ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৭ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বাঙালির আত্মশক্তির উৎসব || সেলিনা হোসেন

সেলিনা হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৪ ১:১৯:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৬ ১০:২৪:১০ এএম
সেলিনা হোসেন। ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাঙালির নববর্ষ ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ বাঙালির এই উৎসব সম্পর্কে জানে এবং আগ্রহভরে প্রবাসী বাঙালিদের অনুষ্ঠানে আসে। বিশেষ করে এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধ, বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম উপাদান হিসেবে এর শেকড়সন্ধানী প্রেরণা মানুষকে আগ্রহী করে।

বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। দেশজুড়ে এই উৎসবের আয়োজন হয় বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায়। মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। মানুষ জড়ো হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। নববর্ষের পোষাকের ভিন্নতা দারুণভাবে দৃষ্টিনন্দন। লাল-সাদা রং স্নিগ্ধতার আবেশ ভরিয়ে তোলে। খাবারের বৈচিত্র্যও নববর্ষ অনুষ্ঠানের একটি দিক। জাতি খুঁজে নেয় যা কিছু তার নিজস্ব, তার সবটুকু। সেই সবটুকুর গৌরব প্রতিটি মানুষের বুকজুড়ে থাকে বলে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট নেই।

১৪১৯ সনে নববর্ষ উপলক্ষে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এটি বাঙালি সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্ব লাভের নজীর। অন্য দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শুধু নয়, সরকারি পর্যায়েও বাংলা নববর্ষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি একটি দিক। অপর আর একটি দিক আছে। গত কয়েক বছর ধরে নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার দুপাশে মিলনমেলা আয়োজিত হয়। ২০১২ সালে পঞ্চগড় উপজেলার অমরখানা সীমান্তে বসেছিল এই মেলা। দু’দেশের সীমান্তে বাস করা আপনজনদের সঙ্গে দেখা হয় নববর্ষের এই দিনে। স্বাধীনতার পরের এক দশকের বেশি সময় ধরে মানুষ বিনা বাধায় যাতায়াত করতে পারত। তখন স্বজনদের সঙ্গে শুধু দেখাই হতো না, ভালো একটা সময় কাটিয়েও আসা যেত। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। ফলে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। গরিব মানুষ পাসপোর্ট ভিসা করে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারে না। তাই নববর্ষের উৎসবের দিনটির জন্য তারা অপেক্ষা করে। স্বজনদের জন্য পিঠাপুলি মোয়ামুড়ি বানায়, নতুন কাপড় কেনে। দুপুর বারোটায় সীমান্ত রক্ষীরা অনুমতি দিলে বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারের এপাশে দাঁড়ায়। ভারতীয় নাগরিকরা তাদের সীমান্তে দাঁড়ায়। শুরু হয় হাসিকান্না, আনন্দ-খুশির উপহার বিনিময়। আবেগের উৎসমুখ খুলে কথার তুবড়ি ছোটে। মিটে যায় অনেকদিন স্বজনদের না দেখার তৃষ্ণা। কাঁটাতারে হাত রেখে কিংবা চিবুক ঠেকিয়ে কথা বলে মন ভরে না। বুকের মধ্যে হাহাকার জেগেই থাকে। আবার একটি নববর্ষের উৎসব দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় তাদের।

একসময় ফুরোয় সময়। সীমান্ত রক্ষীরা নিজ নিজ দেশের লোকদের সরিয়ে দেয় কাঁটাতারের সীমান্ত থেকে। জেগে থাকে সংস্কৃতির প্রবল শক্তি। কাঁটাতারের বেড়ার সাধ্য নেই সেই শক্তিকে উপেক্ষা করার। কাঁটাতারের গায়ে লেগে থাকে আশি বছরের নারী চুনিবালার চোখের জল। একই সঙ্গে আটকে থাকে ইউনেস্কো সনদের প্রথম পঙ্‌ক্তি:  Affirming that cultural diversity is a defining characteristic of humanity. এভাবেই সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে মানবিকতার মৌলিক শর্ত।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসব বিষয়ে ‘উৎসবের দিন’ প্রবন্ধে বলেছেন: ‘মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেই যেদিন আমরা আপনাদিগকে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের দ্বারা চালিত করি, সেদিন না-যেদিন আমরা আপনাদিগকে সাংসারিক সুখ-দুঃখ দ্বারা ক্ষুব্ধ করি, সেদিন না-যেদিন প্রাকৃতিক নিয়মপরম্পরার আপনাদিগকে ক্রীড়াপুত্তলিত যতো ক্ষুদ্র ও জড়ভাবে অনুভব করি, সেদিন আমাদের উৎসবের দিন নহে; সেদিন তো আমরা জড়ের মতো উদ্ভিদের মতো সাধারণ জন্তুর মতো, সেদিন তো আমরা আমাদের নিজের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করি না- সেদিন আমাদের আনন্দ কিসের? সেদিন আমরা গৃহে অবরুদ্ধ, সেদিন আমরা কর্মে ক্লিষ্ট, সেদিন আমরা উজ্জ্বলভাবে আপনাকে ভূষিত করি না, সেদিন আমরা উদারভাবে কাহাকেও আহ্বান করি না, সেদিন আমাদের ঘরে সংসারচক্রের ঘর্গরধ্বনি শোনা যায়, কিন্তু সঙ্গীত শোনা যায় না।

প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’

উৎসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই মহৎ ব্যাখ্যার উদাহরণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালির আত্মশক্তির উৎসব। মনুষ্যত্বের জাগরণের উৎসব। গ্রামীণ অর্থনীতি হালখাতার উৎসব। মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

১৪২৪ বঙ্গাব্দের নববর্ষ বাঙালির জীবনে সুখবার্তা বয়ে আনুক যেন এই জাতি মানুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে মহৎ হয়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop