ঢাকা, সোমবার, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

নজরুলের গল্প

রফিকুর রশীদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২৭ ৮:২০:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-২৭ ১:৫৩:৫০ পিএম

রফিকুর রশীদ : নজরুল তখন সিয়ারশোল স্কুলের ছাত্র। তার প্রাণের বন্ধু শৈলজানন্দ এবং শৈলেন পড়ে রাণীগঞ্জ হাই স্কুলে। স্কুল আলাদা হলে কী হবে, তারা কাছাকাছিই থাকে। ক্লাসের সময়টুকু পেরুলেই তিনজন একত্রিত হয়। 
কী কথা হয় এই তিন জনের?

গোপন কিছু নয়। গল্প, কবিতার কথা আলোচনা হয়। শিল্প-সাহিত্যের কথা সবাইকে শুনিয়ে মজা নেই। বিশ্বাস করতেও চায় না যে ওরা লিখেছে। 

কাজেই ঐ তিনজনই ভালো। নজরুল গল্প লিখে এনে পড়ে। শৈলজা পড়ে কবিতা। নিরপেক্ষ শ্রোতা অপর বন্ধু শৈলেন। সে অবশ্য খানিকটা নির্দয়ও। ভালো না লাগলে নিষ্ঠুর মন্তব্য করতেও ছাড়ে না। বলে, ওগুলো ছিঁড়ে ফেলে দাও। কিছু হয়নি।
কবিতা হয়নি? শৈলজানন্দ অবাক চোখে তাকায় বন্ধুর দিকে। শৈলেন কিন্তু নির্বিকার। কবিতা ছেড়ে এবার সে শৈলজার চুল চেপে ধরে বলে, ওর জন্যই বুঝি চুল রেখেছে?

ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই শৈলজার মাথাভর্তি ঝাঁকরা চুল। এই চুল আবার নজরুলের খুব ভালো লাগে। তারও ইচ্ছে ওরকম চুল রাখার। শৈলেনের খোঁচাটায় তাই নজরুলই একটু রেগে ওঠে- ওর জন্য মানে?
শৈলেন বত্রিশ দাঁত বের করে বলে, কবি হবার জন্য। তারপর নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলে, তুমি ওটা কী পড়ে শোনালে?

নজরুল বলে, গল্প। ওটা আমার নতুন লেখা গল্প।

গল্প মানে তো গদ্য! তুমি গদ্য লিখে কোনোদিন বঙ্কিমচন্দ্র হবে না। এই আমি বলে রাখছি। 

এমন নানান কথায় কেটে যায় তিন বন্ধুর সময়। অবাক করা বিষয় হলো, সেদিন শৈলেনের খেয়ালি মনের কথাই কিন্তু পরবর্তীকালে দুই বন্ধুর জীবনে সত্য হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম গল্প, কবিতা, উপন্যাস সবই লিখেছেন কিন্তু লোকে তাকে ‘কবি’ বলেই জানে। আর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। পরবর্তী জীবনে কবি না হয়ে তিনি কথাসাহিত্যিক হয়েছেন। 

এই তিন বন্ধুর আবার দেখা হয়, কলকাতায় বহুদিন পর। এরই মাঝে বদলে গেছে অনেক কিছু। স্কুলের গ-ি পেরুনোর আগেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হয়েছে নজরুল। বন্ধু শৈলজানন্দও চেয়েছিল সৈনিক হতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার আর যুদ্ধে যাওয়া হয়নি। 

যুদ্ধে গিয়েও নজরুল কিন্তু থেমে যায়নি। করাচির বাঙালি পল্টনে বসেই গল্প, কবিতা রচনা করে এবং তা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয় কলকাতার বিখ্যাত সব পত্রপত্রিকায়। হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম নামে সেগুলো ছাপাও হয় খুব যতেœর সঙ্গে। দেশের মানুষ একেবারে নতুন সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। নতুন তার ভাষারীতি। নতুন তার প্রকাশভঙ্গী, এমনকি বিষয়বস্তুও একেবারে নতুন। দ্রুতই নজরুলের নাম ছড়িয়ে পড়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে। ফলে সৈনিক জীবন শেষে নজরুল যখন কলকাতা এসে ওঠে তখন বেশ আলোচনা হয়। গানের জলসায়, কবিতার আসরে, এমনকি রাজনীতির ময়দানের নজরুলকে নিয়ে টানাটানি। ফলে অতি অল্প সময়ে নজরুল একেবারে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যায়। 

এমন এক সময় শৈলজানন্দ এবং শৈলেন এসে নজরুলকে নিয়ে যায় তাদের আড্ডায়। সেই আড্ডাতেই শৈলজানন্দ বলে, বুঝেছিস শৈলেন নজরুল এখন কবিতা লেখে।

শৈলেন বলে ওঠে, আমি তাহলে আমার কথাটি তুলে নিলাম।

ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে নজরুল। হাসতে হাসতেই বলে, শৈলজা কিন্তু কবিতা ছেড়ে গল্প লেখায় মনোযোগী হয়েছে। 
মনে আছে তাহলে! শৈলেন বলে, আমার কথা তুলে নেয়ার দরকারই হতো না, তোমরা যদি লেখাটা পাল্টাপাল্টি করে না নিতে।

পাল্টাপাল্টি মানে! শৈলজানন্দ জানতে চায়।

এই যে তুমি এখন গল্প লেখ, নজরুল লেখে কবিতা। গোড়াতে তো দুজনই ছিল উল্টো পথের যাত্রী। 

কথা শুনে তিন বন্ধুই হেসে ওঠে। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎ শৈলজানন্দ বলে, নজরুল এখনই বা বেঁচে আছে কোথায়? সবাই হৈ হৈ করছে, টানাটানি করছে, বলছে- গান গাও। কবিতা শোনাও। বাহবা দিচ্ছে। প্রশংসা করছে। কিন্তু কী খেয়ে, কেমন করে ও বেঁচে আছে, সেদিকটা তো দেখছে না। 

কিন্তু এসব দুঃখের কথা নজরুল কাউকে শোনাতে চায় না। সে হো হো করে হাসে আর অর্গানে সুর তোলে এ বিষয়টি চাপা দেয়ার অভিপ্রায়ে। শৈলজার গা জ্বলে যায়। সে রেগে ওঠে- হে হে করে হাসছে দেখ। যারা দুপেয়ালা চা খাইয়ে সারাদিন গাধার মতো খাটিয়ে নেয়, তাদের বলতে পারো না। 

তাদের কী বলব? আচ্ছা বোকা তো! নজরুল বলে।

এই হলো নজরুল। নিজের বোকামি ধরতেই পারে না। শৈলজা শিখিয়ে দেয়- তাদের বলবে, তুমি বাজে কাজে আর যাবে না। তোমাকে লিখতে হবে। টাকার দরকার। দুটো কবিতা লিখলে কুড়িটা টাকা তো পাবে। 

শৈলেন সংশোধন করে দেয়, ও বলবে টাকার কথা! মাথার চুলের দুঃখ ছিল ওর চিরকার। এখন চুলগুলো সাইজ হয়েছে।

কবি কবি চেহারাও হয়েছে বেশ। ওতেই ও খুশি। ব্যস।

চুলের প্রশংসায় নজরুল ভারি খুশি হয়। 

শৈলেন পরিহাসের কণ্ঠে বলে, এবার তোমার চুলগুলো জটা করে ফেলতে হবে। তারপর সাধুসন্ন্যাসী হয়ে কোথাও ধ্যানে বসো। টাকা পয়সার কথা তখন আর ভাবতে হবে না। বেশ মজা হয়, তাই না?

নজরুল লাজুক হেসে বলে-ধ্যাৎ!



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ আগস্ট ২০১৭/তারা

Walton Laptop