ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৫ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সাযযাদ কাদিরের গল্পে নারীর যৌনজাগরণ || মোজাফ্‌ফর হোসেন

মোজাফ্‌ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৭ ২:১২:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৭ ২:১২:২৭ পিএম

ষাটের দশকের শেষের দিকে লিখতে শুরু করেন সাযযাদ কাদির। বাংলা সাহিত্যের পালাবদলের এই দশকে স্বকীয় স্বর নিয়ে তিনিও একটি বিকল্প পথে হাঁটার চেষ্টা করেছিলেন। সাযযাদ কাদিরের প্রধান পরিচয় কবি, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। এর কারণ তিনি গল্পে নিয়মিত হননি। মাত্র তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। ‘চন্দনে মৃগপদচিহ্ন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে; ‘অপর বেলায়’ ১৯৯৭ সালে এবং ‘গল্পসংগ্রহ’ ২০১৬ সালে।

বিষয় ও প্রকরণ
সাযযাদ কাদিরের শুরুর দিককার গল্পের প্রধান বিষয় বা অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে নারী-পুরুষের শরীরভিত্তিক সম্পর্ক। সে সম্পর্কে প্রেম থাকতেও পারে, নাও পারে। স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক, সমকাম, ধর্ষণ, অযাচার (incest sex), অসম যৌনতা, পরকীয়া, স্বমেহন (Masturbation)—এসবই এসেছে। তীব্রভাবেই এসেছে। ঢেকে ঢুকে তিনি কিছু বলেননি। বিশেষ করে অযাচার এবং সমকাম যৌনতার কথা তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেই ষাট ও সত্তরের দশকে তা ভাবলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। সাযযাদ কাদিরের আগে তো বটেই বাংলাদেশে তার পরেও কেউ এই বিষয় নিয়ে এমন তীব্রভাবে লেখেননি। পড়তে পড়তে একধরনের মরবিডনেস তৈরি হবে পাঠকের মনে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন বিষয়ে জ্ঞান লাভের পর থেকে মৃত্যুপর্যন্ত মানুষের মন চেতনে-অবচেতনে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত থাকে যৌনচিন্তায়। নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় বাধা-নিষেধ, সামাজিক শিষ্টতা, সভ্যতার ভব্যতা—এসব কারণে মানুষের যৌনচিন্তার বেশিরভাগই আটকে থাকে অবচেতনে। ফ্রয়েড বলছেন, এই অবচেতন থেকেই অবদমিত হয় এই নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষাগুলো। যা হয়ত স্বপ্নের ভেতর অন্যকোনো রূপে আবার ফিরে আসে। সাযযাদ কাদিরের গল্পে এ ধরনের স্বপ্নের বিষয়টি এসেছে।

তার অধিকাংশ গল্পে নারী-পুরুষের বিকৃত-স্বীকৃত সব রকমের যৌনসম্পর্কের প্রসঙ্গ এসেছে। যেমন ‘যূনী’ গল্পের কথা বলা যায়। গল্পের মূলচরিত্র কিশোর বাশার। নিজের বড়বোন মিনুর পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠা দেখতে দেখতে যৌনতাবিষয়ক জ্ঞান তার হতে থাকে। বাশার পড়তে পড়তে ঝুঁকে পড়া বড়বোনের বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে চোরাদৃষ্টিতে। তার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে বোনের ফুলে ওঠা ফর্সাবুক। লেখক বলছেন, ‘বাশারের হাতে কি যেন উশখুশ করে কিছুক্ষণ।’ সেই রাতে সে স্বপ্ন দেখে, বিশাল এক মনোরম প্রান্তর, সুবাসিত বাতাস। ঘাসফুল। স্নিগ্ধ রোদ। আর ডুলিতে হলুদ শাড়িতে আবৃত এক নারী। কেবল চোখ জোড়া তার দেখা যায়। চেনা চেনা লাগে। স্বপ্নে এর বেশি এগুতে পারে না বাশার। ফ্রয়েডীয় স্বপ্নতত্ত্বে অবদমিত আকাঙ্ক্ষাগুলো স্বপ্নে সেন্সর হয়ে অন্যভাবে আসে। বাশার তার বোনকে চায়, কিন্তু তার নৈতিক-বোধ সেটা মানতে পারে না; ফলে অন্যভাবে তাকে নিষিদ্ধ প্লেজারটা পাইয়ে দেয়। বাশার তার বিকৃত যৌন কামনাকে শেষপর্যন্ত দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। এক রাতে সে সাহস করে হাত দেয় ঘুমন্ত বোনের বুকে। লেখকের ভাষায়, ‘হাতটি আস্তে আস্তে কাঁপতে কাঁপতে বেশি দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। জোরে জোরে চেপে ধরে দলে-মুচড়ে বিধ্বস্ত করতে চায়। তখন বুঝি জেগে ওঠেন আপা। একবার পরিপূর্ণ তাকান। অন্ধকারেও বোঝা যায়। পরক্ষণে আবার বন্ধ করেন চোখের পাতা। আর কম্পিত অবশ হাতে বুকের মধ্যে বাশারের হাত চেপে ধরেন।’ বাশার তার বন্ধুর বড়বোনের শরীরকেও কামনা করে। গল্পের পরিণতিটা বীভৎস। গল্পের দুই প্রধান নারীচরিত্র নির্মম গণধর্ষণের শিকার হয়। বাশারের বন্ধুর বোন বেনুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। ‘নিম্নাঙ্গে অনেকগুলি আঘাত, সম্ভবত কুঠারের। আর স্তন দুটি বুঝি ভোতা কোনো অস্ত্র কেটেছে, ঘষে-ঘষে।’ একইভাবে বাশারের বোনকে সন্ত্রাসীরা তার সামনে বেঁধে গণধর্ষণ করে। বাশার যে যৌনতাকে তার কিশোর বয়সে প্রেমের একটা স্তর হিসেবে দেখেছে তার এমন বীভৎস চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে। সে তখন মৃত্যুকামনা করে অদৃশ্য শক্তির কাছে প্রার্থনা করে বলে, ‘আমাকে বাঁচান। আমাকে হত্যা করুন! ধীরে-ধীরে আমাকে বুঝতে দিয়ে হত্যা করুন!’

একইরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে নিজের মৃত্যুকামনা করে ‘হেমাঙ্গ মৈনাক’ গল্পের মূলচরিত্র জাফরান। আটমাসের গর্ভবতী জাফরান যখন তখন স্বামীর যৌননির্যাতনের শিকার হয়। লেখকের ভাষায়, ‘শয্যা আর তার কাছে শয্যা নয়, সে এক প্রেতপুরী—প্রতিরাতে সেখানে জ্যান্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তাকে। দুর্দান্ত অসুর স্বামীটি বপুষ্টমা তাকে যথেচ্ছ গেঁথে ফেলে, ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দেয়, তবু নিরুপায় সহ্য করতে হয়...।’ শিশু বয়স থেকে জাফরান তার মায়ের বহুগামিতা দেখে বড় হয়েছে। মা দোতলার ঘরে সেজেগুজে বসে থাকেন আর বাবা কিংবা মায়ের বন্ধুরা অতি উৎসাহে সেখানে যায়-আসে। মায়ের কাছে আসা অপেক্ষাকৃত কমবয়সী দাউদ চাচাকে মনে ধরে কিশোরী জাফরানের। সেই তের বছর বয়সে তার দাউদ চাচার ঠোঁটের পাতলা ভাজ ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে।

একইভাবে বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয় ‘ফুলের সাথে বনলতা’ গল্পের নারীকথক। গল্পকথক তরুণী কক্সবাজারে মেজোখালার বাসায় বেড়াতে আসে। পয়তাল্লিশ বছর বয়সী খালা কামুক-প্রকৃতির নারী। মেয়ের ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে জোর করে আলাপ জমান, শরীরের ভাজ দেখিয়ে তাদের কাবু করে তৃপ্তি পান। এটা তার বিকৃত যৌনাচার। খালা সুখ পান অন্যদের মিলনদৃশ্য দেখে। রাতে আড়ালে থেকে কাজের লোকদের যৌনমিলনের দৃশ্য দেখে ঘুমন্ত স্বামীকে জাগিয়ে তুলে তৃপ্ত হন নিজে। তার এই বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয় গল্পকথকও। গল্পকথকের সঙ্গে ড্রাইভারের শারীরিক সম্পর্ক তিনি আড়ালে থেকে উপভোগ করেন, বোঝা যায় তার ইন্ধনেই ড্রাইভার ছেলেটি জোর করে গল্পকথকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ঘটিয়েছে। খালার মতো খালার মেয়ে আন্নাও যৌনাসক্ত। সেও গল্পকথককে নিয়ে মাঝরাতে অন্যের মিলনদৃশ্য দেখে। বাবা-মায়ের মিলনদৃশ্য দেখে গল্পকথকের সঙ্গে সমকাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তার বর্ণনাও দিয়েছেন লেখক খোলামেলা ভাবে, ‘আন্না আমার ঠোঁটে গালে বার দুই চুমু খায়, বাধা দিই না, বস্তুত প্রতি চুমুর পর আরো কটি দীর্ঘ চুমুর তৃষ্ণা জাগে।’ এই পরিবারের এমন অসুস্থ যৌনক্রিয়া সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে আসে গল্পকথক। কিন্তু ততদিনে সেও এই বিকৃত যৌনাচরণে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আগে সে কেবল স্বমেহনে অভ্যস্ত ছিল। এখন সমকামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাড়ি ফিরে দেখে মাও খালার মতো উগ্র সাজ ধরেছে, ‘উদার ব্লাউজ’ পরছে। মায়ের কাছে এক কিশোরী হয়ে ওঠা প্রতিবেশী মেয়ে আসে। গল্পকথক বলেন, ‘মার কল্যাণেই সেই কালোমতো হ্যাংলা মেয়েটা আজ সুন্দর, আমার ঈর্ষার পাত্রী, শরীরের এখানে ওখানে তার নতুন বয়সের মনোরম রঙও ফুটতে শুরু করেছে। ভালোই। ওর চোখ জুড়ানো শান্তশ্রীকে মা ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু কেন? শুধু স্নেহের তাড়নায়?’ সন্দেহ জাগে গল্পকথকের। খালা, খালাত বোন ও নিজের মতো তার পঞ্চাশ বছর বয়সী মাকেও বিপথগামী মনে হয় তার। এরপর নিষিদ্ধ সম্পর্কের লোভে-তাড়নায় গল্পকার নিজেই হাজির হয় মায়ের বিছানায়।

‘চন্দনে মৃগপদচিহ্ন’ গল্পে বন্ধুর খোঁজে গিয়ে বন্ধুর বাড়ি রাত্রিযাপন করে কবির। রাতে তার বিছানায় আসে বন্ধুর বড়বোন। ‘কণ্ঠের সৌরভ’ গল্পেও মৃদুভাবে যৌনসম্পর্কের বিষয়টি এসেছে। গল্পের প্রধান চরিত্র মুবারক স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মাঝামাঝি বাস করে। একদিন সে তার ছোট ভাইয়ের কক্ষে দৃষ্টি গলিয়ে দেখে বাড়ির কাজের মেয়ে আলতার সঙ্গে ভাইয়ের মিলনদৃশ্য। এরপর সে প্রাক্তন প্রেমিকা রেবার চিন্তায় মগ্ন হয়ে দিনযাপন করে। রেবা অন্যখানে সংসারী। তৃপ্ত নারী। মুবারককে শেষ পর্যন্ত আলতার কাছেই যেতে হয়। ‘নক্ষত্রের বাগানবাড়ি’ গল্পে মূলচরিত্র রশীদের বন্ধু কাজেম ঊনসত্তরের আন্দোলনে মারা গেছে। তবে কোনো প্রতিবাদ মিছিলে শরীক হয়ে নয়, এক কারফিউ রাতে হঠাৎ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেরিয়ে পড়েছিল রাজপথে। কাজেম দাম্পত্যজীবনে সুখি ছিল না। স্ত্রী পরকীয়া করত। ফলে তার সজ্জাসঙ্গী না হয়ে কাজেম অন্যকোথাও নিজের দৈহিক চাহিদা মেটাত। কাজেমের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী প্রেমিককে বিয়ে করেছে। তারাও আর সুখে নেই। কারণ প্রেমিকপুরুষ পরকীয়া প্রেমে যে আনন্দ পেত এখন আর সেটা পায় না। ‘কাচের কপাট’ গল্পে সুলেমান ব্রথেলে যায় মদ খেতে। সেখানে একটা কিশোরী মেয়ের সঙ্গে রোজকার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এখানে খুব স্বল্প পরিসরে ব্রথেলের যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা যথার্থ। পছন্দের নারী রশিদা মোমতাজ ও পারিবারিকভাবে বিয়ের জন্য নির্ধারিত নারী আসিয়ার উপেক্ষা থেকে যে দুঃখবোধ সেটি ভুলে থাকতে ছুটে যায় গণিকার ঘরে। সেই রাতে এক খোলা মাঠে লাশ পাওয়া যায় সুলেমানের। না, খুন নয়; হতাশাগ্রস্ত মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যু হবে হয়ত। পরিষ্কার করে সেটি বলা হয়নি। আসিয়া ও রশিদা মাঝে মাঝে তাদের নগ্ন শরীরের ওপর আবিষ্কার করে সুলেমানকে।

‘অশোক বকুল’ গল্পে ভাড়া বাড়িতে থাকে বোরহান। প্রতিবেশী একা নারী ও বাড়ির মালিকের কিশোরী কন্যার সঙ্গে তার প্রণয়। দুজনেই তার কাছে রাতে আসে। একরাতে বাড়িওয়ালার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে পালায় সে। যাওয়ার আগে মেয়েটিকে বলে, ‘তোমাতে যে রক্ত, তা আমাতেও। রক্তের উত্তেজনায় আমরা কেউ ব্যতিক্রম নই। প্রেম নয়, প্রয়োজনীয় এই শরীর নিয়ে এবং শরীরের জন্যই আমরা কোথাও যাবো।’

ভাষা ও কাঠামো
সাযযাদ কাদিরের গল্পের ভাষাটা বেশ উপভোগ্য। মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো ছোট ছোট কাটা কাটা বাক্য তিনি ব্যবহার করেছেন। বাংলা ভাষায় জহির রায়হান এ ধরনের গদ্যভাষা ব্যবহার করেছেন তার ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পটিতে। সাযযাদ কাদির থেকে একটা ছোট্ট নমুনা দিচ্ছি : ‘এ-পাশে খোলা দরজা। মাঠ, মাঠের পরে বিজ্ঞানভবন। উঁচু ক্লাশের ছেলেরা। সেখান থেকে গলিপথ। সোজা ১০মিনিট হেঁটে বাড়ি। জোড় কড়ই গাছ। সুপারি গাছের চিতল পাতা। হাওয়া। বৃষ্টি। মা ভাজছেন ইলিশ মাছ।’ [যূনী]  বাক্যের শেষে খুব প্রয়োজন না হলে ক্রিয়াপদের ব্যবহার করেননি। অর্থাৎ অসমাপিকা ক্রিয়া তিনি ব্যবহার করেছেন। এতে একটি বাক্য শেষ করে পরের বাক্য পড়ার তাগিদ আপনা-আপনি চলে আসে। একটি বাক্য আরেকটি বাক্যের ভেতর জিজ্ঞাসা চাপিয়ে দেয়। নির্মাণশৈলীতে তিনি নতুন কিছু করেননি। ছোটগল্পের ট্র্যাডিশন্যাল বর্ণনাকৌশল অবলম্বন করেছেন। গল্পের ভেতর ন্যারেটিভেও তেমন কোনো কাজ লক্ষ্য করা যায় না। এক্ষেত্রে সাযযাদ কাদির নতুন কিছুর অনুসরণ না করে ঐতিহ্যমুখী হয়েছেন।  সবগুলো গল্পই প্রায় কালের বিচারে ঘটমান বর্তমান। ফ্লাশব্যাকের ব্যবহার খুব সামান্যই। এই স্ট্যাইলটা সুখপাঠ্য এবং বহুল ব্যবহৃত।

চরিত্র নির্মাণ ও বিশেষত
সাযযাদ কাদিরের গল্পে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশিমাত্রায় কামুক এবং ক্রিয়াশীল। মেডিক্যালের ভাষায় যাকে বলা হয় hypersexual behaviorism-এ আক্রান্ত। নারীর যৌনজাগরণ (female sexual awakening) এখানে ঘটেছে। কতগুলো নারী চরিত্র বিকৃতকামে বিশ্বাসী। তবে তারা পুরুদের মতো অত্যচারী বা sadomasochism-এ বিশ্বাসী নয়।

আমাদের সমাজে এখনো বিশ্বাস করা হয়, নারীদের যৌনক্রিয়া অ্যাকটিভ হতে নেই। অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার (unrestrained sex) সমাজের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি নষ্ট করে, নারীর মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে নারী যৌন-আকাঙ্ক্ষাকে অযৌক্তিক ও অনৈতিক বলে ভাবা হয়। এই ধ্যানধারণার কারণে ইউরোপে ঊনবিংশ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগের উপন্যাসের নায়িকাদের যৌনতার ক্ষেত্রে এতটা সক্রিয় হতে দেখা যায় না। বাংলা সাহিত্যে তো নয়-ই। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লেখকদের ভেতর কেট শপার কথা বলা চলে। তিনি নারীর যৌনজীবন নিয়ে যে ট্যাবু বা মিথ তার বিরুদ্ধে লিখেছেন। তার নারী চরিত্ররা যৌনতার ক্ষেত্রে অনেকবেশি সক্রিয়। তার গল্পে নারীদের অ্যাডালটারি, ইনসেস্ট, সমকাম, পরকীয়া এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এ সম্পর্কগুলো তারা স্থাপন করে প্রয়োজন থেকে নয়, আত্মতৃপ্তির জন্য। নারীরা আর যৌনাচরণে অধিনস্ত (submissive) থাকছে না। সতী নারীর ধারণা ওঠে যাচ্ছে। নারীরা যৌনসম্পর্ককে স্বামীর জন্য কর্তব্য, বংশবিস্তারের জন্য অপরিহার্য জ্ঞান না করে নিজেদের উপভোগের বিষয় হিসেবে ভাবছে। নারীবাদের দৃষ্টিতে এটি নারীর অবস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তন বটে।

সাযযাদ কাদিরের গল্পের নারী চরিত্রগুলোও অনুরূপ নারীর, যৌনতার ক্ষেত্রে যে সামাজিক ট্যাবু সেগুলো ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেই অর্থে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি একটি নতুন পথের সন্ধান চালিয়েছেন। তবে তিনি যে সময় লিখছেন সেই সময় তার এ ধরনের যৌনজাগরণের গল্প কতটা প্রাসঙ্গিক সে প্রশ্নও চলে আসে। তিনি লিখছেন একটা উত্তাল সময়ে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন সদ্য শেষ হয়েছে, চলছে স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার আন্দোলন। বাংলায় একটা দুর্ভিক্ষ হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মতো এতবড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল। এসব রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের কোনো অনুষঙ্গ তার গল্পে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়নি। তবে কি তিনি পলাতক (স্কেপিস্ট)? স্বকালের হাহাকার বিপর্যয় থেকে পালাতে চেয়েছেন? নাকি এই বিপর্যয় থেকেই জন্ম নিচ্ছে বিকৃত যৌনতা? এসব প্রশ্ন চলে আসে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ এপ্রিল ২০১৭/রুহুল

Walton Laptop