ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ আষাঢ় ১৪২৬, ১৮ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আয়নায় দেখা দুই হাত || অলাত এহ্‌সান

অলাত এহ্‌সান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১৩ ৫:২২:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১৭ ১:১৪:৩৫ পিএম
Walton AC 10% Discount

ধুম কুয়াশার ভেতরেও রানওয়ের মতো তীক্ষ্ম সোজা হাফ কি.মি. রাজিয়া সুলতানা রোড দিয়ে এত মানুষ হাঁটাচলা করে যে, কুয়াশার ভেতর একটা সাদা ও অনুভূতিশীল সুরঙ্গ তৈরি হয়ে যায়। কখনো কখনো বিভ্রম হয়, আসলে তারা দুই তারে ছড়ান সাদা শাড়ির ভেতর দিয়ে হয়তো হাঁটছে। এমনই এক শীতের সন্ধ্যায় (বিশেষ দিন হিসেবেই মনে আছে), ফেব্রুয়ারির ঠিক ২৬ তারিখ, বাসায় ফিরে দেখি মৌরির প্রসাধনহীন বাম চোখের পাপড়িগুলো ঝরে যাচ্ছে। প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে তখুনি। কথাটা মৌরিকে বলতেই খুব নিস্পৃহভাবে বললো-তাহলে শুরু হয়ে গেছে। আমি অনুধাবন করছিলাম, এটা ওর সঙ্গে আমার অনন্ত ঘটনা শুরুর নমুনা। যেমনটা শুরু হতে পারতো সহকর্মী বর্ণা ফেরদৌসীর সাথে। দশ বছর আগে আমরা যখন একই অফিসে কাজ করতাম-অপ্রতিদ্বন্দ্বিতার ভান করে। মৌরি যে পাপড়ি ঝরার কথা বলছে না, আমি নিশ্চিত। তাই চুপ করে গেলাম। কিন্তু ফ্যাশনদুরস্ত মৌরি কি এখন আয়নাও দেখে না! মোবাইলে ওর চোখের একটা ছবি তুলে দেখাতে চেষ্টা করলাম। আয়নায় বোঝা যাবে না এমন পাপড়ি ঝরা মোবাইলের ক্যামেরায়ও খুব আসছিল না। তখনই ভেবেছিলাম মৌরির সুন্দর পাপড়িগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগে ওর একটা ছবি তুলে রাখবো।

মৌরির চেহারাই এমন, যাকে বলে ফটোজেনিক লুক। মাঝারি উচ্চতায় মজবুত গড়ন। টান টান দুই গালের মাঝে শক্ত টিকালো নাক। তার নিচে সসীম ঠোঁট ওর নাককে দিয়ে গৌরবজনক উচ্চতা-আমি যদি অতিরঞ্জন না করে থাকি-মনে হয় এর চেয়ে বড় ঠোঁট সেখানে মানানসই হতো না। জোড়া ভ্রু’র নিচে বাদামী চোখ। চিকন রিমের চশমাটা ওর চোখের সীমানা সসীম করে দিয়েছে। সাদা পোশাকে ওকে মনে হতো শৈশবে হারিয়ে যাওয়া এক সাদা পালের নৌকা। বিশেষ করে জিন চাপানো ঘোড়ার পিঠের মতো সামান্য বেঁকে যাওয়া কটির ওপরের জামাটুকু দুই ফালি সেলাই করে চাপানো থাকতো। যদিও মৌরি কখনোই আমার সমানে ক্যাবারে নাচিয়েদের মতো সিনা দুলায়নি, তবু তাকে আমি তুলনা করতে পারি টোপ তোলা সাপের স্ফিত বুকের সঙ্গে, যা আমাকে সংবেদনশীলভাবেই উত্তেজিত করতো।

ফ্যাশন ডিজাইনে পড়তে পড়তে ফ্যাশন আর্টের প্রতি ওর ঝোঁক পড়ে গিয়েছিল। নামদার ফ্যাশন হাউসে কাজ করার সুবাদে দু-দশবার মডেল হতে হয়েছিল তাকে। ক্যামেরা অধিক দৃশ্যধারণে পাণ্ডিত্য দেখানো এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল তখনই। তরুণ লেখকদের মতো সে সবসময়ই যে কোনো দৃশ্যকে কিভাবে যৌক্তিক ও ছবির অধিক অনুভূতিতে নিয়ে যাওয়া যায়, তা ব্যাখ্যা করে সবাইকে সম্মোহিত করার চেষ্টা করতো। এমনকি লাঞ্চের সময় ছবি নিয়ে একটি বাক্য ব্যয় না করেও খাবার টেবিলের এক কোণায় ক্যামেরা আর দশাসই সাইজের লং-সুট লেন্সটা দাঁড় করিয়ে ‘লাঞ্চ উইথ রঘু রায়’ মনে করতো। কখনো লেন্সের দাম, কাজের ফিরিস্তি আর ছবি তোলায় আলোর ব্যবহার নিয়ে বর্ণনা দিয়ে কারিশমা দেখাত। লাঞ্চ শেষে চা পর্বটুকু সেরে মৌরি যখন মোবাইলে আমাদের সেলফি তুলতো তখনও তার কাঁধে ব্র্যান্ডের চড়া ফিতায় প্রফেশনাল ক্যামেরাটা ঝুলে থাকতো। সেলফি ফ্রেমে আমি, মৌরি, বর্ণা আর ফটোগ্রাফারের (যার নাম আমি কখনোই বলতে চাই না) মুখ ঠাসাঠাসি করতে করতে মনে হতো আমাদের ব্যক্তিগত একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা থাকতেই পারতো। আমি তখন ওই হাউসের মিডিয়া সেকশনে কাজ করি।

মৌরির ঠিক বিপরীতটাই ছিল বর্ণা, পোস্ট প্রডাকশন ইনচার্জ। ওর বড় ফ্রেম আর মোটা কাঁচের চশমার ভেতর চোখ দুটো ছিলে স্বল্পজলে ভাসানো কাগজের নৌকার মতো সদা টলায়মান। কখনো কখনো বর্ণার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে ওর চোখ খোলার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু এই অভিব্যক্তি প্রতিনিয়ত এতটাই বদলাত যে, কম্পিউটারের জটিল পাসওয়ার্ডের মতো ভয় হতো-না আবার ভুল হয়ে যায়। ভয়ে কী-বোর্ডটার ওপর চোখ দিয়ে রাখি আর ভাবি-হায় খোদা, পরের অক্ষরটা যেন মিলে যায়। মৌরি যখন ফটোগ্রাফারের সঙ্গে চুটিয়ে সম্পর্ক করছে (অবশ্য তা সে বরাবরই অস্বীকার করতো), তখন আমি বর্ণার সঙ্গে অমীমাংসিতভাবে মিশি।

মৌরি নূর এসেছিল চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীর মোহনা পার হয়ে। যেখানে প্রতিবছর বর্ষায় লঞ্চ ডুবিতে বিপুল প্রাণের মৃত্যু ঘটনা ছিল মিডিয়ার আবেগ আর সহমর্মিতা আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ডাকাতিয়া মোহনার বহু চোরাই স্রোতের অপ্রতিরোধ্য টান ছিল মৌরির ভেতর। ওর বিয়েটা ছিল পরিবার থেকে রীতিমতো আদায় করে নেয়ার ব্যাপার। ইতিহাস লুকিয়ে ফেলা প্রাচীন নগরীর মতো ওর বাম হাতের অর্ধেক হারানোর কথা আমি কখনো জানতে পারিনি। শুদ্ধভাষী যশোরের চৈতন্যহীন স্বর বর্ণা ফেরদৌসির গলায় অবিনিত রকম ওঠা-নামা করতো। তাই ঢাকায় এসে ও যে থিয়েটার বা আবৃত্তি সংগঠনে যোগ দিবে তা ছিল প্রায় পূর্ব নির্ধারিত রকমের স্বাভাবিক। বরং আমরা (আমি, মৌরি আর ফটোগ্রাফার) ওইসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হলেও বর্ণা আমাকেই কেবল স্টেজের পেছনের মেকাপ রুমে নিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা আর গুরুত্ব দেখাত।

মৌরির ৩২তম জন্মদিনে (চিরায়ত দুঃখের মতো দিনটা আমার প্রায় মনেই থাকে না) ওকে একটা পারসোনাল ডিএসএলআর কিনে দিলাম। ও ছোট্ট করে বললো-এখনই আমাকে স্মৃতি করে রাখতে চাও। তারপর বিরবির করলো-মানুষ তো স্মৃতির পাহাড়। রায় কুড়িয়ে বেল। মানুষ সারাজীবন সেই স্মৃতির পাহাড়ই বাইতে চায়।

জানালার ধারে উদাস তাকিয়ে আছে মৌরি, ঝুল বারান্দায় বনসাইয়ে ডান হাত বোলাচ্ছে, বারান্দার গ্রিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা বাম হাতটা সামলে দরজার সামনে হেলে আছে এমন ভঙ্গিতে ওর বেশকিছু ছবি তুললাম। তারপর ও ক্যামেরা চেয়ে নিল আমার ছবি তুলবে বলে। আমি ওর কথারই পুনরাবৃত্তি করলাম-মরে যাইনি তো এখনো। জীবিতরাই মৃতদের স্মৃতি বহন করে-উত্তরে মৌরি বললো।

প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মতো ডান হাতে ধরা ক্যামেরাটা অজ্ঞাত স্মৃতিবাহী বাম হাতের বাহুতে ঠেকিয়ে আমাকে নিশানা করছিল। ক্যামেরার আই ফোকালে একবার চোখ রেখেই বললো-অন করে দাও। একটা গোপন অপমান লাঘব করার জন্য ওর কাটা হাতটার দিকে তাকাই। আমি দেখলাম, ক্যামেরাটা তখন দিব্যি চালু আছে। তবু আমি নেড়েচেড়ে দিলাম। ও ভর দিয়ে একই কথা ফেরত দিল-অন করে দাও। আমার ধূর্ততা ধরা পড়ে গেল কি! শিশু বুঝের মতো আবারও আমি নেড়েচেড়ে, লেন্সটা একবার বড় ছোট করে দেখলাম। ক্যামেরা বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেও যদি বলি, আসলে ক্যামেরায় কিছু করারই ছিল না আমার। তারপর কয়েকবার ক্লিক করে ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দিল বিরক্তিসহকারে। পরিত্যাক্ত সরকারি প্রকল্পে ক্ষতির পরিমাণ হিসাব না করার মতো আমি ব্যাপারটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একরাতে ছবিগুলো রিভিউ করে দেখলাম মৌরির তোলা একটা ছবিতেও ক্যামেরা পজিশন ঠিক ছিল না। হয়তো স্বল্প আলোর কারণে আমাকে ঠাওর করে উঠতে পারেনি।

স্বল্প আলোয় মৌরি একদিন আমাকে আর বর্ণাকে সিনেমা হলের এক কোণায় আবিষ্কার করেও ঠিক চিনতে পারেনি। মৌরি আর ফটোগ্রাফারকে আমি আবিষ্কার করেছিলাম পান্থপথের এক গলিতে। তখন প্রয় দিন সকালে মৌরির সঙ্গে আমি এক রিকশায় অফিসে যেতাম। কিন্তু মৌরি ফিরতো ফটোগ্রাফারের সঙ্গে। আর কোনো দিন বর্ণার পরিচিত বায়িং হাউজে চাকরিজীবী বড় ভাই না এলে অসংকোচে ওর সঙ্গে আমি বাসায় ফিরতাম। মৌরির ধারণা, রাজিয়া সুলতানা রোডে বর্ণার বাসা নেয়া ছিল নেহায়েত আমার কাছাকাছি থাকা। তারপর থেকে মৌরি কখনোই আমার সঙ্গে অফিসে যায়নি।

মৌরিকে নিয়ে যে ছোট্ট বাসায় উঠেছি সেটা পুরনো ও স্যাঁতস্যাঁতে। ভেতরে সত্তুর দশকের মোজাইক করা ফ্লোর আর দেয়ালে রাস্তার পুরনো সোডিয়াম লাইটের মতো হলদেটে চুনকাম। তাতে লাইটের আলো অনেকটা শুষে নেয়। ঘরের বাতি বদলালে অল্প দিনের মধ্যে মনে হয় আলো কমে গেছে। এখন আর বাসাবাড়ির বাল্বে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, বিপণী বা কারখানার বেঢপ আলোর বাতি লাগাতে হবে। মৌরি প্রায়ই বাসার আলোক স্বল্পতার কথা বলে। আসলে বিয়ের পর নতুন করে আর বাসা খোঁজা হয়নি। আমার সাথে যে দুইজন চাকরিজীবী ব্যাচেলর ছিলেন, তারা একে একে বিদায় হওয়ার পর সেই দুই রুমের বাসায় মৌরিকে তুলেছি। নিঃশ্বাস ফেলার মতো একটা জানালাসহ পাশের রুমটা আদতে আমাদের অবারিত যৌবন উদযাপন ছাড়া ব্যবহার নেই। মৌরির অভিযোগহীন চোখের চাওয়া মোজাইকের ভেতর সাদা-কালো পাথর কুঁচির মতো অগণন অভিজাত্য নিয়ে একাকার হয়ে থাকে। কখনো আমরা ভাবি-অটোমোবাইলস শো রুমের মতো একপাশে বড় আয়না লগিয়ে দিলে রুমটা দ্বিগুণ করে ফেলতে পারি। যদিও সেখানে আমাদের কখনোই ভ্রমণ করা হবে না।

চশমার পাওয়ারের কারণেও চোখের পাপড়ি ঝরে যেতে পারে। আতশি কাচের নিচে কাগজ রেখে আগুন জ্বালানো অভিজ্ঞতা থেকেই এই তত্ত্ব মাথায় এসেছিল। কিন্তু হেলথ এ- হোপ হসপিটালের লনে বসেও মৌরির সে বিষয়ে কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। কবিতায় পারদর্শিতা দেখানো এই হসপিটালের এক ডাক্তার আমার পরিচিত। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সমস্যার নিগূঢ় অন্বেষী ডাক্তার সদা চিন্তামগ্ন চেহারায় জানালেন, মৌরি আসলে বাম চোখে দেখেই না। এমনকি তা হতে পারে জন্মের পর থেকেই। জন্মের পর থেকেই কেউ এক চোখে দেখে না, অথচ তা জানতে পারছে বত্রিশ বছরে এসে! মৌরির সুকঠিন উদাসীনতা আমাকে বিহ্বল করে। কিন্তু মৌরি বিষয়টাকে খুব আমলে না নিয়ে বলল-তাহলে তো আর কোনো সমস্যা নেই। ক্রমেই জটিল হয়ে ওটা সিকিউরিটির কোডের মতো জটিল হয়ে উঠছে ওর মন। এক সময় হাতের আন্দাজেও চাবিতে খুলে যাওয়া তালার মতো সহজে আর কিছুই খুলছে না। কখনো সে আমলেই নিতো না-ও বাম চোখে কিছুই দেখে না। একবার তো শব্দ শুনে বাম পাশে একটা মশা মারতে গিয়ে চেয়ার থেকে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন মনে হলো, কিছু দিন বাড়তি পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রিকশায় অবধারিতভাবে মৌরির বাম পাশে বসে যখন অফিসে গেছি, তখনও আমাকে খেয়ালই করেনি। সে কারণেই হয়তো অফিসের বিবাহিত ফটোগ্রাফারের সঙ্গে জড়াতে দ্বিধা করেনি। তখন অবশ্য মৌরিও বিবাহিতা ছিল। কিন্তু কখনো সে বেদম উচ্ছ্বাসের সাথে বয়ফ্রেন্ড তথা স্বামীর আর নিজের কথা বর্ধিষ্ণু সুখ মিশিয়ে বলতো যে, খুব সহজ ছিল তাকে বলা যে-তোমার মতো মেয়ে পেলে আমিও জীবন সঙ্গী করতে চাইতাম। ওর সাবেক সহপাঠী থেকে স্বামী বনে যাওয়া সহপাঠীটা কানাডা নাকি অস্ট্রেলিয়া থাকে। এই তথ্যটুকু ছাড়া কোথাও তার ছাপ ছিল না। শুধু সেদিনই বুঝলাম, যখন জানলাম ছেলেটার বহুগামিতার জন্য ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। হতে পারে, ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ওর সম্পর্কের কারণেই আমরা তা বুঝতে পারিনি। শুনেছি প্রথমে মৌরি, তারপর ফটোগ্রাফার ছোকড়াটা চাকরি ছেড়ে কী এক স্টুডিও করে গার্মেন্টস প্রোডাক্টের অনলাইন শপ চালু করে ছিল। ততদিনে আমি হাউজ বদলেছি।

কয়েকদিন আগে বর্ণার সঙ্গে দেখা হলে এসব বিষয় নিয়েই আলাপ হলো। মৌরির চোখের কথা বললাম। বললাম ওর নির্মম উদাসীনতার খবর। বর্ণার ধারণা, ডিভোর্সের পর ফটোগ্রাফারের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পরই ওর এমনটা শুরু। পারিবারিক কারণেই ফটোগ্রাফারেরও উপায় ছিল না সম্পর্ক রাখার। বোঝা গেল, আমার সঙ্গে মৌরির অতর্কিত বিয়েটাকেও সন্দেহ করে বর্ণা। ওর ধারণা, আমরা একজন অপরজনকে কায়দা করে বিছানায় নিয়ে বাগিয়ে নিয়েছি। যেহেতু বর্ণা আমার বিধ্বংসী যৌনাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে খানিকটা অবগত ছিল। কিন্তু মৌরি কি করে তার বাম হাতটা হারিয়েছিল তা সে একেবারেই জানে না। শুধু এই ইঙ্গিত দিয়ে এ পর্ব শেষ হয় যে, ছন্নছাড়া জীবনের জন্য খানিকটা আভিজাত্যে ভোগা মৌরির পরিবার তাকেই দায়ী করেছে; এমনকি তাকে কখনোই গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। আর এ-ও সত্য, পরিবারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার হলেও মৌরির একটা আশ্রয় দরকার ছিল। একইভাবে ওকে অর্জনের অবদমিত ইচ্ছার একটা পরিণতি দরকার ছিল আমার। মৌরির জন্য এটুকু দুঃখ রেখেই বলতে পারি-হাত হারানোর পরই তা সম্ভব হয়েছে। বর্ণাকে পেয়ে আমার নতুন অভিযান সম্পর্কে বিস্তর আলাপ করা গেল-আমি মৌরির জন্য একটা শো করার চেষ্টা করছি।

সে রাতে বাসায় ফেরার পর মৌরি প্রায় তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো-আমি বাসায় ফিরতে দেরি করি কেন? মিইয়ে যাওয়া স্বরে বললো-আমার একা থাকতে কষ্ট হয়। সমুদ্রে ভাসমান শৈলচূড়ার মতো সংসারের অনিবার্য নিয়ম গোপন রেখে আমি ভেতরে ভেতরে চেষ্টা করছিলাম মৌরির জন্য কিছু করার। বিয়ের পর বাসায় বসেই ও পরিচিত কিছু ফ্যাশন হাউজের জন্য ডিজাইন করতো। আমি চাইছিলাম ওর ডান হাতে ভর করেই একটা ছোট্ট শো রুম দাঁড়িয়ে যাক। একসঙ্গে বর্ণারও থাকতে পারে। কিন্তু লেখাজোখা ছেড়ে পাঠের আনন্দে মশগুল এক বয়স্ক লেখকের মতো কেবল যাপনের আনন্দটুকু নিতে চায় মৌরি। চাবি হারানো পুরনো সিন্দুকের মতো ওর ভেতরটা আমরা কেউ-ই দেখতে পারিনি।

এক এক্স-কলিগের সঙ্গে দেখা হয়েছিল- নাম আড়াল করেই কেবল বললাম।

বাকী কথা তোলার আগেই মৌরি বলল- নিশ্চয়ই বর্ণার সঙ্গে!

হুম- প্রস্তুতিহীনভাবে বললাম আমি।

ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কেন?- ভীষণ ক্ষেপে গেল মৌরি। অভিধানগুলোয় শব্দের বিকৃতি পর্যন্ত উল্লেখ করে দেয়ার মতো মৌরির রাগও আমার কাছে একটা পূর্ব নির্ধারিত ব্যাপার ছিল। কিন্তু ও চিৎকার করতে করতে ডান হাতে ধরা কাটা চামচটা নিজের বাম হাতের চেটোহীন কব্জিতে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের হাতটাকে ঠিক ফালা ফালা করতে করতে চিৎকার করতে লাগলো- এই হাতটা ধরে ছিলে ওর, নাহ্, এই হাতটা?

মৌরিকে এরকম ক্ষেপে যেতে আমি কখনোই দেখিনি। আসলে পথর চাপা ঘাসের মতো ওর হৃদয় ছিল নরম আর ফ্যাকাশে। আমি হাতটা চেপে ধরতেই ও কল্লোলিনী কান্না জুড়ে দিল। মনে আছে, সেবারই টানা তিন দিন দায়িত্বের সঙ্গে মৌরির বিছানার পাশে কাটালাম।

ডাক্তাররা আশঙ্কা করছিল ক্ষত জায়গায় ইনফেকশন হয়ে যায় কিনা। কিন্তু সব আশঙ্কা মিথ্যে করে দেয়ার মতো কিছুই ঘটলো না। ইনফেকশনের কারণে কুনইয়ের খানিক নিচ থেকে কেটে ফেলতে হলো। তারপরের সব কিছু যেন দ্রুত আর খাটো হয়ে আসছিল, কিন্তু অদূরপ্রসারি ছিল না কিছুই। এর ঠিক দশমাস পরে মৌরিকে নিয়ে আবার হাসপাতালে এসেছিলাম প্রথম সন্তান প্রসবের জন্য। এনিয়ে মৌরির ভেতরে খানিকটা তাড়া ছিল। প্রচণ্ড প্রসব ব্যথার ভেতরও হাতপাতালের বেডে শুয়ে মৌরি মুখ বল্টে জানালো- সে চায় সিজার না করেই সন্তান জন্ম নিক। কিন্তু সন্তান জন্মের পর ওর কি ধারণা আমি আরো বেশি ঘর মুখো হব। মৌরির ধারণা, আমি তার স্বামী বলেই ভালেঅ মানুষ। কোনো কোনো দিন বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে শ্লেষ দিয়ে বলতো-যেখানেই যাও, দায়িত্ব মনে করেই ফিরে এসো।

মৌরি ভুলেই গিয়েছিল ওর পাগলামী আগের চেয়ে বেড়েছে। একটা কিছু হলেই শিশুদের কান্না ছিল নিয়তি। তখন আমার চুপ করে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকতো না। তারপরও সুযোগ পেলে আমি যেন হারিয়ে যেতাম। অফিস থেকে ফেরার পথে বর্ণার সঙ্গে দেখা করাটা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার।

আমাকে আরো বন্দি করা বা দূরে ঠেলে দেয়ার জন্যই কিনা মৌরি দ্রুতই আরেকটা সন্তান নিলো। ঠোঁট কামড়ে সেবার জীবন বিপন্ন করে দিচ্ছিল, তবু সিজার নিলো না। এটা ঠিক, শিশুদের জন্য হলেও আমাকে সংসারের সময় দিতে হচ্ছিল। পরের বছর আরো একটা সন্তানের জন্ম দিলো নাকে-মুখে প্রায় রক্ত তুলে। সন্ধ্যার পর বাসায় কান্নার হাট বসে যেত। পাশের রুমে আমার পাকাপাকি জায়গা হয়ে গেল। আগে এক রুমে একা থাকার বদলে এখন দুই রুমে একা থাকা আরকি। মৌরির সঙ্গে কথা হয় অনূদিত গল্পের শেষে অনুবাদের উৎস দেয়ার মতো। আর কোনো কোনো রাতে মৌরির সঙ্গে মিলিত হই অকর্মণ্য কাঠুরের মতো। তবে একটু সচেতন থাকতে হয়, সহসাই যেন মরমর করে গাছটা আমাদের ওপরে না পড়ে। সঙ্গম শেষে বাড়িওয়ালার লাগিয়ে দেয়া পুরনো ফ্যানটা বন্ধ করলে বোঝা যেত-ঘরটা আসলে কতটা নৈঃশব্দে ডুবেছে। তারপর আমরা পরস্পরের দিকে ব্যাথাতুর ভাবে তাকাই।

পার্ক কিংবা রেস্টুরেন্টে বর্ণার দিকেও আজকাল ব্যাথাতুরভাবে তাকাই। ছোটবোনটা নিজ দায়িত্বে বিয়ে দেয়ার পর বর্ণা একেবারে নির্ভার হয়ে গেছে। মুখ ফুটে তেমন কথা না বললেও আমরা অনেকক্ষণ বসে থাকতে পারতাম। দীর্ঘক্ষণ বাইরের থাকার এটাই জায়গা বলা যেতে পারে। এ-ও সত্য যে, আমি প্রথম থেকেই মৌরির সঙ্গ প্রত্যাশি ছিলাম। কিন্তু ওর উপেক্ষা ভাষাহীনভাবে বুকের ভেতর চাবুক ছুটাত। ফিরিয়ে দেবে নিশ্চিত জেনেও ওকে দুপুরের আহারে আহ্বান জানাতে আমার উত্তেজনার কমতি ছিল না। আমার পছন্দের ওর দীর্ঘ চুলগুলো তাকের ওপর সাজানো বুদ্ধের মূর্তির মতো মুগ্ধতা ছড়াতো। কখনো কখনো মৌরির মতো পিঠ অব্দি হেয়ার কাটিংয়ে নাতিদীর্ঘ চুলের বর্ণাকে আরো নান্দনিক করে তুলতো। তবে সাহিত্যসুলভ বিক্ষতভাব তরুণ হরিণীর মতো ওকে সব সময় দাবড়ে বেড়াত।

দুর্বোধ্যতার ভেতর গত তিন বছরে ঠিক যে দিন মৌরি তিনটি সন্তান জন্ম দিয়েছে, সে দিনটি ঘনিয়ে আসতেই আমার ভেতরে শঙ্কা লতিয়ে উঠে। চতুর্থ বছরেও সেই দিন বাসায় ফিরে দেখি মৌরি যন্ত্রণায় প্রায় চিৎকার করছে। আমি চোখ গোল করতে করতে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললো, বাম হাতের ইনফেকশনটা একেবারে হাড়ে ধরে গেছে। এবার তার কুনই বরাবর না কাটলেই নয়। মৌরি যেন ভেতর ভেতর তৈরি হয়েই ছিল। আমার কপালের ভাঁজ নামিয়ে দিয়ে গুমড়ে গুমড়ে যা বললো তাতে চোখ কপালে উঠে যাওয়ার জোগাড়- হাতটা কাটার সময় যেন সেন্স রাখা হয়। তখনো মনে হলো, হাত হারালেও ও যেন খুশি নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরে।

মৌরির এইসব পাগলামি আমাকে আরো বেশি উদাসীন করে দিচ্ছিল সব কিছু থেকে। আমি দ্রুতই শো-রুম নেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হই। একটা কাজের সূচনা হয়তো ওকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। বর্ণার ওপর গোছগাছের অনেক বেশি ভার দিয়ে রেখেছি, সে-ই স্বস্তি।

হাত কাটার পর এক রাতে মৌরি আবার চিৎকার করে উঠলো-তার বাম হাতের মাংসপেশিতে খিঁচুনি হচ্ছে। ও আমাকে কব্জিটা চেপে ধরতে বললো। আঙুলগুলো নাকি ব্যথায় কালিয়ে নিচ্ছে। আমাকে একটা একটা করে আঙুলের গিট ফুটিয়ে দিতে বললো। অথচ কুনইয়ের নিচ থেকে ওর হাতাটা কেটে ফেলা হয়েছে! আমাকে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও আরো চিৎকার করে উঠলো-কী হলো, দিচ্ছ না কেন? আমার বৃদ্ধাঙুলটা কর্কট কামড়ে নিচ্ছে, কেনি আঙুলে মস্ত ডাই কামড়ে ধরেছে, মাঝের আঙুলে কে যেন সুঁই বিধিয়ে দিচ্ছে। হাতের ভেতর ইঁদুর মারা ছাটকলটা আটকে আছে। তুমি একটা একটা করে ছাড়াও, একটু ম্যাসেজ করে দাও। হাতটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। টিকটিকির লেজের মতো খসে পড়বে তো, তুমি ধরো।

চোখ বন্ধ করে চিৎকার করছিল আর কাতরাচ্ছিল মৌরি। আমি সুনিপুণ অভিনেতার মতো ম্যাসেজ করে যাচ্ছি শূন্য হাতে আর অন্ধ হোমারের ‘ওডিসি’র মতো ওর হাতের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওর কোঁকানি খানিকটা কমে আসতেই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি দুলে উঠলো-আচ্ছা, ওকে ডান হাতটা আয়নায় দেখালে কেমন হয়?

চট করে বাথরুমের আট বাই বারো ইঞ্চি আয়নাটা এনে ওর বাম পাশে ধরে বললাম- কোথায়, তোমার হাতটা তো ঠিকই আছে। বামপাশে ধরা আয়নায় ওর ডান হাতটা অবিকল বাম হাতের মতো দেখাচ্ছিল। ও বিহ্বলের মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আয়নায় সেই হাতটাই দেখছিল। আঙুলগুলো নাড়িয়ে দেখছিল, উল্টেপাল্টে দেখছিল চেটো। মাঝ রাত পেরিয়েও মৌরি হাতটাকে দেখলো। তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো মৌরির আর্তচিৎকারে- বাথরুম এত ছোট কেন? আট বছর ধরে তো আমরা এই বাথরুম ব্যবহার করছি, কোনো দিন তো এমনটা বলেনি! মৌরি বেসিনে হাত-মুখ ধুতে ধুতে কাঁদছিল। কিন্তু বাথরুমে গিয়ে আমি কোনো বদল দেখলাম না, শুধু রাতে মৌরিকে আয়না দেখানোর পর রাখতে গিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আয়নার শূন্য স্থানে ছোট্ট একটা শামুক খুব ধীরে উপরে দিকে উঠে যাচ্ছে। কিছুতেই মৌরির কান্না থামছিল না- এতটুকু বাথরুমে মানুষ মুখ ধোয় কী করে! অফিস থেকে ফেরার পথে আয়না আনার প্রতিশ্রুতিতে কোনো মতে মৌরিকে রুমে ফেরান গেল। পরে বেসিনের মুখ ধুতে গিয়ে আমারও মনে হলো-সত্যি, বাথরুমটা বেশ ছোট। তার চেয়ে বড় কথা, বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে চোখ দিতেই রুমটা দ্বিগুণ হয়ে যেত। যদিও আয়না দেখে ওই বর্ধিত রুমে আমাদের কোনো দিনই যাওয়া হয়নি।

আয়না ভাঙার পর মৌরি বাথরুমে যেতেই ভয় পেতে শুরু করলো। ওর ধারণা, বাথরুমে কোনো আলো নেই। ওই ঘরে একবার আটকে গেলে আর বের হতে পারবে না। অনেকবার আলো জ্বেলে দেখিয়েছি, তবু ওর ভয় কাটতে চায় না। মাঝে মাঝে ওর শূন্য বাহুতে চিনচিনিয়ে ব্যথা অনুভবের কথা বলে। এবার একটা হাত আয়না আনার কথা ভাবছিলাম, যাতে ও সব সময়ই দুটো হাত দেখতে পারে। বর্ণাও বিষয়টায় সায় দিল। বর্ণাকে নিয়ে নতুন শো রুমের জন্য এটাসেটা কেনাকাটা করতে করতেই মৌরির জন্য পেছনে ধরা যায় এমন একটা হাত আয়না কিনে নিলাম। কিন্তু মৌরি ডান হাতে আয়না ধরে দেখলো বামহাতের কাটা অংশটাই কেবল দেখা যায়। আমার তখনই খেয়াল হলো, আয়নাটা বাম হাতেই ধরতে হবে। কিন্তু ওর বাম হাতটা নেই। বরং মৌরি এখন যা পারে, তা হলো ডান হাতে আয়নাটা ধরতে। তাতে হাত আয়নায় দুই হাতই নেই দেখে। তবু কর্তৃত্বাধীন কিছু পছন্দ করার মতো অবহেলা ছিল ওর চাহনীতে। আমার প্রতি ভালোবাসা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় আমি সব সময়ই অনুভব করতাম। আমাকে সে কাঁহাতক ভালোই বেসেছিল ভেবে ভেবে ওর স্মৃতির প্রতি অঞ্জলি জাগাই।

এই ভালোবাসা, আয়নাবাজি কিংবা প্রতারণার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মৌরি আবার সন্তান নেয়ার অঙ্ক কষতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, ভালোবাসা আর প্রতিশোধ- এ দুটোই মানুষের মাথা বিগড়ে দেয়। কিন্তু মৌরির ক্ষেত্রে এটা কেবল প্রতিশোধ নয়, নিজেকে চূড়ান্ত রকম শেষ করে দেয়া। ও এর শেষটাই দেখতে চায়। চতুর্থ সন্তানটি প্রসবের সময়ও মৌরি প্রায় দম ঠেকিয়ে বলছিল-দয়া করে সিজার করবেন না। আমার সকারণ ভয় হচ্ছিল, এর ফলে নিত্য নবায়িত নরক-নিসর্গটা ওর নাগালের বাইরে না চলে যায়। যদিও ভবিষ্যৎ ক্ষতি আর পূর্ব নির্ধারিত সমাধান চিন্তা করে শো রুমের দায়িত্বটা বর্ণাকে দেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge