ঢাকা, শনিবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৭ মে ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বাঙালির বইপড়া || আদনান সৈয়দ

আদনান সৈয়দ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-২৪ ২:৪৪:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৪ ২:৫৭:৪২ পিএম

বিষয়টা নতুন নয়। আজ থেকে অর্ধশত বছর আগেই সৈয়দ মুজতবা আলী তার ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোকপাত করেছেন। হায়! আজ এত বছর পরও বাঙালি যেন সে অপবাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি।

হিসেবের অংকে বাংলাদেশ আর নিউ ইয়র্ক খুব একটা ফারাক না। কে বলে আমাদের বাঙালি কিপটে স্বভাবের জাতি? কার বুকের পাটা আছে কথাটা বলার শুনি? কথাটা অন্যদেরককে বললে বলুন কিন্তু আমাদেরকে মোটেও বলবেন না। হাতে কোনোরকম কচকচা নোট চলে এলে এর সদব্যবহারের জন্য আমরা সবাই উঠেপরে লেগে যাই। রেস্তোরাঁয় বসে চা, সিঙ্গারা, ফুচকা অথবা ম্যানহাটনের স্টারবক্স কফিতে চুমুক দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে সময় পার করে দিতে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। এইসব বেহিসাবি আড্ডায় খরচ কিন্তু কম হয় না! যেমন ধরুন নিউ ইয়র্কে একটা বিগ ম্যাক কমবো অর্ডার দিলে পকেট থেকে চোখ বুজে আট ডলার খসে যাবে। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এর কোনো বাঙালি রেস্তোরাঁয় দুটো সিঙারা, এক কাপ চা এর মূল্য ৫ ডলার। তো? বাঙালিকে কি ফকিন্নি পেয়েছেন নাকি? তারা ৫ ডলার আর সেই সাথে ২ ডলার টিপস দিয়ে দাঁত খিলাই করতে কারতে রেস্তোরাঁ থেকে বীরদর্পে বের হয়ে আসেন।

কোনো খরচই বাঙালিকে আটকাতে পারে না, পারবে না। আর আনন্দ বিহারের কথা বলছেন? সেখানে টাকা কী কোনো বিষয়? তবে হ্যাঁ, খরচের বেলায় বাঙালি একটা জায়গায় খুব কৃপণ! যত কথাই বলেন, যতই তাদের পটান, যতই তাদের কানে কানে ভালো কথা বলেন না কেন তারা কিন্তু বই কিনবে না। বই এর গায়ে হাত দিলে তাদের হাতে যেন ফসকা পরে। সে কারণে বই কিনে দশ ডলার অথবা দুইশ টাকা ফালতু খরচ না করে বাঙালি সেই টাকা দিয়ে কেএফসি ফ্রাই চিকেন অথবা পিজায় দাঁত বসাবে। অথবা তিন ডলার দিয়ে কোনো সাহিত্য পত্রিকা না কিনে ৬ ডলার দিয়ে চা সিঙ্গারা সহযোগে বিপুল উৎসাহে রেস্তোরাঁয় বসে রাজনীতির গোষ্ঠী উদ্ধার করবে। তারপরও বই নামের বস্তুটাকে তারা ধরবে না। বিষয়টা সত্যি ভাবায়!

সেদিন জ্যাকসন হাইটস এর মুক্তধারা বইয়ের দোকানে বসে বসে একটা রগড় দেখছিলাম। ভদ্রলোক টেক্সাস থেকে নিউ ইয়র্কে বেড়াতে এসেছেন। বাঙালির নিউ ইয়র্ক দর্শন মানেই তাকে অবশ্যই জ্যাকসন হাইটস এর তাজা বাতাসের ঘ্রাণ নেওয়া চাই-ই চাই। আর জ্যাকসন হাইটস মানেই সেখানে মুক্তধারা নামের একটা বই এর দোকান। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ মুক্তধারায় বসে আমার সাথে কথা বললেন। নিউ ইয়র্কে কোথায় কোথায় ঘুরলেন, ১৫০ ডলার খরচ করে হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশে বসে ম্যানহাটন দেখেছেন সে সংবাদটাও দিতে ভুললেন না। হঠাৎ তার মানে হল আরে তাইতো! মুক্তধারা থেকে কিছু বই কিনে নিলে কেমন হয়? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি বই এর একটা ছোট খাট স্তুপ করে সাজাতে লাগলেন। আমি সে দৃশ্য আড় চোখে দেখি আর প্রমাদ গুণি। যাক বাবা! বাঙালিরা বইমুখী হচ্ছে দেখছি!! ভদ্রলোকের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় নত হয়ে গেলাম। কিন্তু হায়! বিধাতা হয়তো আমার দিকে চেয়ে ঠিক মুচকি হাসছিলেন? পনের কুড়িটা বই দাম সম্ভবত ১২০ ডলার হয়েছিল। বাঙালি ভদ্রলোকটি এবার বেঁকে বসলেন। দাম শুনে খাই খাই করে চেঁচিয়ে উঠলেন! ‘কেন ভাই! এত দাম ক্যান? ডলার কি পানিতে ভাইসা আইছে নাকি? ৫০ ডলারে দিবেন কিনা কন?’ মনে হল তিনি যেন আলু পটলের দোকানে ঢুকে দোকানীর সঙ্গে  দামাদামি করছেন। অথচ এই কিছুক্ষণ আগেও তিনি কত সুন্দর করেই না তার খরচের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। জানি মুক্তধারা থেকে বের হয়ে তিনি হয়তো তার বিবি বাচ্চাসহ ৮০ ডলার খরচ করে কাচ্চি বিরিয়ানি খাবেন। কিন্তু ২০ ডলার দিয়ে দুটো বই কিনতে গেলেই জীবনে অন্ধকার নেমে আসবে। তখন টাকা পয়সার ঝুট ঝামেলার ফিরিস্তি আপনিতেই ঠোঁটে জায়গা করে নেয়।

আবার বলি। জানি বিষয়টা নতুন না। বাঙালি বই সহজে কেনে না বা কিনতে চায় না। তারা মনে করে টাকা দিয়ে বই কেনার কোনো মানে হয় না। মাগনা দিলে না হয় একটা কথা! বেশ ভালো করেই জানি ‘বাঙালি নাকি মাগনায় আলকাতরাও ছাড়ে না’। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়াল? আমরা কি তাহালে সারাজীবন বইবিমুখ হয়েই কাটিয়ে দেব?

বেশ মনে পড়ে। ছেলেবেলায় যখন বাংলা ভাষায় অক্ষরগুলো পড়তে শিখেছি ঠিক তখনই আমার বড় মামা সৈয়দ ইরফানুল বারী আমার জন্যে দুটো অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকা দুটো বই কিনে এনেছিলেন। একটি ছিল ম্যাক্সিম গোর্কির ‘চড়ুইছানা’ আরেকটি ছিল আলেক্সান্দর রাক্সিন এর ‘বাবা যখন ছোট’। আহা! ছেলেবেলার সেই অনুভূতি কী কখনো ভোলা যায়? ছেলেবেলায় আমরা উপহার হিসেবে সবসময় বই নামক বস্তুটাকেই হাতে পেয়েছি। জন্মদিন মানেই কারো স্বাক্ষরসহ জন্মদিনের উপহারস্বরূপ একটি বই। আর সেই বইয়ের জন্যে কত রকম ভালোবাসা, কতই না আবেগ! এখন দেখি এক অদ্ভুত কাণ্ড! ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের হাতে দিব্যি নোটবুক, কিন্ডেল, টেবলেট ঘুড়ে বেড়ায় অথচ বই নামক বস্তুটি দেখি না। কেউ নতুন একটা বই পড়ে তা নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনায় বসে না। বন্ধুরা এখন আর একে অপরের বই চুড়ি করে ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা বাড়ায় না। কবি শহীদ কাদরী সেদিন কথায় কথায় বলছিলেন কীভাবে তারা বন্ধুদের বাড়ি থেকে কায়দা করে বই চুরি করতেন। সেই যুগ কি তাহলে সত্যি সত্যি গত? 

জানি অনেকেই বলবেন কথাটা। ‘যুগের একটা দাবি আছে না? যুগের সাথে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে না?’ মানলাম কথাটা। কিন্তু যুগের এই দাবি কী শুধু বাঙালি মুলকেই আটকে রয়েছে? উন্নত বিশ্বের অন্যান্য শহরে তো দেখি বইয়ের দোকানগুলোতে অথবা পাড়ার পাঠাগারগুলোতে আম জনতা সবাই বইয়ের ওপর নাক ঝুলিয়ে গভীর মনযোগে বসে আছেন। কোথায়! তারা কেউইতো যুগের কক্ষপথচূত্য হননি!

সেদিন নিউ ইয়র্কের স্ট্রান্ড বুক স্টোরের ঢুকতেই নাক বরাবর একটি পোস্টার চোখের সামনে চোখে পড়ল। বই না কিনে অন্যান্য বেহুদা খরচে যারা সিদ্ধহস্ত তাদেরকে বইমুখী করার জন্যই এই পোস্টার। ভেবে দেখলাম বিষয়টা খারাপ না। কীভাবে বইকে কাছে টেনে নিবেন? কেন অন্যান্য খরচ কাটছাট করে হলেও বই কেনাটা জরুরি সেই পোস্টারে তার সুন্দর বর্ণনা করা হয়েছে। চলুন দেখা যাক কি আছে সেই পোস্টারে।

এক. আপনাকে জোর করে দস্তয়ভস্কি বা জ্যাক দেরিদা অথবা অস্কার ওয়াইল্ড পড়তে হবে কে বলেছে? আপনি খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন কোন বিষয়ে আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানে। আপনি খেলাধুলা পছন্দ করেন? গান-বাজনা অথবা পোকা মাকড়? কোনো সমস্যা নেই। যে বিষয় আপনি ভালোবাসেন সেই বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে আপনি আপনার বাড়ির কাছেই কোনো বইয়ের দোকানে ঢু দিন। আর বইয়ের দোকানে গেলেই যে আপনাকে বই কিনতে হবে তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। বইটা ধরুন, এর ঘ্রাণ নিন, প্রচ্ছদটা দেখুন, আপনার আশেপাশে মানুষদের সাথে কথা বলুন। দেখবেন মন্দ লাগবে না। এটাই হবে আপনার প্রথম পাঠ।

দুই. আপনার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্থানীয় কোনো বইয়ের দোকানে ঢু দিন। তাদের বই দেখতে দিন, বই নিয়ে কথা বলতে দিন, বই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে দিন। মনে রাখবেন আপনার সন্তান যে বইটি ভালোবাসে সেই বইটির বিষয়বস্তু আপনার ভালো না লাগলেও সেই বইটিই তাকে কিনে দিন। সন্তানের ইচ্ছার প্রাধান্য দিন। বইয়ের প্রতি কোনোরকম বিরুপ মনোভাব তার ভেতর যেন তৈরি না হয় সে বিষয়ে চোখ রাখুন।

তিন. মুদ্রিত বইয়ের চেহারা দেখলে আপনার কান্না পায়? বিষাদে মনটা ভরে উঠে? এই নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনি মুদ্রিত বইয়ের দিকে একেবারে যাবেনই না। তারচেয়ে যেসব বইপুস্তক অডিও বা ভিডিওতে পাওয়া যায় সেদিকে চোখ রাখলে কেমন হয়? এই যেমন ধরুন ই-বুক, কিনডেল বা আইপেড। মনে রাখতে হবে আপনাকে যে বিষয় সবচেয়ে বেশি কাছে টানে আপনি সেদিকেই ঝুঁকবেন। বই পড়াটাকে সম্পূর্ণভাবে বিনোদন হিসেবে নিবেন। বই পড়ে আপনি মহাজ্ঞাণী কিছু হবেন সে বিষয় নিয়ে একেবারেই ভাববেন না।

চার. ঘরে পড়ার একটা পরিবেশ তৈরি করুন। নিজেই ছোট খাট একটা লাইব্রেরি তৈরি করুন। পড়ার পরিবেশ তৈরি করার জন্যে নিজের বসার ঘরটায় সুন্দর একটা চেয়ার এবং সাথে টেবিল রাখুন। টেবিলে কিছু তাজা ফুল রাখতে ভুলবেন না। যে পরিবেশ আপনি পছন্দ করুন সেই পরিবেশে বইয়ের সাথে সময় কাটান। দেখবেন বইয়ের সাথে আপনার একটি সখ্যতা গড়ে উঠেছে।

পাঁচ. এত হিসেবি হবেন না। এলোমেলো হতে শিখুন। ধরা যাক পড়তে হলেই পরিবেশ চুপচাপ থাকতে হবে কে বলেছে? মাঝেমধ্যে জীবনের বিপরীত স্রোতে হাঁটতে হয়। আপনিও হাঁটুন। পড়ার টেবিলে আপনার সন্তানদের নিমন্ত্রণ করুন। তাদের সাথে অহেতুক আড্ডায় মেতে উঠুন। পড়তে বসলেই সুবোধ বালকটি হতে হবে এই ধারণা থেকে নিজেকে মুক্তি দিন। একটু দুষ্ট হলে দোষের কিছু না।

ছয়. হাতিটাকে পোষ মানাতে শিখুন। আপনার ঘরে আপনার অজান্তেই যে হাতির মত বিশাল আকাড়ের একটি পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠছে তাকে ধীরে ধীরে বড় হতে দিন।

আমি বিনয়ের সাথে আপনাদের সামনে একটা প্রস্তাব পেশ করতে চাই। জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস, ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস, বিবাহবার্ষিকী দিবস, বেবি শাওয়ার দিবস, ঈদ, পূঁজা, বড়দিন বাঙালির যত দিবস আছে প্রত্যেকটা দিবসে চলুন বই উপহার দেই। বাসায় মিষ্টি আনবেন না। মেয়েকে চকলেট খাওয়ান ক্ষতি নেই তবে এর পাশাপাশি তাকে একটা বই উপহার দিন। একটা বই মানেই একটা নতুন পৃথিবী আপনি তার সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। আপনি নিজেও সেই বাসিন্দা হতে পারেন। এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/সাইফ

Walton Laptop