ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ মাঘ ১৪২৩, ১৯ জানুয়ারি ২০১৭
Risingbd
 
সর্বশেষ:

সে রহে বিরহে, হাহাকারে, ভালোবাসায় || টোকন ঠাকুর

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১১ ৩:৫০:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৩৪:০২ পিএম

ইচ্ছে পেতে রেখে অপেক্ষায় ছিল পথ, সেই পথে ভালোবাসা আসবে, এরকমই মনে হচ্ছিল। তাই তরুণ কবি দূরের কাশবন হয়ে ছিল। কবি কি কাশবন হতে পারে? হেমন্তের নৈশ-হাওয়ায় যে ছাতিমের ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকে, তরুণ কবি ছাতিমগাছ হয়ে একা দাঁড়িয়েছিল, ফাঁকা মাঠের মধ্যে। নদীপাড়ে তার যেতেই হবে, নদী তাকে ডাকবেই, বালুচরের সঙ্গে তার কিছু কথা আছেই, কার? কার আবার, তরুণ কবির। শ্রাবণে যে বৃষ্টি এলো, একথা স্বয়ং রাষ্ট্রই জানে না যে, প্রতিটি বৃষ্টিকণা পতনের ফোঁটা ফোঁটা ইতিহাস আছে, সেই ইতিহাসের করুণ দর্শক তরুণ কবি। আদতেই? এ কথা কি সত্য যে, সন্ধ্যার জোনাকি সবার কাছেই একটি পোকামাত্র কিন্তু সে পোকা নয়, বিন্দু বিন্দু আগুনের পাখি এবং যে অগুনের সঙ্গে তরুণ কবির আলাপ করিয়ে দিয়ে থাকতে পারে একটি মুহূর্ত। কবি সেই মুহূর্তের সন্ধানে অপেক্ষায় ছিল বারোটি বছর। তাই দুপুর রোদের ঘূর্ণিতে যে ধুলো-কুটো-চিত্রপত্র উড়ে যায়, কবি সেই ছিন্নপত্রের সন্ধানে চরৈবেতি ছিল। ছিন্নপত্রে কার নাম লেখা?  উড়ে যাওয়া ছিন্নপত্রটি ধরতে ঘূর্ণির পেছনে দৌড়ুচ্ছে পাড়ার মোড়ের পাগলা হরেন। হরেন রণজিৎ দাশকে বলেছে, ছিন্নপত্রে লেখা আছে একটি নাম, মালতী বসু। আমরাও দেখেছি দুপুরবেলায় ঘূর্ণির পেছন-পেছন দৌড়ে গেছে তরুণ কবি। ঘূর্ণির মধ্যে ছিন্নপত্র উড়ছে...

 

এই পর্যন্ত লিখে কি একটু থামা যায়? এই পর্যন্ত পাঠ করে কি কেউ ভাববেন, তরুণ কবি একধরনের বিপজ্জনক পোকা! পোকাদের কথা কেন পড়বে মানুষ? পোকারা তো খুব বোকা, আগুনে লাফিয়ে পড়ে। বোকাদের কথা কেন পড়বে বুদ্ধিমান মানুষ? কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষমাত্রই চালাক মানুষ। চালাক মানুষ কি চালাক মানুষের কথা পড়ে মজা পাবে? মজাই তো সব। মজা পেতেই তো মানুষ একটা জীবন পার করার কথা ভাবে। মানুষ মজার সন্ধানে অর্থ খরচ করে সমুদ্রে যায়, পাহাড়ে যায়, জঙ্গলে যায়। কি পেতে যায়? মজা পেতে যায়। সেই মজা দেয় সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের কথা না-না বলা, আদিম জঙ্গলের পাতার মর্মরতা! আর সেই পোকারা-বোকারা মজা দিয়ে যায়। গর্জিত ঢেউ হয়ে বালুতটে, শান্ত মৌন হয়ে পাহাড়ে, অচেনা একটি পাখির ডাক হয়ে জঙ্গলে। তরুণ কবিরাই সেই বালুতট, চুপচাপ পাহাড়ের গান কিংবা অনেক গাছের ভিড়ে জঙ্গলের একটি গাছ কিংবা পাতা কিংবা পাখি কিংবা পাখির ডাক। মানুষ ভ্রমণে যায় বটে, জীবনের ক্লান্তি ঢেলে আসতে, কারণ মানুষ জানে, সমুদ্র, পাহাড় বা সেই জঙ্গল ক্লান্তিটুকু নেবে। মানুষের ক্লান্তি নেবে তরুণ কবি, এই হচ্ছে সারকথা। কারণ, নাগরিক মানুষের প্রেম নেই, তাকে দ্বারস্থ হতেই হবে কবিতার কাছে। ঝিনুকে যেমন দিনে দিনে মুক্তো জমে, অনেক জন্মের প্রেম জমিয়ে একজন কেউ তরুণ কবি হয়। তারপর তরুণ কবি তার বুকের সব প্রেম ঢেলে চলে যায়। কোথায় চলে যায়? আবার সে মুক্তো জমাতে যায়, অনেক জন্ম পার হয়ে হয়ে, অনেক রক্তক্ষরণ করে সে বুকে আবার প্রেম জমিয়ে চলে। তারপর জনপদে আবার একদিন আমরা দেখতে পাই, একজন তরুণ কবি হেঁটে যাচ্ছে দুপুর রোদে, ওর বুকের মধ্যে ঘন জঙ্গল। আবার আমরা দেখতে পাই, তরুণ কবি সারা রাত বাড়ি ফিরছে না, ওর বুকের মধ্যে পঞ্চমীর চাঁদ। নির্ঘুম সমুদ্রের গান বাজছে তরুণ কবির পাঁজরে।  আমরা দেখতে পাই বা শুনতেও পাই, বিগত কালের সব প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাসই পাতার মর্মর হয়ে বেজে উঠছে বনভূমিতে, আজকের বনভোজনপ্রিয় মানুষ দল বেঁধে যাচ্ছে সেই প্রেমিককুলের মর্মর দীর্ঘশ্বাস। কেউ কেউ রেকর্ড করে আনছে দীর্ঘশ্বাসপুঞ্জ। সেই দীর্ঘশ্বাসই তো ভালোবাসা, যা তরুণ কবি চলে গিয়ে রেখে যায়। তাই জগতে তরুণ কবিকে মানুষের কাতারে ফেলে বিচার করাটা দোষণীয় হবে, স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

 

এবং এও স্মরণে রাখার বিষয় যে, দেশের সংবিধানে যেমন তরুণ কবির চিন্তা-জীবনযাপনকে শনাক্ত করে একটি শব্দও লেখা নেই, তরুণ কবিও বিচরণ করে এই সংবিধানের বাইরে দিয়েই। ফলে, তরুণ কবি রাষ্ট্র-সীমানার কাঁটাতার-পাঁচিলের মধ্যে বসবাস করে না। সে থাকে ভালোবাসায়, 'সে রহে বিরহে'। দেশের সংবিধান অনুযায়ী 'সংসার সীমানা'য় তরুণ কবি থাকে না। আবার বয়সে তূণ এবং কবিতা লিখছে- এমন সবাইকেই তরুণ কবি বলে চালিয়ে দেওয়া ঘোরতর অন্যায় হবে। যে তরুণ কবি, সে সমুদ্রের গান। যে তরুণ কবি, সে পাহাড়ের একাকিত্ব। সে বনের গভীর থেকে আসা পাতা কিংবা হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকদের শ্বাসপ্রশ্বাস, লোকে বলে দীর্ঘশ্বাস, যাই হোক।

 

সে, সে আবার কে? সে হচ্ছে সেই তরুণ কবি, যাকে আমরা কয়েক জন্মের ভালোবাসা জমিয়ে জন্মাতে দেখেছি লোকালয়ে। সে সেই, তরুণ কবি, যাকে আমরা দেখতে পাই ভালোবাসার জন্যে নিজেকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। বেশির ভাগ তরুণ এবং কবিতা লিখিয়েরাই যেটা পারে না। বেশির ভাগ তরুণ এবং কবিতা চর্চাকারীরাই যেটা পারে, দিনে দিনে নিজের বয়স, কবিতার বই, সংসারে বাচ্চা-কাচ্চা যেটা আর দশজন কেরানিও করে বেঁচে থাকে। তারা সমুদ্র হতে পারে না, তারা কেরানি হয়; তারা পাহাড়ের ডাক শুনতে পায় না, তারা সারা জীবন পারিবারিক কথাবার্তার ধর্ম, ডাক্তারের দেওয়া স্বাস্থ্য-পরামর্শ, কখনো রবীন্দ্রসংগীত, খেলাধুলা বা দূরদেশের যুদ্ধের খবর এবং নিজেদের দেশাত্মবোধক গান শুনতে শুনতে বাঁচতে চায়। বাঁচেই বা আর কয়দিন! তবু বাঁচার সাধ মানুষের। প্রজননে পরবর্তী প্রজন্মের ভেতর দিয়ে তারা বাঁচতে চায়, যেমন প্রোমোটার বাঁচে, সচিব বাঁচে, শ্রমিক বাঁচে, আদম পাচারের দালাল বাঁচে, সাংবাদিক বাঁচে,  পুলিশ বাঁচে, পাদ্রি বাঁচে। সংসারের পাপ কুড়োতে কুড়োতে তীর্থে গিয়ে পাপ কমিয়ে এনে বাঁচে। এই কি বেঁচে থাকা?

 

 

শুধু ভালোবাসার জন্যে বেঁচে থাকব, না হয় চলে যাব- এই অনুভূতি নিয়ে তরুণ কবি ছুটে যায়। যেভাবে পোকা ছুটে যায় আগুনের কাছে। স্ফুলিঙ্গের ক্ষণকালের পাখায় সে বাঁচে। খুব সংগত কারণেই, 'মেইনস্ট্রিম সোসাইটি' তরুণ কবিকে ধরতে পারে না। কারণ প্রেমিককে বুঝবার শক্তি এই মাথামোটা মানুষের মিলিত প্রবাহ যে 'সমাজ'-  তা তার নেই। তাই এই সমাজের মানুষ মদ্যপায়ীকে চিনতে পারে, দূর থেকে কটাক্ষ করে, গালি দেয় কিন্তু ঘুষখোর-সুদখোরকে তারা চিনতে পারে না। নাকি চেনে এবং ঘুষখোরের টাকা থাকার জন্যে তাকে সমীহই করে? মানুষ বড় অভাবী। সেটা কিছু মানুষের তৈরি রাজনীতি যে, বেশির ভাগ মানুষই গরিব। তাই মানুষ বড় লোভী। অভাবী-লোভী মানুষ সেই ঘূর্ণির মধ্যে ছিন্নপত্র খুঁজতে চাওয়া প্রেমিক এবং পাগল হরেনকে কোনোভাবেই বুঝতে পারে না, পারবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক জন্মের প্রেম যে প্রেমিক বুকের মধ্যে জমিয়ে কবিজন্মের শাপ নিয়ে মর্ত্যে আগত, সে তো লোভী হতে পারে না। সে ব্যথা পেতে পারে। সে ব্যথা পায়। ভালোবাসাই তাকে ব্যথা দেয়। যে ভালোবাসার জন্যেই জন্ম ও জীবন, সেই দেবে ব্যথা? এই নিয়তি নিয়ে তরুণ কবি ঘুরে বেড়ায়। ফলে, আমাদের হয়তো মনে হয় যে, আমরা তাকে চিনি, আসলে তাকে চিনিনি। আমরা তরুণ কবি বা প্রেমিককে চিনতে পারি না। কারণ, আমরা তো কোনোমতে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের কাছে এই টিমটমে জীবনই অনেক বড়, একে টেনে হিঁচড়ে ষাট-সত্তর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার একটা পরম্পরা আছে। আমরা তাই আবুল হাসানকে বুঝতে পারিনি। আবুল হাসান তরুণ কবি। আমরা তাই আপন মাহমুদকে চিনতে পারিনি, আপন আমাদের হারিয়ে যাওয়া তরুণ কবি।

 

আবুল হাসানের কবিতার দুটো লাইন আছে না- ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তো ফলাও'। তরুণ কবি চিরকাল তাই। এখন পর্যন্ত কতজন তরুণ কবি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে? গত সপ্তাহে চলে গেলেন মাহবুবুল হক শাকিল। প্রেম থৈ থৈ করছিল তার বুকের ভেতর। কবিতা টগবগ করছিল তার মাথায়, '...খেরোখাতায়' বা 'মনখারাপের গাড়ি'তে। সব রেখে শাকিল চলে গেলেন। ব্যথা রেখে গেলেন। হাহাকার রেখে গেলেন। ভালোবাসা রেখে গেলেন। এখনো ভালোবাসার জন্যে কবিতার খাতা বা জীবন উৎসর্গ হতে পারে, সেই যে চিরকালের অগ্নিদাহের তরুণ কবি যা পারে, তা পেরে গেলেন। কবি মাহবুবুল হক শাকিল এরপর সারা জীবন আমাদের কাছে একজন প্রেমিক ও তরুণ কবি হয়েই বেঁচে থাকবেন। সমুদ্রে গেলে তাকে ফের পাব, স্তব্ধতা অনুবাদ করতে যখন পাহাড়ে যাব, শাকিলকে পাব। বনভূমিতে গেলে, উৎকর্ণ হতে পারলে যে পাতার মর্মর শুনতে পাব, জানিই যে, সেই মর্মরে কবি মাহবুবুল হক শাকিলের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে। মেয়ে শিশু-বালিকা, কিশোরী-নারী অপহরণ করে ধর্ষণ করে হত্যা করে ফেলে যাওয়া কালে শাকিল নারীকে ভালোবেসেই নিজে চলে গেলেন, এটাই তো সত্য। এই কারণে এই তরুণ কবির জন্যে হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে। ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার পিপাসায় কে আর্ত নয়?

 

মাহবুবুল হক শাকিলের অকাল প্রস্থানে তার বাবা-মা যেমন সন্তান হারালেন, মৌপী, তার মেয়েটা বাবা হারাল, স্ত্রী হারালেন স্বামী। বাংলা কবিতা হারাল একজন তরুণ কবিকে। আমরা হারালাম আমাদের প্রজন্মের এক ঈর্ষণীয় বন্ধুকে। এই ব্যথা, হাহাকারের মধ্যে তবু প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল, এখনো ভালোবাসার জন্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া যায়। চিরকালের অভিমানী কিশোর হয়ে থাকলেন শাকিল। শেকসপিয়ারের নাটকের কোনো চরিত্র যেমন অল্প বয়সে মারা যায়, সেই নাটক যে দেশেই মঞ্চস্থ হোক, সেই চরিত্র সেই অল্প বয়সেই মারা যায়। কারণ, এটা ঐ চরিত্রের নিয়তি। মাহবুবুল হক শাকিলও তার নিজের চরিত্রে থেকে গেলেন আমাদের চেতনায়, আড্ডায়-আলাপে, যে শাকিল তরুণ কবি, যে শাকিল প্রেমিক।

 

কলকাতায় দেখা হলো, হালকা আড্ডাও হলো, ঢাকায় আরো আড্ডা হবে, কথা ছিল, তার আর হচ্ছে না এ জীবনে, কারণ, আপনি চলে গেলেন। হাহাকারের বিষাদ পেয়েছি, পাচ্ছি।

 

একজন আপনাকে পুড়িয়েছে, ঠিক, আজ তো লক্ষজন আপনাকে তাদের হৃদয়ে গ্রহণ করে নিয়েছে, এটাই তো তরুণ কবির প্রাপ্য। আপনি পেয়েছেন, শাকিল।

 

লাভু হে লাভার।

 

১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ঢাকা

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ ডিসেম্বর ২০১৬/সাইফ/এএন