ঢাকা, রবিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রকাশক দ্বারা যে বইগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২৮ ৪:১৪:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-২৮ ৪:২৫:২০ পিএম

|| মুম রহমান ||

বড় ভাই, এবার কী করব বলুন? বই তো লিখে ফেলেছি!

ছাপতে দিন।

প্রকাশক তো বই পছন্দ করে না।

চেষ্টা করে যান।

কত চেষ্টা করব? চারজন প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছে।

উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের নাম শুনেছেন?

হ্যাঁ। ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কবি। নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

তার সবচেয়ে সেরা বই কোনটি?- আপনার বা সমালোচকদের মতে।

‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইস’।

এইবার আসেন কাজের কথায়- আপনি কেমন লেখেন?

মনে তো হয় ভালোই। কিন্তু আপনার পয়েন্টটা কি?

পয়েন্টটা খুবই সরল। উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের ‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইস’ ২১ জন প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

বলেন কি!

হ্যাঁ। প্রত্যাখান। যাকে বলে রিজেক্ট। একজন প্রকাশক বলেছিলেন, ‘একটা আজগুবি আর অনাকর্ষণীয় কল্পকথা যেটা একেবারেই নিষ্প্রভ আর ফালতু।’

বলেন কি! উইলিয়াম গোল্ডিংয়ের ‘লর্ড অফ দ্য ফ্লাইস’ ফালতু, আজগুবি, অনাকর্ষণীয়, নিষ্প্রভ! প্রকাশকের নাম কি?

নামে কি আসে যায়। ঘটনাটাই আসল। এই বইটি এখন পর্যন্ত দেড় কোটি কপি বিক্রি হয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বসেরা শত উপন্যাসের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। বহু তালিকা, সমালোচক, পাঠক একে সাদরে গ্রহণ করেছে।

অথচ একুশজন প্রকাশক এর মূল্য দিল না- তাজ্জব!

না তাজ্জবের কিছু নাই। চলেন, আপনাকে প্রত্যাখ্যাত বইয়ের গল্প শোনাই। সত্যিকারের গল্প।

চীনারা করত পেনজাই আর জাপানিরা তার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করেছিল বনসাই। ‘বন’ মানে পাত্র, ‘সাই’ মানে গাছ। গাছটিকে পাত্রের সঙ্গে এমন সম্পর্কযুক্ত হতে হবে যাতে মনে হবে ঠিক এই গাছটির জন্যেই এই পাত্রটি বানানো হয়েছে। দুটোর মিলনেই একটি আদর্শ বনসাই তৈরি হয়। লেখা আর ছাপার সম্পর্কটাও এমনই অনেকটা। সঠিক লেখকের জন্য চাই সঠিক প্রকাশনা।

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রত্যাখানের ইতিহাসটা কম দীর্ঘ নয়। আজকের অনেক কালজয়ী বিখ্যাত লেখককেও রীতিমতো সাধনা করতে হয়েছে প্রকাশক খুঁজে পেতে।

বিশ্ববিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন ফ্রাঙ্ক হার্বাটের ‘ডিউন’ ২৩জন প্রকাশক দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বলা দরকার, পরবর্তীতে এটি শুধু বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত সায়েন্স ফিকশনই নয়, এর চলচ্চিত্ররূপও হয়েছিল। এই উপন্যাস নিয়ে টিভি সিরিজও হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা সায়েন্স ফিকশন জগতের সেরা দুটি পুরস্কার ‘হুগো এওয়ার্ড’ এবং ‘নেবুলা এওয়ার্ড’ পেয়েছে এই বই।

সায়েন্স ফিকশনের জগতে এইচ জি ওয়েলস আর তার ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ রীতিমতো কিংবদন্তি। অথচ এক প্রকাশক এই বইকে স্রেফ ‘একটি অসীম দুঃস্বপ্ন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এমনকি এই ভয়াবহ বই কাউকে না-পড়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি। তার কথা যে কোন কাজে লাগেনি, ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। কমিকস, রেডিও, টিভি, সিনেমা- সকল মাধ্যমেই এই উপন্যাসের আজ জয়-জয়কার। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিক্রিত বইয়ের তালিকায় আছে এটি।

মার্কিন কবি ও ঔপন্যাসিক লুইসা মে আলকোটকে তো এক প্রকাশক পরামর্শ দিয়েছিলেন লেখালেখি না-করার। তাকে বলেছিলেন, ‘শিক্ষকতাতেই থাকুন’। তার পরামর্শ শুনলে ‘লিটল উইম্যান’ উপন্যাস আমরা পেতাম না। প্রকাশনার দেড়শ বছর পরও এ উপন্যাস আজো বিক্রি তালিকার শীর্ষে, সমালোচকদের-পাঠকদের পছন্দের তালিকাতেও শীর্ষে।

মার্গারেট মিচেলের ঢাউস আকৃতির উপন্যাস ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ ৩৮ জন প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩৬ সালে ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই এই উপন্যাস বরাবরই বেস্ট সেলার তালিকায় ছিল। বলা হয়ে থাকে, আমেরিকাতে বাইবেলের পরই এই উপন্যাস সবচেয়ে জনপ্রিয়। ঐতিহাসিক রোমান্টিক এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৯ সালে ভিক্টর ফ্লেমিং চলচ্চিত্র বানান, যা অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র ছাড়াও অসংখ্য পুরস্কার জিতে নেয়। মার্গারেট মিচেল এই উপন্যাসের জন্যেই পুলিৎজার পুরস্কার পান।

‘গন উইথ দ্য উইন্ড’র মতো আমেরিকার এপিক সাহিত্যে ‘মবি ডিক’ আলোচিত একটি নাম। এই উপন্যাস প্রথম ছাপা হয়েছিলো ১৮৫১ সালে। বহু কষ্টে একজন প্রকাশক মিলেছিল। কিন্তু হারমেন মেলভিলের এই উপন্যাস সে সময় তো বটেই, তার জীবিতকালেও তেমন বিক্রি হয়নি। ১৮৯১ সালে মেলভিল মারা যান। তার মৃত্যুর পর এই উপন্যাসের গুরুত্ব অনুধাবন করা শুরু করে পাঠক, সমালোচক ও প্রকাশক। আমেরিকায় হার্পার এ- ব্রাদার্স এবং ইংল্যান্ডে রিচার্ড ব্যান্টলি এই ঢাউস উপন্যাস নতুন করে ছাপে। উইলিয়াম ফকনারে মতো লেখক এই উপন্যাসের প্রশংসা করেন এবং আফসোস করেন তিনি কেন এমন একটি উপন্যাস লিখতে পারেন না। ব্রিটিশ লেখক ডি এইচ লরেন্স বলেন, ‘বিশ্বের সেরা আশ্চর্যতম এবং সুন্দরতম বইগুলোর একটি এবং সমুদ্র নিয়ে সর্বকালের সর্বসেরা বই।’ এই উপন্যাসের প্রথম লাইন ‘আমাকে ইসমেল বলে ডাকুন’- বলা হয়ে থাকে বিশ্বসাহিত্যের সেরা সূচনা বাক্য। প্রকাশকরা এই উপন্যাসকে ‘অতি দীর্ঘ এবং পুরোনো ধাঁচের’ বলে বর্জন করেছিলেন।

ডি এইচ লরেন্সের ‘দ্য লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ প্রকাশনার ইতিহাসে একটা বিপ্লব। কতবার এই বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে, কত কোটি সংখ্যক বিক্রি হয়েছে, কত প্রকাশক ছেপেছে, সে এক গবেষণার বিষয়। অথচ কেউ এই বই ছাপতে রাজী হয়নি। এমনকি ইংল্যান্ড, আমেরিকার কোনো প্রকাশকই নয়। শেষ পর্যন্ত লরেন্স নিজেই ইতালির ফ্লোরেন্সের এক ছাপাখানা থেকে প্রকাশ করেছিলেন এই বই ১৯২৮ সালে। ছাপার পরপর বইখানার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে। তীব্র যৌনতা এবং প্রচলিত মূল্যবোধকে আঘাত করার অপরাধে লরেন্সকে মুখোমুখি হতে হয় নিন্দা আর ধিক্কারের। অবশেষে ছাপা হওয়ার ত্রিশ বছর পর ১৯৫৯ সালে গ্রোভ প্রেস বইটি আবার ছাপে। এর এক বছর পর পেঙ্গুইন এটি ছাপে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক কোটি কপি বই বিক্রি হয়েছে। লরেন্সকে আজো বিশ্বের অন্যতম বেস্টসেলার লেখক মনে করা হয়।

স্পেনে জন্ম নেয়া, কানাডিয় লেখক ইয়ান মার্টেলকে আমরা চিনি তার ‘লাইফ অফ পাই’ উপন্যাসের কল্যাণে। এই উপন্যাসের জন্যে তিনি ম্যান বুকার প্রাইজও পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত এক কোটি বিশ লাখের ওপর বিক্রি হয়েছে এই বই। এক বছরের বেশি সময়কাল ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্য গ্লোব-এ মেইলের বেস্টসেলার তালিকায় ছিল এই বই। পরবর্তীতে বিখ্যাত চীনা পরিচালক এঙ লি এর চলচ্চিত্র রূপ দেন। সেই সিনেমাও অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রসহ বহু পুরস্কার জিতে নেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য পাঁচজন বড় প্রকাশক এই উপন্যাসকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গার্ডিয়ানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ান মার্টেল বলেছিলেন, ‘আমি কেবল একজনের কথাই শুনেছিলাম, যারা এটাকে গ্রহণ করেছে। এজেন্ট থাকার এটাই ভালো দিক। তারা তোমাকে কখনো কখনো আশীর্বাদের মতো অজ্ঞতার মধ্যে রাখে।’ মার্টেল যথার্থই সৌভাগ্যবান যে, তার এজেন্ট বইটা নিয়ে কাজ করেছে এবং ব্যর্থতার খবরগুলো তাকে দেয়নি।

শিশুসাহিত্যের কথা বলতে গেলেই বিশ্বব্যাপী যে উপন্যাসটির নাম উচ্চারিত হয় তা হলো ফ্রাঙ্ক বাউমের ‘দ্য ওয়ান্ডারফুল ইউজার্ড অফ ওজ’ বা ওজের আশ্চর্য যাদুকর। ফ্রাঙ্ক বাউম আলাদা একটা ডায়েরি করেছিলেন যার নাম দিয়েছিলেন ‘রেকর্ড অফ ফেইলিওর’। তার এই ডায়েরিতে ওজের যাদুকর কতবার প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তার হিসাব রাখতেন। এই ডায়েরিতে তিনি সব প্রত্যাখ্যানপত্র জমিয়ে রাখতেন। অথচ আজকে এই একটি উপন্যাসের সফলতার কথা লিখতে গেলে একটি ডায়েরিতে কোনভাবে লিখে শেষ করা যাবে না। পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান ভাষায় অনূদীত হয়েছে এই শিশুতোষ উপন্যাস। একে অবলম্বলন করে শুধু হলিউডেই বিভিন্ন সময়ে একাধিক সিনেমা হয়েছে। উইজার্ড অফ ওজকে কেন্দ্র করে ভিডিও গেম, সফটওয়্যার, মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক- কী হয়নি বরং, তা-ই বলা মুশকিল হয়ে যাবে।

আরেকটি শিশুতোষ লেখার কথা বলি। অবশ্য শিশুর লেখা বলে লেখাটিকে কিন্তু নেহাত শিশুতোষ বলা ঠিক হবে না। আমরা সবাই এই বইয়ের কথা আজ জানি। ‘দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়ং গার্ল’। ছোট্ট বালিকার এই দিনলিপি লেখা শুরু করেছিল চৌদ্দ বছরের জার্মান বালিকা আনা ফ্রাঙ্ক। ১৬ বছরেই তার মৃত্যু হয় হিটলার বাহিনীর হাতে। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল নাগাদ সে সপরিবারে আটকা পড়ে জার্মান অধ্যুষিত নেদারল্যান্ডে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে তারা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাৎসীবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। ক্যাম্পে থাকা অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। জন্মদিনে পাওয়া ডায়েরিটা সব সময় রেখেছিল সাথে। এই ডায়েরির পাতায় পাতায় সে লিখেছিল যুদ্ধকালীন জীবনযাত্রার কথা। আজ এই ডায়েরিই তাকে অমর করে রেখেছে। তবে অন্তত পক্ষে পনেরো জন প্রকাশক এই দিনলিপি ছাপতে রাজী হয়নি। একজন প্রকাশ বলেছিলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এই বালিকার বিশেষ কোন দৃষ্টিভঙ্গি বা অনুভূতি নেই যেটা এই বইকে কৌতূহলের উর্ধ্বে তুলতে পারবে।’ আড়াই কোটি বই বিক্রি এবং বিশ্বের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদীত এই বই কতোটা কৌতূহলের উদ্রেক করেছিল তা নিয়ে অবশ্য আজ কোনো তর্ক নেই। আজ বিশ্বের বহু দেশের স্কুলে পাঠ্য কিংবা সহপাঠ্য তালিকায় এই বই ঠাঁই নিয়েছে।

ছোটবড় সবার প্রিয় চরিত্র ‘হ্যারি পটার’। জে. কে. রাউলিংয়ের বিশ্ববিখ্যাত এই সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘হ্যারি পটার- দ্য ফিলোসফারস স্টোন’ ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। আধুনিক কালের তরুণ, কিশোর, শিশু ছাড়াও বয়স্ক পাঠকদেরও মুগ্ধ করে এই সিরিজ। ২০১৩ সালের মে মাস নাগাদ এটি ৫০ কোটি পাঠকের হাতে বিক্রি হয়েছে। ইতিহাসের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রির তালিকায় আছে হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই। সিরিজের শেষের চারটি বই বিশ্বে দ্রুততম সময়ে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় সবার উপরে আছে। সিরিজের সর্বশেষ বই ‘হ্যারি পটার- দ্য ডেথলি হলোস’ প্রকাশিত হয় ২১ জুলাই ২০০৭ এ। এটি প্রকাশিত হওয়ার  চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই এক কোটির অধিক কপি বিক্রি হয়। এই সিরিজটি ইংরেজিতে ব্রিটেনে প্রকাশিত হয় ব্লুমসবারি এবং আমেরিকাতে স্কলাসটিক প্রেস থেকে। সিরিজের সাতটি বই বিশ্বের নানা দেশ থেকে ৭৩টি ভাষায় অনূদীত হয়েছে। সিরিজের সাতটি বই নিয়ে ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্স আটটি সিনেমা তৈরি করেছে। এক ব্যবসায়িক হিসাবের সূত্র থেকে জানা যায়, হ্যারি পটার সিরিজের সকল ধরণের আয়ের উৎস থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্জিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সর্বকালের সবচেয়ে বড় ফ্রাঞ্চাইজির উপার্জনের হিসাব এটিই। অথচ এই প্রবল জনপ্রিয় সিরিজের প্রথম বইটি দশ জন প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিল। এক প্রকাশকের কন্যার শেষ পর্যন্ত বইটি পছন্দ হলে তার বাবা অনেকটা নিমরাজি হয়েই এটি ছেপেছিলেন। বলাবাহুল্য, পরের ঘটনাগুলো আজ ইতিহাস।

সি. এস. লুইসের ‘দ্য কর্নিক্যাল অফ নার্নিয়া’ সিরিজের একটি বই বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে সহপাঠ্য। পৃথিবীর বহু স্কুলেই পড়ানো হয় এই বই। সম্প্রতি হলিউড থেকে এর চলচ্চিত্রও মুক্তি পেয়েছে এবং আলোচিত হয়েছে। ‘দ্য কর্নিক্যাল অফ নার্নিয়া’ সিরিজের মোট সাতটি বই এখন পর্যন্ত  ৪৭টি ভাষায় অনূদীত হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই ১০ কোটির উপর বিক্রি হয়েছে। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য বইটি প্রকাশকদের কাছ থেকে ফেরত এসেছে আটশ বার। না, আপনি ভুল পড়ছেন না। সংখ্যাটা আটশ বারই লেখা হয়েছে। এক সময়ের কথিত ব্যর্থ লেখক সি. এস. লুইসের এই বই থেকেই সিনেমা, মঞ্চ নাটক, রেডিও নাটক, টেলিভিশন নাটক নির্মাণ হয়েছে।

ভ্লাদিমির নবোকভ নয়টি উপন্যাস লেখেন রুশ ভাষায়। পরে তিনি ইংরেজি ভাষায় লিখতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ‘ললিতা’ লেখেন। এই একটি উপন্যাস তাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায়। রুশ-মার্কিন লেখক নবোকভ আমেরিকাতে ‘ললিতা’র কোনো প্রকাশক খুঁজে পাননি। প্যারিসে অলিম্পিয়া প্রেস থেকে তার এই উপন্যাস পরে ছাপা হয়। পরে রুশ ভাষায় (লেখকের নিজের করা অনুবাদ) ছাপা হয়। এক যুগ পরে নিউ ইয়র্কের ফেড্রা পাবলিশার্স থেকে ছাপা হয় এটি। তারপরের গল্পটি ইতিহাস। এই বিতর্কিত উপন্যাস নবোকভকে তর্ক-বিতর্ক আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যায়। যে বই প্রকাশকরা ছাপতে রাজী হয়নি সেই ‘ললিতা’ বিক্রির শীর্ষ তালিকায় চলে যায়। সৎপিতার সাথে ১২ বছরের কন্যার মানসিক ও শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে রচিত এই উপন্যাস নিয়ে হলিউডে একাধিক চলচ্চিত্র হয়। স্বয়ং স্ট্যানলি কুব্রিক এর চলচ্চিত্রায়ন করেন ১৯৬২ সালে যার চিত্রনাট্যও নবোকভ করেছেন। মর্ডান লাইব্রেরি সেরা শত উপন্যাসের তালিকায় এটিকে চার নাম্বারে রেখেছে।

আরেকটি আমেরিকান ক্লাসিকের কথা না বললেই নয়- চার্লস স্ক্রিবনার্স সন্স প্রকাশিত এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’। ইউএসএ টুডে প্রকাশিত এক তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত বইটির আড়াই কোটি কপি বিক্রি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই উপন্যাস নিয়ে ছয়টি চলচ্চিত্র হয়েছে। এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৪০ সালে, কিন্তু তার এই উপন্যাস এখনও আয় করে যাচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। অথচ একাধিক প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ছিল এই বই। 

‘আমেরিকাতে জন্তু-জানোয়ারের গল্প বিক্রি করা অসম্ভব’- জর্জ অরওলের ‘এনিমেল ফার্ম’ পড়ে এ কথা বলেছিল এক প্রকাশক। এমনকি টি এস এলিয়টের মতো কবি-চিন্তাবিদও এই বই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফেবার-এ- ফেবার প্রকাশের প্রধান কর্তা ব্যক্তি হিসাবে এই বই ছাপতে রাজী হননি তিনি। তিনি বলেছিলেন এই বই নাকি ‘ট্রটস্কিয় রাজনীতি’র অংশ। অথচ আজ বিশ্বব্যাপী জর্জ অরওলের ‘এনিমেল ফার্ম’ সেরা বিক্রির তালিকায় থাকে। বহু স্কুল, কলেজে এই উপন্যাস পাঠ্য। এর প্রতীক, সংকেতও রূপকের ব্যবহার নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। জন্তু-জানোয়ারের গল্প নয়, এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব মানবতা ও রাজনীতির অর্থপূর্ণ গল্প।

এ্যালেক্স হ্যালি’র ‘রুটস’ উপন্যাসের কথা জানে না এমন পাঠক কমই আছে। মার্কিন দাসপ্রথা আর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভালো বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আট বছর ধরে বিশাল এই উপন্যাস লেখার পর এ্যালেক্স হ্যালিকে ২০০ জন প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু প্রথম প্রকাশের সাত মাসের মাথাতেই এই উপন্যাস ১৫ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল, মুহূর্তেই এটা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিল। ১৯৭৭ সালে পুলিৎজার কমেটি এই আধুনিক ক্লাসিককে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল।

যারা গল্প-উপন্যাস পড়েন না তারা টুয়ালাইটের কথা জানেন। হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কল্যাণে অনেকেই এর সঙ্গে পরিচিত। স্টিফেন মায়ারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘টুয়ালাইট’ প্রকাশের এক মাসের মাথায় দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলারের তালিকায় ৫ নাম্বারে ঠাঁই পেয়ে যায়। কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের আগে স্টিফেন মায়ারকে পনেরো বার ফিরিয়ে দিয়েছে প্রকাশক ও তার এজেন্টরা।

নাইজেরিয়ার লেখক চিনুয়া আচেবে’র বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘থিংস ফল এপার্ট’। আজ আফ্রিকার সাহিত্যের কথা বললেই সবাই এই উপন্যাসটির কথা সর্বাগ্রে বলে থাকে। অথচ আচেবে তার এই উপন্যাসের জন্য প্রকাশক খুঁজে পাননি। প্রকাশকরা তাকে এই বলে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছিল যে, আফ্রিকার উপনিবেশিকতা ও দরিদ্র পরিবারের গল্প কেউ শুনতে আগ্রহী নয়। অথচ এখন পর্যন্ত এ বইয়ের  ৮০ লাখের উপর কপি বিক্রি হয়েছে। আধুনিক আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই উপন্যাস দেশে দেশে অনূদীত হয়েছে।

সবই তো বুঝলাম বড় ভাই, তা আমি এখন কী করব? বিশ্বের এত বড় বড় লেখকরা যখন প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, আমার আর জায়গা কই কন?

মিয়া, জ্ঞান অর্ধেক নিলে তো হইবো না। এখান থেকে কী শিখলা? উনাদের ধৈর্য আর মনোবলটা দেখ, আত্মবিশ্বাস দেখ। ভালো লেখার সাথে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য, মনোবল আর আত্মবিশ্বাস থাকলে জয় তোমার হবেই। রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের মতো লেখকরে প্রকাশকে কইছিল, ‘আমার মনে হয়, আপনে কীভাবে ইংরেজি লিখতে হয় সেটা জানেন না।’ সিলভিয়া প্লাথের মধ্যে কোনো প্রতিভা নাই- এই কথাও বলছিল এক প্রকাশক।

কন কি! নোবেলবিজয়ী রুডইয়ার্ড কিপলিং, ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং ইংরেজি লিখতে জানে না! বিশ্বের অন্যতম সেরা কবি, পুলিৎজার পুরস্কারবিজয়ী কবি সিলভিয়া প্লাথের মধ্যে প্রতিভা নাই?

শোন খালি লেখালেখি না, সবক্ষেত্রে এ রকম হয়। ভ্যান গঘের একটা ছবি কিনতে গেলে বহু ধনকুবেরও ফতুর হয়ে যাবে। সেই ভ্যান গঘের দুইটা ছবি বিক্রি হইছিল তার জীবিতকালে। সময় থেকে যারা এগিয়ে থাকে তাদের চেনা বড় কঠিন।

ঠিক বলছেন। জীবনানন্দ দাশ, কমলকুমার মজুমদার- এদেরকে কে চিনছে সময় মতো? আমাদের হাসান আজিজুল হকের বিখ্যাত ছোটগল্প গ্রন্থ ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ তো পারিবারিকভাবেই প্রকাশ করতে হয়েছিল।

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’ খান ব্রাদার্স ছাপছিল আহমদ ছফার অনুরোধে। আজ দেখ, হুমায়ূনের একটা বই প্রকাশ করতে পারলে প্রকাশক ধন্য হয়ে যায়। তাই তো কই মিয়া, প্রকাশনা নিয়ে ভাইব না। তোমার লেখা উপযুক্ত হইলে তা শুধু প্রকাশিতই হবে না, সবার আদৃতও হবে। তুমি লিখে যাও। এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

 

 



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ আগস্ট ২০১৭/তারা

Walton Laptop