ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২২ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটবেলার নজরুল || টোকন ঠাকুর

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৫-২৪ ৩:১২:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-২৪ ১২:৫৪:৫৬ পিএম
অলঙ্করণ : অপূর্ব খন্দকার

নজরুল ভাই কাজী বংশের পুত্র ছিলেন না, কিন্তু নজরুল ভাইয়ের মাথায় ছিল বাবরি দোলানো ঝাঁকড়া চুল। নজরুল ভাই প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে আর হাই স্কুলের বারান্দায় যাননি। ছোটবেলায় দেখতাম, নজরুল ভাই ছিলেন সুন্দর সুঠাম দেহের এক সদ্যতারুণ্যের যুবক। আমাদের মধুপুর গ্রামেই নজরুল ভাইদের বাড়ি; আমরা প্রতিবেশী। প্রতিদিন সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাতেও দেখা হতো নজরুল ভাইয়ের সঙ্গে। সেই সময়টায় আমি হয়তো পড়তাম প্রাইমারি স্কুলে, কাজেই পাঠ্য বইয়ে `খুকি ও কাঠবেড়ালি` পড়ে চিনে ফেলেছি কাজী নজরুল ইসলামকে। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে একদিন হয়তো স্কুলের মাস্টার কেউ একজন প্রথম বলেছিলেন, ‘বিদ্রোহী কবি’। `বিদ্রোহী কবি` ব্যাপারটা কীরকম, তার একটা কাল্পনিক ধারণা গড়ে উঠছিল আমার মধ্যে। সম্ভবত সে ধারণা এ রকম যে, ছোটবেলাতেই চুরুলিয়ার কাজী বাড়ির ছেলে নজরুলের বাবা-মা মারা যাওয়ায়, নজরুল খানিকটা এতিম গোছের হয়ে পড়ে। একটা দুঃখ লাগা জীবন শুরু হয়। কাজী বাড়ির ছেলে বাপ-মা হারা নজরুলের ছোটবেলার ডাকনামটা আর কেনই বা হবে-দুখু মিয়া?

তারপর মক্তবে পড়তে যাওয়া, রুটির দোকানে কাজ করা, লেটো দলের যাত্রায় নাম লিখিয়ে গানবাজনা করা, তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে যোগ দেওয়া এবং একদিন প্রমোশন পেয়ে হাবিলদারে উন্নীত হওয়া- এ রকম একটি জীবন শুরু হয়েছিল নজরুলের। সেই হাবিলদার যুদ্ধ ফ্রন্টের এক তাঁবুতে বসে ডাক পেলেন কবিতার, বাংলা কবিতার। যুদ্ধপৃষ্ঠার বন্দুকের বদলে একদিন কবিতা লেখার কলম তাকে ডাক দিল বাংলা ভাষায়। নজরুল কবিতায় ঢুকলেন, নতুন একটি শব্দ হলো তখন বাংলা ভাষায়। সেই শব্দটার নাম ‘বিদ্রোহী’। যে কারণে তিনি বিদ্রোহী কবি বলেও আখ্যায়িত বাংলার গ্রাম থেকে গ্রামে, শহরে-বন্দরে।

কবিতা লিখেই তিনি কাঁপিয়ে দিলেন শাসকের চেয়ার। কবিতা লিখেই, বয়স ত্রিশের কোঠা পেরুবার আগেই তিনি বাংলা-জনপদে কিংবদন্তি। নায়ক। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে তখন এ রকম একটি কণ্ঠস্বর খুব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন মেটালেন কবি, সেই চুরুলিয়ার রুটির দোকানে কাজ করা কিশোর-শ্রমিক-ছেলেটা। নজরুল গান লিখে-গেয়ে খুব খ্যাতি পেলেন। অর্থও পেলেন। ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ শাসনের শেষ হয়ে আসা দিনপ্রায়। নজরুল কারাগার থেকে মুক্ত হলেন বটে কিন্তু মাত্র তেতাল্লিশ বছরেই বাকশক্তি হারিয়ে চুপচাপ হয়ে গেলেন। বহুকাল এমনিতরো বাকশক্তিহীন বেঁচে থেকে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় মারা গেলেন।

কিন্তু এই `বিদ্রোহী কবিতা`র কবি নজরুলের একটা মিথিক্যাল ইমেজ তার পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল অবিভক্ত বাংলার প্রায় ঘরে-ঘরে। এমনকি যারা লেখাপড়াও শেখেনি, তারাও অনেকটা জনশ্রুতির গল্পের নায়ক হিসেবে, খানিকটা ট্র্যাজেডির নায়ক হিসেবে নজরুলকে চিনে নিয়েছে। সেই চেনাজানার মধ্যে সত্য-মিথ্যার চেয়ে বেশি আছে  মানুষের কল্পনা শক্তি। যেমন আমরা ছোটবেলায় শুনতাম, নজরুলের শরীরে ব্রিটিশরা জেলের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে বলেই নজরুল আর কবিতা লিখতে পারলেন না, বাকশক্তি হারালেন। তারপর একদিন শুনলাম, নোবেল পুরস্কারটা নজরুলই পেতেন, রবীন্দ্রনাথরা তো জমিদার, তাই পলিটিক্স করে নোবেল নিয়ে নিয়েছেন। এসব হচ্ছে বাংলার মুসলিম অধ্যুষিত জনপদের বাল্যবেলার ভাষা। এর মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক অজ্ঞানতা কাজ করেছে। যদিও একটা অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের জন্যে নজরুল বহু রচনা রেখে গেছেন বাঙালির জন্যে। কিন্তু শাসকবর্গ সব সময় এই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে তাদের শাসন-স্বার্থে কাজে লাগিয়ে চলেছে। নজরুলের বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্যও এই ধনী কর্তৃক গরিবকে শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

বিচিত্র এক জীবনের অধিকারী ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলার বিদ্রোহী কবি। বাংলার জনপদে কবিজীবন নিয়ে নজরুল রীতিমতো কিংবদন্তি। পাড়ায়-পাড়ায় রবীন্দ্র-নজরুলে গান শেখে ছেলেমেয়েরা, এখনো। আমাদের ছাত্রজীবনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত উৎসব বলে বাৎসরিক একটা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হতো ঘটা করে। নজরুলের নামেই নামকরণ হয়েছে কতশত বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছেলে বাচ্চাদের। নজরুল এতটাই খ্যাতি অর্জন করেছেন বাংলা ভাষায়।

সেভাবেই, কাজী বংশের নয় কিন্তু নাম নজরুল, আমাদের দেখা নজরুল ভাইয়ের। নজরুলের ছবি দেখেই তার মতো করে বাবরি চুল অনেকেই রেখেছে, নজরুল ভাইয়েরও আমরা বাবরি চুল দেখেছি। কেউ যখন নজরুল ভাইকে বলত, তোমার নাম কি?
নজরুল ভাই বলতেন, নজরুল।
সে জন্যেই কি বাবরি চুল?
নজরুল ভাই খুশি হতেন তাকে দেখে কেউ কবি নজরুলের কথা বললে বা ভাবলে। অথচ নজরুল ভাই কবিতা কি জিনিস তার কোনো ধারণাও রাখেন না, জানতেন বলেও  মনে হয়নি।

তখন, আমাদের ছোটবেলায় গঞ্জের হাটে দু`টাকার ক্যালেন্ডার পাওয়া যেত। সে-সব ক্যালেন্ডারে মনীষীদের ছবি ছাপা থাকত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজি সুভাষ বোস বা আরো অনেকের ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার ছাপা হতো। মানুষ সেই ক্যালেন্ডার কিনে নিয়ে যেত এবং ঘরে টাঙিয়ে রাখত। আমিও  রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও শরৎচন্দ্রের ক্যালেন্ডার কিনে এনে বাড়িতে পড়ার ঘরের বেড়ায় টাঙিয়ে রেখেছিলাম। আবার একদিন দেখলাম, নজরুলের ছবির ক্যালেন্ডারে অনেক ফুলের মাঝে নজরুলের একটা মায়াবী চাহনির ছবি। ক্যালেন্ডারের উপরেই লেখা, ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি?

পরে, সিনেমার নায়ক নায়িকাদের ছবি নিয়ে ভিউকার্ড বেরুলে একদিন দেখলাম, ভিউকার্ডেও নজরুলের ছবি। ছোটবেলায় দেখা নজরুলই আমার কাছে সেই বিদ্রোহী নজরুল। যে কোনো বাধা মানে না, সেই তো বিদ্রোহী। কমবেশি প্রত্যেক বাঙালির মধ্যেই যখন বিদ্রোহ দানা বাঁধে, তখন তার মধ্যে নজরুল দানা বাঁধে। যখন, বিরহ-বঞ্চনা আসে, তখন নজরুল প্রতিভাত হন তার গানে গানে। আর ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো কেউ মানেই তো সেই নজরুল, এই বাংলায় তাই নজরুল অনিঃশেষ। সব সময় কোনো গ্রামে, শহরে, বন্দরে কেউ একজন ঝাঁকড়া চুলে বাবরি দুলিয়ে হেঁটে যাবে, তাকে দেখে আমাদের নজরুল নজরুল মনে হবে।

অনেক রচনা লিখে গেছেন আমাদের জন্যে সেই `দুখু মিয়া`। কিন্তু এ কথাও সত্য, বাঙালি পাঠবিমুখ একটা জাতি। কাজেই না পড়েই জানে তার কবিকে এই জাতি। কিন্তু পড়া দরকার। ভুলভাল কমে আসবে, সত্যমিথ্যা জানা যাবে। মুখে মুখে শোনা সেই ছোটবেলার একটা ছড়া, এ ছড়ার লেখক কে, জানি না। কেনই বা কী ভেবে এই ছড়া ছড়িয়ে পড়ল মুখে মুখে, তাও জানি না। কিন্তু জানতে পারলে ভালো লাগত। ছড়াটা বলি? বললে তো বলবেন, ওহ্! জানি-

‘নজরুল তুমি করিয়াছ ভুল
দাঁড়ি না রেখে রাখিয়াছ চুল।`



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ মে ২০১৫/তাপস রায়

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge