ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প : বধ্যভূমি

সোহরাব শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২৫ ৪:২৭:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২৫ ৪:৩২:১১ পিএম
আলোকচিত্র: সংগৃহীত

|| সোহরাব শান্ত ||

প্রিয়তোষ রায় ভয় পেয়েছেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই পায়ের ফাঁক গলে যেভাবে কিছু একটা দৌঁড়ে গেল, কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিল সত্যিই ভূতের কবলে পড়েছেন তিনি। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বুকে দু’বার থুতু ছিটিয়েছেন। অস্ফুট স্বরে রাম নাম জপেছেন। শরীরের কাঁপুনি থামতে একটু সময় লেগেছে। আশি ছুঁই ছুঁই মানুষটার এমন হওয়া একেবারে অস্বাভাবিক নয়।

সন্ধ্যার পর হাইস্কুলের ছোট মাঠটার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্য নতুন নয়। মাঝে মাঝে এখানে আসেন তিনি। অনেকটা সময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। স্কুলের উত্তর পাশে রাস্তা। এরপরই বিরাট ফসলী মাঠের শুরু। মাইলের পর মাইল শুধু ফসলী জমি। দিনের বেলা এখানে দাঁড়ালে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। রাতেও দেখা যায়। চাঁদনী রাতে খুব ভালো লাগে। কী মনোরম সেই দৃশ্য! এই দৃশ্য দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টার কাটিয়ে দেওয়া যায়।

ফসলের মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরে একটা-দুইটা গ্রাম দেখা যায়। দিনের বেলা তাকালে মনে হয় কুয়াশাচ্ছন্ন। আবছা দেখা যায়। অবশ্য ওই গ্রামগুলোতে নতুন কোনো ঘর উঠলে, সূর্যের কিরণে চিক চিক করে ওঠে। এত দূর থেকে তাকালেও চোখ ধরে আসে। রাতের বেলা এমন মনে হয় না। চাঁদের আলো পড়ে গ্রামগুলোকে মনে হয় ধূসর রঙের চাদর। আর নতুন ওঠা ঘরগুলোর টিনের চাল মনে হয় চাদরের ছেঁড়া অংশ!

প্রিয়তোষ রায় নিজের গায়ে জড়ানো চাদরটায় একবার হাত বুলালেন। মুচকি হাসলেন। একটু আগে খুব ভয় পেয়েছিলেন বলেই কিনা, হাসি পেল বলে নিজেকে বোকা বোকা লাগছে। চারদিকে তাঁকালেন। না কেউ দেখে নি! আজ ভয় পাওয়ার ঘটনাটা না ঘটলে তিনি আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেন। স্কুলের উত্তর-পশ্চিম পাশের টিলায় বসতেন। ওখানে গ্রামের বধ্যভূমি। কৃষ্ণপুর বধ্যভূমি। প্রতিবছর বিজয় দিবসের আগের রাতে ওখানে একা একা বসে থাকেন প্রিয়তোষ। নিজের পেটের যে অংশটায় গুলি লাগার ক্ষত, সেখানে আনমনে হাত বুলান। হারিয়ে যাওয়া বন্ধু-স্বজনদের কথা মনে করেন। গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকেন।

১৯৭১ সালে সংগ্রামের সময় এই গ্রামে ১২৭ জন পুরুষকে লাইন ধরে গুলি করে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনারা। সঙ্গে ছিল আশপাশের এলাকার রাজাকাররা। ওরা গ্রামের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়। লুটপাট করে। গণহত্যার শিকার শহীদদের স্মরণে এই বধ্যভূমি। এখানে একটা স্মৃতিসৌধও তৈরি করা হচ্ছে। তিন-চার বছর ধরেই কাজ থমকে আছে। কবে শেষ হবে কে জানে!

আনুষ্ঠানিকভাবে ওই টিলাটিকে বধ্যভূমি বলা হয় বটে কিন্তু প্রিয়তোষ রায় জানেন এ গ্রামে দুইটা বধ্যভুমি আছে। স্কুলের পেছনে; দক্ষিণ-পশ্চিমে নৃপেন রায়দের উঁচু পাচিলঘেরা বাড়িটাও বধ্যভূমি। ১২৭ জনের বেশিরভাগ মানুষকে ওই বাড়িতে লাইন ধরিয়ে গুলি করে মারা হয়েছে। প্রিয়তোষ রায় যেখানে বসে আছেন, এই জায়গাটাও বধ্যভূমি। এখানে কিছু মানুষকে একসঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছিল। সব ঘটেছিল তার সামনেই। তখন এই স্কুল ছিল না। জায়গাটা খোলা মাঠ ছিল।

দিনটা ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর। সেদিন সকালে গ্রামবাসী একত্রিত হয়েছিল। মহালয়ার দিন। আর পনেরো দিন পরেই দূর্গাপূজা। অন্যান্য বছরের মতো উৎসব উৎসব ভাব নেই। সবার মনে ভয়, কখন না জানি পাঞ্জাবিরা এসে পড়ে। সেবার দূর্গাপূজার আয়োজন হবে কিনা, এ নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা। সকালবেলা এ নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। গ্রামভর্তী দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিভিন্নজনের আত্মীয়-স্বজন। প্রিয়তোষ রায়ের নিজের বোনও স্বামী-সন্তানসহ চলে এসেছে।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম-বাঙ্গালপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের গোয়ালনগরের ভিটাডুবি, সুনামগঞ্জের আজমীরিগঞ্জসহ হাওর অধ্যূষিত বিভিন্ন গ্রামের আত্মীয়-স্বজনরা গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছে। বাঙালি পরিবার কুটুম্বের আগমনকে বরাবরই শুভ লক্ষণ জেনে এসেছে। এবারের বিষয়টা তা নয়। সবাই বিপদে। বিশেষত প্রিয়তোষদের মতো হিন্দুরা ভয়ানক বিপদে। নির্বিচারে হিন্দুদের গুলি করে মারছে পাকিস্তানি হানাদার সেনারা। তাদের চেয়ে দ্বিগুন উৎসাহে হিন্দু নিধনে নেমেছে এ দেশের কিছু কুলাঙ্গার। তারা মুখে বলে ইসলাম রক্ষায় কাজ করছে, আসলে তারা যা করছে তার সবই ইসলাম ধর্মের নীতি বিরুদ্ধে। হিন্দু বাড়িগুলোতে লুটপাট করে আগুন দিচ্ছে। কিশোরী-যুবতীদের ধরে নিয়ে দিয়ে আসছে পাকিস্তানি বর্বর সেনাদের ক্যাম্পে। সুযোগ পেলে নিজেরাও মেতে উঠছে আদিম আনন্দে। যেসব মুসলমান হিন্দুদের পক্ষ নিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে তাদেরকেও অত্যাচার করছে রাজাকাররা। প্রিয়তোষ রায়রা প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও সব খবর পাচ্ছে। দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজন যেভাবে আশ্রয়ের খোঁজে আসছে, তাতে এসব খবর মিথ্যে ভেবে উড়িয়ে দেয়া যায় না।  

গ্রামের বেশ কয়েকজন যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতে ট্রেইনিংয়ে চলে গেছে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্রিয়তোষ রায়ও যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ততদিনে রাজাকার কায়সার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এদিকের সীমান্ত। তাই নোয়াপাড়া থেকেই ফিরে আসতে হয়েছিল তাদের। যুদ্ধের ট্রেইনিং নিতে যেতে না পারলেও গ্রামের লোকজনকে একত্রিত করে রাখার কাজটা নিষ্ঠার সঙ্গেই করে যাচ্ছিলেন তিনি। স্কুলের মাঠে বসে সবই মনে পড়ে তার। 

পূজা হবে কী হবে না?- এই আলোচনা শেষে সবাই সেদিন যার যার বাড়ি চলে গেছে। হঠাৎই শোনা গেল চিৎকার চেঁচামেচি। পাকিস্তানি সেনারা এ গ্রামেও চলে এসেছে! সঙ্গে প্রায় একশ রাজাকার। সেদিন প্রিয়তোষ ধরা দিয়েছিলেন। অন্যদের ভালোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। যদিও তিনি নিজেও আরো অনেক গ্রামবাসীর মতো প্রথমে স্বজন নারী-পুরুষ ও প্রতিবেশীদের নিয়ে পুকুরের কচুরি পানার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানিতে শরীর ডুবিয়ে কোনোরকম নাকটা ভাসিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কখন মিলিটারি আর রাজাকাররা গ্রাম ছেড়ে যায়। যখন বুঝলেন এভাবে লুকিয়ে থাকলে গ্রামের অনেক মানুষ ধরা পড়ে মারা যাবে তখন নিজেই পানি থেকে উঠে এসে ধরা দিলেন। তাকে পেয়ে  রাজাকাররা আর পুকুরে নামেনি। রক্ষা পেয়ে যায় পুকুরে আশ্রয় নেওয়া সবাই।

মাঠের একপাশে আটকে রাখা হয় ধরে আনা যুবতী ও নারীদের। অন্যপাশে পুরুষদের উপর চালানো হচ্ছিল নির্যাতন। পরিতোষ রায়কে এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলো নৃপেন রায়দের বাড়িতে। সেখানেও একইভাবে পুরুষদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তির অপেক্ষা শুধু। পরিতোষ রায়কেও তারা লাইনে দাঁড় করাতে বাধ্য করেছিল। তারপর চালাল গুলি। তার গুলি লেগেছিল পেছন থেকে। তিনি কোনো মতে বাম হাত দিয়ে প্রাণপণে জায়গাটি চেপে ধরেছিলেন। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল ক্রমাগত। কিন্ত জ্ঞান হারাননি। ফলে পাঞ্জাবি সেনারা ফিরে যেতেই সর্বশক্তি দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর একটা গাছ ধরে উঠে পড়েছিলেন পাচিলের ওপর। বুঝতে পেরেছিলেন, টপকে সেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তার আগেই একটা রাজাকার পা টেনে ধরলো। তারপর হেঁচকা টানে নিচে ফেলে বাঁশ দিয়ে পেটাতে শুরু করলো। এবার পরিতোষ রায় জ্ঞান হারালেন। যখন জ্ঞান ফিরলো পানি ভেবে খেয়ে নিলেন চারপাশে ভেসে যাওয়া মানুষের রক্ত!

এই যে একটু আগে তিনি খুব হাস্যকরভাবে ভয় পেলেন, এর কারণ কি বুঝে উঠতে পারেন না প্রিয়তোষ রায়। দশ গাঁয়ের মানুষ তার সাহসীকতার খবর জানে। চারদশক আগে; যৌবনে তিনি খুব সাহসী ছিলেন। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বেরিয়ে ব্যবসা নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতা। ব্রিটিশ ভারতে কলকাতার মতো আলো ঝলমলে শহর ক’টা ছিল। পরিতোষ রায়ের বাবা কলকাতার বালিঘাটে বাড়িও করেছিলেন। অল্প বয়সে হঠাৎ মারা না গেলে পরিতোষ রায়দের নিয়ে হয়তো ওই বাড়িতেই উঠতেন তিনি। বাড়িটা অবশ্য এখনো আছে। পরিতোষ রায়ের কিছু আত্মীয় থাকে সেখানে। তারাই দেখাশোনা করে।

এই চারদশকে বহুবার তাকে শুনতে হয়েছে ‘কিও প্রিয়তোষ কাকা, বালিঘাটে বাড়ি থুইয়া তুমি এইদেশে পইড়া রইলা কে রে?’ কথাগুলো এখানকার হিন্দুরাই বলে। প্রিয়তোষ রায় এসবে পাত্তা দেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের গুলি খেয়ে, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে নৃপেন রায়দের বাড়ির উঁচু দেয়াল পাড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে বাঁশের বাড়ি খেয়েও যে দেশে বেঁচে আছেন; এদেশ ছেড়ে কেন কলকাতার বালিঘাটে যাবেন তিনি ভেবে পান না?

গাছের ছায়ায় আবছা অন্ধকারে অত দূরের বধ্যভূমিতে ‘অসমাপ্ত’ স্মৃতিসৌধটি দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই কেঁদে ফেললেন প্রিয়তোষ রায়। বয়স প্রায় শেষদিকে। কোনদিন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে কে জানে? বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধটা সম্পূর্ণরূপে দেখে যেতে পারবেন কিনা সেই ভাবনা পেয়ে বসেছে তাকে। চার দশক আগে নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা প্রিয়তোষ রায় আশায় বুক বাঁধেন-বধ্যভূমির নির্মাণ কাজ একদিন শেষ হবে।




 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ মার্চ ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
   

সংশ্লিষ্ট খবর: