ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

দুনিয়া বদলে দেয়া বই

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-১৪ ২:২৮:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-১৫ ৭:১০:৪৬ পিএম

মুম রহমান : সাটন এলবার্ট গ্রিগস (১৮৭২-১৯৩৩) মার্কিন লেখক। লেখালেখির পাশাপাশি চার্চে পুরোহিতের কাজ করতেন এবং সমাজকর্মেও নিয়মিত ছিলেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইম্পেরিয়াম ইন ইম্পেরো’ কাল্পনিক প্রেক্ষাপটে রচিত। কিন্তু কল্পনাটি ভীষণ শক্তিশালী। তিনি এই উপন্যাসে এমন এক দেশের কথা বলেছেন, যেটি আমেরিকার মধ্যে অবস্থিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র যেখানে কালো-আমেরিকানরা থাকবে। এমন সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী ও বৈপ্লবিক লেখকও বই ভয় পেতেন, সমীহ করতেন। তার একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করছি: ‘অধিকাংশ সময় কিছু কিছু বই পড়তে যুদ্ধে লড়াই করার চেয়ে বেশি সাহস লাগে।’

পড়ুয়ারা নানা কারণে বই পড়েন। কেউ হয়তো বিনোদন খোঁজেন, কেউ জ্ঞান খোঁজেন, কেউ শখে পড়েন, কেউ না-পড়ে থাকতে পারেন না। যে যে-কারণেই বই পড়ুক না-কেন এটা সত্যি যে, সব বই ভাবনার দেয়ালে প্রবল ধাক্কা দেয় না। মানুষের চিন্তা-চেতনা নাড়িয়ে দেয়ার মতো বই পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। তবে এমন বইও আছে যা একবার পড়লে পূর্ব-ধারণায় ফিরে যাওয়া কঠিন। প্রচলিত চিন্তা-ভাবনা বদলে দেয়ার মতো বেশ কিছু বই পৃথিবীতে এসেছে। সাটন এলবার্ট গ্রিগসের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলা যায়, এমন বই সত্যিই আছে যা পড়তে যুদ্ধে যাওয়ার মতোই সাহস লাগে।

ধরা যাক, চার্লস ডারউইনের ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ বইটির কথা। বইটির পুরো নাম ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন, অর দ্য প্রিজারভেশন অব ফেভারড রেইসেস ইন দ্য স্ট্রাগল ফর লাইফ’। ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রকাশ হওয়ার পরপরই এই বই হইচই সৃষ্টি করে। মূলত বিবর্তন ধারণার সূত্রপাত হয় এই বই থেকেই। পৃথিবীর সকল ধর্মমতে মানুষ কিংবা প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে স্রষ্টার হাতে। সৃষ্টি তত্ত্বের ধর্মীয় ধারণায় একটা ইঁদুর, বানর, বিড়াল কিংবা মানুষ সবাই তার আদিরূপে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ডারউইনের বিবর্তনবাদে বলা হয়, মানুষ কিংবা কুকুর কিংবা বানর- কোনো প্রাণীই এই চেহারায় ছিলো না। কালে কালে বিবর্তিত হয়ে তাদের আজকের রূপটি এসেছে এবং এ রূপও স্থির নয়। শুধু তাই নয়, প্রাণীদের সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই। প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় ডাইনোসর হারিয়ে গেছে কিন্তু তেলাপোকা টিকে আছে। অর্থাৎ যোগ্যতমরাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে।

বলাবাহুল্য, ডারউইনের এই ধারণা স্পষ্টতই ধর্মবিশ্বাস বিরোধী। ফলে তার এবং তার বইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। চার্চে চার্চে তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়। তার বইটি ক্রমশ বিতর্কিত ও আলোচিত হতে থাকে। গবেষণা লব্ধ এই বইয়ের মতামত আপনি স্বীকার বা অস্বীকার যা-ই করুন না-কেন একটা বিষয় পরিষ্কার যে, বইটি পড়ার পর আপনি আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারবেন না। সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে আপনাকে পুনরায় ভাবতে বসতে হবে। এমন বই পড়া তো যুদ্ধে যাওয়ারই সামিল।

সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন। ইংরেজ প্রকৃতিবিদ ডারউইনের জন্মের বহু বছর আগেই ইংরেজ গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী নিউটন মানুষের যুগ যুগের ভাবনাকে বদলে দেয়ার মতো গ্রন্থ লিখেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পিন্সিপিয়া’ ১৬৮৭ সালের ৫ জুলাই প্রকাশিত হয়। আজকের আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও গণিতের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায় এই এক বই দিয়ে। বইটিতে নিউটনের বিখ্যাত মধ্যাকর্ষণ ও গতির সূত্রাদি ঠাঁই পেয়েছে। তার এইসব সূত্র অবলম্বন করেই মানুষ রকেট তৈরি থেকে শুরু করে চাঁদে অভিযানের মতো কার্যাদি সম্ভব করেছে। এখন পর্যন্তু বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বই সবার ধারণাতেই আমূল পরিবর্তন এনেছে। ডারউইন বা নিউটনের ভাবনা বৈজ্ঞানিক। পাশ্চাত্য সমাজেই শুধু নয়, সারা পৃথিবীতে তাদের লিখিত বই ভিন্ন ভাবনার খোরাক দিয়েছে। প্রাচ্য ভাবনার ক্ষেত্রে কনফুসিয়াসের ‘এনালেক্টস’র ভূমিকা অনেকটা নান্দনিক, দার্শনিক এবং নৈতিক।

সাহিত্যের সার বা টুকিটাকি সংগ্রহকে ইংরেজিতে এনালেক্টস বলে। কনফুসিয়াসের এনালেক্টস আর যাই হোক টুকিটাকি সংগ্রহ নয়। প্রাচীন চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের দর্শন ও বীক্ষার এটি গুরুত্বপূর্ণ এক সংগ্রহ। তার বিভিন্ন মতবাদ ও ভাবনার পাশাপাশি সে সময়ের জ্ঞান চর্চার এক পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ এনালেক্টস যা চীন এবং পূর্ব এশিয়ার মানুষকে আজও প্রভাবিত করে। ধারণা করা হয় ৪৭৫ থেকে-২২১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কনফুসিয়াসের মৃত্যুর বহু বছর পর তার শিষ্যের শিষ্যগণ এগুলো সংকলিত করেছেন। কনফুসিয়াস মতবাদ অনুসারীদের জন্যেই শুধু নয়, যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের মনভাবনায় এই বই বদল আনতে পারে। চিন্তাবিদ ও দার্শনিক কনফুসিয়াসের মৌলিক ও অনবদ্য ভাবনা কয়েকশ বছর ধরে চীন ও তার আশপাশের অঞ্চলের মানুষকে আজও ভাবায়। অবশ্য সকল ভাবনা চিরন্তন নয়। খুব আলোড়ন তুলে কোনো কোনো ভাবনা জলের মধ্যে কিছু ঢেউ দিয়ে হারিয়ে যায়। কিছুটা স্মৃতি থাকে। তেমনি ঘটেছিলো সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’ গ্রন্থটি নিয়ে। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত এই বই মনোঃসমীক্ষণের জগতে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। ফ্রয়েড প্রথম ব্যক্তি যিনি মনোবিজ্ঞান, মনোবিদ্যা, মনোচিকিৎসা ইত্যাদির জগতে নতুন নতুন ভাবনা দিয়েছিলেন। মানসিক সমস্যাকে চেষ্টা করেছিলেন যৌক্তিকভাবে দেখার। আজকের দিনে ফ্রয়েডের সকল তত্ত্ব খাটে না, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি অতিরঞ্জনের দোষে দুষ্ট। তবু এ কথা আজও সত্য ‘দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস’ বইটি এখনও ভাবনা উদ্রেককারী এবং পাঠে আনন্দ দেয়। বইটিতে ফ্রয়েড তার বিখ্যাত স্বপ্নতত্ত্ব, ইডিপাস কমপ্লেক্স ইত্যাদি তুলে ধরেন। মানুষের অবচেতন মনের ভাবনা, স্বপ্নের মধ্যে তার প্রভাব এবং মানব-চরিত্রে যৌনতার বিকাশ ইত্যাদি এই বইতে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়। ফ্রয়েড এই বইটি কমপক্ষে আটবার সংশোধন, সংযোজন করেছেন। যদিও প্রথম ছয়শ কপি বই বিক্রি হতে বেশ কয়েক বছর লেগেছে, অথচ আজ এই বই ক্লাসিক। বছরে হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়। বিশ্বের বহু ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে এটি।

১০২৫ খ্রিস্টাব্দে ১৪ খণ্ডে প্রকাশিত হয় ‘কেনন অফ মেডিসিন’ গ্রন্থটি। আরব দেশীয় চিকিৎসাবিদ ইবনে সিনা একাই এই বিশাল চিকিৎসা কোষগ্রন্থ প্রণয়ন করেন দীর্ঘ দিনের সাধনায়। প্রাচীন গ্রীস, পারস্য এবং ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে এগারো শতকের চিকিৎসা শাস্ত্রের সকল জ্ঞান একত্র করে রচিত হয়েছে ইবনে সিনার বিখ্যাত ‘কেনন অফ মেডিসিন’। এই বই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের ভিত্তি প্রস্তর তৈরি করে দিয়েছিল। শারীরবিদ্যা পরিচিতি, রোগ ও প্রতিকার, সংক্রামক ব্যাধি, রোগের লক্ষণ-বিচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে এই বইতে আধুনিক ভাবনার প্রকাশ দেখা যায়। ইবনে সিনার এই বই মানুষকে চিকিৎসা নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছে, বদলে দিয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়নের ধরন ও প্রকৃতি। বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থবিজ্ঞানের নানা বইয়ের কথা হলো। এবার একটা ইতিহাসের বইয়ের কথা না-বললেই নয়। বিজ্ঞান যদি আমাদের ডানা হয় ইতিহাস তবে শেকড়। ইতিহাসের সঠিক পাঠ ছাড়া সভ্যতার বিবর্তন বোঝা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। ইতিহাসের জনক বলা হয় হেরাডোটাসকে। ইতিহাসবেত্তা থুকিডাইডেস, দার্শনিক সক্রেটিস ও নাট্যকার ইউরোপিদিসের সমকালীন ব্যক্তি হেরাডোটাস পঞ্চম শতকের গ্রীক ইতিহাসবিদ। তিনি প্রথম ইতিহাসবিদ যে নিজে ইতিহাসের নানা উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন, বহু লোকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। পাশ্চাত্য ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভূগোলের অনেক তথ্যই উঠে এসেছে তার লেখা ‘হিস্টোরিজ’ গ্রন্থে। মূলত পঞ্চম শতকের গ্রীক-পারস্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত তার এই গ্রন্থ ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেছে অকাতরে। আজও হেরাডোটাসের ‘হিস্টোরিজ’ পাশ্চাত্য সভ্যতা অনুধাবন করতে একটি যুগান্তরী গ্রন্থ হিসাবে বিবেচ্য।



অন্তত একটি গ্রন্থ যা আমাদের রাষ্ট্র ভাবনার জগতে বদল এনেছে, তার নাম বলতে হলে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’র কথা বলতে হবে। গণ মানুষ কিংবা গণতন্ত্রের কথা এই বইয়ে প্রথম উঠে এসেছে। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত বইটিতে ব্যক্তি ও তার স্বাধীন চিন্তাকে সবার উপরে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। সভ্য রাষ্ট্রে ব্যক্তির বিকাশই সবচেয়ে বড় উপাদান। নৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক- সকল অর্থেই সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার কথা বলেছেন ইংরেজ দার্শনিক স্টুয়ার্ট মিল। তাই এই গ্রন্থ রাষ্ট্রের ও ব্যক্তির সম্পর্ককে নতুন করে ভাবিয়েছে। বদল এনেছে পুরনো ভিক্টোরিয়ান কিংবা সামন্ত ভাবনায়। সক্রেটিসের ছাত্র প্লেটোর রাষ্ট্র ভাবনাও বিশেষ আলোচ্য। দর্শন ও রাজনৈতিক তত্ত্বালোচনায় প্লেটোর ‘দ্য রিপাবলিক’ পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। পরবর্তীকালে বহু জ্ঞানী-গুণিজনের ভাবনার সীমানায় অদল-বদল ঘটে গেছে এই একটি বইয়ের কারণেই। ডায়ালগ বা সংলাপ আকারে লেখা এই বইতে ন্যায়শাস্ত্র, বিধি-বিধান, কাব্যচর্চা, আত্মিক বিকাশ ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে রচিত এই বই আজও প্রাসঙ্গিক। বইয়ের নৈতিকতা নিয়ে অনেকের অনেক কথাই আছে। অনেকেরই ধারণা, বই হতে হবে জ্ঞানের আধার, নানা নীতি কথা থাকবে তাতে। বিশেষ করে সাহিত্যের নৈতিকতা নিয়ে কথার তো শেষ নেই। অন্তত একটি বইয়ের কথা জানি, যা সাহিত্যের নৈতিকতার ধারণা পাল্টে দিয়েছিলো। ইংরেজ ঔপন্যাসিক ডি এইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ যারা পড়েছেন তারা কম-বেশি একে অশ্লীল উপন্যাসই বলেন। ১৯২৮ সালে এই বই ছাপা হয় ইতালিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। লেখকের স্বদেশে এটি আলোর মুখ দেখে আরো ৩২ বছর পর ১৯৬০ সালে। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা পেঙ্গুইন এই বই ছাপার সাথে সাথে মামলায় জড়িয়ে পড়ে। যৌনতায় ভরপুর এই বইয়ের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলা হয়। পেঙ্গুইন মামলা জেতার ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই এই বইটি ৩০ লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়। বই বিক্রির ইতিহাসে এ এক অনন্য নজির। অন্যদিকে সাহিত্যে যৌনতা, নৈতিকতা, শ্লীলতা ইত্যাদি নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোড়াক জোগায় এই বই এবং এর বিরুদ্ধে পরিচালিত নিষেধাজ্ঞা। উচ্চবিত্ত এক নারীর সঙ্গে শ্রমজীবি এক পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে রচিত এই বই যৌনতার বিস্তৃত বর্ণনার পাশাপাশি তখনকার বিবেচনায় ছাপার অযোগ্য বহু শব্দ ছিলো। আজকের দিনে অনেক সমালোচকই দাবি করেন, এই উপন্যাসের গল্পটি লরেন্সের নিজের অসুখি দাম্পত্য জীবন দ্বারা অনুপ্রাণিত। লেখক তার নিজের শৈশবের শহর নটিংহামশায়ারের পরিপ্রেক্ষিতে বইটি লিখেছেন।

লরেন্সের স্ত্রী এক তরুণ কর্মচারীর সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলো- গল্পটিতে তার প্রভাবও আছে। আপাতভাবে অনেকেই ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসকে যৌনতা আর অশ্লীলতার প্রকাশ মনে করলেও বিখ্যাত ব্রিটিশ পণ্ডিত, তাত্ত্বিক, সাহিত্য সমালোচক রিচার্ড হুগার্ট মনে করেন, এই উপন্যাস আসলে বিশুদ্ধতা ও সম্পূর্ণতার জয় গান গায়। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের নানা বর্ণ চিত্রায়িত করা হয়েছে এ উপন্যাসে। কখনো কখনো একটি বই একটি ভাষার জন্যেও দিক নির্দেশনা হতে পারে। জিওফ্রি চসারের বিশ্বখ্যাত ‘দ্য ক্যান্টাবেরি টেলস’র ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। ১৪শ শতকে গদ্যে-পদ্যে রচিত এই উপাখ্যান ইংরেজ ভাষা ঋদ্ধ করেছে। সেই সময়ে অভিজাত ইংরেজরা ল্যাটিন কিংবা ফরাসি ভাষায় কথা বলাকে গুরুত্ব দিতো। চসার তার এই গ্রন্থে সাধারণ মানুষের মুখের প্রচলিত ইংরেজি তুলে এনেছেন সাহিত্যিক দক্ষতায়। বলা হয়ে থাকে, চসারের এই বই ইংরেজি অভিধানকে বর্ধিত করেছে, সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে এই বই একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। লন্ডন থেকে একদল সাধু-সন্তু ক্যান্টাবেরি ক্যাথিড্রালে যাচ্ছে সন্তু টমাস বেকেটের মঠ পরিদর্শনে। এই তীর্থযাত্রাকালে তাদের মুখ দিয়েই মধ্যযুগের প্রচলিত ইংরেজিতে গল্প বলিয়েছেন জিওফ্রি চসার। ইংরেজি সাহিত্যের শুরুর দিককার বিশাল এই কর্ম আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্ব সহকারে পাঠ করানো হয়।

বিশ্বের অনেকটা আজ আমরা হাতের মুঠোয় পেয়েছি। কিন্তু খ্রিস্টজন্মের আগে একজন একক মানুষের পক্ষে বিশ্ব সম্পর্কে কতটুকু জানা সম্ভব? যখন তেমন কোনো প্রযুক্তি কিংবা যন্ত্রপাতি ছিলো না তখন ক্লদিয়াস টলেমি একাই বসে গেলেন বিশ্ব মানচিত্র আঁকতে। টলেমির ‘জিওগ্রাফিয়া’ ভূগোল ও মানচিত্র বিদ্যা চর্চায় অগ্রগামী বই। রোমান সাম্রাজ্যের নানা তথ্য উপাত্ত, সরকারি নথিপত্র এবং মারিনাস অফ টায়ারের মানচিত্র ঘেটে (যা এখন হারিয়ে গেছে) টলেমি তার ‘জিওগ্রাফিয়া’ রচনা করেন। নবম শতকে এর আরবি অনুবাদ এবং ১৪০৯ সালে করা একটি ল্যাটিন অনুবাদের কল্যাণে টলেমির ভূগোলের কথা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আজকের আধুনিক মানচিত্র বিদ্যা, ভূগোল চর্চার ক্ষেত্রে টলেমির এই বই ভৌগলিক অভিধান হিসেবে দিক নির্দেশনা দিয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মানচিত্র ও ভূগোল চর্চার দলিল হয়ে আছে। টলেমি বিশ্বের চারভাগের একভাগ অঞ্চল সম্পর্কে জানতেন, তার তথ্য-উপাত্তের অনেক কিছুকেই আজ বিশ্বস্ত মনে করা হয় না কিন্তু ভূগোল সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং মানচিত্র বিদ্যাকে অগ্রসর করে তোলায় তার অবদান অনস্বীকার্য। নিকলো ম্যাকিয়াভেলির লেখা ‘দ্য প্রিন্স’ ১৫১৩ সাল থেকেই নানা জনের হাতে বিতরণ করা হয়, তবে তা সবার জন্য ছাপা হয় ১৫৩২ সালে। ছাপা হওয়ার পর থেকেই প্রশংসা ও নিন্দার ঝড় বয়ে যেতে শুরু করে। পোপের অনুমতি নিয়ে ম্যাকিয়াভেলির মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে বইটি ছাপা হয়। বলা দরকার, ছাপা হওয়ার পর থেকে এই বই নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। অনেকে এটিকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বই হিসেবেও দেখে থাকেন। রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে এই বইয়ের একাধিক কথা বিভিন্ন সময় ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে স্টালিন, হিটলার, মুসোলিনির মতো স্বৈরশাসকরা এই বই দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। ‘দ্য প্রিন্স’ এর একটা অংশে বলা হচ্ছে, ‘একজন যুবরাজের জন্যে এটা জরুরি নয় যে উপরের সবগুলো গুণাবলীই থাকতে হবে (দয়া, বিশ্বস্ততা, মানবিকতা, সততা এবং ধর্মবোধ), কিন্তু এটা যথার্থ দরকারী, দেখে যেন মনে হয় এ সবই তার মধ্যে আছে। বস্তুত, আমি এটা বলার স্পর্ধা রাখি যে, এগুলো থাকা এবং সব সময় মেনে চলা বরং ক্ষতিকারক এবং এগুলো আছে এমন ভাব দেখানোটা উপকারী।’

সোজা কথায়, একজন স্বৈরশাসকের সকল ভণ্ডামির ছাড়পত্র ‘দ্য প্রিন্স’। অথচ লেখার কৌশল, বর্ণনার আভিজাত্যে ম্যাকিয়াভেলির এই ক্ষুদ্র নিবন্ধটি ইতালিয় সাহিত্যে সেরা একটি উদাহরণ। এটি দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র মতোই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। অনেক সমালোচকই ‘দ্য প্রিন্স’ প্রথম আধুনিক দর্শন গ্রন্থ কিংবা রাজনৈতিক দর্শনের দিশারী বলে উল্লেখ করেছেন।

সতেরো শতকের ইতালিয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পুরোধা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র কথা আমরা সবাই আজ জানি। বহুবিদ্যা বিশারদ গ্যালিলিও একাধারে জ্যোতির্বিদ, পদার্থবিদ, প্রকৌশলী, দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। তারচেয়েও বড় কথা তিনি ছিলেন মুক্তমনা। সতেরো শতকে বিজ্ঞান চর্চায় তার বৈপ্লবিক চিন্তাধারা আজও আমাদের ভাবায়। তিনি টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেছিলেন, জুপিটার গ্রহের চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন, সৌর কলঙ্কের কথা বলেছিলেন, সামরিক বাহিনীর জন্য কম্পাসসহ বহু যন্ত্রপাতি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এইসব কিছুর ঊর্ধ্বে তার সবচেয়ে বড় অবদান বলা যায় তার রচিত বই ‘ডায়লগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’। ১৬৩২ সালে লেখা এই বইতে তিনি পূর্ববর্তী জার্মান জ্যোর্তিবিজ্ঞানী কোপার্নিকাস এবং গ্রীক গণিতজ্ঞ-জ্যোতির্বিদ-মানচিত্র বিশারদ টলেমির তত্ত্বের তুলনামূলক আলোচনা করেন। কোপার্নিকাস বলেছিলেন, পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, অন্যদিকে টলেমির ধারণা ছিলো মহাবিশ্বের সবকিছুই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। বলা বাহুল্য যে, তখন টলেমির মতবাদেই সবাই একাত্ম ছিলো, সর্বোপরি এই বিশ্বাস চার্চের আনুকূল্য পেয়েছিলো। অন্যদিকে কোপার্নিকাসের মতবাদটি ধর্ম ও চার্চের বিরোধিতা করে। এই বই প্রকাশের সাথে সাথে ইনডেক্স অফ ফরবিডেন বুকসের তালিকায় চলে যায়। চার্চের কারণে তখন ধর্মের বিরোধিতাকারী বই নিষিদ্ধের তালিকায় ঠাঁই পেতো। গ্যালিলিও-এর সকল বই এই নিষিদ্ধ তালিকায় ঠাঁই পায়। শুধু তাই নয়, ধর্ম বিরোধিতার জন্য তাকে প্রাণও দিতে হয়। অবশেষে ১৮৩৫ সালে বইটি আবার আলোর মুখ দেখে। মুক্তচিন্তার অপরাধে শাস্তির নজির হয়ে আছেন গ্যালিলিও আর তার প্রভাববিস্তারি বই।

কমিউনিস্ট ম্যানিফিস্টো বা কমিউনিস্ট ইস্তেহার- নামে এর চরিত্রের প্রকাশ। নব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম প্রভাব বিস্তারী রাজনৈতিক চিন্তার ফসল কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ম্যানিফিস্টো। চাপা পড়া মানুষ তথা শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই ইস্তেহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফিস্টো’ মার্ক্সসীয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে দেশে দেশে ভূমিকা রেখেছে। ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই মতবাদ যদিও প্রায়োগিকভাবে সফল হয়নি, তবু আজও মার্ক্স-এঙ্গেলসের তত্ত্ব দুনিয়া বদলে ভূমিকা রাখে। ছোট্ট এই ম্যানিফিস্টোর সুবাদে রুশ, চায়না, ভারত, ল্যাটিন আমেরিকার নানা স্থানে সমাজতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়। পাশ্চাত্য পুঁজিবাদী সভ্যতা এখনও সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয় কমিউনিস্ট ইস্তেহারের নাম শুনলে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’- শ্লোগানে এখনও বহু পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

সমাজতন্ত্রের মতো বিংশ শতকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ নারীবাদ। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশে দেশে শুরু হয় নারীবাদী আন্দোলন। নির্যাতিত নারীর প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে ওঠে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সড়ক-ময়দান। নারীবাদ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ফরাসী নারী সিমন দ্য ব্যুভেয়ারের ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থটি। এই বইতে ব্যুভেয়ার সভ্যতার ইতিহাস খুঁটিয়ে প্রমাণ করে দেন যে, যুগে যুগে কালে কালে পুরুষরাই রাজত্ব করেছে, সে রাজত্বে নারী দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে অবস্থান করেছে। তিনি দাবি করেন, এমনকি নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্রাফটও তার লেখায় নারীকে পুরুষের মতো হওয়াকেই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখেছেন। নারীর ব্যক্তি সত্তা বিকাশ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আসল চিত্র উঠে এসেছে তার লেখাতে। নারী পুরুষ সম্পর্ক, নারীর অবস্থান, নারী মুক্তির মতো বিষয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে তার বই।

বই যে বিপজ্জনক হতে পারে তা হিটলারের চেয়ে বেশি করে আর কেইবা জানতো! হিটলারের নাৎসীবাদের অজুহাতে বহু বই পোড়ানো হয়েছে। বিরুদ্ধ সকল মতবাদ যথার্থ পুড়িয়ে বিনাশ করতে চাইতেন তিনি। বিশ্বের অন্যতম নিন্দিত, কিন্তু একদা ক্ষমতাধর, প্রতিভাবান স্বৈরশাসক হিটলার যখন বই লেখেন তখন যে সেটি বিপজ্জনক, ভয়াবহ হতে পারে এতে কোনো সন্দেহ নাই। ১৯২৫ সালে অ্যাডলফ হিটলার লিখলেন তার কুখ্যাত গ্রন্থ ‘মাইন ক্যাম্ফ’। বইটিতে হিটলার নতুন জার্মানির জাতীয়তাবাদের বীজ বপণ করেন। তার এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হইুদি গণহত্যা, ফ্রান্স ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ এবং সর্বোপরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘঠিত হয়। যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন তেমন করে কারো নজরে পড়েনি এই বই। ধারণা করা হয় ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমপক্ষে ১ কোটি বই বিতরণ করা হয়। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এই বইয়ের ভূমিকা প্রবল। আজকের পৃথিবীর বর্তমান অবস্থান ও চেহারা তৈরির ক্ষেত্রে এমন অনেক বইয়ের ভূমিকা আছে। উপন্যাস, প্রবন্ধ, বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, রাজনীতি, দর্শনের বহু বই আমাদের চিন্তা চেতনা প্রভাবিত করেছে; বদলে দিয়েছে বহুদিনের ধারণা। তবে সবচেয়ে বেশি বদল মানুষের ভেতরে এনে দিয়েছে ধর্মগ্রন্থগুলো। তার মধ্যে বাইবেল ও কুরআন সবচেয়ে বেশি মানুষকে বদলেছে। কিন্তু এগুলো ওহী কিতাব বলেই এখানে তার আলোচনা করা গেল না। অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মগ্রন্থগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে, পরে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ জুলাই ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel