ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

৪১টি বিড়ালের ‘মা’

শাহীন রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৪ ১২:৫২:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-১৪ ২:৫৭:৩৯ পিএম

পাবনা প্রতিনিধি : পাবনার চাটমোহরের পৌর কাউন্সিলর আলেপা খাতুন নাকি ৪১টি বিড়ালের ‘মা’। এলাকাবাসী তাকে এই পরিচয়েই খুব ভাল চেনে। বিড়ালের সঙ্গে সখ্যতার জন্য তিনি এখন বিখ্যাত।

প্রাণিদের প্রতি ভালবাসার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পৌর কাউন্সিলর আলেপা খাতুন। এলোমেলো চুল, পোশাক-আশাকে অতি সাধারণ আলেপা খাতুন (৪২)চাটমোহর পৌরসভার ৪,৫,৬নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনে পরপর দু’বার নির্বাচিত কাউন্সিলর।

কাউন্সিলর হলেও সাংসারিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয় তার। কোন মতে চলে সংসার। সেখানে তিনি তার সম্মানির পুরো টাকা খরচ করে ৪১টি বিড়ালের অন্ন জুগিয়ে চলেছেন। অবশ্য শুধু সম্মানির (৪ হাজার) টাকা দিয়েই বিড়ালগুলোর খাওয়া হয়না। এর জন্য একমাত্র ছেলে মহরমের কাছ থেকেও টাকা নিতে হয় তাকে।

বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া দুই শতক জায়গার উপর দু’টো কুঁড়ে ঘর করে ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এই বাড়িতেই বাস করছে তার সন্তানতুল্য আরও ৪১টি বিড়াল।

আলেপার সঙ্গে কথা বলতে তার বাড়িতে প্রবেশ করতেই কানে এলো বিভিন্ন নাম। প্রথমে মনে হয়েছিলো কোন মানুষকে তিনি ডাকছেন। যেমনটা মা’র ডাকে সন্তানরা ছুটে আসে, তেমনি আলেপার মধুর ডাকে একের পর এক বিড়ালগুলো ছুটে এলো তাদের মা’র সাজানো খাবার খেতে। চোখ আটকে যায় একেকটি বিড়ালের জন্য থালায় থালায় সাজানো মাছ-ভাত দেখে।

এ সময় আলেপা খাতুন বিড়ালগুলোর উদ্দেশ্যে বলছিলেন, ‘বাবা কনে গেছিলা, বাবা ভাই কনে? খাও বাবা খাও।’  কোন হিংসা বা মারামারির বালাই নেই। বিড়ালগুলো আপন মনে খেয়ে চলেছে তাদের ‘মা’র হাতের সাজানো খাবার।

আলেপা বলেন, ‘আমিই ওদের মা। আমি ছাড়া ওদের দেখপি কে? প্রতিদিন আড়াই কেজি চালের ভাত আর সাথে ৮০/৯০ টাকার মাছ লাগে আমার এসব ছেলে-মেয়েদের (বিড়াল) জন্য। এখন এদের সংখ্যা বাচ্চাসহ ৪১টা। এর আগে আরও বেশি ছিলো কিন্তু কুকুর মেরে ফেলেছে। এছাড়া ছিলো বেজি। কিন্তু মানুষ সেগুলাক বিষ দিয়ে মেরে ফেলেছে। টাকি মাছ বেশি পছন্দ আমার ছেলেগুলোর (বিড়াল)। খায় সিলভার কাপ/লোয়ারি মাছও। ছোট মাছ কম খায়। দিনে ৫/৬ বার খাবার দিতে হয়।’

আলেপা আরো বলেন, ‘র‌্যাতে উয়্যারে জন্যি ভালোভাবে ঘুমাতেও পারিনা। মারামারি লাগলি আমার ঘুম থেকে উঠে গিয়ে শাসন করা লাগে। তখন ওরা মারামারি বন্ধ করে। আবার শাসন করলি উয়্যারা পা চ্যাইপে ধরে। উয়েরে জন্যি আলাদা বাসন-কোসন। আলাদা রান্না করি। মসলা কম কম দেওয়া লাগে। বেশি মসলা দিলে উরা খ্যাবির পারে না।’

প্রতিদিন খরচ কত হয় জানতে চাইলে আলেফা বলেন, ‘আড়াই কেজি চালের ভাত, একপোয়া দুধ ও মাছ লাগে। তাতো ২৫০ টাকার নীচে হয় না। আমার ঘরেই ওরা থাকে। খাটে ও মেঝেতে বিছানা প্যাড়া দিই। মশারি টাঙ্গায়া দিই। ছোটবেলা থেকেই আমি এসব ভালোবাসি। ওরা অবলা প্রাণি। উয়েরে জন্যি ভীষন মায়া লাগে আমার। উয়েগারে ছ্যাড়া আমি থ্যাকপার পারবো না। রাত ২টা পর্যন্ত জাগা লাগে উয়েগারে লাগে। খুঁজা লাগে। ঘুড়্যা বেড়ায় বাড়ি বাড়ি। উয়েগারে শুয়ায়ে তারপর আমি শুই। আমি খাবার লিয়ে গেলি তবে ওরা খায়। আর কারো তা খায় না।’ বলেন, ‘ওরা প্রাণী হলিও সব বোঝে। খালি মানুষই মানুষেক ভালো বোঝে না। ভালো চায় না।’

স্বামী-সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করতেই এবার একটু আবেগী হয়ে ওঠেন আলেপা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাপ-মা ছোট কালে বিয়্যা দিছিলো। সংসার কি জিনিষ বুঝব্যার পারি নাই। ২৬ বছর আগে গর্ভে সন্তান (মহরম) থাকতেই স্বামী আমাক ছ্যাড়ে চলি যায়। ছাওয়ালেক (মহরম) অনেক কষ্টে মানুষ করিছি। সে এখন রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। কিছুদিন আগে ছাওয়ালের বিয়্যাও দিছি। আছি উয়েরেক নিয়্যা আর....মানুষকে নিয়্যা। সবাই আমাক ভালোবাসে। ভোটে দাঁড়ালাম, মানুষ ভোট দিল মেলা করে। কাউন্সিলর হলেম। প্রতিদিন এলাকার মানুষদের কাছে যাই খোঁজ-খবর লেই। এলাকার মানুষ আমাক খুব ভালোবাসে।’

আলেপা বলেন, ‘বিড়ালগুলোর অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া লাগে, আবার ওষুধ কেনা লাগে। শীতের মধ্যে বেশি কষ্ট হয়। উয়ারে জন্যি একটা ঘর হলে ভালো হয়, কিন্তু টাকা পাবো কনে? উয়েরেক খাওয়াবো, নাকি ঘর বানাবো!’

প্রতিবেশীরা সবাই সমান মনের না। আলেপার বিড়াল নিয়ে কারবার অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেন। মাঝে মধ্যে এনিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে বিবাদও হয়। সেটা অনেক দূর গড়ায়। তবুও তিনি সব কিছু উপেক্ষা করে তার সন্তানদের (বিড়াল) অন্ন জুগিয়ে চলেছেন।

কথা হয় দোলবেদীতলার (৬ নং ওয়ার্ড) রনি রায় ও সন্দ্বীপ কর্মকারের সাথে। তারা বললেন, ‘আলেপাখুব সাদামাটা জীবন যাপন করেন। প্রতিদিনই আমাদের সাথে দেখা করেন, খোঁজ খবর নেন। এছাড়াও কোন বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে বা মারা গেলে সবার আগে পৌঁছে যান আমাদের আলেপা আপা।

পৌর শহরের ৪নং ওয়ার্ডের পুরুষ কাউন্সিলর ও তার প্রতিবেশী রাজ আলী বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই আপাকে দেখে আসছি। তার এই প্রাণিপ্রেম দেখে আমরা মুগ্ধ। অনেক কষ্টে চলে তার সংসার। কিন্তু কোন সময় কাউকে তিনি তা বুঝতে দেন না। বিড়ালগুলোই তার সবকিছু।’

 

 

রাইজিংবিডি/পাবনা/১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/শাহীন রহমান/টিপু

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC