ঢাকা, শনিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সবখানে ছড়িয়ে পড়ুক নারী নেতৃত্ব

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৭ ৬:২৪:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:১৩:৪০ পিএম

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু : ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে প্রথম আলোচিত হয় বিশ্ব নারী দিবস পালনের কথা। পরে ১৯৭৭ সালে এক সভায় ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। ১৯৭৮ সাল থেকে সারা বিশ্ব দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের চিন্তা থেকেই মূলত নারী দিবসের কথা উঠে আসে বলে জানা যায়। তবে নারী অধিকার কায়েমের লক্ষ্যে সেই ১৯১০ থেকেই বামপন্থী চিন্তাধারার নারীরা সংগ্রাম করে আসছে। এ ধরনের দাবি নিয়ে নারীরা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সময় সংগ্রাম করেছে।

১৯১৮ সালে সুইডেনের ইওতেবরি শহরে সুইডিশ নারীরা নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে সর্বপ্রথম ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সময় নারীরা নারীদের ভোটের অধিকার দাবি করে। সেই থেকেই নারী অধিকার নিয়ে সুইডেন দিনটি পালন করে আসছে। সুইডিশ নারীরা তাদের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবি করে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লব অনুষ্ঠিত হলে বামপন্থীরা বিভক্ত হয়ে যায়। তবে কমিউনিস্টরা ১৯২১ সালে তাদের ব্যানারে ৮ মার্চ নারী অধিকার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে বামপন্থী নারীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে ৮ মার্চ লন্ডনে এক সভায় মিলিত হয়।

পঞ্চাশ দশক থেকে দিনটি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো পালন করে আসছে। ১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম পশ্চিম ইউরোপে নারী দিবস পালনে নারীরা এগিয়ে আসে। এ সময় নারী অধিকার ও নারীবাদ বিষয়টি নারীদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করে। ফলে প্রথমে আমেরিকা পরবর্তীতে ইউরোপে নারী অধিকারের দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে স্বাধীনের পরপরই দিবসটি সর্বত্র পালন করা না হলেও বর্তমানে বিভিন্ন নারী সংগঠনসহ রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে আসছে। তবে দিবসটি যথাযথভাবে পালন করা হলেও নারী অধিকারের প্রশ্নে আরো সচেনতার প্রয়োজন রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পসহ অন্যান্য কর্মস্থল যেখানে নারী শ্রমিক রয়েছে সেখানে বেতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত।

সম্প্রতি ঢাকায় অবস্থানের সময় গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয়া থাকা এক নারীর সঙ্গে একান্ত আলোচনায় তিনি বিষয়টি আমার কাছে তুলে ধরেন। বামপন্থী এই নেত্রী দীর্ঘদিন থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। এজন্য জেল-জুলুম অত্যাচারসহ তাকে নানা হুকমিও পেতে হচ্ছে।

সারা বিশ্বে নারী নির্যাতন একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশে এই সমস্যা আরোও প্রকট। ২০০৫ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গাইনেজেশনের অনুসন্ধান মতে, বাংলাদেশে ৫৭.৫% নারী যৌন ও শারীরিকভাবে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন নারী বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি নির্যাতিত নারীর সংখ্যা আরও বেশি। এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ, প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে ৮০ জনই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। বলতে গেলে প্রায়ই নারীকে তাদের স্বামী পিটিয়ে, গলা টিপে কিংবা অমানবিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করে থাকেন। আবার অনেক নারী মানসিক ও শারীরিক  নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজে থেকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেন।

সাধারণত বিয়ের সময় নারীর পরিবার যৌতুক প্রদান করে থাকে। যৌতুকের টাকা নেওয়া শেষ হলে স্বামীর পক্ষ থেকে আবারো যৌতুক দাবি করা হয়। টাকা না পেলে সে তার স্ত্রীকে নির্যাতন করতে থাকেl স্বামীর দাবি করা টাকা আনতে না পারলে অনেক নারীকে সইতে হয় অবর্ণনীয় নির্যাতন। এর এক পর্যায়ে অনেক নারীকে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে তার কক্ষে সুইডিশ জাতীয় সংসদ সদস্যের এক আলোচনায় নারী অধিকারের প্রশ্নটি সামনে এগিয়ে এলে তিনি বলেন, আমরা নারী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ নারীদের তাদের জীবন উন্নয়নের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। ইতোমধ্যে আমাদের সরকার বিভিন্ন পেশায় নারীদের সামনে নিয়ে এসেছে। আজ বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন প্রশাসনে নারীদের চাকরি করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রিপরিষদেও রাখা হয়েছে বেশ কয়েকজন নারী। এর পূর্বে নারীদের অধিকার বাস্তবায়নে আর কেউ এভাবে সামনে এগিয়ে আসেনি বলে তিনি দাবি করেন।

একটি গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিভিন্ন পদে নারীদের ওপর দায়িত্বভার দেওয়া প্রচলন শুরু হয়েছে। নারীদের ক্ষমতা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা এভাবে বৃদ্ধি পেলে ধীরে ধীরে চাকরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান কমে আসবে। পরিবারের কৃষি কাজে যদি নারী কৃষকদের পুরুষদের মতো একইভাবে প্রবেশাধিকার আসে তাহলে বিশ্বের ক্ষুধার্ত সংখ্যা ১৫০ মিলিয়ন পর্যন্ত কমে আসবে বলে ধারণা করা হয়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বের বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের নেতৃত্ব সৃষ্টি হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাল ফলাফল কার্যকর হবে। বর্তমানে সরকার ও বিভিন্ন এনজিও বিষয়টিকে লক্ষ্য রেখে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নারীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত করছে।

তবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি চাকরি কিংবা রাজনীতি ক্ষেত্রে নারীরা সামনে এগিয়ে এলেও এখনো দেশের এক বিশাল নারী সমাজ পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত। বাংলাদেশ এখনো পুরুষশাসিত সমাজের মধ্যেই আটকে আছে। এর প্রধান কারণ হলো ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। সরকারকে বিষয়টির ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন গঠনে বর্তমান সরকার এই প্রথম একজন নারীকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করেছেন যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। একথা সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের যেভাবে সামনে আনা হয়েছে অতীতে কেউ তা করেনি। আজকের এই নারী দিবসে আমাদের দাবি নারী নির্যাতনে সরকার যেন আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। নির্যাতিত নারীদের প্রাণ রক্ষার্থে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। কারণ সারা বিশ্ব যেখানে আজ নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সেখানে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?

লেখক : কাউন্টি কাউন্সিলার স্টকহোম কাউন্টি কাউন্সিল



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ মার্চ ২০১৭/মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু/মুশফিক

Walton Laptop