ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ব্রিসবেনে বৈশাখি উৎসবের ১৭ বছর ও নতুন প্রজন্ম

শিল্পী রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-২৮ ৪:৫৪:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-২৯ ৪:০২:০৬ পিএম
ব্রিসবেন বৈশাখী মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

শিল্পী রহমান : সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে পয়লা বৈশাখের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান ও মেলা। যা দেখে সত্যি মুগ্ধ হতে হয়েছে ব্রিসবেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের।

ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ার স্টেট কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী। অপূর্ব সুন্দর ব্রিসবেনে রয়েছে বাংলাদেশি কমিউনিটি। এখানে কৃষ্ণচূড়া থেকে শুরু করে শিউলি ফুলের মনোরম সুগন্ধে দেশের সাধ নিচ্ছে মানুষ। প্রথমেই অভিনন্দন জানাচ্ছি সব বাংলাদেশিদের এবং আয়োজকদের, গত ৬ মে নগরীর স্ট্যাফোর্ডের কিওং পার্কে এমন আনন্দঘন একটি দিন ব্রিসবেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের উপহার দেবার জন্যে। 

আমরা দেশের বাইরে এসে দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করতে চাই আত্মার গভীরে এবং তা আগলে রাখতে চাই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে। কারণ আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভালোবাসি, আমাদের দেশীয় খাওয়া দাওয়া, চালচলন, আতিথেয়তা, শাড়ি পাঞ্জাবি, গান বাজনা, নাটক, কবিতা, আড্ডা সবকিছু নিয়ে যে সংস্কৃতি আমাদের আবেগে আপ্লূত করে রাখে সেই সংস্কৃতিকে জড়িয়ে রাখতে চাই আমাদের আত্মার সাথে। আরো একটা বিশেষ কারণ হলো, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পৌঁছে দিতে চাই আমরা।   তাই দেশ থেকে এতো দূরে থেকেও সবরকমের চেষ্টাই চলতে থাকে এই সংস্কৃতিকে পরিচর্যা করা এবং টিকিয়ে রাখার। আর এই প্রত্যাশা যেন দেশের বাইরে এসে একটু বেশিই বেড়ে যায় বাঙালিদের মধ্যে।

ব্রিসবেনে বাংলাদেশিদের একদম শুরুর দিকটা কবে ঠিক ক্যালেন্ডার ধরে বলতে পারবো না। তবে আমি এসেছি ১৯৯৫ এর শুরুতে। খুব বেশি হলে ৫০টা পরিবারের বাসস্থান ছিল তখন ওখানে। ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ইন ব্রিসবেন’ তখন থেকেই ছিল। অর্থাৎ আমি এসেই পেয়েছি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো এবং সেখানে সেলিনা, পিয়া, মিমি এবং জোয়েনা নাচ করতো। বাচ্চারা ছড়া, কবিতা আবৃত্তি করতো। আর বড়দের মধ্যে সংগীত শিল্পী ছিলেন।

আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের ছোটবেলায় গান, নাচ, কবিতা, ছবি আঁকা, পিয়ানো, গিটার, তবলা, ভায়োলিন, আরো অনেক কিছু শেখাতে চেষ্টা করি।  এটা সাধারণত বাবা মায়েদের ইচ্ছের কারণেই শুরু হয়, পরে বড় হয়েও কেউ কেউ তা নিজের উৎসাহে ধরে রাখে, আবার কেউ তা ছেড়ে দেয়। এটা আমাদের নিজেদের বেলাতেও হয়েছে, কারণ আমরা ছোটবেলায় অনেকে অনেক কিছুই শিখেছি যা বড় হয়ে আর অনুশীলন করা হয়নি বা ইচ্ছেও হয়নি, এমন বহু আছে। এটাই স্বাভাবিক। বড় হতে হতে উৎসাহ পাল্টে যেতেই পারে মানুষের। কিন্তু যারা ধরে রাখে তাদের বোধহয় সত্ত্বায় মিশে থাকে এই বীজ।

আমি যখন অ্যাসোসিয়েশনে ঢুকলাম ১৯৯৬ সালে, তখন থেকেই ব্রিসবেনের সবার সাথে আমার পরিচয়। কিছু বুঝে উঠবার আগে প্রথম অনুষ্ঠানটাই ছিল ব্রিসবেনে বাংলাদেশকে বা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই সুযোগটা হেলায় হারাবার মতো নয় বলে মনে হয়েছিল তখন। যদিও একদম একা মনে হয়েছিল  নিজেকে সেদিন তবুও সাহস করে নেমে পড়েছিলাম এই  আনন্দময় সংগ্রামে। ওয়েস্ট এন্ডে এখন যে গুয়ানা শেপের একটা স্টেজ আছে রাস্তার ওপরেই, সেখানে নেচেছিলাম প্রথম, সেটা ছিল ব্রিসবেনের মাল্টিকালচারাল ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কেউ ছিল না সেদিন আমার সাথে কারণ আমি তখন কাউকে চিনতামই না ভালো মতো, তা ছাড়া মানুষও অনেক কম ছিল যদিও অ্যাসোসিয়েশনের সাপোর্ট ছিল এতে। পরে ওটার আসল ফেস্টিভ্যালটি হলো নিউ ফার্মের একটি মাঠে। সেই অনুষ্ঠানে প্রচুর মানুষ পেয়েছিলাম।

বাচ্চাদের লাঠি খেলা থেকে শুরু করে নিজের নাচ, অন্যদের নাচ, গান দিয়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশেবাসিদের সামনে তুলে ধরতে খুব গর্ব হয়েছিল  সেদিন। এভাবেই ব্রিসবেনে আমার যাত্রা শুরু। এরপর অনেক ফেস্টিভ্যালেই বাংলাদেশকে তুলে ধরার সুযোগ হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল আমরা অন্যদের আয়োজিত মালটি কালচারাল ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা। তখনও ফেস্টিভ্যালের মতো বড় আয়োজন করবার সাহস হয়নি আমাদের। কিন্তু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত।

আমার জন্যে প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ১৬ ডিসেম্বর এর অনুষ্ঠান। সেখানে প্রায় অর্ধেক কমিউনিটি নিয়ে স্বাধীনতা, ইতিহাসকে স্মরণ করেছিলাম আমরা বাকি অর্ধেক ছিল দর্শক। স্টেজের পেছনে ব্যাকড্রপ করার মতো টাকা ছিল না অ্যাসোসিয়েশনের, কারণ মানুষই কম ছিল আসলে। তাই নিজের শাড়ি কেটে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে মানুষ এবং গাছের শেপ কেটে কাথার মতো শেলাই করে বিশাল এক ব্যাকড্রপ বানিয়েছিলাম দুয়েকজন বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে কয়েকদিন বসে। এমন আরো অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে তখন। কিছুই বাদ যায়নি। একুশের অনুষ্ঠান, বন্যার জন্যে টাকা সংগ্রহ, পহেলা বৈশাখ, ২৬ মার্চ ইত্যাদি সবই হয়েছে। শুধু বাকি ছিল ফেস্টিভ্যাল করা। তাও হলো ২০০০ সালে।

 



ব্রিসবেনে লোকসংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল তখন আস্তে আস্তে। প্রথম সারা দিনব্যাপী ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হয় ২০০০ সালে।  সকাল ১০টা থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত মাঝে বিকেলের দিকে ২/৩ ঘণ্টার একটা বিরতি। সেটা  হয়েছিল রবীন্দ্র এবং নজরুল জয়ন্তীকে  কেন্দ্র করে। সেখানে পুরো কমিউনিটি অংশগ্রহণ করেছিল এবং দেখতেও এসেছিল সবাই। সম্মানিত অতিথিদের  মধ্যে এসেছিলেন এটর্নি জেনেরেল ম্যাট ফলী, ক্যানবেরা থেকে এসেছিলেন অ্যাম্বাসেডর। তখন থেকেই নিয়মিত আমাদের সব অনুষ্ঠানে স্থানীয় মেয়র আসতেন, স্থানীয় মন্ত্রী বা মালটি কালচারাল বিভাগের মন্ত্রী আসতেন,  ক্যানবেরা থেকে আমাদের অ্যাম্বাসেডর আসতেন। এবং সেই ২০০০ সাল থেকেই আমরা শুরু করেছিলাম অন্য দেশের সাংস্কৃতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো, যেমন থাই, নেপালি, উরুগুয়ে, ইন্ডিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান, মালয়েশিয়ান, এবোরিজিনাল এবং অস্ট্রেলিয়ান অংশগ্রহণকারীরা এসে তাদের নাচ বা গান পরিবেশন করতেন। এমনকি তাদের স্টলও থাকতো আমাদের সেই সারা দিনব্যাপী ফেস্টিভ্যালে। আগে যেমন আমরা গিয়েছি গ্রীক বা মাল্টি কালচারাল ফেস্টিভ্যেলে অংশগ্রহণ  করতে, এরপর থেকে আমাদের ফেস্টিভ্যালেই অন্যরা আসতে শুরু করলো, বিশেষ করে পয়লা বৈশাখের মেলাগুলোতে।

এবার সেই ফেস্টিভ্যালের ১৭ বছর পার হলো।   ব্রিসবেনে বাঙালির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মনে হয় দশ বারো  হাজার। কিংবা আরো বেশি। দিনে দিনে ব্যাপারগুলো সহজ হয়েছে অনেক বেশি মানুষ হওয়াতে। গানের শিল্পীদের মান ভালো, নাচের শিল্পী তো প্রচুর আছে এখন, ছোটদের শুরু করে বড়রা পর্যন্ত। সাথে  টেকনোলোজি তো, হাতে বানানো ব্যাকড্রপস লাগে না আর।

গত বছর ব্রিসবেনের একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে অনেক নতুন মানুষ দেখেছি, সবাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল। সত্যি খুব গর্বের বিষয় এটা, কবিতা, গান, নাচ এবং আরো  অনেক কিছু, খুব ভালো লাগল অনেক কাজ হচ্ছে দেখে।   

এর মাঝে ব্রিসবেনে অনেকেই এসেছে আবার চলেও গেছে কিন্তু সবারই বিন্দু বিন্দু অবদান রয়ে গেছে আজ ব্রিসবেন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে। যারা অল্প সময়ের জন্যে এসেও আমাদের সমৃদ্ধ করে দিয়ে গেছেন তাদেরকেও ভুলতে চাই না আমি কারণ একদিনে তৈরি হয়নি এই সমাজ এবং সংস্কৃতি। এর একটা শুরু ছিল কোথাও, এখন তা প্রবাহমান। 

যে কথাটা আমি বিশেষভাবে আলোকপাত করতে চাই সেটা হলো আমাদের পরের প্রজন্ম। শুরুতেই বলেছিলাম আমাদের এগুলো করার পেছনে একটা বিশেষ আকাঙ্খা  বা প্রত্যাশা হলো আমাদের পরের প্রজন্ম যদি এগুলো বয়ে নিতে পারে তাদের সন্তানদের জন্যে এবং তারও পরে- এই স্বপ্নকে চোখের সামনে সত্যি হতে দেখেছি ব্রিসবেনেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সেলিনার মধ্যে। নিজেতো শিখেছেই, প্রচুর অনুষ্ঠানও করেছে এবং সেই সাথে একটু বড় হতে হতেই অন্যদেরকেও শিখিয়েছে। এটা একটা বিশেষ গুণ। অনেকেই নিজে করতে পারে এবং করছেও কিন্তু একটা লিডারশিপ নিয়ে অন্যদেরকে শিখিয়ে পরিবেশন করা একটা অসাধারণ গুণ।  সেলিনার পরে ব্যাপারটা আর কতদুর এগুবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না আমি কিন্তু এখন যাদের দেখে আমি মুগ্ধ হচ্ছি তারা হলো নাহিলা এবং নুশিন। এই মেয়ে দুটো শুধু শিখাচ্ছেই না তারা অনুষ্ঠান আয়োজন করতেও পিছপা হচ্ছে না। শুধু নিজেদের বন্ধুদের মধ্যে নয় পুরো বাংলা স্কুলের বাচ্চাদেরকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা আমি মনে করি খুবই সাহসের বিষয়। যেই মেয়েগুলো বাংলা স্কুলের অ আ থেকে শেখা শুরু করেছিল এবং অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছোট ছোট রাজকন্যা সেজেছিল, অথবা অন্য কোনো চরিত্র, কিংবা দলীয় বা একক নাচ করেছে সেই মেয়েগুলো। এখনো তারা নিজেরাই হাল ধরেছে এখন বাংলা সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখবার জন্যে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

ব্রিসবেনের বাংলা স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে নিজে অনেক কাজ করেছি, সত্যি বলতে গেলে আমার সময়কার সব বাংলাদেশি বাচ্চাদের নিয়েই কাজ করেছি। একটা অসাধারণ সময় গেছে তখন। এদেরকে নিয়ে কথা বলবার সময় নিজের অজান্তেই বলে ফেলি আমার বাচ্চারা... এখন আমার সেই বাচ্চারা এতো বড় হয়েছে, নিজেরা বাংলা স্কুলের পরের প্রজন্মের বাচ্চাদের শিখাচ্ছে, ওদের নিয়ে অনুষ্ঠান করছে,  সত্যি অসামান্য প্রাপ্তি এটা পুরো কমিউনিটির জন্যে।  এই গর্ব প্রকাশের ভাষা নেই আমার।

ব্রিসবেনে এবারের বৈশাখী মেলার ছবি দেখে খুব ভালো লাগল। বৈশাখ তোরণ দেখে আমি মুগ্ধ। রঙে রঙে রেঙেছিল পয়লা বৈশাখের মেলা ব্রিসবেনের বিশাল এক মাঠে। প্রতিটি বাংলাদেশিদের মধ্যে জেগে উঠেছিল   ঝলমলে হাসি। সেদিনকার সেই ছোট শিশুগুলোও কবে যেন বড় হয়ে এখন স্টেজে উঠে কবিতা আবৃত্তি করছে, নাচছে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করছে... সত্যি, আর কি চাই? এটাই তো স্বপ্ন ছিল। ব্রিসবেনের  বাংলাদেশিদের জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন। অনেক অনেক ভালোবাসা সবার জন্যে। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ, বেঁচে থাক বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য, পৃথিবীর বিভিন্ন আনাচে-কানাচে গড়ে উঠুক এক টুকরো বাংলাদেশ।

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ মে ২০১৭/সাইফ

Walton
 
   
Marcel