ঢাকা, শনিবার, ১ পৌষ ১৪২৫, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

‘ছোটো ছোটো ছড়া’ কিন্তু ছোটো নয়

জব্বার আল নাঈম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৫ ১:৩৬:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-১৫ ১:৩৬:০০ পিএম

জব্বার আল নাঈম: অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত ছড়া দিয়েই শুরু করা যাক: ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো। তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো! তার বেলা?’

এখানে কত সহজ ও সরলভাবে শৈল্পিক এক বর্ণনা রয়েছে। আদতে এটা সহজ কথা নয়, সহজ উপস্থাপনাও নয়। ভারত সাম্রাজ্যের ভাঙন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, ছোটরাই শুধু ভুল করে না, বড়রাও করে। ছড়া শুধু যে শিশুতোষ হবে এমন নয়, ছড়াসাহিত্য সার্বজনীন। এর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বিশ্বসাহিত্যে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘খুকু ও খোকা’ সেই বাস্তবতা আমাদের জানান দিচ্ছে। অথচ পরবর্তী সময়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের উত্তরসূরীরা যেনো ভ্রান্তপথিক। সময়ের উল্টোদিকে হাঁটছেন নতুনের সন্ধানে। যেখানে ভিন্ন রকমের সুভাষ আর ছন্দ রয়েছে। ফলে আমরা পেয়েছি গতানুগতিক সাহিত্য। সেখানে তালে তাল মিলিয়ে নতুন কোনো ব্যঞ্জনা খুঁজে পাইনি আমরা। অথচ এর ভেতরেও ব্যতিক্রম এক সুন্দর নাম ফারুক হোসেন। যিনি বিষয়ভিত্তিক ছড়া লিখে আপন রাজ্য গড়ে তুলেছেন।

সমসাময়িক সময়ে তিনি একাই দাঁড়িয়ে আছেন ছড়ার রাজ্য শাসন করার জন্য। অবশ্য রাজ্যে রাজা একজনই থাকেন, প্রজা অনেক। বিষয়ভিত্তিক ছড়ার রাজ্যে ফারুক হোসেন মহারাজা। রাজ্যে সুরধ্বনি আছে, ছন্দের তালে তালে, অথচ ব্যঞ্জনা অন্যরকম। শব্দগুলো টক-ঝাল-মিষ্টি হয়ে ধরা দেয়, অথচ স্বাদ ভিন্নরকম। ভাষা সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল, অথচ উদ্দীপক। রঙরস ও ভালোবাসায় ভরপুর, অথচ এর ভেতরেও গভীর এক প্রতিবাদ। আকারে আকৃতিতে ছোট-খাটো গড়নের ছড়া হলেও চেতনায় ভরা। ফারুক হোসেনের ছড়ার বড় গুণ যে কোনো সহজ বিষয়কে ভাবের গভীরতা দিয়ে পারঙ্গম করে তোলা। যা তিনি অনায়সে করতে পারেন। এদিক ওদিক দুললে যদি/ দোলনা বল তাকে/ দোলনা বলা হয় না কেন/ ঘড়ির দোলকটাকে?

শোলক: লুটোপুটি এখানে আমাদের প্রাচীণ শোলকে তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে সবাইকে ভাবতে বাধ্য করেছেন। কোনো লেখা পড়ে কেউ যদি দুই মিনিট না ভাবে, সদ্যশেষ করা লেখাকে নিজের বলে দাবি না করে কিংবা আরেকটা লেখার অনুপ্রেরণা না আসে ততক্ষণ এটাকে শিল্প ভাবতে নারাজ আমি। ফারুক হোসেন সেখানে ভালোভাবে সামনের সারিতে রয়েছেন। কার কিবা আসে যায়/ নেই কারো শঙ্কা/ এইভাবে কমবে/ মহা-জনসংখ্যা- এটি ‘ম্যানহোল’ কবিতার অংশ বিশেষ। এখানেও তিনি সচেতনভাবে আমাদের সতর্ক করছেন। অথচ এর অন্তনির্হিত স্থানে বিশাল প্রতিবাদ। সচেতনতার প্রয়াসে দারুণ ছন্দবদ্ধ জনাব ফারুক হোসেন কখনও কখনও কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে বিরুদ্ধে কিংবা বিপদে সরাসরি মাঠে নামেন। আর বলতে থাকেন, যুদ্ধে যুদ্ধে মলিন বিশ্ব/ ভাঙচুর সারা অঙ্গ/ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটান/ নিরুপায় জাতিসংঘ।

সুব্রত চৌধুরীর ছবি ও প্রচ্ছদে ‘ছোটো ছোটো ছড়া’ বইতেও ফারুক হোসেন বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দেখিয়েছেন। এখানেও বিষয়ের বাইরে তিনি যাননি। একটা সময় বিষয়ভিত্তিক ছড়াকার বলতে আসবে ফারুক হোসেনের নাম। এই বইটিতেও রয়েছে প্রজাপতি, ফড়িং, উইপোকা, ঝিঁঝিঁপোকা, পামরি পোকা, গরু-ছাগল, জোনাকি, দোয়েল, নদী, বৃষ্টি, ইলিশ, কাঠাল, জাতীয় গাছ, শাপলা, প্যাঁচা প্রভৃতি। যে কেউ ছন্দে ছন্দে এই বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ছোটো ছোটো ছড়া উল্টাতে বাধ্য। যেখানে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বীর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। এবং জায়গাটি খুবই ঈর্ষণীয়। এ জন্য অনেকেই ভাবতে পারেন ছড়াকার গাণিতিক হিসেব মাথায় নিয়ে লিখতে বসেন কিনা? আমি বলব কিছু মানুষের এটাই সহজাত পদ্ধতি।

ছড়াকার ফারুক হোসেন সেখানে অনন্য। ছোটো ছোটো ছড়া শুধুমাত্র যে বাচ্চাদের জন্য লেখা এমন নয়, এই লেখকের লেখা সার্বজনীন। যে কেউই ভিন্ন আনন্দ নিয়ে একটানা পাঠ করতে পারবেন। পঠন শেষে বড়োরা ভাববে এটা আমাদের জন্য লেখা। কিশোর ভাববে আমার। আর শিশুরা ভাববে ফারুক হোসেন ভাই চিরকাল আমাদের জন্য লিখেছেন। এখানেই একজন প্রকৃত ছড়াকারের আসল তুলনা বা পার্থক্য। মূলত ফারুক হোসেন অসামান্য সুন্দরের স্রষ্টা। ‘ছোটো ছোটো ছড়া’ বইটির প্রচ্ছদ ও ছবি নিয়ে কাজ করেছেন সুব্রত চৌধুরী। বইটি প্রকাশ করেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC