ঢাকা, শুক্রবার, ৫ শ্রাবণ ১৪২৪, ২১ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আরো কিছু দেয়ার ছিল, যা আমি করিনি : হেলাল হাফিজ

জব্বার আল নাঈম : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৪ ৭:৩৫:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-০৫ ৮:১৫:৫৩ এএম

সমকালীন বাংলা কবিতায় হেলাল হাফিজ এক রাজকুমারের নাম। প্রতিবাদ ও প্রেম, দ্রোহ আর বিরহের এই কবি অকল্পনীয় নৈপুণ্য ও মমতায় শব্দের মালা গেঁথে কবিতাপ্রেমী মানুষকে অনির্বচনীয় আমোদ দিয়ে চলেছেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি পাইয়ে দেয়। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'- এই অমর পঙ্‌ক্তিযুগল তাঁর পাণ্ডুলিপি থেকে উঠে আসে মিছিলে, স্লোগানে আর দেয়ালে দেয়ালে। বিস্ময়ের বিষয় হেলাল হাফিজের কবিতা ব্যতীত প্রেম যেন অসম্পূর্ণ। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় এই কবির প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রীত এই কাব্যগ্রন্থ তাঁকে এনে দেয় তুঙ্গস্পর্শী কবিখ্যাতি আর ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তা। অল্প লিখেও হেলাল হাফিজ গল্প হয়েছেন। নিজের কবিতার মতোই রহস্যাবৃত তার যাপিত জীবন। কবির রচিত মমতা জড়ানো মর্মস্পর্শী পঙ্‌ক্তিমালা, রূপকথার এই মানুষটিকে সত্যিই আজ কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। এই কবির মুখোমুখি হয়েছেন আরেক তরুণ কবি জব্বার আল নাঈম। পড়ুন দুই প্রজন্মের দুই কবির কথোপকথনের দ্বিতীয় পর্ব।

জব্বার আল নাঈম: আপনার বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। বইটির প্রকাশের গল্প শুনতে চাই।
হেলাল হাফিজ:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বইটি প্রকাশিত হয় ‘অনিন্দ্য প্রকাশ’ হতে। বর্তমান যে অনিন্দ্য আছে সেখানে নয়। আমাকে ধরল বইটি প্রকাশ করার জন্য। সেদিন সঙ্গে এসেছিল নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আহমেদ ও সালেহ চৌধুরী। এই তিনজন এসে আমাকে বলল যে, কবি তোমার বইটি অনিন্দ্যকে দিতে হবে। সে বছর অনিন্দ্য হতে তিনটি বই প্রকাশিত হয়। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ আর আমার। আমার মতে, ইট ওয়াজ টক অব দ্য ক্যান্ট্রি। একটা কবিতার বই যে এমন আলোচিত হতে পারে এটা মানুষের ভাবনার মধ্যে ছিল না। বইটির বৈধভাবে ২৬তম এডিশন বাজারে আছে। এই ঘটনা রেয়ার।

জব্বার আল নাঈম: একটি মাত্র কবিতার বই এত পাঠক পড়ছেন, এডিশন হচ্ছে- মানে সেই কবি জীবন্ত কিংবদন্তী?
হেলাল হাফিজ:
বলা যেতে পারে। আমি সেই সৌভাগ্যবান কবি। বাংলা সাহিত্যে এমন নজির আর নেই। পাইরেসিও হয়েছে অসংখ্য। হেলাল হাফিজের কবিতা বাংলা ভাষার সাহিত্যচর্চা যারা করেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকের ঘরে আছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিয়েছে কিংবা যারা বিপ্লবী রাজনীতির সাথে জড়িত তারাও নিয়েছেন। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কবির বই এত আনাচে-কানাচে আছে কিনা সন্দেহ।

জব্বার আল নাঈম: এতটা পাঠকপ্রিয় হয়েও গত ত্রিশ বছরে আপনার দ্বিতীয় বই নেই। এর কি বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে?
হেলাল হাফিজ:
ত্রিশ বছর হয়ে গেল প্রায়ই আমাকে বিভিন্ন জনের মুখে এ প্রশ্ন শুনতে হয়। কথা হলো, প্রথম বইয়ের পর মানুষের প্রত্যাশা আমার কাছে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। আমাকে আরো ভালো কিছু লিখতে হবে এই তাড়না আমার ভেতরে কাজ করে। গত তিন বছর আমি ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছি, আগামী বছর দ্বিতীয় নতুন বই করব। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তা হয়ে উঠছে না। আবার টুকটাক কিছু টিভি অনুষ্ঠান করার কারণেও ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। আমার দ্বিতীয় বইটি তো প্রথমটির চেয়ে ভালো না হোক, কাছাকাছি রাখতে হবে। সেটা যদি না পারি আমি কেন লিখব? তারপরও আমি মোটামুটি একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। কিন্তু কিছুতেই আমি তৃপ্ত হতে পারছি না।

জব্বার আল নাঈম: আপনার দ্বিতীয় বই কী ধরনের কবিতা দিয়ে সাজানোর পরিকল্পনা করেছেন?
হেলাল হাফিজ:
আমার পাণ্ডুলিপির নাম ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। নাম শুনেই বুঝতে পারো। এখানে থাকবে মানবিক বোধের কবিতা, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা। এই অঞ্চলের মানুষ তো প্রেমপরায়ণ। প্রেম প্রাধান্য দিতেই হবে। এসব নিয়েই প্রতিনিয়ত ভাবছি। আশা রাখি ১৮ সালে বইমেলায় কিংবা তার পরে বই করার পরিকল্পনা আছে।শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। চোখে সমস্যা হচ্ছে।

জব্বার আল নাঈম: বাংলা একাডেমি আপনাকে সম্মাননা জানাল। পুরস্কার...
হেলাল হাফিজ
: সেই টাকা আমি চোখের অপারেশনে দিয়েছি। ছানি অপারেশন করেছি। দুচোখেই অপারেশন হয়েছে। সেই অপারেশনের পর বাম চোখে গ্লুকোমা হয়েছে। তোমার উল্লেখ করে দিও, গত এক বছর কবি শারীরিক সমস্যার কারণে লেখালেখি করতে পারেন না।

জব্বার আল নাঈম: এই যে দীর্ঘ বিরতি। আপনার মনে হয় না, আপনি পাঠককে ঠকিয়েছেন?
হেলাল হাফিজ:
এ জন্য আমি নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করি। আমি আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারিনি। অপরাধবোধ কাজ করে। হেলায় অনেক সময় নষ্ট করেছি। পাঠককে আমার আরো কিছু দেয়ার ছিল, যা আমি করিনি। আমি নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি। এ জন্য আমি লজ্জিত, দুঃখিত ও মর্মাহত। একজন লেখকের যে সব লেখা সমান হবে তেমন নয়। সম্ভবও না। আমার অন্তত পনেরটি বই থাকার কথা ছিল। এ জন্য দায়ী তোমরাও কম না। তোমরা যদি আমাকে এত বেশি ভালো না বাসতে আমি চাপ নিতাম না। তোমাদের দেয়া চাপ সহ্য করতে না পেরে আমার এই অপেক্ষা (হাসি)। এখন লিখতে বসলে হাত কাঁপে। ভয় লাগে-‘যে জলে আগুন জ্বলে’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব তো?

জব্বার আল নাঈম: ‘কবিতা একাত্তর’ বইটির নাম না বলার কারণ কী?
হেলাল হাফিজ:
সেটি এক অর্থে আমার নতুন বই নয়। ৫৬টি কবিতার সাথে নতুন ১৫টি কবিতা সংযোগ করে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। ওইটা কোনো অর্থেই মৌলিক বই নয়। দেখো, একটা ইংরেজি অনুবাদ বই মুড়ির মতো বিক্রি হচ্ছে। এখানে একটা কথা আছে। প্রকাশক আমার সাথে মনে হয় প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। আমি ব্যাপারটি যদিও প্রথমে বুঝতে পারিনি। আমার একটা বই বেরিয়েছে, সেখানে পাঠক ঝাপিয়ে পড়েছে। কিনে দেখে আরে, এ তো পুরাতন কবিতার সাথে নতুন ১৫টি কবিতা। পাঠক খুব হতাশ হয়েছে। ব্যাপারটি আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি।

জব্বার আল নাঈম: যদি বলি, আপনি দীর্ঘ ২৫ বছর স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। কারণটা কী ছিল?
হেলাল হাফিজ:
এটা একটা টোটাল কারণ। এর মধ্যে দুই একটা বলি, তোমরা প্রকাশ করতে পারো। কিছু ব্যক্তিগত অভিমান, ব্যক্তিগত কিছু পরাজয়, কিছু না পাওয়া। আরেকটা হলো, আমি তো আবার এত প্রতিভাবান কবি না যে চাইলেই কবিতা লিখতে পারি। আমি খুব ঘষেমেজে কবিতা লিখতাম। এতে আমার অনেক সময় লেগে যেত। চাইলেই কবিতা হয়ে যেত না। আর আমি খুব জুয়া খেলতাম। গ্যাম্বলিং ওয়াজ মাই প্রফেশন। আমি স্পোর্টস হিসেবে খেলি না। আমি খেলেছি জীবিকার জন্য। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বের হওয়ার পর আমারও কিউরিসিটি হয় এটা নিয়ে গ্যাম্বলিং করার। আড়ালে গিয়ে দেখি, আমি যে দিন মারা যাব পাঠক আমাকে ভুলে যাবে কিনা? এই অবজারভেশন থেকে আমার আড়াল হওয়া। নিজের কাছে নিজেকে লুকিয়ে রাখা। এর ফলে ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে একেবারে নিজেকে লুকিয়ে নিলাম। কেউ আমাকে এই ঢাকা শহরে কোথাও দেখে না। কাগজে আমার লেখা নেই। কোনো টিভি অনুষ্ঠানে নেই। তখন মোবাইলও ছিল না। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেছিল আমি মরে গেছি। কেউ কেউ ভাবত আমি বিদেশ চলে গেছি। একমাত্র তারা জানত যারা ঐ সময়ে প্রেসক্লাবে আসত। তারা আমাকে প্রায় দেখত। তারা জানত আমি লেখালেখি করি না, ছেড়ে দিয়েছি। আসলে আমি সারাদিন জুয়া খেলতাম। আবার পালিয়ে থাকাটাও জুয়া খেলার মতো। এই ২৫ বছর আড়ালে থাকলেও কারা কী লিখছে, আমার কবিতা নিয়ে কার কী মন্তব্য, আমাকে নিয়ে কারা আলোচনা করছে তার সবই আমি দেখতাম বা জানতাম। গোপনে গোপনে খোঁজ রেখেছি। দেখে আমার বোধ হলো, আমি যখন মারা যাব একেবারে রাতারাতি মানুষ আমাকে ভুলে যাবে না। কিছুকাল অন্তত মনে রাখবে।

জব্বার আল নাঈম: আপনি নিজেই বলেছেন, আমি কবিতা ছাড়তে চাইলেও কবিতা আমাকে ছাড়েনি। কিন্তু স্বেচ্ছানির্বাসনে গেলেন, কবিতা লিখলেন না- ব্যপারটি আপনার বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা?
হেলাল হাফিজ:
আমি কবিতা লিখিনি ঠিক কিন্তু আমি কি কবিতা ছেড়ে গিয়েছি? আমি তো কবিতা ছাড়িনি। আর লিখি না; এ জন্য আমার ভেতরে অনুশোচনা কাজ করে- কিছুক্ষণ আগেও বলেছি। এটা খুবই অন্যায় হয়েছে। এখন বাকি পরমায়ু যতটা পাব সেটা কাজে লাগানো। কবিতার পেছনে দেয়া। আরেকটি কথা, আমি মনে মনে এক ধরনের হোমওয়ার্ক করছি। একটা পরিকল্পনা আছে আত্মজীবনী লেখার। খুবই হৃদয়গ্রাহী হবে। কারণ আমি সেখানে কিছুই হাইড করব না। হাইড করার ইচ্ছে নেই।

জব্বার আল নাঈম: তার মানে সেখানে হেলেন, হিরণবালা, রানা, সবিতা সেন তারা আসবে।
হেলাল হাফিজ:
সব আসবে। আমার জুয়া খেলাও আসবে। সমাজে নারী পতিতা আছে শুধু তাই নয়, আমি পুরুষ বেশ্যা ছিলাম। আমার সেই কথাও আসবে। সমকামিতার কথা আসবে। একটা সময় সমকামিতা আমার খুব পছন্দ ছিল। আমি সেসবও নিয়ে আসব। আমার অপরাধবোধ থাকবে। প্রেমের কথা থাকবে। বিরহ থাকবে। কিছুই বাদ দেব না। আমার জীবনে যে ছোটখাটো কিছু অন্যায় বা ত্রুটি আছে সেসবও নিয়ে আসব।

জব্বার আল নাঈম: আপনি পুরুষ বেশ্যার কথা বলছিলেন। সমকামিতার কথা বলছিলেন। আপনার লেখার কারণে তরুণ সমাজ যদি উৎসাহিত হয় এগুলোর প্রতি তার দায় আপনার ওপর বর্তাবে না?
হেলাল হাফিজ:
আমি একথা বলছি যে, এটা লিখব আত্মজীবনীতে। আসলে আমি প্রেমের ব্যাপারে খুব উদাসীন। প্রেমের তো দুইটি বিষয় আছে। এর একটি হলো জৈবিক, আরেকটি দেহ ছাড়াও প্রেম আছে। তাই না? মানে ফ্রয়েডকে বাদ দিয়েও প্রেম একটা অংশ। আছে না? এখন একজন তরুণ প্রেমকে বাদ দিতে পারবে না। আমি আমার নৈতিক অবস্থান থেকে বলব, এটা তুমি চাইলে কোডও করতে পারো- আমার আপত্তি নেই।

জব্বার আল নাঈম: আপনার কথাগুলো রেকর্ডিং হচ্ছে আপনি বলতে পারেন।
হেলাল হাফিজ:
দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ উভয়ের সম্মতিতে যে কোনো কাজ করতে পারবে। উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে। দুজন পুরুষ হতে পারে অথবা একজন পুরুষ একজন নারী হতে পারে। আবার দুজন নারীও হতে পারে। এখানে একটি মাত্র কন্ডিশন- দুজনের সম্মতি লাগবে। একজনের সম্মতি থাকবে, আরেকজনের থাকবে না তাহলে হবে না। তখন এটা ধর্ষণে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। তা করা যাবে না। আচ্ছা, এ বিষয়ে আমি  আত্মজীবনীতে বিস্তারিত লিখব। তখন পাবে।

জব্বার আল নাঈম: আপনার প্রেম ও রোমান্স সম্পর্কে জানতে চাই।
হেলাল হাফিজ:
আমার কবিতায় আছে সবিতা সেন, হেলেন, রানা। এগুলোর কেউ কাল্পনিক নয়। এরা সবাই বাস্তব। রক্ত মাংসের মানুষ। সেখানে সবিতা সেন হলেন আমার প্রথম এবং অসম প্রেম। তিনি আমার চেয়ে বারো বছরের বড়। আমরা একই শহরের থাকতাম। তিনি খুব রূপসী এবং বিদূষী মহিলা ছিলেন। খুব ছোটবেলায় আমার মা মারা গেছেন তা তো জানো। তাকে দেখলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ত। তিনি তা বুঝতে পেরে আমাকে অসম্ভব রকমের আদর করতেন। তিনি ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। যেহেতু আমার বাবা খুব নামকরা শিক্ষক ছিলেন; ডাকসাইটে, সে হিসেবেও তিনি আমাকে আদর করতেন। কিন্তু তার প্রতি আমার আস্তে আস্তে মোহ কাজ করতে থাকে। তার এক ছোট ভাই ছিল আমার ক্লাস ফ্রেন্ড। তখন আমি ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়ি। তখন তার সাথে আমার নিবিড় সখ্য গড়ে উঠে। স্কুল থেকে ফিরে বই রেখে তার কাছে ছুটতাম। গিয়ে দেখি সে তখনও হয়ত আসেনি। তখন মন খারাপ হতো। মাঠের পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। রাস্তা দিয়ে যখন দিদিকে যেতে দেখতাম তখন আমি দৌড় দিতাম। দেখা যেত তিনি বাসায় নাড়ু বানাচ্ছেন। ভাইকে দিয়ে আমাকে খবর পাঠাতেন- যা হেলালকে বলে আয়। আসলে তখন ছিল আমাদের বয়ঃসন্ধিকাল।

জব্বার আল নাঈম: হেলেন কে ছিলেন?
হেলাল হাফিজ:
ফোর, ফাইভ, সিক্স, সেভেন। সেভেনে যখন আমি পড়ি তখন হেলেনের সাথে আমার সম্পর্ক হয়। হেলেন ছিল আমার সমবয়সী। তখন সবিতা সেনকে আমি দ্বৈত ভূমিকায় আবিষ্কার করি। তার প্রতি এক ধরনের কাম জাগে। অর্থাৎ মানুষের যে জৈবিক তাড়না, মানে ফ্রয়েড আমার মাথায়। যদিও তখন আমি ফ্রয়েডের নাম জানি না। হেলেনের চেয়েও তখন আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল সবিতা সেন। সবিতা সেন তখন আমার কাছে শুধু মা নন। প্রেমিকাও। তার প্রতি অদ্ভুত একটা মোহ কাজ করতে থাকে। ছোটবেলা যখন তার কাছে যেতাম তখন কোলে নিয়ে নাড়ু খাওয়াতেন, মাথার চুল আচড়ে দিতেন। আমার চেহারা তখন খুব সুন্দর ছিল- দুধে আলতা। আমার দিকে তাকালে তখন কেউ চোখ ফিরিয়ে নিতে পারত না। তো এখন আমি বুঝি যার সঙ্গে প্রেম তার সঙ্গে পরিণয় হয় না। এখন আমি বুঝি, ছেলেবেলায় যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন তিনি আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। কাছে ডেকেছেন। তারও তো দরকার। আমার চেয়ে মাত্র বারো বছরের বড় যুবতী। বেশি বয়স আর কই?

জব্বার আল নাঈম: মেয়েদের যৌবন চল্লিশ পর্যন্ত থাকে।
হেলাল হাফিজ:
তখন সবিতা সেনের বয়স চল্লিশ হয়নি। তারও কম। আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি, তখন নেত্রকোনা শহরের সবাই জেনে গেছে হেলাল দুটো প্রেম করে। একটি সবিতা সেন, আরেকটি হেলেনের সঙ্গে। এটা আমাদের পিতৃতুল্য যারা তারা জেনে গেছে, বন্ধুরা জেনে গেছে, নেত্রকোনার সব নারী জেনে গেছে, আমার সব বন্ধু জেনে গেছে। সবিতা দিদির স্কুলের সবাই জানে, আমার স্কুল কলেজের সবাই জানে। মানে এটা একটা মহা আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাবাকে সবাই ‘পাগড়িওয়ালা স্যার’ বলে ডাকতেন। বাবার কারণে আমাকে তেমন কেউ কিছু বলতে পারত না। এরপর ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা চলে আসি। ঢাকায় আসার পর থেকে যোগাযোগ কমতে থাকে। তখন ল্যান্ড ফোনের যুগ কিন্তু আমার বা সবিতা কারো বাসায় তা ছিল না।

জব্বার আল নাঈম: তাহলে প্রেম করতেন কীভাবে?
হেলাল হাফিজ:
চিঠির মাধ্যমে। একমাত্র বাহন ছিল চিঠি। চিঠি লিখতেও ভয় পেতাম। কার হাতে গিয়ে পরে। তখনকার সমাজ কনজারভেটিভ ছিল। এই ভয়ে চিঠি লিখতামও কম। এই হলো আমার প্রথম প্রেম।

জব্বার আল নাঈম: গত এক বা দুই বছর আগে এক নারী কবি তার প্রকাশিত বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘আমিই হেলেন’। এই হেলেন কে?
হেলাল হাফিজ:
হ্যাঁ, আমি জানি। আমি তাকে চিনি। নাম শামসুন্নাহার রহমান। সে আমার বই থেকেই নামটি নিয়েছে। আমার সাথে কথাও হয় মাঝে মাঝে। দেখাও হয়েছে। তবে কবিতার বিষয়বস্তু তার। সে মোটিভেট হয়ে নামটি নিয়েছে। আসলে আমার নারীভাগ্য খুব ভালো। (আগামী পর্বে সমাপ্য)



 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ মার্চ ২০১৭/তারা

Walton Laptop