ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

কারাগারের দিনলিপি: অভিজ্ঞতার পাঠ ও ইতিহাস অনুসন্ধান

ড. তানভীর আহমেদ সিডনী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৯ ১০:৫২:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৯ ১০:৫৬:৫৬ পিএম

।। ড. তানভীর আহমেদ সিডনী ।।

শোষকের কোনো জাত নাই ধর্ম নাই। একই ধর্মের বিশ্বাসী লোকদেরও শোষণ করে চলেছে ছলে বলে কৌশলে। [পৃ. ১৮৭]

‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ থেকে এই চিরায়ত বাণী উদ্ধৃত করার মধ্যদিয়ে আমরা প্রাচ্যের একজন রাজনৈতিক নেতার দার্শনিক পরিচয় পাই। যিনি রাজপথ থেকে নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে এনেছেন। কারাগারে বসে পাঠ করেছেন সাহিত্য, দর্শন এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের গ্রন্থ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের একটি পর্বের প্রত্যক্ষ বর্ণনা পাওয়া যাবে। এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের দুটি সময়ের পর্ব ধৃত। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের কাহিনি এই গ্রন্থে পাওয়া যাবে। ভূমিকা থেকেই জানতে পারি ১৯৫৮ পর্বে লেখা দুটি খাতা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, তার একটি বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার [স্পেশাল ব্রাঞ্চ] সদস্যরা বহুবছর পরে তাদের মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করতে পেরেছেন। প্রত্যাশায় আছি আরো  একটি খাতা উদ্ধার হোক-হয়তো আমরা ইতিহাসের নতুন কোনো খনির সন্ধান পাবো। প্রসঙ্গটি এজন্য তোলা হলো যে, জেলখানার এই দিনলিপি আমাদের সামনে অনেকগুলো দরজা খুলে দিয়েছে। পাকিস্তান আমলের জেলখানার যে অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাওয়া গেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। আবার একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতা কেমন করে জনপ্রিয়তা পান। অর্থাৎ কোনো সুবিধাবাদীর কাছে নয়-একেবারে সাধারণ মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছিল। এদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কেন সাধারণ মানুষ তার জন্য প্রার্থনা করেছে। কেনই গ্রামের কৃষকপত্মী নফল নামাজ মানত করেছে কিংবা রোজা রেখেছে। তিনি পরিবার আর রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। বিশেষ করে বাংলাদেশের গরিব মানুষের জন্য ছিল তাঁর বিশেষ ভালোবাসা-এ একজন রাজনৈতিক নেতার লাভ-ক্ষতির হিসেবের ভালোবাসা নয়। বরং গণমানুষের হৃদয়ে বসবাসকারী একজন বাঙালির পথচলা। যিনি বাংলাদেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যথার্থই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে খুব কম আলোচিত মানুষ বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব। অথচ ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানেন একজন শেখ মুজিব তৈরির জন্য পরিবারের ভূমিকা নিতান্ত কম নয়। পরিবারের সকল দায়িত্ব থেকে নির্ভার করে স্বামীকে দেশের জন্য উৎসর্গ করার কাজটি যে কতো কঠিন তা অভিজ্ঞতাহীন মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা দূরহ। বেগম মুজিব সে কাজটি করেছেন সযতনে। আরেকটি কাজ তিনি করেছেন, তা হলো যখনই কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার সে সময়ে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আর বাঙালির পক্ষে কথা বলেছেন। এই লেখার সূত্রে বলে নেওয়া যাক, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মী কিংবা গবেষকদের লেখায় তাঁর বিষয়ে কম আলো ফেলা হয়েছে। এর প্রধান কারণ তিনি নিজে নেপথ্যে থাকতে যেমন পছন্দ করতেন; অনুরূপ নারী হিসেবে তার দিকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার গবেষকদের দৃষ্টি কম পড়েছে। অথচ বেগম মুজিব ইতিহাসের জরুরি দলিলগুলো সংরক্ষণ করতে চেয়েছেন। স্বামী জেলে যাবার সময় তিনি যেমন খাতা কিনে দিতেন অনুরূপ জেল থেকে মুক্তি পেলে যে জিনিসটি তিনি ফেরত আনা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন তা হলো খাতাগুলো। এ বিষয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার ভাষ্য দেখে নেওয়া যেতে পারে, “আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধে আব্বা লিখতে শুরু করেন। যতোবার জেলে গেছেন আমার মা খাতা কিনে জেলে পৌঁছে দিতেন আবার যখন মুক্তি পেতেন তখন খাতাগুলি সংগ্রহ করে নিজে সযত্মে  রেখে দিতেন। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তা যদি না থাকতো তাহলে এই মূল্যবান লেখা আমরা জাতির কাছে তুলে দিতে পারতাম না।” ইতিহাসের নতুন দিকে দৃকপাত করতে এই গ্রন্থটি সহায়তা করেছে। এই দিনলিপির নামকরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার যৌথপ্রয়াসে ঋদ্ধ হয়েছে বাঙালির ইতিহাস।

বাঙালির ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু রাজনীতির সাথে তার ভেতরে যে কবিমন আছে তা পাওয়া যায় ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ থেকে। একটু চাঁদের আলো দেখার হাহাকার যে কয়েদি হিসেবে তার মনে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার লেখায়, “কয়েদিরা যত দিন জেলে থাকে- সন্ধ্যার পরে অন্ধকার হলো, কি চাঁদের আলো, এ খবর খুব কম রাখে।” [পৃ. ২৮]

অথবা আরেকটি উদ্ধৃতি যেখানে তিনি অন্ধ কুঠুরিকে তুলনা করেছেন গুহার সঙ্গে। পাঠকের জন্য সে উদ্ধৃতি তুলে দেওয়া হলো, “আবার কারাগারের ক্ষুদ্র কুঠুরিতে ফিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকি জমাদার সাহেবের আগমনের জন্য। তালাবন্ধ হতে হবে। যথারীতি আমার গুহার মধ্যে রাতের জন্য শুভাগমন করিয়া ‘তৃপ্তির’ নিশ্বাস ফেললাম।” [পৃ. ৯৫]

পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এই নেতা জেলে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক দাবি আদায়ের সংগ্রামে। কিন্তু জেলে চারদেয়ালে বন্দি থেকে রাজনীতির গতি প্রকৃতির দিকে যেমন দৃষ্টি রেখেছেন তেমনি প্রকৃতির সাথেও আত্মীয়তা করেছেন। তাই প্রকৃতির কাব্যিক চিত্র অঙ্কন করতে যেয়ে লিখেছেন, “দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভাল লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দূর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলি বাতাসের দোলে তালে তালে  নাচতে থাকে।” [পৃ. ১১৭]

পর্যবেক্ষণের পাশে আমরা পাঠ করি কবিতার পংক্তির মতো লেখাগুলো।

বাংলাদেশের জেলের অলিগলি যদি চিনতে চায় কেউ তাহলে তার সামনে এই গ্রন্থ দলিল হিসেবে কাজ করবে। এখানেই জানতে পারি জেলে সূর্যাস্ত হয় স্বাভাবিক সময়ের আগে। বাক্যটি পাঠ করা যাক, “সূর্য বিদায় নিয়েছে, জেলখানায় একটু পূর্বেই বিদায় নেয়। কারণ ১৪ ফিট দেয়াল দাঁড়াইয়া আছে আমাদের চোখের সম্মুখে।” [পৃ. ১০৫]

 

‘কেসটাকোল’ বলে একটা শব্দ পাঠ করতে পারি। আমরা জানতে পারি ঢাকা জেলে কয়েদিদের শাস্তি দেওয়া, তাদের চিঠি লেখা, দাবি আদায়ের জায়গা এই ‘কেসটাকোল’। বেশ কয়েকটি পরিভাষার বিবরণ পাওয়া যায়- এখানে রয়েছে রাইটার দফা, চৌকি দফা, জলভরি দফা, ঝাড়– দফা, বন্দুক দফা, পাগল দফা, শয়তানের কল, দরজি খাতা, মুচি খাতা, পাহারা, রাইটার, খোকড়, সিকম্যান, মেডিক্যাল ডাইট ইত্যাদি। একজন পাঠকের জন্য এমনি বর্ণনা নতুন জগৎ খুলে দেবে। তিনি লিখতে লিখতে জানিয়ে দেন জেলে সে সময় আড়াই হাজার কয়েদি ছিল। জেলখানা যে নতুন একটা পৃথিবী, যারা কখনও যায়নি তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে এখানকার কাণ্ড কারখানা। এখানে যে অপরাধ হয় তার একটা ছবিও পাওয়া যাবে এই দিনলিপিতে। এ কারণেই খাতাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। যাতে প্রশাসনের অপরাধ বাইরে আসতে না পারে। পরে অবশ্য পুলিশের বিশেষ শাখা এই খাতাটি উদ্ধার করে যা জাতির জন্য একটি জরুরি দলিল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। লেখক প্রথমেই আমাদের জানিয়ে দেন, “জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে।” [পৃ. ২৭]

 

তাঁর বর্ণনা পাঠ করতে করতে আমরা সে জেলের খবর পেয়ে যাই। ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের লেখক তার রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে কারাগারের প্রচলিত নিয়মনীতি তুলে এনেছেন। আর এনেছেন কারাগারের অবস্থা; তাইতো লিখেছেন, “ঢাকা জেলে একটা কম্বল ফ্যাক্টরি আছে, ভালো ভালো কম্বল তৈয়ার হয়। বিশেষ করে জেলখানায় কয়েদিদের তিনটা করে কম্বল শীতের দিনে দেওয়া হয়, আর গরমের দিন দুইটা। ঢাকা জেলের কম্বল ফ্যাক্টরি সমস্ত জেলের কয়েদিদের কম্বল সাপ্লাই করে।” [পৃ. ৩৫]

এই কম্বলের খবর পাঠ করতে করতে আমাদের জানিয়ে দেন ইংরেজ আমলের তুলনায় পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক বন্দিদের কতটা বেশি নির্যাতন করা হয়। তিনি শুধু রাজনৈতিক বন্দিদের খবর নিতেন না। সাধারণ বন্দিদের কষ্ট বেদনাও তাঁর দৃষ্টিপথ এড়িয়ে যায়নি। এ কারণেই তিনি জেলে তেল তৈরির ঘানি বন্ধ করাতে ভূমিকা রাখেন। এখানেই গণমানুষের নেতার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। যিনি তাঁর সব ক্ষেত্রেই জনগণের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর প্রচেষ্টা নিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর বর্ণনা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না-

: আমি যখন ফরিদপুর জেলে যাই তখন দেখতে পেলাম মানুষ দিয়ে ঘানি ঘুরাইয়া তেল করা হয়। একদিন জেলার সাহেবকে আমি বললাম, ‘সরকার হুকুম দিয়েছে কয়েদি দিয়ে ঘানি ঘুরানো চলবে না, আপনার জেলে এখনও চলছে কেন’? তিনি বললেন ‘২/১ দিনের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হবে, গরু কিনতে হুকুম দেওয়া হয়েছে। উপরে লিখেছি। অনুমতি এলেই কয়েদিদের পরিবর্তে গরু দিয়ে করা হবে।’ সত্যই জেলার সাহেব আমি থাকতেই বন্ধ করে দিলেন। না দিলে হয়তো আমার প্রতিবাদ করতে হতো অথবা সরকারের কাছে দরখাস্ত করতে হতো। একটা লোক ঘানি ঘুরাতে ঘুরাতে অসুস্থ হয়ে একবার হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে কষ্টের কথা আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সে বলেছিল, ‘হুজুর দিনভর গরুর মতো ঘুরে রাতে যখন শুতে যাইতাম তখনও মনে হতো ঘুরছি, ঘুমাতে পারতাম না, দেখেন সেই যে শরীর নষ্ট হয়ে গেছে আর ভাল হয় নাই। খোদা আপনাকে বাঁচাইয়া রাখুক, আপনি জেলে না আসলে আর কতদিন যে গরুর মতো ঘুরতে হতো বলতে পারি না।’ [পৃ. ৪২-৪৩]

কারাগারের বর্ণনা পাঠ করতে করতে বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি ভোলেন না। আবার একজন পর্যবেক্ষকের চোখে দেখতে থাকেন মানুষকে। তাঁর এই পর্যবেক্ষণপ্রসূত দৃষ্টি পাঠককে সহায়তা করে নতুন এক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। কারো জেলে আসার কারণ অনুসন্ধান করেছেন গবেষকের দৃষ্টি দিয়ে। তার সঙ্গে কথা বলে, খুঁজে বের করেছেন লুদু নামে এক পকেটমারের জেলে আসার কারণ। তাঁর এই কাজটিকে আমরা অনায়াসে ফিল্ডওয়ার্ক বলতে পারি। অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের প্রয়াস ছিল জেলে থাকা অবস্থায়। আবার একই সঙ্গে অপরাধীর ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় ঢাল ব্যবহারের বিষয়টিও আমাদের নতুন এক সত্যে পৌঁছে দেয়। আমরা তাঁর লেখার সঙ্গে পথ চলতে চলতে জনৈক মাওলানার সাক্ষাৎ পাই যেখানে লেখা হয়,

দুপুর বেলা দেখা এক মওলানা সাহেবের সঙ্গে, কোরানে হাফেজ, তাঁর বাবাও খুব বড় পীর ছিলেন, কুমিল্লায় বাড়ি। হাজতিদের মধ্যে নামাজ পড়বার আগে বক্তৃতা করছেন, ওয়াজ করছেন, হাজতিরা বসে শুনছে। আমি দূরে দাঁড়াইয়া তাঁর বক্তৃতা শুনছি। তিনি বলছেন খুব জোরে ‘দরুদ শরীফ’ পড়ো। শয়তান দূর হয়ে যাবে। জোরে পড়ো। অনেকক্ষণ বক্তৃতা করলেন; সুন্দর চেহারা, অল্প বয়স, চমৎকার বলার কায়দা। তবে জামাটা খুব বড়। ঐটা দেখেই মনে সন্দেহ হলো। একদম পা পর্যন্ত জামা। বোধ হয় ছয় সাত গজ হবে কমপক্ষে। তজবি হাতেই আছে। মাঝে মাঝে চক্ষু বুজে কথা বলেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই মওলানা সাহেব কি মামলায় এসেছেন।’ আমাকে এক‘পাহারা’ বললো, ‘জানেন না, ‘রেপ্ কেস’; একটা ছাত্রীকে পড়াতো তার উপর পাশবিক অত্যাচার করেছে, মসজিদের ভিতর। মেয়েটার ১২/১৩ বৎসর বয়স, চিৎকার করে উঠলে লোক এসে দেখে ফেলে। তারপর ধরে আচ্ছামত মারধর করে। জেলে এসে কয়দিন তো হাসপাতালেই থাকতে হয়েছে। আমি বললাম ‘হাজতে এসে ধর্ম প্রচার শুরু করেছে।’ বেটা তো খুব ভণ্ড। [পৃ. ৪৪-৪৫]

বাংলাদেশে গণতন্ত্র সব সময় হুমকির সম্মুখীন থাকে এজন্য যে-এখানে রাজনীতিবিদদের মাঝে দুটি জিনিস স্পষ্ট একটি হলো আমি বা আমিত্ব, আমার ব্যক্তিগত লাভের কাছে বর্জন করা হয় সবকিছু। এমনি করেই নীতিহীন রাজনীতি আমাদের বাংলাদেশকে সকল সময় গণতন্ত্র ও গরিব মানুষকে বিপদাপন্ন করে। রাজনীতি বিষয়ে তার এই ভাবনা লিখেছেন এরকম যে, “রাজনীতি করতে হলে নীতি থাকতে হয়। সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হয়। বুকে আর মুখে আলাদা না হওয়াই উচিত।” [পৃ. ৫৮]

তাঁর রাজনীতি সঙ্গী করেছে জাতীয়তাবাদকে। দেশপ্রেম ছাড়া কারও পক্ষে উন্নতি করা যায় না। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এটি একটি শিক্ষা। শুধু রাজনীতিবিদই নয় এ বিষয়ে যারা কাজ করছেন তাঁদের জন্যও এই গ্রন্থের লেখা সহায়ক হবে। বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, তাই এদেশের শিল্পপতি এবং রাজনীতিজীবীরা বাংলাদেশের জন্য নয় কাজ করেছে নিজের জন্য। পাকিস্তান আমলেও বামপন্থিরা দুটি ধারায় বিভক্ত ছিল। একটি ছিল রুশপন্থি আর অপরটি চীনপন্থি। এই দুই ধারার চর্চা আজও বর্তমান। তারা নিজের দেশের গরিব মানুষের চাহিদার চেয়ে বিদেশি তত্ত্বকে সঙ্গী করতে চেয়েছে। আর সাধারণের সাথে তাদের দূরত্ব দিনে দিনে বেড়েছে। সে সময়ের একটি ধারা নিয়ে লিখেছেন তিনি, “এরা নিজদেরকে চীনপন্থী বলেও থাকেন। একজন এক দেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী প্রগতিবাদী হয়? আবার জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিৎকার করে।” [পৃ. ৫৭]

বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে চৈনিক বামপন্থিরা সামরিক শাসকদের পদলেহন করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। তখন দেশের তথাকথিত ‘চীনা বামপন্থি’রা ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব এই চিন্তা থেকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে পশ্চাৎমুখী করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এদের একাংশ মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করেছিল। আর স্বাধীনতার পর এদেশের বাম নেতাদের সামরিক স্বৈরাচারের পদলেহন তো আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে।

রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনাসমূহ পাকিস্তান আমল পেরিয়ে আজও সত্য। রাজনীতির মারপ্যাচে ক্ষমতাও যে কখনও কখনও বিপদজনক হয়ে যায় তার কথা তিনি বারবার দিনলিপিতে লিখেছেন। তেমনি একটি উদ্ধৃতি, “সকলেই তো জানে একদিন মরতে হবে। তবুও মানুষ অন্ধ হয়ে যায় স্বার্থের জন্য এবং হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। পরের ছেলেকে যখন হত্যা করে, নিজের ছেলের কথাটি মনে পড়ে না। মানুষ জাতি স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।” [পৃ. ১৮৪]

তিনি আশা প্রকাশ করেছেন বাঙালির দাবি আদায়ে সক্ষম হবেনই। এখানে দৃঢ় এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয় যিনি জেলকে নিজের বাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন। জেলে আসা তাঁর দলের কর্মীদের সাহস দিয়েছেন। তারা যেন আরামে থাকে সে জন্য জেল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো ছিল তাঁর নিত্য কাজ। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো যখনই বাড়ি থেকে খাবার আসছে তিনি ভাগ করে খাচ্ছেন। তিনি এক স্থানে লিখেছেন- “মুড়ি খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে কারাগারে। কাঁচা মরিচ, পিঁয়াজ, আদা আর সরিষার তৈল দিয়ে একবার মাখালে যে কি মজা তাহা আমি তো প্রকাশ করতে পারি না। আমার না খেলে চলে না।” [পৃ. ১৬৫]

এখানে জনপ্রিয়তা বলতে কারাগারের বন্দিদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। তার মানে তিনি একা খেতেন না। যেমন করে তার কাছ থেকে খিচুড়ি খাওয়ার জন্য সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। সে বর্ণনাটুকু তুলে রাখা হোক পাঠক যেন গ্রন্থটি সংগ্রহ করে পাঠ করতে পারে।

জেলে থেকেও যে আনন্দে থাকা যায় তার প্রমাণ জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর নানা কাজ। এখানে তিনি বাগান করতে করতে লিখছেন, “ফুলের গাছ চারদিকে লাগাইয়াছিলাম, নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করেছে। বড় চমৎকার লাগছে। আজকে সূর্যের জোর নাই, বেশ মেঘলা দিন। খুবই বাতাস। ঘরে ফিরে এসে বসলাম।” [পৃ. ৮০]

লক্ষ্য করুন পাঠক ফুলের নতুন পাতা দেখে তার আমোদ হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়। মেঘলা দিনে বাতাসের জোর নিয়ে লিখেছেন। তিনি জানতেন পাকিস্তানীরা তার দাবি মেনে নিবে না। একটাই পথ তার সামনে একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঝে গরিব বাঙালির অভাব দূর করতে হবে। পরিবারকে জানিয়ে দিচ্ছেন, “চিন্তা করিও না। জীবনে বহু ঈদ এই কারাগারে আমাকে কাটাতে হয়েছে, আরও কত কাটাতে হয় ঠিক কি! তবে কোনো আঘাতেই আমাকে বাঁকাতে পারবে না। খোদা সহায় আছে।” [পৃ. ২০১]

জেলে তার ঈদ কাটানোর বর্ণনা পাঠ করতে করতে মনে হয়, এইতো তো তাঁর নিয়তি। একে আনন্দের সাথে উদ্যাপন করতে হবে। তিনি চাইতেন না তাঁর পরিবারের সদস্যরা এই কষ্টের জীবন জানুক। এমনিতেই তাঁর জেলে থাকা নিয়ে পরিবারের সকলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কষ্টে আছে, এর সঙ্গে তাঁর শরীর খারাপের বিষয়টি আসলে তারা চিন্তিত হবেন।

কোনো শব্দ পরিবর্তন না করেই প্রকাশ করা হয়েছে ‘কারাগারের রোজনামচা’। যার ফলে অনেকের বিষয়ে জানা গেছে, যাদের কেউ কেউ নিজ রাজনৈতিক চিন্তার বদল ঘটিয়েছেন। কিন্তু একটি বিশেষ কালের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। যে কাল বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের একটি বর্ণনা পাওয়া যায় দিনলিপিতে যা আমাদের নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি তাঁর জীবনের কতটা জুড়ে বাংলাদেশ ছিল। একই সঙ্গে নিজেকে সাধারণের কাতারে ভাবার বিষয়টিও আমাদের সঙ্গী হয়।

আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই-বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস’! দেখে হাসলাম।

...ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি নূরে-এ-আলম- আমার কাছে ২০ সেলে থাকে, কয়েকটা ফুল নিয়ে আমার ঘরে এসে উপস্থিত। আমাকে বলল, এই আমার উপহার, আপনার জন্মদিনে। আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। তারপর বাবু চিত্তরঞ্জন সূতার একটা রক্তগোলাপ এবং বাবু সুধাংশু বিমল দত্তও একটি শাদা গোলাপ এবং ডিপিআর বন্দি এমদাদুল্লা সাহেব একটা লাল ডালিয়া আমাকে উপহার দিলেন।

...তখন সাড়ে চারটা বেজে গিয়েছে, বুঝলাম আজ বোধ হয় রেণু ও ছেলেমেয়েরা দেখা করার অনুমতি পায় নাই। পাঁচটাও বেজে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জমাদার সাহেব বললেন, চলুন আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রওয়ানা করলাম জেলগেটের দিকে। ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলেমেয়েদের চুমা দিলাম। দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসেলকে দিয়েই কাটালাম আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেটে থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।

...আর একটা কেক পাঠাইয়াছে বদরুন, কেকটার উপর লিখেছে ‘মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে’। বদরুন আমার স্ত্রীর মারফতে পাঠাইয়াছে এই কেকটা। ...শুধু মনে মনে বললাম, ‘তোমার স্নেহের দান আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। জীবনে তোমাকে ভুলতে পারব না।’



...ছয়টা বেজে গিয়াছে, তাড়াতাড়ি রেণুকে ও ছেলেমেয়েদের বিদায় দিতে হলো। রাসেলও বুঝতে আরম্ভ করেছে, এখন আর আমাকে নিয়ে যেতে চায় না। আমার ছোট মেয়েটা খুব ব্যথা পায় আমাকে ছেড়ে যেতে, ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি। ব্যথা আমিও পাই, কিন্তু উপায় নাই। রেণুও বড় চাপা, মুখে কিছুই প্রকাশ করে না। [২০৯-২১১]

জেলে থাকা অবস্থায় তিনি ভেবেছেন এ দেশের গরিব মানুষের কথা। অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন না কিন্তু জানতেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি বা সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমেই জাতীয় সম্পদ বাড়বে। এ মাটির প্রতি ভালোবাসা ছিল না পাকিস্তানীদের, এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন শেখ মুজিব। একই সঙ্গে বাঙালিদের একাংশ যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের পদলেহন করছেন তা তাঁকে ক্ষতাক্ত করেছে। তাই লিখেছেন, “সামান্য পদের বা অর্থের লোভে পূর্ব বাংলাকে যেভাবে শোষণ করার সুযোগ দিতেছে দুনিয়ার অন্য কোথাও এটা দেখা যায় না। ছয় কোটি লোক আজ আস্তে আস্তে ভিখারি হতে চলেছে। এরা এদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথাও চিন্তা করে না।” [পৃ. ২১৫]

কারাগারের এই দিনলিপি পাঠ করতে করতে জানতে পারি, তিনি বন্দি জীবনে একাকীত্ব দূর করতে কেমন করে পাখিদের সাথে সম্পর্ক করেছিলেন। সেই বর্ণনার নির্বাচিত অংশ উদ্ধৃত করা হলো,

সিভিল ওয়ার্ডের সামনে ছোট একটা মাঠ আছে। সেখানে কয়েকটা আম গাছ আছে। ফুলের বাগান করেছি। জায়গাটা ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। আবার কোথায় দিবে ঠিক কি? রাতে যখন ঘুমাতে পারি না তখন মনে হয় আর এখানে থাকবো না। সকাল বেলা যখন ফুলের বাগানে বেড়াতে শুরু করি তখন রাতের কষ্ট ভুলে যাই। ...ভোরের বাতাস আমার মন থেকে সকল দুঃখ মুছে নিয়ে যায়। আমার ঘরটার কাছের আম গাছটিতে রোজ ১০টা ১১টার সময় দুইটা হলদে পাখি আসে। ওদের খেলা আমি দেখি। ওদের আমি ভালবেসে ফেলেছি বলে মনে হয়। ১৯৫৮ সালে দুইটা হলদে পাখি আসত। তাদের চেহারা আজও আমার মনে আছে। সেই দুইটা পাখির পরিবর্তে আর দুইটা পাখি আসে। পূর্বের দুইটার চেয়ে একটু ছোট মনে হয়।

১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাখি দুইটা আসত। এবার এসে তাদের কথা আমার মনে আসে, আমি খুঁজতে শুরু করি। এবারও ঠিক একই সময় দু’টা হলদে পাখি এখানে আসত। মনে হয় ওদেরই বংশধর ওরা।

তারা বোধ হয় বেঁচে নাই অথবা অন্য কোথাও চলে গিয়াছে। ১০টা ১১টার মধ্যে ওদের কথা এমনিভাবেই আমার মনে এসে যায়। চক্ষু দুইটা অমনি গাছের ভিতর নিয়া ওদের খুঁজতে থাকি। কয়েকদিন ওদের দেখতে পাই না। রোজই আমি ওদের খুঁজি। তারা কি আমার উপর রাগ করে চলে গেল? আর কি ওদের আমি দেখতে পাব না? বড় ব্যথা পাব ওরা ফিরে না আসলে। পাখি দুইটা যে আমার কত বড় বন্ধু যারা কারাগারে একাকী বন্দি থাকেন নাই তারা বুঝতে পারবেন না। আমাকে তো একেবারে একলা রেখেছে। গাছপালা, হলদে পাখি, চড়ুই পাখি আর কাকই তো আমার বন্ধু এই নির্জন প্রকোষ্ঠে। যে কয়েকটা কবুতর আমার বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে তারা এখানে বাচ্চা দেয়। কাউকেও আমি ওদের ধরতে দেই না। সিপাহি জমাদার সাহেবরাও ওদের কিছু বলে না। আর বাচ্চাদেরও ধরে নিয়ে খায় না। বড় হয়ে উড়ে যায়। কিছুদিন ওদের মা-বাবা মুখ দিয়ে খাওয়ায়। তারপর যখন আপন পায়ের উপর দাঁড়াতে শিখে এবং নতুন ডিম দেওয়ার সময় হয় তখন ওই বাচ্চাদের মেরে তাড়াইয়া দেয়। আমি অবাক হয়ে ওদের কীর্তিকলাপ দেখি। [পৃ. ২১৯-২২০]

জেলে তিনি মুরগির যত্মও নিয়েছেন। অসুখ হলে চিকিৎসা করেছেন লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে।

কারাগারের রোজনামচা সম্পাদনার সময়ে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কখনো কখনো চোখের জলে ভিজেছেন। এর পেছনে কারণ কী ছিল? উত্তরও পাওয়া যায় গ্রন্থের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় একজন বাবা, একজন স্বামী কিংবা একজন রাজনৈতিক নেতার সবটুকু জুড়ে গরিব বাঙালির প্রতি প্রেম। ‘গরিব’ শব্দটির প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া যায়। কেননা, তিনি যখনই লিখেছেন কিংবা বলেছেন তার সবটুকু জুড়েই ছিল গরিব মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আবার বাবা হিসেবে তাঁর এই আবেগের ছবি পাই এভাবে,

রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের উপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই এদিক ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বলল, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কি করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, ‘তুমি রেহানাকে মার?’ রাসেল বলল, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিল, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না। জামাল বলল, ‘আব্বা আমি এখন লেখাপড়া করি।’ বললাম, ‘তুমি আমার ভাল ছেলে মন দিয়ে পড়িও।’ সন্ধ্যা হয়ে এলে ছেলেমেয়েদের চুমা দিয়ে ও রেণুকে বিদায় দিলাম। বললাম, ‘ভাবিও না অনেক কষ্ট আছে। প্রস্তুত হয়ে থাকিও।’ [পৃ. ২৩৪]

আরেকটি বর্ণনায় পাই, একজন বাবা তার সন্তানের জন্য আবেগাক্রান্ত হয়। সেই আবেগ পাঠককে খানিকটা আদ্র করবে সন্দেহ নেই। তিনি লিখেন-

৮ই ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, “আব্বা বালি চলো”। কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ওতো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, “তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।” ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে!

দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে। [পৃ. ২৪৯]

একই সময়ে আমরা উপলব্ধি করি এই ছোট্ট রাসেলকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। রাসেলের অপরাধ ছিল সে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান। আর বঙ্গবন্ধুর অপরাধও একটি তা হলো একটি পরাধীন জাতির প্রাণে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জাগিয়ে তুলে স্বাধীনতা এনে দেওয়া। আর যখনই মুক্তিসংগ্রামে নামলেন তখনই হত্যা করা হলো তাঁকে। এই রোজনামচা পাঠ করতে করতে মনে হয় তিনি যেন প্রস্তুত ছিলেন ঘাতকের হাতে নিজের জীবন দিতে।

তাইতো লিখেন, “নিজে ভোগ নাও করতে পারি, দেখে যেতে নাও পারি, তবে ভবিষ্যৎ বংশধররা আজাদী ভোগ করতে পারবে। ...এ দেশের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মা-বোনের দোয়া আছে আমাদের উপর। জয়ী আমরা হবোই। ত্যাগের মাধ্যমেই আদর্শের জয় হয়।” [পৃ. ৬৮]

তাঁর প্রস্তুতি ছিল নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করার। প্রস্তুতি নিয়েই নেমেছিলেন জনগণের জন্য লড়াইয়ে। প্রিয় পাঠক স্মরণের চেষ্টা করুন তাঁর প্রথম গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে তিনি লিখেছিলেন একজন মাঝি কেমন করে বলেছিলেন “পাকিস্তানের কথা তো আপনার কাছ থেকেই শুনেছিলাম, এই পাকিস্তান আনলেন!” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১০৬]

সাধারণের সঙ্গে যোগ থাকলেই সাধারণের উদ্ধৃতি লেখা যায় দিনলিপিতে, আবার বেশ সাবলীলভাবেই জেলজুলুমের কথাও পাওয়া যায়। তাইতো তিনি লিখেন, “আমি তো এই পথে জেনে শুনেই নেমেছি। দুঃখ তো আমার কপালে আছেই। দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে, কষ্ট ও জুলুম স্বীকার করতে হয়।” [পৃ. ২৩২]

জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জনসম্পৃক্ততাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রচলিত পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল নয়, বরং জনগণকে পাশে নিয়ে অধিকার আদায় করতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি স্পষ্টই লিখেন, “এই দেশের মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করবার জন্য যখন জীবন দিতে শিখেছে তখন জয় হবেই, কেবলমাত্র সময় সাপেক্ষ। ...যে রক্ত আজ আমার দেশের ভাইদের বুক থেকে বেরিয়ে ঢাকার পিচঢালা কাল রাস্তা লাল করল, সে রক্ত বৃথা যেতে পারে না।” [পৃ. ৭৩]

পাকিস্তান এবং ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে দেখা গেছে বিরুদ্ধ মতকে দমন করার জন্য হত্যাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। কখনও জনসভায় বোমা হামলা হয়েছে আবার কখনো বা ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে আহসানউল্লাহ মাস্টার ও শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে জনসভায় হত্যা অসংখ্য হত্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি। আবার একই সঙ্গে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সভায় বোমা হামলা করা হয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের নির্যাতন নিয়ে তিনি লিখেছেন, “মতের বা পথের মিল না হতে পারে, তার জন্য ষড়যন্ত্র করে বিরুদ্ধ দলের বা মতের লোককে হত্যা করতে হবে এ বড় ভয়াবহ রাস্তা। এ পাপের ফল অনেককেই ভোগ করতে হয়েছে।” [পৃ. ৫৯]

জেলে থাকা এই নেতা একবারের জন্যও আশা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণ যদি সক্রিয় হয় তাহলে অধিকার আদায় হবেই। তিনি জানেন যে, জেলে তাঁর ওপর যে মানসিক ও দৈহিক অত্যাচার করা হচ্ছে তাতে তাঁর মৃত্যু হতে পারে। দাবি আদায়ে নিজের বিশ্বাসের কথা বলেছেন, “দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা গেছে যে কোনো ব্যক্তি জনগণের জন্য এবং তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কোনো প্রোগ্রাম দিয়েছে, যাহা ন্যায্য দাবি বলে জনগণ মেনে নিয়েছে। অত্যাচার করে তাহা দমানো যায় না। যদি সেই ব্যক্তিকে হত্যাও করা যায় কিন্তু দাবি মরে না এবং সে দাবি আদায়ও হয়। যারা ইতিহাসের ছাত্র বা রাজনীতিবিদ, তারা ভাল করে জানেন। জেলের ভিতর আমি মরে যেতে পারি তবে এ বিশ্বাস নিয়ে মরব। জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার একদিন আদায় করবে।” [পৃ. ২৩৯]

জেলে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমের ওপর পাকিস্তান সরকারের নির্যাতনের যে খবর এসেছে সেসব লিখে রেখেছেন তার খাতায়। আটক করে এনেছে বিশিষ্ট সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। শুধু তাই নয়, বন্ধ করা হয়েছে প্রগতিশীল সব দৈনিকসমূহকে। তিনি জানতেন এই আটক আর বন্ধ করার পেছনে রয়েছে তাঁর ঘোষিত ৬-দফা কর্মসূচি। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বাস ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাকে বন্ধ এবং সম্পাদককে আটক করে ক্ষমতাসীনরা পার পাবে না।

মার্কিন গণতন্ত্রের রূপ বিষয়েও জানা যায় তাঁর লেখা থেকে। কেননা পৃথিবী জুড়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করতে মার্কিনীরা নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বারংবার। পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিতে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছে মার্কিনীরা। শুধু তাই নয় বিশ্বের বিভিন্ন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার মধ্যদিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে ক্ষমতাসীন করার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে চলছে আজও। যে কোনো গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে বড়ো হুমকি। তাঁর দিনলিপিতে লেখা এই উদ্ধৃতি পৃথিবীর যে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের দেয়াললিখন হতে পারে, “আমেরিকানরা নিজের দেশে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, আর অন্যের দেশে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য গণতন্ত্রকে হত্যা করে ডিক্টেটর বসাইয়া দেয়।” [পৃ. ১৩৫]

কুর্মিটোলার পথে চলছেন নিউজউইকের ভাষায় রাজনীতির কবি শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময়েও তাঁর লেখায় কাব্য মূর্ত হয়েছে। অনুমান করি, রাজনীতির সাথে সাথে বাঙালির চিরায়ত কবিমন তাকে তাড়িত করেছে সকল সময়ে। তাইতো অনিশ্চিত যাত্রার সময় লিখছেন, “একজন মেজর সাহেব আমাকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমি গাড়ির ভিতরে বসলাম। দুই পার্শ্বে দু’জন সশস্ত্র পাহারাদার, সামনের সিটে ড্রাইভার ও মেজর সাহেব। গাড়ি নাজিমুদ্দীন রোড হয়ে রমনার দিকে চলল। আমি পাইপ ধরাইয়া রাত্রের স্নিগ্ধ হাওয়া উপভোগ করতে লাগলাম, যদিও শীতের রাত। ভাবলাম কোথায় আমার নূতন আস্তানা হবে! কোথায় নিয়ে যাওয়া হতেছে! কিছুই তো জানি না। গাড়ি চললো কুর্মিটোলার দিকে।” [পৃ. ২৫৫]

সেনা জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর লেখার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, এদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের একাংশ বাংলা ভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয় আমাদের তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বিয়ে করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর দেখা হলে তিনি পুরো সময় ইংরেজি অথবা উর্দুতে কথা বলেন। তখন আমরা বুঝতে পারি আগরতলা মামলায় একজন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা কোন যুক্তিতে এখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি অবশ্য পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়েছিলেন।

‘কারাগারের রোজনামচা’ পাঠ করতে করতে আমাদের কাছে আরেকটি নতুন সত্য চলে আসে। ৭৫-এর বিয়োগান্তক ঘটনার পর অনেকেই বলতে চেয়েছেন, বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষকে চিনতে পারেননি। তারা যে তাঁকে হত্যা করতে পারে এটা তিনি বিশ্বাস করতেন না। সে ধারণা ঠিক ছিল না। তিনি জানতেন এদেশের মানুষ তার জন্য যেমন প্রাণ দিতে পারে তেমনি এদেশে এমন লোকও আছে যারা তার প্রাণ নিতে পারে। তাই লিখেন, “আমার যেমন নিঃস্বার্থ বন্ধু আছে, আমার জন্য হাসতে হাসতে জীবন দিতে পারে, তেমনই আমার শত্রু আছে, যারা হাসতে হাসতে জীবনটা নিয়ে নিতে পারে।” [পৃ. ১৭২]

৬৮ সালে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের সময় তিনি বাংলার মাটিকে সালাম জানিয়ে বলেছিলেন, “তোমাকে আমি ভালবাসি। মৃত্যুর পরে তোমার মাটিতে যেন আমার একটু স্থান হয়, মা।” [পৃ. ২৫৬]

তাই ৭১-এ বন্দি করার পর নানা কৌশলের পরও তাঁকে হত্যা করতে পারেনি পাকিস্তানী সামরিক শক্তি। তারা দেশ স্বাধীনের সাড়ে তিন বছর পর সফল হয়েছিল। টুঙ্গিপাড়ার জমিনে শুয়ে আছেন বাঙালির রাখাল রাজা। তাঁর চিন্তা আর লেখা বাঙালির জন্যই শুধু নয় বিশ্বের যে কোনো গণতান্ত্রিক চেতনার মানুষের ভাবনার উৎস হবে।

গ্রন্থ পরিচয়
কারাগারের রোজনামচা
শেখ মুজিবুর রহমান
প্রকাশক: বাংলা একাডেমি

মূল্য: ৪০০.০০
প্রথম প্রকাশ: মার্চ ২০১৭
প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ-নকশা: তারিক সুজাত





রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ এপ্রিল ২০১৭/সাইফ

Walton
 
   
Marcel