ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রেসক্রিপশন || ফিরোজ আলম

ফিরোজ আলম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-৩০ ৬:১১:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-৩০ ৬:২৭:৪৬ পিএম

গফুর মিয়া ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে এসে বেঞ্চে ধপাস করে বসে পড়ল। মাথার উপর ভনভন করে ঘুরতে থাকা বৈদ্যুতিক পাখার বাতাসে প্রেসক্রিপশনটা তিরতির করে কাঁপছিল। এর মধ্যেই একদল ওষুধ কোম্পানির ফেরিওয়ালা গফুর মিয়াকে ঘিরে ধরেছে। কে যেন গফুর মিয়ার হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা নিয়েও নিল। গফুর মিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। উপরে ঘুরন্ত পাখাটির চেয়েও তার মাথা জোরে ঘুরছিল। তিন দিনের মধ্যে ৯০ হাজার টাকা না হলে জুলেখাকে বাঁচাতে পারবে না সে। আচ্ছা, কয়টা পাঁচশ টাকার নোটে ৯০ হাজার টাকা হয়? ডাক্তারের একবার ছুরি চালানোর টাকা তুলতে তাকে কতবার রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে হবে? ভাবতে ভাবতে যখন সংবিৎ ফিরে এলো, হাতে থাকা প্রেসক্রিপশনের কথা মনে পড়ল তার। সেটি ইতোমধ্যেই ওষুধ ফেরিওয়ালাদের ছবি তোলার বস্তুতে পরিণত হয়েছে! এক হাত থেকে আরেক হাতে যাচ্ছে আর সবাই প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলছে। যেন সদ্য জন্ম নেয়া সোনার ডিমপাড়া হাঁস! শেষ জনের ছবি তোলা হলে প্রেসক্রিপশনটা আবার হাতে পেল গফুর। এরপর আস্তে আস্তে ক্লিনিকের বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

গফুর মিয়া যখন পথে নামল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যটা ঠিক ডিমের কুসুমের মতো দেখাচ্ছে। সেটি দেখে তার ডাক্তারের দেয়া পথ্যগুলোর কথা মনে পড়ল। অপারেশনের পর জুলেখাকে বেশি বেশি ডিম-দুধ-মাছ-মাংস খাওয়াতে হবে। এই খাবারগুলোর মধ্যে একমাত্র ডিমটার কথাই তার কানে ঢুকেছে। অন্যগুলো তার মস্তিষ্ক শুরুতেই বাতিল করে দিয়েছে। কারণ গফুর মিয়ার মতো রিকশাওয়ালা তিনবেলা মাছ-মাংস কল্পনাতেও খেতে পারে না। তবুও অবস্থাটা বুঝতে সে রাস্তা পেরিয়ে বাজারের পথ ধরল। করিম বেপারির ডিমের আড়তের সামনে এসে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আড়তে বেশ ভিড়। এখন করিম বেপারিকে ভাঙা ডিমের কথা বললে রেগে যাবে। গফুর মিয়া মাঝে মাঝে এখান থেকে ভাঙা ডিম কম দামে কেনে। মাঝে মাঝে ব্যবসা ভালো গেলে বেপারি দুই-চারটা ডিমের দামও নিতো না আগে। কিন্তু আজকাল বিনাপয়সায় তো দূরের কথা, কম দামে কেনাটাও কষ্ট হয়ে গেছে। এখন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের লোকেরা এসব ডিম কিনে নেয়। ভাঙা ডিম দিয়ে ওরা কী করে তা বেপারিকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল গফুর মিয়া। বেপারির কথা পুরোটা না বুঝলেও এটুকু বুঝেছে- ভাত ভাজা টাইপের কিছু একটা বানায় এসব ভাঙা ডিম দিয়ে। 

 

গরিবের কোনো সুখ বেশি দিন টেকে না। বড় লোকেরা কোনো না কোনোভাবে সেটাতে ভাগ বসাবেই। এসব ভাবতে ভাবতে বিড়ি টানছিল গফুর। এমন সময় বেপারির হাঁক কানে এলো- গফুর মিয়া না কি?
গফুর মিয়া বিড়ি ফেলে আড়তে ঢুকল। পান খাওয়া লাল হাসিমুখে বেপারি বলল, আইজ তো একটাও ভাঙা ডিম নাই। শুনে ঘাম চটচটে ম্রিয়মান মুখটা আরো মিইয়ে গেল গফুরের। ভালো ডিমের দর কত বেপারি সাব?
গফুরের প্রশ্ন শুনে আরেক প্রস্থ হেসে বেপারি বলল, দাম তো কমই মিয়া। তয় তোমার পোষাইব কিনা কইতে পারি না। এরপর দরদাম করে দুটো ডিম কিনে আড়ত থেকে বের হলো গফুর। আরো কিছু টুকটাক সদাই কিনে বাড়ি ফিরল। জিনিসগুলো রেখে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে এলাকার তমিজ মাদবরের কাছারির পথ ধরল সে।

*
হাজি তমিজ মৃধা সন্ধ্যার পর সাধারণত বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে লোকজনের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবার, গল্পগুজব করেন। আসলে তিনি বলেন আর সবাই শোনে। তমিজ সাহেবরা বংশগতভাবেই এই মফস্বল শহরের প্রভাবশালী পরিবার। ছেলেরা ব্যবসার হাল ধরায় তমিজ মাদবরের সারা দিন গল্পগুজব আর বিচার শালিস ছাড়া তেমন কোনো কাজ নাই। আজ সে এই অজপাড়াগাঁ কীভাবে এমন আধা-শহরে পরিণত হলো সেই গল্প করছিল। গল্পটা যখন জমে উঠেছে তখন পেছন থেকে কে যেন চায়ের জন্য গুণগুণ করে উঠল। এরপর চায়ের জন্য আবদার শুরু হয়ে গেল। তমিজ মাদবর কিছুটা বিরক্ত হয়ে তার কাজের লোক রতনকে আরেক প্রস্থ চা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলল, মিয়ারা একটু আগে না চা খাইলা।

আসলে জমায়েতের বেশির ভাগ লোক আসে সন্ধ্যার পর ফ্রি চা খেতে। গল্প শোনা বাহানা মাত্র। চা পরিবেশনের ঠিক আগের মুহূর্তে গফুর মিয়া ঢুকল। তমিজ মৃধা তাকে দেখেই হেসে বললেন, আরে গফুর যে? কয়দিন ধইর‌্যা তো দেহি আসো না্। খবর-টবর কী?

পেছন থেকে কে যেন বলল, ওর বউয়ের খুব অসুখ মাদবর সাব। মাদবর কিছুটা চিন্তিত মুখে বললেন, কী হইছে গফুর?
গফুর প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিয়ে বলল, মাদবর সাব পেটের মধ্যে নাকি টিউমার না কি জানি হইছে। ডাক্তার সাব কইছে তিন দিনের মধ্যে অপারেশন করাইতে হইব। নইলে আছমার মায় বাঁচব না।
শুনে মাদবর সাহেব বলল, ধুর ডাক্তার কি হায়াত-মউতের মালিক হইয়া গেছে নাকি? কইলো আর মানুষ মইরা গেল। তগোর তো আল্লাহ-খোদার নাম নেওয়ার বালাই নাই। নামাজ পড়ব না ঠিকমত; অসুক অইবো না তো কি অইবো?
মুখ কাচুমাচু করে গফুর বলল, মাদবর সাব কথাটা ঠিকই কইছেন। তয় অসুক যহন অইছে চিকিৎসাতো করন লাগে।
হ তা করবি, ঠিক আছে। তয় এত টাকা কই পাবি?

মাদবরের প্রশ্নে মাথা নিচু করে গফুর বলে, আপনি যদি একটা উপায় কইরা দিতেন। মাদবর তাড়াতাড়ি প্রেসক্রিপশনটা গফুরের হাতে ফেরত দিয়ে বলল, আমি কী করুম? কমিশনারের কাছে যাও। তারে ভোট দিয়া কমিশনার বানাইছ। সেই কিছু করুক। এরপর চা এলো। সবাই চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর মাদবর ব্যস্ত হলো তার গল্প বলা নিয়ে।

*
পরদিন খুব সকালে উঠে কমিশনারের বাড়ি গিয়ে তাকে পেল না গফুর। কমিশনার বাড়ির কামলা আব্বাস সব শুনে তাকে পৌরসভায় যেতে বলল। সেখানে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকার পর কমিশনার সাহেবকে প্রেসক্রিপশনটা দিল গফুর। কমিশনার পুরো কথা না শুনেই পাশের ছেলেটিকে বলল, এই ডাক্তার আবার কবে আইলোরে?
ছোকরা প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে বলল, জানি না বস।
এবার কমিশনার দাতমুখ খিঁচিয়ে ছেলেটিকে একটা ধমক দিলো। কী করস সারা দিন! এলাকার কোনো খবর রাখস?

 

এ ধরনের কথোপকথনে গফুর আশার আলো দেখছিল। এখনি বোধহয় ডাক্তারকে ডেকে কম খরচে চিকিৎসার একটি ব্যবস্থা করে দেবেন তিনি। সে যখন একটা একটা করে আশার সিঁড়ি বেয়ে সমাধানের দিকে এগোচ্ছিল তখন কমিশনার সাহেব তার হাতে প্রেসক্রিপশনটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, এখানে কিছু হবে না। তুমি উপজেলা অফিসে গিয়ে ইউএনও সাবেরে ধরো। দেখ কিছু করতে পার কিনা। আমিও দেখা হইলে ইউএনও সাবেরে তোমার কথা কমুনে। এহন তুমি যাও। এরপর পাশের ছেলেটিকে বলল, ওই ক্লিনিকে গিয়া ডাক্তারের সাথে দেখা কইরা কইবি- তগোরে চান্দা না দিয়া এইহানে রোগী দেহন যাইব না। বাকিটা আমি বুঝতাছি।
গাছ থেকে পড়ে গিয়ে পাখির বাচ্চাগুলো যেভাবে কাঁপে গফুর মিয়ার হাত-পা সেভাবে কাঁপছিল। আশায় বুক বেঁধে সে অনেক উপরেই উঠেছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। হতাশায় ডুবে যাওয়া ক্লান্ত দেহটি টেনে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। পৌর ভবনের বাইরে কিছু তরুণ বসেছিল। গফুর মিয়াকে কাছে ডেকে সব শুনে ছেলেগুলো সমবেদনা জানাল। বলল, কীসের ফেসবুক না কি যেন, সেখানে জুলেখার বিছানায় শোয়া একটা ছবি দিলেই নাকি বিকাশে টাকা আসতে থাকবে। শুনে গফুর আবার আশার আলো দেখতে পেল। কিছু দিন আগে এলাকার ফ্লেক্সি লোডের দোকানদার মজনু জোর করে তার মোবাইলে বিকাশ করে দিয়েছে। সেটা এখন কত কাজে লাগবে ভেবে মনে মনে মজনুকে ধন্যবাদ দিলো সে। এরপর ওই দলের দুটো ছেলে গফুর মিয়ার বাড়িতে এসে তার স্ত্রীর বিছানায় শোয়া কিছু ছবি তুলে নিল। জুলেখা অচেনা ছেলেদের দিয়ে ছবি তোলাতে চাচ্ছিল না। কিন্তু ছেলেগুলো বলল, আপনি আমাদের মায়ের মতো। আপনার চিকিৎসার জন্য আমরা সব করব। এরপর অনিচ্ছা সত্বেও বিভিন্নভাবে জুলেখা বেগমের ছবি তুলে ছেলেগুলো চলে গেল। গফুর মিয়া দৌড়ে রাস্তার মোড়ে গিয়ে ওদের কাছে নিজের বিকাশ নম্বর দিয়ে এলো।

পরদিন মজনুর দোকানে গিয়ে মোবাইলটা হাতে দিয়ে জানতে চাইল- টাকা এসেছে কিনা? মজনু কী সব টিপে দেখে বলল, না, গফুর ভাই কোনো টাকা তো আসে নাই। এর মধ্যে এক ছেলে এসে বিকাশ থেকে দশ হাজার টাকা তুলে নিল। গতকালকের ওই ছেলেদের দলে এই ছেলেটি ছিল না? অনেকক্ষণ ভেবে গফুর মিয়া ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, বাবাজির সাথে কি কাল পৌরসভায় আমার দেখা হইছিল? প্রশ্ন শুনে ছেলেটি থতমত খেয়ে বলল, ও হ্যাঁ, চাচা আমরাই ছিলাম। এই যে টাকা তুললাম, সেটা আবার ভাববেন না আপনার টাকা। এটা আমার অন্য টাকা।
গফুর বলল, না না তা ভাবুম কেন। আমার টাকা আইলে তো আমার মোবাইলেই আইতো। ছেলেটি চলে গেলে মজনু গফুর মিয়াকে প্রশ্ন করল, কি হইছে আমারে বলেন তো ভাই?
গফুর মিয়া সবকিছু খুলে বলল। শুনে মজনু তার কম্পিউটার অন করল। কিছুক্ষণ কী সব করার পর মনিটরে গফুর মিয়ার স্ত্রী জুলেখার ছবি ভেসে এলো। সব পড়ে মজনু মিয়া বলল, ওরা তো তোমার নম্বর দেয়নি গফুর ভাই। অন্য একটা নম্বর দিছে। এরপর খাতা খুলে নম্বর মিলিয়ে বলল, এখানে যে নম্বর দুটো দিছে সেই দুটো থেকে আজ ওরা বিশ হাজার টাকা তুলছে। আর এখানে তো অনেকেই টাকা দিছে। তোমার বউয়ের কি ক্যানসার হইছে?
গফুর বললো, ক্যানসার না, টিউমার হইছে। মজনু বলল, ওরা তো লিখছে ক্যানসার হইছে আর চিকিৎসার জন্য কয়েক লক্ষ টাকা লাগব।

পর দিন গফুর মিয়া ঘুম থেকে উঠে বউয়ের পাশে বসে কাঁদছিল। তার মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন খড়কুটোর মতো বানের পানিতে যেন ভেসে ভেসে আসছে। আজ তৃতীয় দিন। ডাক্তারসাবের কথা মতো আজকেই শেষ দিন। কিন্তু একথা সে কীভাবে জুলেখা কিংবা মেয়ে আসমাকে বলবে। অঝরে কাঁদছিল সে। আসমা বাবার পাশে এসে দাঁড়াল। বাবা কী হইছে মায়ের? তুমি খালি কয়দিন ধইর‌্যা কান্দো আর আউলা-ঝাউলা ঘুইরা বেড়াও। কামেও যাও না।
মেয়ের কথা শুনে গফুরের কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায়। এমন সময় বাইরে থেকে মজনু মিয়ার হাঁক শোনা যায়। বাইরে এলে মজনু মিয়া বলে আপনার রিকশাটা বাইর করেন তো গফুর ভাই।
গফুর বলে, সবই তো তোমারে কইছি। আজ আর আমি বাইরে যামু না। শেষ সময়ে বউডার পাশে থাকতে চাই।
মজনু বলল, ঠিক আছে আপনি রিকশা বাইর না করেন, আমি অন্য রিকশা আনতাছি। তাড়াতাড়ি ভাবিরে রেডি করাইয়া বাইরে নিয়া আসেন। গফুর মিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, বাইরে আইব কেন?
মজনু বলল, তারে নিয়া সদর হাসপাতালে যামু। আপনি কাইল ভুলে ভাবির রিপোর্টগুলা আমার দোকানে ফালাইয়া আসছিলেন। আমি রাতে সেইগুলা নিয়ে সদর হাসপাতালের হেদায়াত ডাক্তারের বাসায় গেছিলাম। ডাক্তারসাহেব আমার দোকান থেকে লোড-টোড করে। স্যারেরে সব দেখাইতেই কইল, সামান্য এপেনডিসাইটিস হইছে। সদর হাসপাতালে নিয়া গেলে ৩-৪ হাজার টাকার মতো খরচ হবে। কথাটা শুনে গফুর মিয়া যেন প্রাণ ফিরে পেল।

*
তিন দিন পর মোটামুটি সুস্থ জুলেখাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে সেই ছেলেগুলো গফুর মিয়ার বাড়ি আসে। আগামীকাল স্কুল মাঠে তার হাতে টাকা হস্তান্তরের অনুষ্ঠান হবে। এলাকার গণ্যমান্য সবাই থাকবে। তার জন্য এক সেট নতুন পাঞ্জাবি আর জুলেখার জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছে ছেলেগুলো। যাবার সময় বার বার বলে গেছে, সে যেন নতুন পাঞ্জাবিটা পরে যায়। অনেক সাংবাদিক থাকবে। পর দিন গফুর মিয়া স্কুল মাঠে গিয়ে দেখল মাঠ ভর্তি অনেক লোক। এলাকার কমিশনার, মাদবর, ইউএনও সবাই মঞ্চে বসে আছে। বিশাল মঞ্চের পেছনে জুলেখার রঙিন ছবি দিয়ে লিখেছে ‘ক্যানসার আক্রান্ত জুলেখা বেগমের চিকিৎসায় সাহায্যের অর্থ হস্তান্তর। এরপর ছেলেরা সবাই ধরে তাকে নিয়ে মঞ্চে বসালো। পাশে বসা মাদবর সাহেব একটু ইতস্তত করলেও চুপচাপ মেনে নিল। এরপর সবাই বক্তৃতা দিতে লাগল।

গফুর মিয়ার বাবা যে মুক্তিযোদ্ধা ছিল আজ কমিশনার সাহেব সবার সামনে স্বীকার করলেন। এতদিন বলতেন গণ্ডগোলে মারা গেছে। যদিও কমিশনারের বক্তৃতার সময় মাদবর সাব একটু গাইগুই করছিল পুরান কথা টানাটানির জন্য। ইউএনও সাহেবও বক্তৃতা দিলেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে গফুর মিয়ার স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ কিছুটা বহন করা হয়েছে। কিন্তু সেটা যে মাত্র ৭০০ টাকা সেটা বললেন না। এরপর সবাই মিলে গফুর মিয়ার হাতে একটা খাম তুলে দিল। অনেক অনেক ছবি তোলা হলো, হাততালি পড়ল খুব। গফুর মিয়ার কিছু বলার অনুরোধ আসার আগে এক ফাঁকে খামের টাকাটা গুণে দেখল সে। বিশটি পাঁচশ টাকার নোট। টাকা গোনার সময় ছেলেদের নেতাটি কানে কানে বলল, খুব কম টাকাই উঠেছে। তার উপর আবার অনুষ্ঠানের মেলা খরচ হয়ে গেল। ডেকোরেটরকেই দিতে হলো পঞ্চাশ হাজার টাকা। এছাড়া অতিথিদের আপ্যায়নসহ অনেক খরচ গেছে। এসব কথা শুনতে শুনতেই গফুর মিয়া মাইকের সামনে দাঁড়াল। সবাইকে সালাম দিয়ে কথা বলতে শুরু করল সে।

আমি গফুর মিয়া। রিকশা চালাই। এই শহরের এক কোণায় বাপের একটু ভিটা আছে। সেখানেই থাকি। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ছি। এরপর আর পড়তে পারি নাই। কি কইরা পড়ুম কন? বাপটা যুদ্ধে গিয়া মইরা গেল। এতদিন লেখাপড়া করি নাই দেইখা খুব দুঃখ ছিল। এখন আর দুঃখ নাই। এইটুকু বলে সে একটু থামল। এরপর পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে আবার বলতে লাগল, এই যে প্রেসক্রিপশনটা দেখতাছেন এইডা আমারে লেখাপড়া না শেখার দুঃখ ভুলাইয়া দিছে। একথা শুনে ক্লাবের ছেলেগুলো ভাবল, এবার বুঝি চিকিৎসার টাকা পেয়ে সব দুঃখ ভুলে গেছে সেই কথা বলবে। তারা তুমুল হাততালি দিল। কেউ কেউ তরুণ সংঘের নামে স্লোগানও দিল।

স্লোগানের রেশ থামলে গফুর মিয়া আবার বলতে লাগল, আমার স্ত্রী কয়েক মাস যাবত পেট ব্যথায় কষ্ট পাইতেছিল। সবাই কইলো জনতা ক্লিনিকে বড় ডাক্তার আসে ঢাকা থেকে তারে দেখাও। এই প্রেসক্রিপশন ওই ডাক্তার সাবেরই লেখা। অনেক লেখাপড়া জানা মানুষ। তিনি বললেন স্ত্রীর পেটে টিউমার। তিন দিনের মধ্যে অপারেশন না করাইলে নির্ঘাত মৃত্যু। অপারেশন করতে ৯০ হাজার টাকা লাগব। শুইনা আমাদের মাদবর সাবের কাছে গেলাম। উনি কইলেন আমরা নামাজ পড়ি না তাই আমাগোর অসুক অয়। এরপর গেলাম আমাগো কমিশনার সাবের কাছে। তিনিও বিএ পাস শিক্ষিত মানুষ। তিনি আমার চিকিৎসা বাবদ এত টাকা লাগবে শুইনাই রাইগ্যা গেলেন। কিন্তু আমার বউয়ের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করলেন না। তাড়াতাড়ি লোক পাঠায়া তার অনুমতি ছাড়া কেমনে চেম্বার খুলছে ডাক্তারসাব হেইডার ব্যবস্থা নিতে কইলেন। চাঁদা না দিয়া এত টাকা কামানো নিশ্চয় ডাক্তার সাবের অন্যায় হইছিল। এরপর আমার কাছে আইলো এই শিক্ষিত জোয়ান পোলাগুলা।

আবার হাততালি-স্লোগান। এবার স্লোগান একটু বেশিই স্থায়ী হলো। সেই করতালির জোয়ার থামলে গফুর মিয়া আবার বলতে শুরু করল, আমার স্ত্রীরে মা ডাইকা ছবি তুইলা নিয়া ওই ডাক্তারের বলা টিউমাররে তারা ক্যানসার বানায়া ফেছবুক না কি দিয়া লাখ লাখ টাকা তুলল। আজ আমার হাতে তুইলা দিল মাত্র দশ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকা তুইলা দেওনের জন্য তারা নাকি ডেকোরেটর ভাড়া করছে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়া। এই প্রেসক্রিপশনটা না হইলে লেখাপড়া জানা মানুষগুলো কত নিচ হইতে পারে আমি জানতেই পারতাম না। এক শিক্ষিত ডাক্তার এপেনডিসাইটিসরে বানাইল টিউমার, শিক্ষিত পোলাগুলান টিউমাররে বানাইল ক্যানসার, কমিশনার সাব আমারে সাহায্য করার চাইতে তার চাঁন্দা আদায়টা জরুরি মনে করল, টিএনও সাব মাত্র ৭০০ টাকা দিয়া এতগুলা বড় বড় কথা কইল- এইসব দেইখা লেখাপড়ার উপর ভরসা হারাই ফালাইছি। তয় কিছু কিছু শিক্ষিত লোকের উপর বিশ্বাস উইঠা গেলেও আমার মাইয়ারে আমি পড়ামু। সদর হাসপাতালের হেদায়াত ডাক্তারের মতো শিক্ষিত মানুষ বানানোর জন্য। এই বলতে বলতে গফুর মিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। চোখ মুছতে মুছতে বলল, লাগব না বাবাজি তোমাগোর টাকা। এই টাকাটাও তোমরা রাইখ্যা দ্যাও। তোমাগোর মনের ভেতর লোভের যে ক্যানসার হইছে তার চিকিৎসা করাও।
এই বলে গফুর মিয়া টাকার খামটা তরুণ সংঘের নেতার হাতে দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে হন হন করে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো মঞ্চ ফাঁকা হয়ে গেল। পড়ে রইল শুধু একটি ছেঁড়া প্রেসক্রিপশন।



 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ আগস্ট ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel