ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মনে পড়ে রোমেনা আফাজ

তাপস রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-৩০ ৫:৪২:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-১৭ ৪:২০:৪৭ পিএম
রোমেনা আফাজ, ডানে বইয়ের প্রচ্ছদ

তাপস রায় : ‘বই পাঠের নেশা ধরানো ছিল যার কাজ, দস্যু বনহুরখ্যাত তিনি রোমেনা আফাজ’- কথাটি মিথ্যে নয়। স্বাধীনতারও আগে, ১৯৬৫ থেকে আশির দশক পেরিয়ে নব্বইয়ের সূচনালগ্ন পর্যন্ত দস্যু বনহুর সিরিজে পাঠক এতোটাই বুঁদ হয়ে ছিল যে, প্রকাশক এক পর্যায়ে লেখিকাকে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, আপনি যদি লিখতে না চান তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে লেখাব!

না। লেখিকা প্রকাশককে হতাশ করেননি। তিনি পাঠককেও বঞ্চিত করেননি দেশীয় পটভূমিতে গোয়েন্দা কাহিনির রস আস্বাদনে। সে সময়ের শতসহস্র পাঠক এর প্রতিদান দিয়েছিলেন লেখিকাকে হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই দিয়ে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, তখন বাংলাদেশে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দুর্ধর্ষ স্পাই MR-9 এসে গেছেন। দোর্দণ্ড প্রতাপে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাঠকের হাতে, বইয়ের ব্যাগে, পড়ার টেবিলে। যদিও পাঠকের হাতে মাসুদ রানার আগেই দস্যু বনহুর পৌঁছেছিল। দুজনের প্রকাশকালের পার্থক্য খুব বেশিদিনের নয়- এক বছর। এর বাইরে ওপার বাংলায় তখন রয়েছে দস্যু মোহন, দস্যু বাহরাম এমনকি কিরীটি রায়। তাদের পাঠকও কম নয়। কিন্তু সব ছাড়িয়ে বনহুর প্রকাশের পর পাঠক আপন করে নিল। এ দস্যুর প্রতি পাঠকের ছিল অপার ভালোবাসা, অকুণ্ঠ পক্ষপাত। মাথায় কালো হ্যাট, মুখে রুমাল বেধে বনহুর যখন ঘোড়ার পিঠে অরণ্যে ছুটে চলত তখন পাল্লা দিয়ে ছুটত পাঠকের কল্পনা। ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে পাঠ্যবইয়ের আড়ালে পঠিত হতো বনহুর। সেখানেই শেষ নয়। গল্পের শেষ পরিণতি জানতে মাঝরাতে টুটে যেত কিশোরের ঘুম। বনহুরের প্রতি নূরীর প্রেম রাত জাগা হ্যারিকেনের আলোয় শিহরণ জাগাতো গ্রাম্য কিশোরীর মনে। অনেক তরুণী পাঠক বনহুরের প্রেয়সী মনিরার মাঝে খুঁজে পেত নিজের ছায়া। এভাবেই বনহুরকে নিয়ে রোমেনা আফাজ পৌঁছে গিয়েছিলেন শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম্য তরুণী এমনকি কুলবধূদের কাছেও।

চিরকালের বঞ্চিত যারা তাদের নায়ক হয়ে উঠেছিল বনহুর। সে যেন বাংলার রবিনহুড। যে ধনীর অবৈধ সম্পদ লুট করে এনে বিলিয়ে দেয় গরিবদের। শোষিতের বঞ্চনার প্রতিবাদে নিজেই ঘোষণা করে শোষকের শাস্তি। দুষ্কৃতিকারীর শেষ পরিণতি জানতে (যা অনেক সময় বাস্তবে দেখা যায় না) পাঠক উল্টে যেত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা- বইয়ের একেবারে শেষ অবধি। পাঠক ততক্ষণে কল্পনায় নিজেই হয়ে উঠত দস্যু বনহুর।  

রোমেনা আফাজ স্মৃতি সংগ্রহশালা


এখানেই রোমেনা আফাজের লেখনীশক্তির পরিচয়। বনহুরের দুরন্ত প্রতিবাদী জীবনের স্বপ্ন তিনি পাঠকের চোখে এঁকে দিতে পেরেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। তিনি এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যার মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও নিষ্ঠা থাকবে। দেশীয় পটভূমিতে সে হয়ে উঠবে পাশের জন। তার চারিত্রিক দৃঢ়তায় আকৃষ্ট হবে কিশোর-তরুণেরা। যে কারণে এই সিরিজের স্লোগান ছিল: সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দস্যু বনহুর। যে সর্বদা এক কথায় গরিবের বন্ধু চোরাকারবারীদের চিরশত্রু, সাক্ষাৎ যমসম।

১৯৬৬ সালে লন্ডনের কাগজ ‘আওয়ার হোম’ রোমেনা আফাজকে বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনির লেখিকা আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে তুলনা করে লিখেছিল: ‘শি মে ওয়ানডে বি নোন অ্যাজ আগাথা ক্রিস্টি’। লেখিকার ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ বইটির সমালোচনা করে পত্রিকাটি এ মন্তব্য করেছিল। সেখানে আরো যা লেখা ছিল তার বাংলা তর্জমা হলো: ‘তাঁর রচনাশৈলি আকর্ষণীয় এবং কাহিনি চিত্তাকর্ষক। তিনি ইতিমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের বাঙালি পাঠকের কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। বিলাতের বাঙালি পাঠকরাও তাঁর বই পছন্দ করেন।’

সত্যি বলতে সে সময় পশ্চিম বাংলায় ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। তবে উভয় বাংলায় রোমেনা আফাজকেই বেশি পাঠকপ্রিয় মনে করা হতো। এর মূলে ছিল এই লেখিকার ‘বনহুর’ এবং ‘রক্ত আঁকা ম্যাপ’ দুটি থ্রিলার সিরিজ। এখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক সেই সময়ে একজন বাঙালি লেখিকা রহস্য উপন্যাস লিখতে আগ্রহী হলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের লেখিকার কিশোরীবেলার দিকে ফিরে তাকাতে হবে।



রোমেনা আফাজের জন্ম বগুড়া জেলার শেরপুর থানায়, ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে। বাবা কাজেম উদ্দীন আহম্মেদ ছিলেন পুলিশ অফিসার। কার্যোপলক্ষে তাকে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। ফলে তিনিও বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ তো বটেই দিল্লি, আগ্রা, হুগলি, কলকাতা, লক্ষ্মৌ, মেদিনীপুর প্রভৃতি স্থান ঘুরেছেন। বাবার মুখে শুনেছেন অসংখ্য অপরাধ ও অপরাধীর রোমহর্ষক কথা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তাঁর কিশোর মন সেগুলো প্রভাবিত করেছিল। যদিও তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা কবিতা দিয়ে। মা’র অনুপ্রেরণায় লিখেছিলেন প্রথম কবিতা ‘বাংলার চাষী’। অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘বগুড়ার কথা’ পত্রিকায় সেটি প্রকাশিত হয়। কবিতাটির প্রথম চার পঙ্‌ক্তি:

‘বাংলার চাষী

মুখে নাই হাসি

পেটে নাই ভাত

খাটে দিনরাত।’

কবিতাটিতে অল্প বয়সি এক কিশোরীর বাংলার কৃষকজীবনের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনার কথা ফুটে উঠেছে। পরবর্তী জীবনে তাঁর সাহিত্যে আসানসোলের সাঁওতালদের দুঃখগাথা চিত্রিত হয়েছে। তিনি গণমানুষের কথা বলতে চেয়েছেন। আরো চেয়েছেন তাদের ভেতর থেকেই একজন নায়ক উঠে আসুক যে তাদের হয়ে প্রতিবাদ করবে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় হবে নির্মম, অধিকার আদায়ে হবে তেজদীপ্ত। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা বনহুরের মধ্যে দেখতে পাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এক সময়ের বহুল পঠিত রোমেনা আফাজ এখন বিস্মৃতপ্রায়। তার স্মৃতিটুকু অন্তত টিকিয়ে রাখার সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। জন্মদিন-মৃত্যুদিনে কোনো সাহিত্যপাতায় ছাপার অক্ষরে তাঁকে দেখা যায় না। তাঁকে স্মরণ করে উচ্চারিত হয় না শোক অথবা গৌরববাক্য। এ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বগুড়ার জলেশ্বরীতলার মন্তেজুর রহমান আঞ্জু। পারিবারিক উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতি ঘর’।

সংগ্রহশালায় লেখকের সঙ্গে মন্তেজুর রহমান আঞ্জু


আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সে ঘর ঘুরে দেখার। ছোট্ট সেই ঘর অসংখ্য বই, ফটোগ্রাফ, চিঠিপত্র এবং বিবিধ পুরস্কারে সাজানো। সেখানে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে কেটে যায় সময়। রোমেনা আফাজের বিভিন্ন বয়সের দুর্লভ ছবি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার মধুর সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। আঞ্জু ভাই নিজেই বর্ণনা করছিলেন সেইসব ছবির পেছনের গল্প। কিন্তু এ তো গল্প নয়, উঠে আসতে লাগল বাস্তব যা অনেক আগেই অতীত হয়ে গেছে। লেখিকার লেখা প্রায় সব বই-ই সেখানে সযত্নে গুছিয়ে রাখা আছে। আছে কাজের স্বীকৃতি পুরস্কারের ক্রেস্ট। উল্লেখ্য যে, রোমেনা আফাজ শুধু লেখিকাই ছিলেন না, তিনি সমাজকর্মী ছিলেন। কল্পনাতীত সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ত্রিশটিরও বেশি সংগঠনের সঙ্গে সক্রীয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে সংগ্রহশালায় যে জিনিসটি আমাকে অভিভূত করেছে তা হলো ভক্তের লেখা চিঠি। একটি-দুটি নয়, শত শত চিঠি, যেগুলো গুছিয়ে রাখা হয়েছে বড় দুটি আলমিরায়!

সংগ্রহশালায় রোমেনা আফাজের সঙ্গে চিত্রপরিচালকদের ছবি দেখে কৌতূহল জাগল। আঞ্জু ভাই কৌতূহল মেটালেন। তার মুখ থেকেই জানলাম, রোমেনা আফাজের লেখা গল্প নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও বনহুরকে কেন্দ্র করে মাত্র একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ‘দস্যু বনহুর’ শিরোনামের সেই চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় সোহেল রানার বিপরীতে ছিলেন অঞ্জনা। উল্লেখ্য চিত্রনায়িকা অঞ্জনার প্রথম ছবি ছিল সেটি। প্রায়ই শুনি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে মৌলিক গল্পের সংকটের কথা। তারপরও এ দেশে ‘গরীবের রাজা রবিনহুড’ ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তি যায়। রাজধানীর সিনেপ্লেক্সে ধুমসে চলে আয়রন ম্যান, স্পাইডার ম্যান, ব্যাটম্যান, সুপারম্যান। অথচ আমরা বনহুরকে নায়ক বানাতে পারি না। হায়! সংগ্রহশালা থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে পড়ে রোমেনা আফাজের কবিতা:

‘জীবনকালে যে পেলো না মালা

চিনিলো না যারে করি অবহেলা

মৃত্যুর পরে কি হবে তার সুনাম!

কি হবে আর তাঁহারে স্মরি!

কি হবে আর স্মৃতিসৌধ গড়ি!

প্রদীপ যদি নিভে যায়

কি হবে তায় তৈল ভরে হায়!

(প্রতিভার ক্ষয়)



 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel