ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ চৈত্র ১৪২৩, ২৩ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

সাহিত্যের ভেতরকার দেয়াল ভাঙ্গতে পছন্দ করি: শাহাদুজ্জামান

অঞ্জন আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-০৯ ৬:৩৪:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৮ ৪:১১:২৪ পিএম
শাহাদুজ্জামান

বর্তমান বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক শাহাদুজ্জামান। কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি বিস্তৃত হলেও সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে তাঁর বিচরণ। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় বিচরণের প্রভাবে তাঁর কথাসাহিত্য স্বাতন্ত্র্য একটি ধারায় প্রসারিত হয়েছে। নিজের মধ্যে বিরাজমান অপরিসীম কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য তিনি সমাজকে যেমন গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেইসঙ্গে প্রতিনিয়ত জ্ঞান অন্বেষণে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে, ভাবনার দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ পরিবর্তনের প্রভাব তাঁর লেখায় দেখা যায়।

গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ মিলিয়ে তাঁর ২৫টি গ্রন্থ প্রকশিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রকাশনী সংস্থা মাওলা ব্রাদার্স আয়োজিত কথাসাহিত্যে পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার পেয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’।  এখন পর্যন্ত তাঁর উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, সাক্ষাৎকারগ্রন্থ , অনুবাদগ্রন্থ, , গবেষণাগ্রন্থ , ভ্রমণগ্রন্থ, সম্পাদিত গ্রন্থ , কলাম বা প্রবন্ধগ্রন্থ  প্রকাশিত হয়েছে।

শাহাদুজ্জামান পড়াশোনা করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। সাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তিনি কথাসাহিত্য বিভাগে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। বহুমাত্রিক এই লেখকের মুখোমুখি হয়েছেন তরুণ লেখক অঞ্জন আচার্য।


অঞ্জন আচার্য: কীভাবে লেখালেখির শুরু?
শাহাদুজ্জামান: আমার লেখালেখির শুরু আশির দশকের মাঝামাঝি লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে। লেখালেখিকে আমি গভীর ধ্যান এবং পরিশ্রমের কাজ বলে মনে করি। আমি লেখা শুরু করেছিলাম অনুবাদ ও প্রবন্ধ দিয়ে। মূলত মার্ক্সিস্ট এসথেটিক্স নিয়ে। লেখক হওয়ার জন্য এসব লেখা তখন অনুবাদ করিনি। আমি তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। আমার তখন একাধারে রাজনীতি আর সাহিত্য উভয় ব্যাপারেই সমান আগ্রহ। এ দুটার মধ্যে কী সম্পর্ক সেটা বোঝার জন্য নানারকম ইংরেজি বইপত্র পড়তাম। একসময় মনে হলো, এগুলো অনুবাদ করে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা দরকার। এটি বিশেষভাবে মনে হলো, কারণ আমি তখন বামপন্থী একদল তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতাম। দেখতাম তাদের মিটিং-মিছিলে যত আগ্রহ জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যাপারে তত আগ্রহ নেই; কিন্তু তারা রাজনীতি-শিল্প নিয়ে নানা কথাবার্তা বলত। তাদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করতে গিয়েই আমি এসব পড়তে শুরু করি এবং মনে হয় অনুবাদ করলে এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক কী সব চিন্তাভাবনা হচ্ছে সেটা হয়তো অনেকের জানার সুযোগ হবে। সুতরাং ঠিক লেখক হওয়ার মোটিভেশন থেকে নয়, একেবারে ভিন্ন একটা মোটিভেশন থেকে লিখতে শুরু করা। অবশ্য এক পর্যায়ে টের পেলাম সক্রিয় রাজনীতি আমার কাজের জায়গা নয়। আমি শিল্প-সাহিত্যের নানা মিডিয়ার ব্যাপারে খুব কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আমি আশির দশকে ফিল্ম, নাটক, পেইন্টিং, মিউজিক এসব মিডিয়ার সঙ্গে খুবই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম। তো গল্প যখন লিখতে শুরু করেছি তাতে অন্য সব শিল্প মাধ্যমের সঙ্গে আমার যে যোগাযোগ, রাজনীতির সঙ্গে যে যোগাযোগ তার একটা প্রভাব পড়েছে। নানা মিডিয়ায় এক্সপেরিমেন্টাল যেসব কাজ হয়েছে সেগুলো আমাকে ইনসপায়ার করেছে। আমার লেখার নিরীক্ষাধর্মীতার সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতার একটা সম্পর্ক আছে।

অঞ্জন আচার্য : আরও  একটু বিস্তারিত জানতে চাই...
শাহাদুজ্জামান : ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে আমি লিখতে শুরু করি; কিন্তু প্রস্তুতিপর্ব ঠিক কখন শুরু হয়, সেটা তো এমন সরাসরি বলা যাবে না। আর আমার ক্ষেত্রে তো বলেছি, যে লেখক হবো এটা ভেবে কোনো সচেতন প্রস্তুতি ছিল না। আমার পরিবারের ভেতর সাহিত্য, গান-বাজনা ইত্যাদির চর্চা ছিল। ফলে শুরুটা সেখান থেকে। আমি ক্যাডেট কলেজে পড়েছি, সেটা রেজিমেন্টেড লাইফ তুমি জানো; কিন্তু সেখানে দু-একজন শিক্ষক, বন্ধু এদের সূত্র ধরে সাহিত্যের আগ্রহটা জিইয়ে থেকেছে। তবে ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে মুক্তজীবনে এসে বলা যায় প্রথম শিল্প-সাহিত্য নিয়ে মশগুল হওয়ার সুযোগ এলো। আমি মেডিক্যালে পড়লেও দেখলাম আমার মন পড়ে থাকে গান-বাজনা, সাহিত্য, নাটক, ফিল্ম এগুলোর দিকে। চিটাগাংয়ে থাকতে কলেজের অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, আবৃত্তি ইত্যাদিতে নিয়মিত অংশ নিতাম। রেডিওতে গান করতাম, চিটাগাং ফিল্ম সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম, গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, যুক্ত ছিলাম ‘সময়’ পেইন্টারস গ্রুপের সঙ্গে। মোটকথা শিল্প-সাহিত্যের সবক’টি মিডিয়ার সঙ্গে একটা সক্রিয় যোগাযোগ আমার ছিল তখন। আর্ট, কালচার জগতে এক ধরনের ঘোর তৈরি হয়েছে তখন বলতে পারো। এসব কথা বলছি, কারণ আমার প্রস্তুতিপর্বের কথা যদি বল তাহলে আমার লেখালেখি শুরুর আগের এসব কর্মকাণ্ড স্মরণ করতে হয়। আমি এসময় বিশেষ করে রাজনীতি আর শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। এসব নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করলাম। মূলত অনুবাদ। বলতে পার বিখ্যাত সব লেখকদের লেখা অনুবাদ করে তাদের আড়ালে গিয়ে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছি। এরপর ধরো শিল্প-সাহিত্য যারা সৃষ্টি করে তাদের ক্রিয়েটিভ প্রসেসটার ব্যাপারে আমার আগ্রহ তৈরি হলো। সেই সূত্র ধরে কিছু ক্রিয়েটিভ মানুষের ইন্টারভিউ করি। আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, এসএম সুলতান এদের ইন্টারভিউ করেছি। সেগুলো আমার কথা পরম্পরা বইটাতে আছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে অনুভব করলাম, আমার যে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো হচ্ছে, নিজে যে নানা রকম দ্বন্দ্ব, সংশয়, প্রেম, দ্বিধা এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি সেগুলো অনুবাদের ভেতর দিয়ে বা অন্যের সাক্ষাৎকারের ভেতরও প্রকাশ করা যাবে না। আমার নিজের কথাগুলো বলার একটা জায়গা তৈরির জন্য আমি প্রথম গল্প লিখি। সে গল্পটার নাম ‘অগল্প’। তুমি পড়েছ নিশ্চয়ই। লক্ষ করেছ যে, ওটা আসলে ঠিক প্রচলিত ন্যারেটিভের গল্প নয়। বরং বলা যায় অ্যান্টি ন্যারেটিভ গল্প। একটা গল্প বলে সেটাকে আবার ভেঙে দেয়া। এ ব্যাপারে আসলে আমি প্রভাবিত হয়েছি ব্রেখটের নাটক দিয়ে, গদারের ফিল্ম দিয়ে। আগেই বলেছি, আমার এক্সপেরিমেন্টাল শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল। এই যে নানা শিল্প মাধ্যমের ভেতর চলাফেরা করেছি সেটা আমার আত্মনির্মাণে ভূমিকা রেখেছে মনে করি।

অঞ্জন আচার্য: কবে থেকে গল্প লেখার শুরু? প্রথম বই প্রকাশের গল্পটিও শুনতে চাই।
শাহাদুজ্জামান: গল্প লেখা শুরু মূলত নব্বই দশকের গোড়ার দিকে। আমার প্রথম লেখা ছাপা হবার কথাটা বলি। আমি তখন চিটাগাং মেডিকেলের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র, কিন্তু গান, নাটক, ফিল্ম এসব নিয়ে থাকি। সেখানে আমার এক সিনিয়র বন্ধু আছেন মিলন চৌধুরী, নাটকের মানুষ। তার এক ধনবান ব্যবসায়ী সাহিত্যপ্রেমিক বন্ধু ছিলেন, উনি তাকে বললেন, একটা লিটল ম্যাগাজিন ফাইন্যান্স করতে। আর আমাকে বললেন, আপনি তো নানা বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করেন, এসব নিয়ে লেখেন। তো তার চাপাচাপিতেই আমি প্রথম অনুবাদ করতে শুরু করি। সেটা ছাপা হয় ‘চর্যা’ নামের সেই লিটল ম্যাগাজিনে। সেই পত্রিকাটি বেশ কয়েকটা সংখ্যা বেরিয়েছিল। সেখানে নিয়মিত লিখেছি। পরে ‘প্রসঙ্গ’ নামে আমরা ক’জন মিলে নিজেরাই নতুন ধরনের মাল্টি ডিসিপ্লিনারি একটা পত্রিকা করি। সেসময় এ ধরনের পত্রিকা ছিল না, যেখানে সাহিত্য, ফিল্ম, নাটক, পেইন্টিং এসবের একটা কমপারেটিভ আলোচনা হতো। ‘প্রসঙ্গ’ সেই দিক থেকে ছিল ব্যতিক্রমী একটা পত্রিকা। আমি অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে লিখিনি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। গৌতম বুদ্ধের সেই কথাটা ‘নিজে নিজের প্রদীপ হও’ আমার পছন্দের কথা। এটা আমার বিশ্বাস যে, কেউ যদি নিজের প্রতি সৎ থাকে তবে সেই সততা কোথাও না কোথাও গিয়ে স্পর্শ করে। তুমি যে জানতে চাইলে লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাবে কিনা সেটা আমার কাছে কোন চ্যালেঞ্জ ছিল কিনা। না, আমি এ বিষয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলাম না। শুরু থেকেই আমার এমন একটা ভাবনা ছিল যে, পাঠকের রুচি শুধু ফলো করলে হবে না, গাইডও করতে হবে।

অঞ্জন আচার্য: সেই চিরায়ত প্রশ্ন ‘কেন লেখেন?’
শাহাদুজ্জামান: লেখকদের কাছে এ প্রশ্নটা করার রেওয়াজ বেশ পুরোনো। এর উত্তর দেবার আগে আমি বরং ভাবছিলাম, এ প্রশ্নটা কেন বার বার লেখকদের করা হয়। জগৎ সংসারে মানুষ যে আরো বিবিধ সব কাজ করে থাকে তাদের কি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় কখনো? লেখকদের কাছে এই যে প্রশ্ন, এর পেছনের প্রণোদনাটা কি কৌতূহল না জেরা? সন্দেহ নাই লেখার কাজটা অদ্ভুত। কেন-ই বা একজন অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে একটা বিকল্প জীবন তৈরি করতে চায়? ব্যাপারটা কী? এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে অ্যাঁদ্রে জিদ বলেছিলেন, ‘লিখি, কারণ না লিখলে হাত ব্যথা করে’। গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, ‘লিখি যাতে আমার বন্ধুরা আমাকে আরো একটু বেশি ভালোবাসে।’

ঠিক নিশ্চিত মনে পড়ছে না সম্ভবত হেমিংওয়ে বলেছিলেন, ‘যে কারণে বাঘ হরিণ শিকার করে সে কারণে আমি লিখি।’ বোঝা যায় প্রশ্নটাকে তারা হালকা চালেই নিয়েছিলেন। এও বোঝা যায়, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে একধরনের অসহায়ত্বও তৈরি হয়েছিল তাদের। কারণ এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া দুরূহ। তার চেয়ে বরং উত্তর দেওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। অনেক লেখক অবশ্য বেশ মনোযোগের সঙ্গেই এ প্রশ্ন মোকাবেলার চেষ্টা করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন লিখেছিলেন: ‘লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যেসব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্য লিখি।’ জীবনানন্দ দাশ ছোটখাটো একটা নিবন্ধ লিখেই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়েছিলেন। লিখেছিলেন: ‘আমার এবং যাদের আমি জীবনের পরিজন মনে করি তাদের অস্বস্তি বিলোপ করে দিতে না পেরে জ্ঞানময় করার প্রয়াস পাই এই কথাটি প্রচার করে যে জীবন নিয়েই কবিতা।’ এসব তো সাহিত্যের দিকপালদের কথা। কিন্তু আমি কেন এই লেখালেখির পাকচক্রে পড়লাম? একটা ব্যাপার বুঝি যে, না লিখলে সর্বনাশ কিছু হতো না, বরং লিখতে গিয়েই যা কিছু সর্বনাশ হয়েছে। কোথাও কোনো দস্তখত দেইনি যে লিখতে হবে, না লিখলে আমার মৃত্যুদণ্ড হবারও কোনো আশঙ্কা নাই, লিখে বৈষয়িক, জাগতিক কোনো সুবিধাও বিশেষ হয়নি- তারপরও লিখে চলেছি। কারণটা কী? কেন লিখি- এ বিষয়ে অন্যেরা যা বলেছেন আমি তার চেয়ে অভিনব কিছু বলতে পারবো তার সম্ভাবনা নাই। তারপরও যারা লেখালেখিতে নিযুক্ত তাদের সবারই নিজস্ব একটা গল্প থাকে। আমি আমার নিজের গল্পটা ভাবার চেষ্টা করি।

অঞ্জন আচার্য: আপনার শৈশব-কৈশোর, অর্থাৎ বেড়ে ওঠা বলতে গেলে শহরে। গ্রাম কি আপনার কাছে অনেকটা পরিব্রাজকের মতো দেখা?
শাহাদুজ্জামান: ঠিক গ্রামে আমি বড় হইনি কিন্তু সেই অর্থে বড় কোন শহরেও বড় হইনি। আমার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তার বদলীর চাকরি ছিল দেশের নানা পাওয়ার স্টেশনে। সেসব পাওয়ার স্টেশনগুলো  তো ছিল বলতে গেলে প্রত্যন্ত এলাকায়। আমার শৈশব কৈশরের একটা বড় সময় কেটেছে সিলেটের শাহজীবাজার নামের একটা জায়গায়, যেখানে একটা গ্যাস পাওয়ার স্টেশন আছে। ওটা তো রীতিমতো জলা জঙ্গলার একটা জায়গা। ওখানে গ্যাস আবিষ্কার হওয়াতে পাওয়ার স্টেশনটা হয়েছিল। ওখানে ছিল একটা প্রাচীন মাজার আর একটা ছোট গ্রাম। এই সময়ের স্মৃতি নিয়ে আমার একটা গল্প আছে ‘মাজার, টেবিল টেনিস, আসলি মোরগ’ নামে। এছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, ঢাকার কাছে সিদ্ধিরগঞ্জ, খুলনার খালিশপুর এসব জায়গার পাওয়ার স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আমার বাবা, সেসব জায়গায় থেকেছি আমি। তবে সেসব জায়গায় থাকলেও এইসব ছোট ছোট শহরের মূল জীবনযাত্রার সাথে আমাদের যোগাযোগ ছিল না। আমরা থাকতাম ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারি কোয়ার্টারে, নানা সরকারি সুযোগ-সুবিধার ভেতর। ইঞ্জিনিয়ারদের নিজস্ব একটা জগৎ ছিল যেটা স্থানীয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, একটা এলিট জীবন বলা যায়। এরপর আমি তো ক্যাডেট কলেজে চলে গেলাম, সেটাও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির জীবন।  ফলে আমি ঠিক শহরে বড় হইনি, বরং বলা যায়, গ্রামে বা মফস্বলে থেকেও এক ধরনের আরবান লাইফ স্টাইলে বড় হয়েছি। তবে আমি সত্যিকার অর্থে গ্রামে যাই পড়াশোনা শেষে ব্র্যাকের স্বাস্থ্য প্রকল্পের ডাক্তার হিসেবে। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে কাজের সূত্রে থেকেছি। এটা গ্রামে বেড়াতে যাওয়া না, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস থাকা। সেটা আমার জন্য ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা। গ্রামে থাকার সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে দেখার চোখ বদলে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত জীবনের গণ্ডি, বইপত্র আর অক্ষরকেন্দ্রিক জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে একটা নতুন জগতের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। গ্রামের অভিজ্ঞতা আমার লেখার উপরও অনেক প্রভাব ফেলেছে। গ্রাম জীবনের সংগ্রাম আর ঐশ্বর্য খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমাদের গ্রামগুলো তো একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন। তারপরও লোকসংস্কৃতির নানা মাত্রার সাথে সরাসরি পরিচয় হয়েছে আমার তখন। রাত জেগে পালা শুনেছি, যাত্রা দেখেছি। আমার খুব পছন্দের কাজ ছিল হাটের দিনে নানা ওষুধের ক্যানভাসারদের বক্তৃতা শোনা। আমি তাদের গল্প বলার ক্ষমতায় মুগ্ধ থাকতাম। এসব অভিজ্ঞতা আমার লেখাকেও প্রভাবিত করেছে।

অঞ্জন আচার্য: আপনি যে আঙ্গিকে লিখেন তা না জনপ্রিয় ধারা, না দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা। নিজের লেখার আঙ্গিক সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন কী? মূলত কার জন্য লিখেন আপনি?
শাহাদুজ্জামান: পাঠকপ্রিয় হওয়া, জনপ্রিয় হওয়া এসব আমার ভাবনার মধ্যে একেবারে কখনোই ছিল না। আমি বরং পাঠকপ্রিয় না; কিন্তু মেধাবী, যারা আমার পাঠের অভ্যাসকে আঘাত করে এমন লেখকদের ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছি। যেমন কমলকুমার মজুমদার একসময় আমাকে আকর্ষণ করেছিল। তিনি নিজের জন্য এক ধরনের সান্ধ্য ভাষা তৈরি করে নিয়েছিলেন। আমি নিজে কোনোদিন এ ধরনের ভাষায় লিখব সেটা চিন্তা করিনি; কিন্তু তার সাহস এনজয় করতাম। তিনি একবার বলেছেন, ভাষাকে যে আঘাত করে সে ভাষাকে বাঁচায়। আসলে জনপ্রিয় হওয়া, পাঠকপ্রিয় হওয়া এসবের চেয়েও লেখার পুরো প্রক্রিয়াটা, জগৎটা অনেক বড় ব্যাপার। আবার আমি জনপ্রিয় ধারায় লিখি না সেটা প্রমাণ করতে জোরজবরদস্তি করে ভাষার ইঞ্জিনিয়ারিং করে লেখাকে দুর্বোধ্য করে এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়ালপনা করার প্রবণতাও আছে। আমি সেটার ব্যাপারেও সতর্ক থেকেছি। জনপ্রিয়তা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। একাধারে মেধাবী এবং জনপ্রিয় এমন লেখক পৃথিবীতে আছে। আসলে নিজের কথাটা সৎভাবে, সত্যিকারভাবে বলতে যে ভাষা, যে আঙ্গিক দরকার সেটা ব্যবহার করলে সেটা পাঠকের কাছে কোনো না কোনোভাবে পৌঁছায় আমি সেটাই বিশ্বাস করি। যখন লিখতে শুরু করেছি, তখন এ লেখা কয়জন পড়বে সেটা ভাবিনি। মনে হয়েছে এ লেখাটা দরকার তাই লিখেছি। আগেই বলেছি, আমি বহুদিন শুধু লিটল ম্যাগাজিনে লিখেছি। বড় পত্রিকায় লিখিনি। তখন তো পত্রিকা অফিসে গিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করা, নানা রকম সাহিত্যিক গোষ্ঠী করা এসব খুব ছিল, এখনও আছে। ওগুলোর মধ্যে আমি ছিলাম না কখনও। বড় দৈনিক পত্রিকায়, সাহিত্য পত্রিকায় আমি এক সময় যখন লেখা পাঠাই সেটাও পাঠিয়েছি পোস্ট করে। পত্রিকার কাউকেই চিনতাম না। আমার প্রথম দিকের গল্পগুলো ছাপা হয়েছে সংবাদে, ভোরের কাগজে, সাহিত্যপত্রে। এসব পত্রিকার সম্পাদক কাউকে তখন চিনতাম না। আমার লেখা ছাপানোর অনেক পরে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। মূলত একটা প্যাশন থেকে লেখালেখি করে যাই এবং টের পাই যে আমার একটা পাঠকগোষ্ঠী আছে। নানাভাবে আমার লেখার রিয়াকশন পাই। অচেনা একজন মানুষকে শুধুমাত্র লেখার মধ্য দিয়ে স্পর্শ করতে পেরেছি- সেটা দেখতে পাই। সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশিষ্ট না বিখ্যাত লেখক- সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবি না।

অঞ্জন আচার্য: বলতে গেলে আপনার লেখায় রোমান্টিকতার বিষয়টি প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। এ রহস্যের পেছনের কারণ কী?
শাহাদুজ্জামান: রোমান্টিকতা বলতে তুমি সম্ভবত প্রেমের ব্যাপার বোঝাচ্ছ। তথাকথিত প্রেমের গল্প আমি লিখিনি- সেটা ঠিক। তবে আমার ‘আন্না কারেনিনার জনৈকা পাঠিক’ কিংবা ‘জ্যোৎস্নালোকে সংবাদ’- এগুলো তো গভীর অর্থে প্রেমের গল্প, রোমান্টিক গল্প। তবে হ্যাঁ, প্রেম বিষয়ে লেখালেখি করার ব্যাপারে একটু সতর্ক থেকেছি। সতর্ক না হলে এসব বিষয়ে লেখা খুব সেন্টিমেন্টাল ধাঁচের হয়ে উঠে। তাছাড়া তারুণ্যে দেখতাম, যারা নতুন লিখতে চাচ্ছে তাদের অধিকাংশের লেখার বিষয় প্রেম। এসব আমার কাছে খুব ছেলেমানুষী মনে হতো। ফলে খানিকটা সচেতনভাবেই ওই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছি। এটা ঠিক যে, এক বয়সে যখন আমার অনেক বন্ধুদের ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা হচ্ছে প্রেমে পড়া আমি তখন রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য এসব নিয়ে ব্যস্ত। ফলে সমসাময়িকদের সঙ্গে আমার একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ ছিল কথাটা সত্যি। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। আমি চরম বাস্তববাদী তা ঠিক নয়। আমি খুবই আবেগপ্রবণ, আমি প্রেমও করেছি প্রবলভাবে; কিন্তু বলতে পারো আবেগের চেয়ে মনন আমাকে গাইড করে বেশি।

পরকীয়া প্রেম, যৌনতা এগুলো তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগেই বলেছি এসব নিয়ে লিখতে সতর্ক থাকি। কারণ এসব বিষয়ের প্রচুর অপব্যবহার দেখেছি সাহিত্যে। বাজারমুখী হালকা আনন্দের বিষয় হতে দেখেছি। আমার লেখায় প্রকটভাবে এসব নিশ্চয়ই নাই কিন্তু সূক্ষ্মভাবে আছে। ‘ক্যালাইডোস্কোপ’ গল্পটায়, ‘বিসর্গতে দুঃখ’তে পরোক্ষভাবে আছে। সেই যে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটা লাইন আছে না, ‘ফুলকে সরিয়ে নাও, একে দিয়ে অনেক মিথ্যা বলানো হয়।’ আমার লেখায় এসব বিষয়কে একটু সরিয়ে জীবনের অন্য দিগন্তগুলোর ওপর একটু বেশি জোর দিয়েছি বলতে পারো।

অঞ্জন আচার্য: আপনার একটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গল্প সংকলন ‘ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন’। এ কাজটি হাত দেয়ার পেছনে একটা কারণ আছে জানি, যদি শেয়ার করতেন।
শাহাদুজ্জামান: বলতে পার সেসময় এক ধরনের রাইটার্স ব্লক চলছিল আমার। তার কিছু আগে ‘ক্রাচের কর্নেল’-এর মতো গবেষণাধর্মী বড় একটা কাজ শেষ করেছি। নতুন কোনো গল্প লেখাও হয়ে উঠছিল না। কিন্তু কিছু লিখতে ইচ্ছা হচ্ছিল। তখন অনুবাদে হাত দেই।

অঞ্জন আচার্য: একটু বিস্তারিত শুনতে চাচ্ছি...
শাহাদুজ্জামান: ‘ক্যাঙ্গারু দেখার শ্রেষ্ঠ দিন’-এর গল্পগুলো অনুবাদ করেছি প্রবাসে বসে। সে বছর আমি ইউকেতে গেছি নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে। আমার জীবনযাপনে একটা পরিবর্তন এসেছে। বলতে পারো বিদেশে যাওয়ার পর নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার একটা নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। এসবের একটা প্রভাব পরবর্তী গল্পেও পড়েছে। এই বইটার পর আমার লেখায় এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে গল্পের দৈর্ঘ্য যে পাঠকের সমালোচনার ভিত্তিতে বেড়েছে তা নয়। আমি কখনই এমন ভেবে গল্প লিখিনি যে এটা দু’ পৃষ্ঠা বা তিন পৃষ্ঠার গল্প হবে। আমার বলার কথাটা বলে ফেলবার জন্য যতটুকু পরিসর দরকার আমি ততটুকুই দিয়েছি। দু’ পৃষ্ঠায় আমার মূল কথাটা বলা হয়ে গেলে শুধু পৃষ্ঠা বাড়াবার জন্য সেটাকে আর দীর্ঘ করিনি।

অঞ্জন আচার্য: সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে এমন কিছু বলবেন।
শাহাদুজ্জামান: সাহিত্যের দিগন্ত এখন নানাদিকে প্রসারিত হচ্ছে। সাহিত্যের নানা শাখার ভেতরকার দেয়ালগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। এবছর বেলোরুশের যে লেখিকা নোবেল পুরষ্কার পেলেন তিনি মূলত সাংবাদিক, তিনি সাংবাদিকতা আর সাহিত্যের ভেতর মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। আমি  ব্যাক্তিগতভাবে এই সাহিত্য দর্শনে বিশ্বাস করি। আমার লেখাপত্রে আমি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধের মূল উপাদানের মিশেল ঘটাতে পছন্দ করি।

অঞ্জন আচার্য: পেশাগত জীবন ও ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করেন নিজের লেখালেখি?
শাহাদুজ্জামান: আসলে আমি দুটো একেবারে প্যারালাল জীবনযাপন করি বলতে পারো। একটা আমার পেশাগত জীবন, যেটা শিক্ষকতা, গবেষণা আরেকটা আমার লেখক জীবন। দুটাই খুব ডিমান্ডিং। আমি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি, বিশ্বস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করি, এগুলো খুবই পরিশ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ কাজ। এরপর আমি যে ধরনের লেখালিখি করি, সেগুলো অনেক সময় দাবি করে। এর বাইরে সংসার, স্ত্রী, পুত্র- এদের নিয়েও তো নানা দায়িত্ব রয়েছে। ফলে আমাকে ভীষণ অর্গানাইজড হতে হয়, তা না হলে এতগুলো জীবন সামলানো অসম্ভব। আমি না লেখালেখি করলে হয়তো আরও ভালো স্বামী বা বাবা হতাম, আরও ভালো একাডেমিক হতাম। কিন্তু লেখার নেশা আমি ছাড়তে চাইনি। ফলে ধীরে ধীরে এই অর্গানাইজড হওয়াটাকে রপ্ত করতে হয়েছে। আমি আমার লেখার কাজগুলো করি রাতে, প্রতি রাতেই লিখতে বসি। প্রবাসে থাকলে একটা সুবিধা অবশ্য আছে। যেহেতু চেনা-জানা মানুষ এখানে কম, ফলে সোসালাইজেশনে বেশি সময় দিতে হয় না।

অঞ্জন আচার্য: কর্নেল তাহেরকে নিয়ে আপনার আলোচিত উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’ লেখার পেছনের তাগিদ কী ছিল?
শাহাদুজ্জামান: আমি মনে করি, স্বপ্নের যেমন মৃত্যু হয় না, কর্নেল তাহেরের মতো বিপ্লবীদেরও মৃত্যু নেই। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। কর্নেল তাহেরের জীবন পাঠ করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পাঠ করা হয়। আমি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সময় নিয়ে নিজের মতো করে উপন্যাসটি লেখার চেষ্টা করেছি। এটি সাহিত্য হিসেবে কতটুকু মানোত্তীর্ণ হয়েছে তা পাঠক বিবেচনা করবেন। তবে লেখক হিসেবে আমি ইতিহাসের প্রতি বস্তুনিষ্ঠ থেকেছি। বইটির ঐতিহাসিক তথ্যগুলি নিয়ে এ পর্যন্ত কেউ প্রশ্ন তোলেননি।

আরেকটা কথা, আমি মনে করি, ব্যক্তি হিসেবে কর্নেল তাহের ব্যর্থ। কারণ তিনি যা করতে চেয়েছেন তার কিছুই করতে পারেননি। আমি তার স্পিরিট ধরতে চেয়েছি। তাহেরকে বুঝতে হলে তার সময় বুঝতে হবে। সেই সময়ের তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাগুলো কেমন সাহসের সাথে তিনি ধারণ করেছেন সেটা লক্ষ করতে হবে। উনি পরবর্তী যে কাজগুলো করেছেন সেগুলো তো এক অর্থে সব উশৃঙ্খলতা। কিন্তু তোমার মনে রাখতে হবে, যেকোনো বিপ্লব মাত্রই একধরনের উশৃঙ্খলতা। আজকের পৃথিবীর যে হিসাবী, বৈষয়িক প্রজন্ম তাদের দিকে তাকিয়ে সেই প্রজন্মের মানুষগুলো একটা কোনো আদর্শের জন্য যেসব বেহিসাবী কাজগুলো করেছেন সেগুলোকে আমি সহানুভূতির সাথে দেখি। তাদের জীবন অনেক সিগনিফিকেন্ট মনে হয়। 

অঞ্জন আচার্য: আপনার মধ্যে কিন্তু কবি-সত্তা প্রবল। ‘কাঁঠালপাতা ও একটি মাটির ঢেলার গল্প’ এই গল্পের লাইনগুলো যদি একটার পর একটা সাজানো যায় তবে ভালো একটা কবিতা পেয়ে যাই। আপনি কি কবিতা লিখতেন বা লেখেন?
শাহাদুজ্জামান:  না কবিতা আমি সেভাবে লিখিনি কখনো। হ্যাঁ, ক্লাস নাইন-টেনে থাকতে একটু চেষ্টা করেছিলাম। তারপর আর কখনো লিখিনি। কিন্তু কবিতার আমি একেবারে পেটুক পাঠক। বাংলা সাহিত্যের মোটামুটি সব ধারার কবিতা আমি পড়ার চেষ্টা করেছি। এখনও নিয়মিত কবিতা পড়ি। এই গল্পটা আসলে একটা কবিতা দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা।

অঞ্জন আচার্য: আপনার একটি গল্পগ্রন্থের নাম ‘গল্প, অগল্প এবং না-গল্প’। এমন নামকরণের পেছনে কারণ কী? এর পেছনে কি কোনো সংশয় কাজ করেছে আপনার?
শাহাদুজ্জামান: বলতে পারো তাই।  আমি সেই বইয়ের ভূমিকায় সে কথা বলেছি। আমার অনেক গল্প প্রচলিত ধারার গল্প হয়তো বলা যাবে না। আমি বলেছি যে সাহিত্যের নানা শাখার ভেতরকার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলতে আমি পছন্দ করি। আমার গল্পের ভেতর প্রবন্ধ বা কবিতার উপাদানও আছে। আমার কোন কোন গল্পকে কেউ বলেছেন ডকু ফিকশন, কেউ মেটাফিকশন। আমার একটা এ্যান্টি ন্যারেটিভ গল্পের নাম ‘অগল্প’, যেটার কথা আগে বলেছি। তো এসব মিলিয়েই আমি আমার গল্পগুলোকে কোন বিশেষ তকমায় ফেলতে চাইনি বলে এ ধরনের একটা নাম দিয়েছি। এ লেখাগুলোকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন আমার আপত্তি নাই।

অঞ্জন আচার্য: আপনার গল্প-উপন্যাসের নায়করা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি দুর্বল। কেন? এটা কি আপনার ব্যক্তি আদর্শের প্রতিফলন?
শাহাদুজ্জামান: আমি যখন লেখালেখি শুরু করি তখন রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে আমি মার্ক্সবাদের অনুসারী ছিলাম। পৃথিবীব্যাপী যে ব্যাপক বৈষম্য তা নিরসনে মার্ক্সবাদী বিশ্ববীক্ষা একটা প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয় বলেই আমি মনে করি। তবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভাঙ্গনের ভেতর দিয়ে অনেক  নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজতান্ত্রিক দর্শনকে নতুন করে ভাবার আছে। একটা সাম্যবাদী সমাজের প্রতি আমার অবশ্যই দুর্বলতা আছে। তবে সেটা কীভাবে আসবে তা নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে কীভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করা যায় সেসব নিয়ে ভাবার আছে। নিও মাক্সিজম, সাব অলটার্ন ভাবনা এক্ষেত্রে আমাদের নতুন চিন্তার খোরাক দেয়। পুরনো সোভিয়েত ধারার সমাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই এখন আর।

অঞ্জন আচার্য: নিজের লেখা কোন গল্পে আপনার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি?
শাহাদুজ্জামান: এক অর্থে তো সব গল্পই নিজের সাথে কথা বলা। তবে একটা গল্পের কথা বিশেষ করে বলতে পারি- ‘শিং মাছ, লাল জেল’। ঐ গল্পটায় আসলে আমি বরং আমার এক বন্ধুর মানসিক অবস্থাটাই ধরতে চেয়েছি। সে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী ছিল। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়েনের পতন ঘটলে সে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার সেই মানসিক দ্বন্দ্বগুলোই ঐ গল্পে ধরবার চেষ্টা করেছি। সেখানে আমিও হয়তো আংশিকভাবে আছি।

অঞ্জন আচার্য: বইমেলায় আপনার নতুন কী কী বই পাচ্ছি?
শাহাদুজ্জামান: আমি জীবনানন্দ দাশের জীবনের ওপর ভিত্তি করে একটা উপন্যাস লেখার কাজ করছিলাম অনেকদিন ধরে, এবার সেটা শেষ হয়েছে এবং এবছর তা প্রকাশিত হবে। তবে বইমেলার সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হবে বলে মনে হয় না। বইমেলায় পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত হবে আমার ‘ভাষান্তর সমগ্র’, গদ্যপদ্য প্রকাশনী থেকে ‘নির্বচিত গল্প’ এবং চৈতন্য প্রকাশনী থেকে আমার চলচ্চিত্র-বিষয়ক লেখার সমগ্র ‘চলচ্চিত্র কথা’।



 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/তারা

Walton Laptop