ঢাকা, রবিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

হানিফের যত আবিষ্কার

স্বপ্নীল মাহফুজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৬-১১-২২ ৮:৪৯:৪৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০১-০৬ ২:৩০:৪২ পিএম

স্বপ্নীল মাহফুজ : হানিফ আলী সোহাগ। পড়ালেখা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল এবং ইলেক্ট্রনিক বিভাগে। ইতোমধ্যে তার আবিষ্কৃত বিভিন্ন যন্ত্র ও সফটওয়্যার বাংলাদেশের প্রযুক্তির দুনিয়ায় সুনাম কুড়িয়েছে।

 

দিনাজপুর শহরের কালিতলার বাসিন্দা আইনজীবী সলিমুল্লাহ সেলিমের তৃতীয় সন্তান হানিফ আলী সোহাগের ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু করার ইচ্ছা। তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলেন দিনাজপুরের জিলা স্কুলে। অংশ নিতেন বিভিন্ন বিজ্ঞান মেলায়। কিন্তু তেমন কোনো ফল হতো না। তাতে দমে যাননি এই ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদ। নবম শ্রেণিতে থাকতে দিনাজপুরের আঞ্চলিক পর্যায় অনুষ্ঠিত গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথম রানার্সআপ হন হানিফ আলী সোহাগ।

 

হানিফের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘আমার প্রযুক্তির বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ আমার বাবা অনেক ছোট থাকতেই কম্পিউটার কিনে দেন। যেখানে অন্য বাবা-মা কম্পিউটার কিনে দিলে ছেলের ক্ষতি হবে ভাবেন, তখন আমার মা-বাবা তা করেননি। এর ফলে ছোট থেকেই কম্পিউটারের কাছাকাছি থাকা। আর ভাবতে থাকা এটা দিয়ে নতুন কি করা যায়। সপ্তম, অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে ভিজ্যুয়াল বেসিক দিয়ে ছোটখাট সফটওয়্যার বানাতাম। কিন্তু তেমন পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান না থাকায় বড় কোনো প্রজেক্ট চাইলেও করতে পারতাম না।’

 

দিনাজপুরের জিলা স্কুলের থেকে এসএসসি পাশ করে সোহাগ ভর্তি হন ঢাকা নটরডেম কলেজে। সেখানে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান মেলায় সোহাগ দেখান কীভাবে সাইকেলে প্যাডেল দিয়েই বিদ্যুৎ সহজেই উৎপন্ন করা যায়। এজন্য গিয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যেন অল্প পরিশ্রমে অনেক শক্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে বড় পরিসরে তা করার জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা থাকলেও কোনো কারণে তা আর করা হয়নি।

 

এইচএসসির পর ভর্তি হলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল এবং ইলেক্ট্রনিক বিভাগে। প্রথম সেমিস্টারে মনের মতো ল্যাপটপ বাজারে না থাকার কারণে হাতে কোনো কম্পিউটারই ছিল না সোহাগের। কিন্তু তিনি প্রথম সেমিস্টারে থাকতেই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বড় ভাইদের আয়োজিত সি প্রোগ্রামিং কর্মশালায় অংশ নেন। কম্পিউটার না থাকায় খাতায় কোড লিখতেন। এর ফলে হানিফের বরং সুবিধাই হয়। কারণ প্রতিটা লাইন বুঝে বুঝে লিখতে হতো যেহেতু খাতায় কোনো কম্পাইলার নেই। তাই ভুল ও নিজের বুঝতে হতো। সারা দিনে হয়তো আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রুমমেটের কম্পিউটার নিয়ে খাতায় লেখা প্রোগ্রামগুলো রান করাতেন। এভাবেই কেটে যায় তার প্রথম সেমিস্টার।

 

অবসর পেলেই হানিফ বসে যেতেন কীভাবে নিজের প্রোগ্রামিং দক্ষতা বাড়ানো যায়। শেখার চেষ্টা করতেন নতুন নতুন প্রোগ্রামিং এর ভাষা। আর যাই শিখতেন তা দিয়েই নতুন কোনো প্রজেক্ট বানানো যায় কিনা চিন্তা করতেন। যেমন জাভা লাঙ্গুয়েজ শেখার পর তৈরি করেছিলেন আল কোরআনের একটা সফটওয়্যার। যার কাজ ছিল আল কোরআনের সব সুরার বাংলা অনুবাদ।

 

চলুন জেনে নেওয়া যাক, হানিফের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি।

 

হানিফ ওয়েব সিস্টেম : হানিফের উদ্ভাবিত এই সিস্টেমটির মাধ্যমে দূর থেকেই যন্ত্র পরিচালনা সম্ভব। যেমন ধরুন আপনি জরুরি দরকারে বাইরে গেছেন কিন্তু রুমের ফ্যান, লাইট বন্ধ করতে ভুলে গেছেন। হানিফ ওয়েব সিস্টেম ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই বাইরে থেকেও মোবাইলে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। দেখে নিন, হানিফের উদ্ভাবিত ওয়েব সিস্টেম।

 

তারবিহীন মাউস : তারবিহীন মাউস সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। যা মূলত ব্লুটুথ মাউস হিসেবে বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু হানিফের তারবিহীন মাউসটি ভিন্ন রকমের, এতে মোবাইলের অ্যাকসিলেরোমিটার সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে।  

 

ল্যাপটাচ : যখন শখের বশেই হানিফ ইমেজ প্রসেসিংয়ের কাজ শিখছিলেন তখন মাথায় এল এটা দিয়ে নতুন কিছু করা যায় কিনা। এমন চিন্তা যখন মাথায় ঘুরছিল তখনই মনে হলো যদি যেকোনো সাধারণ ডেস্কটপ কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনকে টাচস্ক্রিনে পরিণত করা যায় তাহলে কেমন হয়। আর তাও যদি অল্প মুল্যে করা যায়।

 

সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই কাজে নেমে পড়া। ঘটনাটা ২০১৫ এর মাঝামাঝি, হানিফ তৈরি করে ফেলল ল্যাপটাচ নামক এক সফটওয়্যার। যার কল্যাণে যেকোনো সাধারণ ডেস্কটপ কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনকে টাচস্ক্রিনে পরিণত করা যাবে। এ বছরের শুরুতে কুয়েটে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টার ইউনিভার্সিটি টেক ফিয়েস্তা’-তে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সফটওয়্যার ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অধিকার করে নেয় হানিফের ‘ল্যাপটাচ’। এ ছাড়া সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ব্র্যাক মন্থন ডিজিটাল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড জিতেছে হানিফের এই সফটওয়্যার।

 

অটোমেটিক রেলওয়ে গেট কন্ট্রোলিং : রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা অহরহ ঘটে। কখনো ঠিক সময়ে রেল ক্রসিং গেট বন্ধ না হওয়া অথবা মানুষের অসচেতনতার জন্য এমন হয়। কিন্তু হানিফের উদ্ভাবিত অটোমেটিক রেলওয়ে গেট কন্ট্রোলিং ডিভাইস এমন দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাবে। ট্রেন আসার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুবিধা দেবে ডিভাইসটি।

 

বাংলা ওসিআর : ধরুন আপনার বন্ধুর একটা বই আছে, আপনার নেই তখন কী করবেন? খুব সহজ এখন, ছবি তুলে নেবেন মোবাইলে। কিন্তু পরে দেখলেন ছবিতে কিছু ঠিক করতে হবে, মানে কিছু লেখা পরিবর্তন করতে হবে। তখন কী করবেন?

 

ওটাকে টেক্সট ফাইল করে নিতে হবে। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব। হ্যাঁ, তাও সম্ভব। এটাই সম্ভব করেছেন হানিফ। তিনি উদ্ভাবন করেছেন ব্লাইন্ডসাইট বাংলা ওসিআর নামক সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে ইমেজের লেখাকে টেক্সটে রূপান্তর করা যাবে।

 

যানবাহন চুরি প্রতিরোধক ডিভাইস : মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার চুরির ঘটনা নানা সময়েই ঘটে থাকে। এসব যানবাহন চুরি প্রতিরোধে হানিফ উদ্ভাবন করেছেন চুরি প্রতিরোধক সিস্টেম। এই সিস্টেমের আওতায় মোবাইলের এসএমএসের মাধ্যমে গাড়ি লক করে ফেলা যাবে। চোর যদি লক করা গাড়িটি কোনো মাধ্যমে তুলে নিয়ে যেতে চায়, তাহলে সেই সতর্কতামূলক এসএমএস আসবে মোবাইলে।  

 

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে হানিফ জানান, তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বাইরে যেতে চান এবং নিজেকে একজন সফল প্রযুক্তিবিদ হিসেবে দেখতে চান।

 

* আলোহীন পৃথিবীতে স্বপ্নই শাহীনের আলো

 

* শুভ্র দ্য ফাইটার

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ নভেম্বর ২০১৬/ফিরোজ/এসএন