ঢাকা, সোমবার, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

রিজওয়ান: বোধ ও মননের বিশ্লেষণ

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১৩ ৭:৩০:৫৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১৩ ১:৫০:৫৩ পিএম

মুম রহমান || ডেভিড মামেট নাট্যরচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘যখন তুমি থিয়েটারে আসো, তোমাকে এটা বলায় উৎসাহী হতে হবে যে, আমরা সবাই এখানে এসেছি একটা যোগাযোগ সৃষ্টি করতে, খুঁজে বের করতে যে এই দুনিয়াটা কী ছাইপাশ হচ্ছে! তুমি যদি এটা বলতে উৎসুক না হও, তাহলে তুমি আসলে শিল্পের বদলে পাবে বিনোদন এবং নিচু মানের বিনোদন।’

আমরা যে আঙুলের স্পর্শে যোগাযোগের ডিজিটাল দুনিয়ায় এসেছি সেখানে ক্রমশই সেলফি, স্ট্যাটাস, লাইক, শেয়ারের তরলতায় বিনোদন পাচ্ছি, শিল্প বড় দুর্লভ হয়ে উঠছে ক্রমশ। সৈয়দ জামিল আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ‘রিজওয়ান’ দেখার পর এই কথাগুলোই মনে পড়ে গেল।

Send your cries to me, if only in this way:

I’ve found a prisoner’s letters to a lover—

One begins: “These words may never reach you.”

Another ends: “The skin dissolves in dew

without your touch.” And I want to answer:

I want to live forever. What else can I say?

It rains as I write this. Mad heart, be brave.

                         - The Country Without a Post Office by Agha Shahid Ali


‘রিজওয়ান’ নাটকের মূল সূত্রটি আগা শাহিদ আলী’র ‘দ্য কান্ট্রি উইথআউট আ পোস্ট অফিস’ কবিতা থেকে নেয়া। ১৯৯৭ সালে এই কাব্যগ্রন্থটি আগা শাহিদ আলীকে মার্কিন ইংরেজি কাব্যে একটু গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তিনি তাঁর মাতৃভূমি কাশ্মীরের দুঃসময় চিত্রায়িত করেন এই শিরোনাম কবিতা ও অন্যান্য কবিতায়। কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মঞ্চ নাটকের নজির খুব বেশি নেই। সেই বিবেচনায় বেঙ্গলোরবাসী নাট্যকার, নির্দেশক অভিষেক মজুমদার কবিতাকে অবলম্বন করে মঞ্চ নাটক লেখার দুরূহ কাজই করেছেন। অভিষেক মজুমদার ‘রিজওয়ান’, ‘দ্য জিনস অব ঈদগাহ’ এবং ‘গাসা’ লিখে কাশ্মীর ট্রিলোজি সম্পন্ন করেছেন। তিনি রিজওয়ান নাটকটি প্রথম পুনে ফিল্ম-এ  টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের জন্যে মঞ্চস্থ করেন ইন্ডিয়ান অঁনসম্বলের প্রযোজনায় হিন্দি ও ইংরেজিতে। তার ভাষ্যমতে, ‘রিজওয়ান কাশ্মিরী গল্প কিন্তু এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক।’ আর কে না জানে গণহত্যা, ধর্মীয় সহিংসতা, সামরিক স্বৈরাচার- এসবই আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কতোটাই না ভয়াবহ। অভিষেক মজুমদারের মূল নাটক সেই ভয়াবহতাই ধারণ করে। রিজওয়ানে গল্প কম, কবিতাই বেশি। কাব্যিক এই নাট্যে আগা শাহিদ আলীর কবিতার মূল সুরটিই ধরা হয়েছে। বেদনা আর বিদ্রোহের কাব্যিক সুর রয়ে গেছে রিজওয়ানের পাণ্ডুলিপিতে। বলা প্রয়োজন, সংলাপ কম হলেও বর্ণনাভঙ্গির এই নাটক ভীষণ কাব্যিক এবং ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্যের বাংলা অনুবাদে সেই কাব্যিকতা কিছুটা হারিয়েছে। তবে মূল বিষয় ও ভাবনা থেকে ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য দূরে সরেননি একবারও।
 


রিজওয়ানের গল্পকাঠামো খুবই সরল। রিজওয়ান ও ফাতিমা এই দুইজনকে ঘিরে গল্প আবর্তিত হয়। কাশ্মিরের সেনা আগ্রাসনের কালে একে একে রিজওয়ানের বাবা, মা, বোন, দাদা সবাই নিহত হয়। রিজওয়ান এই  হত্যা মেনে নিতে পারে না। সে স্বজনের লাশ দাফন না করে নিজের ঘরেই লুকিয়ে রাখে। একসময় রিজওয়ানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে যে, সে স্বজনদের হত্যা করে তাদের লাশ লুকিয়ে রেখেছে। সামরিক সেনারা রিজওয়ানকে হত্যা করে। রাষ্ট্রশক্তি যখন বন্দুকের জোড়ে চলে তখন সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয় দুর্বল জনতা। গল্পটি যতো সরলই হোক, এর উপস্থাপনা, বর্ণনা ভঙ্গি মোটেও সরল নয়। বিমূর্ত কবিতার মতো গল্পটিকে বলা হয়েছে সচেতনভাবেই অবিন্যস্ত করে। ধারাবাহিক নিটোল কাহিনি বলার মধ্যে একটা সরল বিনোদন আস্বাদনের সুযোগ থাকে। রিজওয়ান সে সুযোগ দেয় না। আমরা কখনো দেখতে পাই রিজওয়ানের জন্ম হচ্ছে সরকারি হাসপাতালে, সেখানেও তার ভূমিষ্ঠ হতে সময় লাগছে, যেন সে স্বর্গ ছেড়ে এখানে আসতে চায় না। আমরা দেখতে পাই, রিজওয়ানের বোন ফাতিমা স্কুটারে চলতে চলতে জানায় সে মারা গেছে। দাদাকে দেখি মৃত্যুপুরীর দিকে এগিয়ে যেতে। বিরান শীতল কাশ্মিরে কোনো ডাক পিওন আসে না, নৌকায় করে চিঠি পৌঁছানোর কোনো তাগাদা নেই। ‘ভূস্বর্গ’ বলে খ্যাত কাশ্মির এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছে। গল্পকথনে রিজওয়ানের জন্ম, সেনা কর্তৃক ফাতিমার ধর্ষণ ও হত্যা, ট্রেনের মধ্যে বাবার মৃত্যু, রিজওয়ানের মা ও দাদার মৃত্যু- এ সবই সরল ধারাবাহিকতা ভেঙে উপস্থাপিত হয়েছে। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে আর যাই হোক জীবনের গল্পটা ধারাবাহিক থাকে না, সম্ভব না। বোন ফাতিমা মারা গেলেও সে বারবার রিজওয়ানের কাছে ফিরে আসে। রিজওয়ান যার নামের অর্থ স্বর্গের দ্বার রক্ষি সেও যেন এক জীবনে পরিভ্রমণ করে স্বর্গ-মর্তের নানা স্তর। স্বভাবতই বক্র রেখায় চলে রিজওয়ানের জীবনের সরল গল্প। এ এক আশ্চর্য বৈপরীত্য। ভূস্বর্গে জন্ম হলেও নারকীয় অভিজ্ঞতা পায় সে এ মর্তে এসে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাস। বিষয়ের জটিলতার আঁচ এসে লাগে রিজওয়ানের নাট্যভাষ্যে। আর পুরো নাটকটিতেই মালার্মের প্রতীকবাদী কবিতার মতো কতো রূপক, সংকেত, প্রতীক এসে ভিড় করে। নিশ্চিতই রিজওয়ানের টেক্সট-এর দারুণ বুনন! আর ওই যে প্রাসঙ্গিকতা, তার উপলব্ধি টের পাই নাটক দেখতে দেখতেই। নাটক দেখতে দেখতেই ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে যায়, আমাদের পাহাড়ের মানুষদের কথা, মনে পড়ে যায় রোহিঙ্গা নিধনের কথা। রোহিঙ্গা, পাহাড়ি, মুসলমান, হিন্দু, কৃষ্ণাঙ্গ- মানুষকে এমন কতো রকম শিরোনাম দিয়ে চিহ্নিত করেই না হত্যা করা যায়। মানুষকে মানুষ ভাবতে গেলেই তো রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাসের অসুবিধা হয়ে যায়। রিজওয়ান সেই অসুবিধার দিকটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ‘আমাকে বলো না বাবা মারা গেছে, বাবাকে বোলো আমি মারা যাইনি’- আহা, মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতিও আসে যখন মানুষ নিজের মৃত্যুকেও আড়াল করতে চায়, স্বজনের মৃত্যুকেও অস্বীকার করে! সিরিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, পূর্ব তিমুর, কাশ্মির, মিয়ানমারে এমনকি একাত্তরেও বাংলাদেশেও গণহত্যার ভয়াবহ কালগুলোতে মৃত্যুর কালো থাবা ইতিহাসে দাগ ফেলে গেছে। সেই সব দাগেরই একটি দলিল ‘রিজওয়ান’, যা সমকাল ও বিশ্ব রাজনীতির চিত্ররূপ।

গল্প এবং বিষয়ের কারণেই ‘রিজওয়ান’ দেখা খুব সুখকর হওয়ার কথা নয়। গলার মধ্যে এক ধরনের দলা পাকানো অস্বস্তি কাজ করে নাটকজুড়ে। টানটান উত্তেজনা চলে নাটক চলাকালে। অভিনয়, সংগীত, আলো এবং কোরিওগ্রাফিতে রয়েছে বেদনা ও বিপ্লবের ঝাঁজ। তীব্র অনুভূতির নাটক রিজওয়ান। এর মূল রস করুণ। ‘প্রিয়জনের বধ দর্শন, অপ্রিয় বাক্য শ্রবণ প্রভৃতি ভাববিশেষ দ্বারা করুণরস উদ্ভূত হয়।’  নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ট্র্যাজিক সুরটি বহাল ছিল। নাটকের শুরুতেই যেন আমরা দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র জগতে চলে যাই।

they had their faces twisted toward their haunches

and found it necessary to walk backward,

because they could not see ahead of them.

... and since he wanted so to see ahead,

he looks behind and walks a backward path.

এবং এভাবে পেছন ফিরে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে রিজওয়ানের গল্পকথন। ডিভাইন কমেডির মতোই এ গল্পে জীবন আর মৃত্যু, স্বর্গ আর মর্ত আর নারকীয় যন্ত্রণা একাকার হয়ে ওঠে।

রিজওয়ানের প্রায়োগিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এর ত্রিমাত্রিকতা। মঞ্চ যে একটি ত্রিমাত্রিক এবং জীবন্ত জগত তা অনেকাংশেই ভুলে যাই আমরা। শিল্পকলায় সবচেয়ে থ্রিডি ও লাইভ অ্যাকশন মঞ্চেই ঘটানো সম্ভব। রিজওয়ান তাই প্রমাণ করল। দর্শন আর শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের পাশাপাশি বোধের জগতেও হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে যায় রিজওয়ান। বোধ আর ভাবনার গভীরতা ও তীব্র বেদনার কারণেই হয়তো এই নাট্য গলাধঃকরণ করা খুব সহজ হয়ে ওঠে না। এমনিতেই বিশ্লেষণধর্মী নাটক সহজপাচ্য নয়। ট্র্যাজিকধর্মী হলেও এ নাটক খুবই গতিশীল। নির্দেশক পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়েছে পুরো প্রেক্ষাগৃহটি ঢেলে সাজানোর। অভিনেতাদের ক্রীড়াঙ্গন করে তুলেছেন পুরো প্রেক্ষাগৃহ। প্রচলিত প্রসেনিয়াম মঞ্চের ধারণা ভেঙে দিয়ে এ নাটকে অভিনেতাদের প্রবেশ-প্রস্থানের নানা দ্বার খুলে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে তৈরি করা হয়েছে নানা দৃশ্যমাত্রাও। দড়িতে ঝুলে ওঠা-নামা, মই বেয়ে অভিনয়, দর্শক সারির মাথার উপরে স্বচ্ছ পাটাতন ইত্যাদি নানা কারণে সব সময় মাথাটা ঘোরাতে হয়েছে প্রেক্ষাগৃহের চারপাশে। প্রতি মুহূর্তে আলো, দৃশ্যস্থান ও শিল্পীদের স্থানান্তর দর্শককে ব্যস্ত রেখেছে। অভিনেতা ও দর্শকের নৈকট্য নিয়ে সুচিন্তিত ভাবনার প্রকাশ দেখা গেছে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। সাধারণত ঘেরাটোপ মঞ্চে আমরা যখন অভিনয় দেখি তখন পাঁচ ফুট থেকে ছয় ফুট (আমাদের অভিনেতাদের গড়পড়তার উচ্চতা) আমাদের চোখ ব্যস্ত রাখে। কিন্তু অভিনেতার মাথার উপরে যে বিশাল শূন্যস্থান তা নিয়ে ভাবার অবকাশ তো থাকেই। সেই ভাবনার গোড়াতেই জল ঢেলেছে রিজওয়ান। আমরা মঞ্চে সে অর্থে শূন্য বা অব্যহৃত স্থান দেখি না। মনে হয়, আমাদের দৃষ্টিসীমার পুরোটাতেই কুশিলবরা আছেন। পিটার ব্রুকের এম্পটি স্পেস তত্ত্ব মতে, যে কোনো শূন্য স্থানই হতে পারে রঙ্গমঞ্চ। সেই নজির আমরা এখানে ভালো করেই টের পাই। রিজওয়ানের স্থান ভাবনা মনে করিয়ে দেয়, থিয়েটারের সীমানা কতো বৃহৎ আর বিস্তৃতই না হতে পারে।
 


থিয়েটার যেমন জীবন্ত, তেমনি বহু শিল্পকলার যৌগিক সমন্বয়। সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য- শিল্পের সব শাখা থেকেই অকাতরে গ্রহণের সুযোগ রয়েছে নাট্যমঞ্চে। সেটাও উপলব্ধি করা যায় ‘রিজওয়ান’ দর্শনে। কবিতা থেকে অনুপ্রণিত এ নাট্যের পাণ্ডুলিপি ও মঞ্চায়নেও রয়ে গেছে কাব্যের নান্দনিকতা। শুধু কবিতা নয়, কখনো কখনো এর বর্ণনা ও মোচড় আপনাকে ছোটগল্পের ভুবনেও নিয়ে যাবে। এ নাটকে আলোর বিন্যাস, কোরিওগ্রাফি প্রায়শই চিত্রকলাস্পর্শী। উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা গোলাপ ফুলের গুচ্ছ, কিংবা মঞ্চজুড়ে ঝোলানো কাগজের নৌকা- রং ও বিন্যাসে চিত্রকলার আবেশ এনে দেয়। বড় চিত্রশিল্পীর দক্ষতাতেই এ নাটকে রঙের ব্যবহার হয়েছে। কৃত্রিম ধোঁয়ার ব্যবহার একাধিক দৃশ্যেই বহুমাত্রিকতা সৃষ্টি করেছে। রিজওয়ানের নান্দনিকতা চোখকে আনন্দ দেয়, মনকে প্রজ্ঞা দেয়। যেভাবে এ নাটকের প্রেক্ষাগৃহ, মঞ্চ (অভিনয় এলাকা) সাজানো হয়েছে তা রীতিমতো একজন সুকৌশলী স্থপতির কাজ বলেই মনে হয়। স্থানের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের জন্যে এ নাটকে স্বর্গ, মর্ত, নদী, হাসপাতাল, ট্রেন, রাস্তা কতো কী-ই না তৈরি হয়ে গেলে অবলীলায়।

আর পুরো নাট্যমুহূর্ত তৈরিতে সবসময়ই সবচেয়ে বেশি করে প্রয়োজন হয় একটা যথার্থ টিমওয়ার্কের। মঞ্চে যারা অভিনয় করেন, মঞ্চে যে আলো আর দৃশ্য দেখি, যে শব্দ আর সুর আমরা শুনি তার পেছনে থাকে নেপথ্য কর্মীরা। এই নেপথ্য কর্মীদের কাজ আর যাই হোক রেজওয়ানের দৃশ্যায়নে আড়ালে থাকে না। যে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে শিল্পীরা উপর থেকে নেমে আসে, ওঠে যায়, লাফ-ঝাঁপ দেয়- তাদের নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তার পুরোটাই রয়ে যায় নেপথ্য শিল্পীদের হাতে। মাথার উপরে চলমান প্ল্যাটফর্ম কিংবা প্রপস সমূহের আকস্মিক উদয়, মুহূর্তেই মঞ্চসজ্জার অদল-বদল, ধ্বণি ও সুরের মায়া- এই সবই ভীষণ ঐক্যবদ্ধভাবে চলে নেপথ্যশিল্পীদের কল্যাণে। রিজওয়ান অবশ্যই দলগত কাজের এক নিঁখুত উদাহরণ।

এটা সত্য যে, রিজওয়ানের যে নকশা করেছেন নির্দেশক তাতে করে অভিনয়ের পুরো ব্যাপরটাই ভীষণ দুরূহ হয়ে উঠেছে। নানা ভঙ্গিমা ও অবস্থান থেকে শারীরিক কসরত করে অভিনেতারা একনিষ্ঠ চেষ্টা করেছেন রস সৃষ্টি করতে। এ নাটকের তরুণ অভিনেতারা আঙ্গিক, বাচিক অভিনয়ে সাধ্যমতো উৎরে যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন। ফাতিমা চরিত্রে মহসিনা আক্তার, রিজওয়ান চরিত্রে তিতাস জিয়া আমাদের কাঁদিয়েছেন। তবুও সাত্ত্বিক অভিনয়ের দিকে কিছুটা ঘাটতি অনুভব করা গেছে। আসলে এই জটিল আর গতিময় নকশার মধ্যে থেকে অভিনেতাকে চূড়ান্ত শৈল্পিক সত্তায় পৌঁছুতে হলে আরো চর্চা ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করতে হবে। ধারণা করা যায়, সেটুকু তারা কালে কালে করবেন। নায়লা আজাদের পোশাক পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফি অভিনেতাদের অনেকটা সাহায্য করেছে উতরে যেতে। মিতালী দাশের সুদূর পাহাড়ের গানটিও পুরো নাট্য আবহের সঙ্গে খুব মানিয়ে গেছে। আলো যে একটা চরিত্র সেটাও এ নাটকে বোঝা গেছে। মঞ্চ আর আলো নিয়ে খেলেছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ, তাদের ভাষা দিয়েছেন।

এ নাটকের সংলাপ তুলনায় কম। অভিনেতার দেহের ভাষা এখানে মূখ্য। তারপর কিছু বর্ণনা ও সংলাপ সত্যিই মনে রাখার মতো। ধর্ষিত ফাতিমার মুখে বারবার বলা ‘আমার মৃত্যু প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে’ ভীষণ প্রতীকী। এক পর্যায়ে ফাতিমা বলে, ‘আমাদের গোলাপবাগান, ঘরের উঠোন সমস্তই তাদের চাই এবং আমরা হয়তো উৎসর্গীকৃত তাদেরই জন্য। আমাদের সমস্ত মৃত্যু তাই প্রাকৃতিক, জন্মালে যেহেতু মরতে হবেই।’ এই সংলাপ আমাদেরকে স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। এই বিশ্বে তারা সত্যিই ভাগ্যবান যারা অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যু পেয়েছেন। একটি সংলাপ বারবার ঘুরেফিরে আসে, ‘এ দুনিয়ায় যদি কোনো জান্নাত থেকে থাকে, তবে সে জান্নাত এই মাটিতে, এই মাটিতে, এই মাটিতে।’ ভূস্বর্গ কাশ্মীর শুধু নয়, প্রত্যেক সচেতন মানুষের জন্যেই তো তার মাতৃভূমি, স্বদেশ স্বর্গের মতো। এই সংলাপটি চাকমা ভাষায়, ‘এ পৃথ্বিমীত যদি হোন ছগ্‌গ থে থাই, ছালে ছে ছগ্‌গ   এ-মাদিত, এ-মাদিত, এ-মাদিত’ ব্যবহার করাও ইঙ্গিতপূর্ণ। আমাদের পাহাড়িদের সংকটের দিকে যেমন ইংগিত করে তেমনি লঘু নৃগোষ্ঠীর ভাষার দিকেও আমাদের মন ফেরায় এ সংলাপ। তবে সংলাপের গভীরতা ও সূক্ষ্মতা সবসময় ধরা পড়েনি অভিনেতার বচনে কিংবা অভিব্যক্তিতে।

তবুও নাট্যমুহূর্ত সৃষ্টি হয়। অনেক দিন পর আমাদের চোখে লেগে থাকার মতো একাধিক নাট্যমুহূর্ত সৃষ্টি হয় রিজওয়ানে। ভাইবোনের স্কুটারে করে পুরো মঞ্চ পাটাতনে ঘুরে ঘুরে সংলাপ দেয়া, ফাতিমার পাল্টা-ধর্ষণ দৃশ্য, রিজওয়ান ও তার মায়ের গল্প কথন, দাদার মৃত্যু দৃশ্য- এমন অনেক দৃশ্য আমাদের মোহিত করে। শেষ পর্যন্ত মোহ আর মায়ার সীমানা পেরিয়ে রিজওয়ান ঢুকে যায় আমাদের মননের গভীরে। নাটক শেষে দর্শক ভাববে, আলোচনা করবে, বোধহয় সেটাই হতে পারে স্বার্থক নাটক। রিজওয়ানে সেই সম্ভবনা লক্ষ্য করে আনন্দিত হই। বাংলা নাটকের জয় হোক, দর্শকের ভালোবাসা জেগে উঠুক বাংলা নাটক, মঞ্চে তৈরি হোক নতুন নতুন নাট্যপাঠ ও নির্মাণ- রিজওয়ান দেখতে দেখতে তেমন প্রার্থনাই মনে এলো।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop