ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মানসিকভাবে প্রবাসীরা কখনো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না

মুশফিকুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৭ ৬:৪৬:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৯ ৫:২৯:২২ পিএম
রুখসানা রফিক : (ছবি সংগৃহীত)

রুখসানা রফিক। প্রবাসে থেকেও মাটির টানে মাঝেমাঝেই দেশে চলে আসেন। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার বিশেষ টান থাকায় চেষ্টা করেন ফেব্রুয়ারির বইমেলায় উপস্থিত থাকার। লেখালেখি নেশা হওয়ায় বইও প্রকাশ করেন মেলা উপলক্ষে। এবারও মেলায় এসেছিলেন। তিনি রাইজিংবিডিতেও প্রবাস বিভাগেও লিখছেন। সেসব সূত্রেই তার সঙ্গে কথা হয়, যার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। কথোপকথনে ছিলেন মুশফিকুর রহমান।

রাইজিংবিডি : বইমেলায় এসেছিলেন, আপনার অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে বলবেন কী?
রুখসানা রফিক :
আগে অল্প সময়ের জন্য বইমেলায় আসা হয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম পুরো সময় বইমেলায় থাকার সৌভাগ্য অর্জন  করলাম। বইমেলা নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই আমার হয়েছে। ইতিবাচক দিকটি হলো, প্রতি বছর বইমেলায় প্রচুর নতুন বই আসছে। প্রতিটি বইয়েরই একজন লেখক, প্রকাশক আছেন। অর্থাৎ লেখা এবং প্রকাশের কাজে মোট প্রকাশিত বইয়ের সমপরিমাণ ব্যক্তি সৃজনশীল সময় ব্যয় করে থাকেন। আবার প্রতিটি বইয়ের যদি কম করে হলেও ১০ জন পাঠকও থাকেন তাহলে সেই পরিমাণ মানুষ এই আধুনিক ব্যস্ত সময়েও বইয়ের জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করছেন। আর নেতিবাচক দিকটি হলো- এদেশের লেখক সমাজের মধ্যে কিছু লিখে ফেলেই স্বীকৃতি বা খ্যাতি অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসভায় যার নাম যত বেশিবার উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি যেন তত বেশি বড় সাহিত্যিক! এর ফলে লিখিত বিষয়ের প্রতি সাধনা বা মনোসংযোগে ঘাটতি থেকে যায়। লেখক সমাজের ভেতর থেকে এ বিষয়টি উৎপাটিত হলে প্রকৃত সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে বলে আমি মনে করি।

রাইজিংবিডি :  আপনার এবার কী বই বেরিয়েছে?
রুখসানা রফিক :
এবার একজন অনুবাদক আমার নির্বাচিত কবিতাসমূহের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। বইটির নাম ‘ভাঙ্গা আরশী-Broken Mirror’. এতে অনুবাদের পাশাপাশি বাংলা কবিতাগুলোও সংযোজিত হয়েছে। এবারই প্রথম নিজের করা প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ হওয়ায় ভালো লাগছে। এরপর থেকে নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই করার চেষ্টা করব ভাবছি।

রাইজিংবিডি : মেলার আগেও কী আপনার বই বের হয়েছে?
রুখসানা রফিক :
বইমেলার আগে গত ৭/৮ বছরে আমার ৯টি কাব্যগ্রন্থ ও একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- ‘কবিতায় কথকতা’, ‘পরিযায়ী পেলিক্যানের দিনলিপি’, ‘একশত একটি হাইকু’, ‘তৃষিত তিমিরে’, ‘মহুয়া মাদল’, ‘মেঠো সুর’, ‘মেঘবতী মন আমার’, ‘নৈঃশব্দের পদাবলী’, ‘চিরহরিৎ জোছনার অরণ্যে’। আর গবেষণাগ্রন্থটি হলো- ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলন’। এ বইটি ফেমিনিজম বা নারী আন্দোলনকে উপজীব্য করে লেখা নয়। বরং একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নারী অধিকার আন্দোলন কীভাবে প্রভাবিত করে এবং সে দেশটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহ কীভাবে চলমান নারী অধিকার আন্দোলনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে- এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমি এই বইটিতে আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছি।

রাইজিংবিডি :  ভাঙ্গা আরশী যার ইংরেজি অনুবাদ Broken mirror বইটির মূল থিম কী?
রুখসানা রফিক :
ভাঙ্গা আরশীর মূল থিম এর প্রচ্ছদেই অন্তর্নিহিত আছে। প্রচ্ছদের ওপরের অংশে আমি একটি শৈল্পিক আরশী বা আয়নার কিছু কাচভাঙা অংশসহ পূর্ণাঙ্গ একটি আয়নার মাধ্যমে জীবনের পূর্ণতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপ ফুটিয়ে তুলেছি। প্রচ্ছদের নিচের অংশে মেঝেতে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়া সেই আয়নার ভাঙা অংশগুলোতে আমি জীবনের নানা অবয়ব যেমন- নারী, আকাশ, পাখি, ফুল, বৃক্ষ, নদী, নৌকা, খোলা বই- এরকম টুকরো টুকরো ছবি দিয়েছি। আমাদের পূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা এবং ভেঙে খানখান স্বপ্নগুলো আবার পরস্পরের সঙ্গে স্থান বদলের মাধ্যমে দ্বিমুখী প্রক্রিয়ায় চলমান একে অপরের অভিমুখে- এটিই এবারের বইয়ের মূল উপজীব্য।

রাইজিংবিডি :  বইটিতে কেমন সাড়া পেলেন?
রুখসানা রফিক :
মেলার প্রায় শেষদিকে ২১ ফেব্রুয়ারি বইটি দোয়েল প্রকাশের স্টলে আসে। বইটি হাতে পেয়ে অনেক বোদ্ধা পাঠকই প্রশংসা করেছেন। তবে শুধু বিক্রির ওপরই বইয়ের সাড়া নির্ভর করে বলে আমি মনে করি না। বরং বইটি দীর্ঘমেয়াদে পাঠকমানসের ওপর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলল কি না- এটাই বিবেচ্য। এটি একটি প্রলম্বিত লয়ের ব্যাপার, কাজেই বইয়ের সাড়া পাওয়া না-পাওয়ার বিষয়টি এখনো ভবিষ্যৎকালে ওপর নির্ভর করছে।



রাইজিংবিডি :  প্রবাসে থাকলে দেশ ও দেশের মানুষের কথা বেশি মনে পড়ার কথা। লেখায় কী সেগুলো থাকে?
রুখসানা রফিক :
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ভৌগোলিক গণ্ডির কারণে আমরা যে বাঙালি, শারীরিকভাবে প্রবাসে অবস্থায় করলেও মূলত মনের প্রতিটি মিলি মাইক্রনে আমরা বাঙালিই থেকে যাই। এর ফলে মানসিকভাবে আমরা প্রবাসীরা কখনো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমার লেখাতেও বাংলাদেশের মাটি ও প্রকৃতি, এদেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি স্বপ্রণোদিতভাবেই ওঠে আসে।

রাইজিংবিডি :  আপনার মতো অনেক প্রবাসীই বইমেলা উপলক্ষে বই প্রকাশ করে থাকেন। মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে কী প্রবাসী লেখক হিসেবে কোনো প্রত্যাশা আছে? যেমন- একটা প্রবাসী কর্নার যদি মেলায় থাকত...
রুখসানা রফিক :
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কারণে এদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখকের অনেকেই আজ প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন। আবার প্রতি বছর তুলনামূলক নবীন প্রবাসী লেখকদের মেলায় বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে পুরনো বা প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী লেখকদের পূর্বপরিচিতির কারণে প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু নবীন প্রবাসী লেখকদের এক্ষেত্রে প্রচুর হয়রানি, ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তাই আলাদা করে প্রবাসী কর্নার করার দরকার নেই, বরং প্রতি বছরের মাঝামাঝি (জুন-জুলাই) মেলা কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হয়ে যদি প্রবাসী লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের সমন্বয়ের একটি ব্যবস্থা নেন, তাহলে তা বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।

রাইজিংবিডি : আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন, আপনার লেখালেখির বিষয়বস্তু কী?
রুখসানা রফিক :
আমি মূলত রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্রী ও শিক্ষক হলেও আমার লেখায় দ্রোহের কথা কম এসেছে, যদিও আমি পারিপার্শ্বিকতা সচেতন। বাল্যকাল থেকেই পাঠ্যবইয়ের চেয়ে অন্য বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বেশি থাকায় ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করি। বরাবর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকাও লেখালেখির পটভূমি হিসেবে আমাকে মানসিক দৃঢ়তা যুগিয়েছে। আমি একজন কোয়লিফাইড ইন্টেরিয়র ডিজাইনারও। লেখালেখিতে আমার রাজনীতি অধ্যয়নের চেয়ে সাহিত্য ও ডিজাইন পাঠই বেশি প্রেরণা যুগিয়েছে আমাকে। ফলে আমার লেখায় মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রেম, প্রকৃতি- এসবই বেশি ওঠে এসেছে।

রাইজিংবিডি : সময়কালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনা?
রুখসানা রফিক :
ব্রিটিশ শাসনের উত্তরাধিকার রক্তে বহনের কারণে কেরানিবৃত্তির মনোভাব থেকে এখনো বাঙালি সমাজ সম্পূর্ণ বের হয়ে আসতে পারেনি। ফলে সমাজের বিদগ্ধ অংশটুকু বাদ দিয়ে বৃহত্তর অংশের পঠন-পাঠন এখনো পাঠ্যসূচিতে প্রণীত সাহিত্যের সূচিতেই আটকে আছে। তাই প্রায়ই অনেকেরই হাহুতাশ করে বলতে শোনা যায়- রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-বেগম রোকেয়া-সুফিয়া কামালের পর বাংলাসাহিত্য আর এগোয়নি। বাস্তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বিগত কয়েক দশকে সাহিত্যের সবকটি মাধ্যমে লেখার বিষয়বস্তু-পটভূমি-উপমা-উৎপ্রেক্ষার যে ব্যাপক নতুনত্ব তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আজকের কোনো লেখক আর ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের পর’- বললে চলে না। বরং তিনি হয়তো লিখবেন- ‘সূর্যটা টুপ করে নেমে এলো ডিমের কুসুমের মতো, আমার প্রাতঃরাশ ভাবনায়।’ এখানেই সমকালীন বাংলাসাহিত্যের বিকাশ ও স্বকীয়তা। এখন নতুনেরা তৈরি করে চলেছেন সাহিত্যের নতুন নতুন ব্যঞ্জনা। আর নতুন কোনো ধারা বা মতবাদ এখনকারকালে তৈরি হচ্ছে কি না, তা বলে দেবে ভবিষ্যৎ। সে ভার কালের হাতেই থাক।

রাইজিংবিডি :  লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
রুখসানা রফিক :
সচরাচর আমি আমার কোনো পরিকল্পনাই প্রকাশ করতে পছন্দ করি না। বরং তা বাস্তবায়নের পর বলি, এটি আমার পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিল। তবুও যখন জানতে চাইলেন তাহলে বলি- প্রায় হাজারখানেক কবিতা লিখে ফেললেও আমার মনে হয় আমার কবিতায় পাঠকের প্রাণে যে স্পন্দন, যে শিহরণ আমি জাগিয়ে তুলতে চাই, তা এখনো করা হয়ে ওঠেনি। আরো গভীরে যেতে হবে আমায়। প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। আর মনের খুব গোপনকোণে ইচ্ছে আছে, জীবনমুখী কিছু গদ্যসাহিত্য রচনার।

রাইজিংবিডি : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রূখসানা রফিক :
আপনাকে ও রাইজিংবিডিকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ আমার পক্ষ থেকে। রাইজিংবিডির আরো পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ মার্চ ২০১৭/মুশফিক/সাইফ

Walton
 
   
Marcel