয়ে ঘাট থেকে ট্রলারে করে বেলতলা গেলেই গাড়ি পাবেন। লামচরি স্কুলের পাশ দিয়ে ফেরার পথে স্কুল ড্রেস পরা ক'জন ভবিষ্যত যোদ্ধাদের সাথে দেখা হয়ে গেল। 

 

পথ ঘাট চিনি না। ওদের একজনকে ঘাটের কথা জিজ্ঞেস করতেই দুজন এগিয়ে এলো। সজীব আর শালেক। ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিল ওরা। ট্রলারে ওঠার আগে আরজ আলীকে নিয়ে কথা হলো ওদের সাথে। জিজ্ঞেস করলাম, বড় হয়ে কী হতে চাও? সজীব বলল, ডাক্তার। এখানকার মানুষ চিকিৎসা পায় না। তার বাবাও বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। সঙ্গী শালেক বলল, সে শিক্ষক হতে চায়। আরজ মাতুব্বরের মতো পড়াশোনা করতে চায়। দার্শনিক হতে চায় সে। শুনেই মনে বিশ্বাস জন্মাল নতুন করে। নিশ্চিন্তেই এবার ধরি ফেরার পথ। আমি জানি, ধীরে ধীরে হলেও আরজের আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে সত্যের জয় অনিবার্য। 

 

 

আরজ আলী মাতুব্বরের সংক্ষিপ্ত জীবনী : আরজ আলী মাতুব্বর ১৯০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম আরজ আলী। আঞ্চলিক ভূস্বামী হওয়ার সুবাধে তিনি ‘মাতুব্বর’ নাম ধারণ করেন। গ্রামের মক্তবে কিছুকাল পড়াশোনা করেন, যেখানে শুধু কোরান ও অন্যান্য ইসলামিক ইতিহাসের উপর শিক্ষা দেওয়া হতো। তিনি নিজ চেষ্টা ও সাধনায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর জ্ঞান অর্জন করেন। ধর্ম, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। 

 

৮৬ বছরের জীবনকালে ৭০ বছরই লাইব্রেরিতে কাটিয়েছেন পড়াশোনা করে। জ্ঞান বিতরণের জন্য তিনি তার অর্জিত সম্পদ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি’। ১৯৩২ সালে আরজ আলী মাতুব্বরের মা মারা গেলেন, যে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনসংগ্রামের পুরো স্মৃতি জড়িয়ে। মায়ের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হলেন আরজ। বরিশাল সদর থেকে একজন পেশাদার আলোকচিত্রগ্রাহক এনে মায়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে একটি আলোকচিত্র ধারণ করলেন লাশ দাফনের আগে। 

 

এতেই ঘটে গেল তুলকালাম কাণ্ড। আপত্তি জানিয়েছিল স্থানীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। ধর্মান্ধ মানুষেরা জানাজার নামাজ পড়তে অস্বীকৃতি জানালেন। শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়েই মায়ের লাশ দাফন করলেন আরজ আলী। সেই থেকেই আরজ আলী মাতুব্বরের অন্তরে নতুন প্রশ্নের জন্ম নিল। আরজ স্থির করলেন, তিনি আরও জ্ঞান অর্জন করবেন। তাঁর অর্জিত জ্ঞান, চিন্তাচেতনা ও বিবেকবুদ্ধির সবটুকুই তিনি নিয়োজিত করবেন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। 

 

 

আরজ আলী বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্যপদ (১৯৮৫), বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার’ (১৯৭৮) ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর (বরিশাল শাখা) সম্মাননা (১৯৮২) লাভ করেন। তিনি ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

 

কীভাবে যাবেন : বরিশাল সদর থেকে স্থলপথে ইজি বাইকে লামচরি যাওয়া যায়। তবে ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। কারণ লামচরি গ্রামের প্রবেশমুখের রাস্তাটা এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সে পর্যন্ত যেতে জনপ্রতি বিশ টাকা লাগবে। এরপর কিছুদূর পায়ে হেঁটে লামচরি মোড়ে ওঠার পর মাহেন্দ্র গাড়ি বা বাইকে করে মাতুব্বর বাড়ির কথা বললেই পৌঁছে দেবেন চালক।

 

কোথায় থাকবেন : লামচরি একেবারেই নিভৃত গ্রাম। নদীর ভাঙন কবলিত এই গ্রামে থাকার সুব্যবস্থা নেই। দিনে দিনে ফিরে আসাই ভালো। তবে অনুরোধ করে থাকা সম্ভব। দরিদ্র হলেও গ্রামবাসীরা অতিথিপরায়ণ।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা

Walton
 
   
Marcel