ঢাকা, রবিবার, ১০ বৈশাখ ১৪২৪, ২৩ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সন্‌জীদা খাতুন : আমাদের বাতিঘর

দীপংকর গৌতম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৪ ৭:৩৭:৩৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৪ ১১:৩৭:৪৯ এএম

দীপংকর গৌতম : ‘চাকরি জীবনে স্বাধীনচেতা মানুষকে নানা দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। পরাধীন দেশে বিড়ম্বনার তো কোনো শেষ নেই আবার! সরকারি আদেশ বা ইঙ্গিত নয়, নিজ বিবেকের নির্দেশেই সবসময় চলেছেন গুরুসদয়। হাওড়া জেলার লিলুয়াতে কারখানা শ্রমিকদের ওপরে পুলিশের অতর্কিত গুলি চালনার বিচারের দায়িত্ব ছিল গুরুসদয়ের ওপরে। শ্রমিক সমাবেশে কোনোরকম হুঁশিয়ারি না দিয়ে বিনা প্ররোচনায় গুলি চালনার আদেশ দেবার জন্য ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তাকেই দায়ী করেন তিনি। আবার ময়মনসিংহে চাকরি করবার সময়ে, গান্ধীজীর লবণ আন্দোলনে যোগদানকারীদের কঠোর হাতে দমন করবার নির্দেশ এলেও গুরুসদয় তাতে কর্ণপাত করেননি। ফলে শাস্তিস্বরূপ তাকে বদলি করা হয়।

পরাধীন দেশে সরকারি চাকরি করেও, বাঙালির দৈহিক-মানসিক গঠন এবং নৈতিক বোধ উন্নয়নের ভাবনা থেকে গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত প্রাসঙ্গিক নৃত্যগীত অবলম্বন করে গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলনের সূত্রপাত করেন।’ (ব্রতচারী আন্দোলনের গুরুসদয়-সন্‌জীদা খাতুন)

অগ্নিযুগের বিপ্লবী গুরুসদয় দত্ত সম্পর্কে এ লেখাটি লিখেছেন সন্‌জীদা খাতুন। গুরুসদয় দত্তের জীবন ও কর্মের প্রতি তার অনুরাগের কারণ একটাই তা হলো গুরুসদয় দত্তের দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম। এই দৃঢ়তা সন্‌জীদা খাতুনেরও প্রধান গুণের একটি। তার জীবনের যে বড় স্বার্থকতা হলো, বাঙালি সংস্কৃতির পিঠস্থান ছায়ানট তার নাম একই সমান্তরালে বয়ে গেছে। ছায়ানট গঠনের ইতিহাসের যে গতিবিধি দেখা যায় সেটা রাষ্ট্রের নিয়ম রীতিকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে। রাষ্ট্র যখন বলছে গান গাওয়া যাবে না। সন্‌জীদা খাতুন তার প্রাণের তাগিদ ও স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে লড়েছেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। তিনি নিজেদের সততা ও মূল্যবোধ প্রসূত জীবন নিয়ে চলেছেন। সংস্কৃতিবান দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমিকদের একজন সন্‌জীদা  খাতুন।

তার দ্রোহ নিষ্ঠা সততা দেশেপ্রেমের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের যেতে হবে ১৯৬১ সালে। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের দোর্দণ্ড প্রতাপ চলছে। সে সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশত বর্ষপূর্তির উৎসবের বিরোধীতা করেন পাকিস্তানের সামরিকজান্তা। কবিগুরুকে অস্বীকার করে তারা তাদের উমেদারদের রবীন্দ্র সংগীত লেখার প্রস্তাব দেন। আসলে এটা ছিল বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বড় ধরনের আঘাতই শুধু নয়। সংস্কৃতিকে পঙ্গু করার অপচেষ্টা। একটা জাতিকে নিঃশেষ করতে তার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র বোধ করি আর নেই। পাকিস্তানি জান্তার এসব ধুরন্ধর পদক্ষেপ বুঝতে পেরেছিলেন বিদগ্ধ সংস্কৃতিবানরা। তাই তারা পাকিস্তানি জান্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, একত্রিত হয়েছিলেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন কিছু করতে। তাই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্র ভাবনাকে অবলম্বন করে কিছু রবীন্দ্র অনুরাগী যারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। সন্‌জীদা খাতুন সেই দৃঢ়চেতা সংস্কৃতিবানদের একজন। সেবার রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। এই যুগান্তকারী আয়োজন বাংলার সংস্কৃতি-সচেতন মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। আর এর মধ্যদিয়ে রবীন্দ্র চর্চার জগতে সন্‌জীদা খাতুন সংস্কৃতিবানদের মধ্যে একটা জায়গা করে নেয়। মূলত ১৯৬১ সাল থেকেই সন্‌জীদা খাতুনসহ অন্যরা ‘শ্রোতার আসর’ নামে ঘরোয়া আসর বসাতেন। এর পেছনের লক্ষ কি ছিল তা রাষ্ট্রপক্ষ তখন অনুধাবন করতে না পারলেও যারা করছিলেন তারা ঠিকই বুঝছিলেন তারা কি করবেন। তাদের লক্ষ তারা ধীরে ধীরে ঠিক করে ফেলেছিলেন। তারা তখনই অনুভব করেছিলেন, দেশে চর্চার সংকট রয়েছে, রয়েছে রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীর অভাবও। এই অভাব দূর করতে হলে প্রয়োজন একটি রবীন্দ্র চর্চার প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজন একটি সংগীত বিদ্যালয়ের। রবীন্দ্র শতবর্ষের অনুষ্ঠান উদযাপন শেষে এক বনভোজনে গিয়ে কবি সুফিয়া কামাল, মোখলেসুর রহমান, সায়েরা আহমদ, শামসুন্নাহার রহমান, আহমেদুর রহমান, ওয়াহিদুল হক, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, মীজানুর রহমান, সাইফউদ্দীন আহমেদ মানিক ও সন্‌জীদা খাতুনসহ আরো অনেক অনুপ্রাণিত কর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৩ সালে ছায়ানটের যাত্রা শুরু হলো। এর পর রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, শুদ্ধ সংগীত, পল্লী গীতিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হলো। সন্‌জীদা খাতুনরা তখন মানুষের ঐতিহ্যপ্রীতি বাড়াতে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করার রীতি শুরু করেন। ছায়ানট ধীরে ধীরে মহিরুহ হয়েছে। যারা শুরুতে ছিলেন তারা অনেকেই আজ নেই। কিন্তু সন্‌জীদা খাতুন এর হাল ধরে আমাদের সংস্কৃতিকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন যেখানে একটি সাংস্কৃতিক আশ্রয় নির্মাণ হয়েছে। ছায়ানট আমাদের সংস্কৃতির পিঠস্থান। ছায়ানটকে সামনে রেখে আজ জাতি তাকিয়ে আছে। এমন ভরসা তৈরি করেছে ছায়ানট। সন্‌জীদা খাতুনের দৃঢ়তা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। ছায়নট পয়লা বৈশাখের যে সংস্কৃতি চালু করেছে তার বিন্যাস বিশাল, তার ব্যপ্তি আকাশ সমান। সারা বিশ্বের বাঙালি পয়লা বৈশাখকে ঘিরে যে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চা করে, তার পথ প্রদর্শক ছায়ানট। শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৯৭১ সাল ছাড়া প্রতি বছরই রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদযাপন করে আসছে ছায়ানট। ঢাকার রমনা উদ্যানে অশ্বত্থ গাছের নিচে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাত, ইংরেজি ১৯৬৭ সালের মধ্য এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ছায়ানটের প্রথম অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান স্থলের নাম করা হয় বটমূল। এ অনুষ্ঠানকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সন্‌জীদা খাতুনকে কত শ্রম ঘাম দিতে হয়েছে তা প্রবাসী কবি দাউদ হায়দারের একটা লেখায় স্পষ্ট।

‘পড়ি সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে। বাসা মালিবাগে, আবুজর গিফারি কলেজের পেছনে (তখনও অবশ্য কলেজ হয়নি)। বাসা-স্কুলের দূরত্ব সাকুল্যে পাঁচ মিনিটের। ক্লাস সেভেনের ছাত্র। পঞ্চাশ বছর আগের কথা বলছি। ২৯ চৈত্রে, অগ্রজ জিয়া হায়দারের সঙ্গে নবাব ভাই (লেখক কাজি আনোয়ার হোসেন)- এর বাড়িতে গিয়েছি, সেগুনবাগিচায়। জিয়া ভাইয়ের বন্ধু তিনি, বয়সে যদিও বড়। যেহেতু জিয়া ভাইয়ের বন্ধু, সেই সুবাদে নবাবকেও ভাই বলি। বাড়িতে ঢুকতেই, এক যুবতী, বয়সে জিয়া ভাইয়ের বড়, বললেন, জিয়া, ভাই বোনদের নিয়ে রমনা পার্কে এসো সকালে, নববর্ষে, পয়লা বৈশাখে। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। ফেরার সময় জিয়া ভাই বললেন, উনি ডক্টর কাজি মোতাহার হোসেনের মেয়ে, ডাকনাম মিনু, ভাল নাম সন্‌জীদা খাতুন, চমৎকার রবীন্দ্র সংগীত গান। পয়লা বৈশাখে যদি যাস, মিনু আপার গান শুনবি। লিনুও (ফাহমিদা খাতুন) যেতে পারে, গাইবে হয়ত। হুবহু মনে নেই, বয়ানমালা ওইরকমই তবে। যেটুকু বাজছে কানে। জিয়া ভাই যাননি। গিয়েছিলুম পাশের বাড়ির মনুকে নিয়ে, সহপাঠী। বয়সও এক। অনুষ্ঠানে সাকুল্যে ৫০ জন শ্রোতাও নয়, বালক দলে আমরাই দুজন। শ্রোতাকুলের কেউ দাঁড়িয়ে, বসে, কেউ খোশগল্পে, কারোর পায়চারি, যেন প্রাতঃভ্রমণে। পরনে অবশ্য ট্রাকস্যুট নয়। সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি। সকালের হাওয়ায় খোশমেজাজি। অনুষ্ঠান এক ঘণ্টারও নয়। গান (রবীন্দ্র সংগীত) ছিল গোটা চারেক (কান যদি প্রতারক না হয়)। মিনু আপার কণ্ঠে একটি। গোটা তিনেক কবিতাও পাঠ। একটি আবৃত্তি করেন গোলাম মুস্তফা (অভিনেতা)। (ছায়ানট, সন্‌জীদা খাতুন ও পয়লা বৈশাখ/দাউদ হায়দার)’।

দাউদ হায়দারের এ লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে কিভাবে একটি অনুষ্ঠানকে সংগঠিত করতে হয়। একটা মানুষের ভেতর কতটা আত্মবিশ্বাস থাকলে ছোট একটি আয়োজনকে জাতীয় থেকে বৈশ্বিক রূপ দেওয়া যায়। ছায়ানটের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে বহু চেষ্টা করেছে অপশক্তি। রমনার বটমূলে বোমা হামলা করে স্তব্ধ করতে চেয়েছে বাঙালির মাঙ্গলিক সুরকে। তা পারেনি পারবে না। সন্‌জীদা খাতুনের দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা সামনে নিয়ে যাবে ছায়ানটকে, যাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে। এই মহীয়সীর জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তি নিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ১৯৭৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি দেয়। তাকে শান্তি নিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ২০১২ সালে সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দেশিকোত্তম’ দেওয়া হয়। তার চেয়েও বড়কথা হলো সন্‌জীদা   খাতুনই বাংলার মানুষের রক্তে মিশিয়ে দিয়েছেন পয়লা বৈশাখের মঙ্গল ধ্বণি। একই সঙ্গে চলে আসে সাধক ওয়াহিদুল হকের নাম। যারা দিয়েছেন নববর্ষের আত্মিক-ঐতিহ্যের শিক্ষা।

এই মহীয়সীর জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ এপ্রিল ২০১৭/সাইফ

Walton Laptop