Breaking News
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন স্থগিত
X
ঢাকা, বুধবার, ৪ মাঘ ১৪২৪, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ও হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-১৫ ৮:৩৩:৫৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-১৫ ১১:৩৫:৩২ এএম

|| মুম রহমান ||

মানুষের মুক্তি, মুক্তি সংগ্রাম ও যুদ্ধের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের সেরা সবগুলো মহাকাব্য এবং ধ্রুপদী ভাণ্ডার ভরে আছে যুদ্ধ আর বীরত্বগাঁথায়। ‘ইলিয়াড’ ‘অডেসি’ ‘ঈনিদ’ ‘রামায়ণ’ ‘মহাভারত’ থেকে শুরু করে ‘গিলগামেশ’ ‘বেউলফ’ সব মহাকাব্যেই যুদ্ধ হয়ে উঠেছে ক্যানভাসের প্রধান রং। এমনকি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’ও যুদ্ধ ও মুক্তির কথা বলে।

আধুনিক কালে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ইলিয়া এরেনবুর্গের ‘ফল অব প্যারিস’, জারোস্লাভ হাসেকের ‘দ্য গুড সোলজার সোয়াইক এন্ড হিজ ফরচুনস ইন দি ওয়ার্ল্ড ওয়ার’, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘আ ফেয়ার অয়েল টু দি আর্মস’ ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’, তলস্তয়ের ‘ওয়্যার এন্ড পিস’, জোসেফ হেলারের ‘ক্যাচ টুয়েন্টিটু’, বরিস পাস্তারনায়েকের ‘ড. জিভাগো’, জেমস জোন্সের ‘ফ্রম হেয়ার টু এটার্নিটি’ যুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ধ্রুপদী মর্যাদা পেয়েছে। ট্রোজানদের যুদ্ধ, আমেরিকার গৃহযুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে নাৎসিবিরোধী সংগ্রাম, ফ্রান্স বা রুশবিপ্লব, ভূ-ভারতে ইংরেজবিরোধী আন্দোলন ও বিপ্লব নিয়েও একাধিক বড় মাপের সাহিত্য রচিত হয়েছে। শিল্পী ও সাহিত্যিকরা বরাবরই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপিয়াসী। তাই তাদের কলম ও তুলি থেকেই রচিত হয় সেরা সাহিত্যকর্ম। যুদ্ধের ভয়াবহতা অনেক, কিন্তু যুদ্ধের কারণেই আমরা বিশ্ব সাহিত্যের সেরা কিছু উপন্যাস পেয়েছি। বিশ্বসেরা উপন্যাসগুলোতে মানুষের মুক্তি চেতনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব বরাবরই ভয়ংকর ও ক্ষতিকর। যে পক্ষই জয়ী হোক যুদ্ধ উভয় পক্ষের বড় ক্ষতি করে দিয়ে যায়। তবু মানুষ নিরন্তর যুদ্ধ করে, মুক্তির জন্য, এমনকি শান্তির জন্যও। যুদ্ধ বিশ্বের সেরা কিছু সাহিত্য ও শিল্পকর্মের সূতিকাগারও। মুক্তিকামী ও স্বাধীনচেতা বাঙালির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের এই যুদ্ধে আমরা প্রিয়জন হারিয়েছি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি অর্থনৈতিকভাবে, বেছে বেছে বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে, নারীর অবমাননা হয়েছে, এসব কিছুই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। বাঙালি জাতির সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেশের প্রধান সব লেখকের হাতেই পেয়েছে নতুন মাত্রা।

বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে প্রথমেই মনে পড়ে আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’। আনোয়ার পাশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছিলেন এ উপন্যাস। তিনি মুক্তিযুদ্ধেই শহীদ হন। উপন্যাসজুড়ে যে অনিশ্চয়তা আর মৃত্যু বিভীষিকা খেলা করে তা যেন সত্যি হয়ে ওঠে লেখকের জীবনেই। একাত্তরের এপ্রিল মাসে লেখা শুরু হয় উপন্যাসটি, শেষ হয় জুন মাসে। উপন্যাসের নায়ক সুদীপ্ত শাহীন ২৫ মার্চের পর তিন দিন অবরুদ্ধ থাকে। পাক বাহিনীর ঘেরাটোপে বন্দী সুদীপ্ত অস্থির সময় পার করে বেদনা, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তায়। কিন্তু এর মাঝেও সে অনুধাবন করতে পারে স্বাধীনতার আগমন ধ্বনি। ১৯৭৩ সালের মে মাসে প্রকাশ পায় আনোয়ার পাশার উল্লেখিত উপন্যাসটি। কিন্তু তার আগেই ১৪ ডিসেম্বর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয় লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ আনোয়ার পাশাকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত এই প্রথম উপন্যাসটির জন্য অমর হয়ে থাকবেন বাংলার মানুষের মাঝে। এরপর বশীর আল হেলালের ‘প্রথম কৃষ্ণচূড়া’ ১৯৭২ সালে ঢাকার বর্ণবীথি প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আলোড়িত করেছে পশ্চিম বাংলার লেখকদেরও। তার মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘১৯৭১’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মূলত তারাশঙ্করের দুটি উপন্যাসিকা মিলিয়ে এই বই। তার মধ্যে একটি ‘একটি কালো মেয়ের কথা’। এখানে উঠে এসেছে পূর্ববাংলায় বাংলাভাষার দাবি, মুজিব প্রসঙ্গ, পুরোনো পল্টনে শ্রমিক ফেডারেশনের মিটিং, ভুট্টোর ঘাড় হেঁট করে ফিরে যাওয়া, জামাতে উলেমার দালালি, আছে দেশে মার্শাল ল জারি, টিক্কা খাঁর কথা, মুজিব নগরে বাংলাদেশ সরকার তৈরির কথা। ১৯৭১ সালে কলকাতার মিত্র এন্ড ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয় তারাশঙ্করের এই উপন্যাস। এখানে মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতার অবস্থান, শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত বাঙালিদের জীবনযাত্রাও উঠে এসেছে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আধুনিক ধ্রুপদি উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বিশেষভাবে আলোচনার যোগ্য। এটি দুই খণ্ডে রচিত সহস্রাধিক পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাস। তলস্তয়ের ‘আনা কারিনিনা’ বা ‘ওয়ার এন্ড পিস’র মতো এই মহাকাব্যিক উপন্যাসে ১৯৫০ থেকে ১৯৭৭ নাগাদ পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী উঠে এসেছে। পূর্ব-পশ্চিমে পঞ্চাশের দাঙ্গা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ভাসানীর কাগমারি সম্মেলন, আইয়ুব খানের শাসন, শেখ মুজিবের গ্রেফতার, ৬-দফা, ১১-দফা, পাক বাহিনীর আক্রমণ, বুদ্ধিজীবীদের কলকাতায় আশ্রয় গ্রহণ, কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠন ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে বিস্তৃতভাবে। উল্লেখ্য এর যে কোন একটি বিষয় নিয়েই হতে পারে একটি বৃহৎ আকারের উপন্যাস। সুনীলের ক্যানভাস শুধু বড় নয়, তার বর্ণনা ও বিস্তার নিখুঁত ও সুগভীর।

শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস চারটি। এগুলো হচ্ছে ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ ‘নেকড়ে অরণ্য’ ‘দুই সৈনিক’ ও ‘জলাংগী’। শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাসসমূহের ক্যানভাস আর আয়তন সে তুলনায় বৃহৎ নয়। তার উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘জলাংগী’ উপন্যাসে উঠে এসেছে এক ভীরু ও প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার কথা। ‘নেকড়ে অরণ্য’ উপন্যাসে তিনি তুলে এনেছেন হাজী মখদুম মৃধা নামের এক রাজকারের দালালি এবং তার বিপর্যয়ের কাহিনি। ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের চিত্র। মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার ও পাক বাহিনীর অত্যাচারের চিত্র সংবলিত এই উপন্যাসগুলোকে শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধের ট্রিলোজি বলা যায়।

সেলিনা হোসেন তার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন একাত্তরের গ্রামীণ জীবনের চিত্র। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বুড়ি তার একমাত্র সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসর্গ করে। শহর থেকে দূরের এক গ্রাম হলদী গাঁয়ের মেয়ে বুড়ি এই উপন্যাসে হয়ে উঠেছে একাত্তরে সন্তানহারা হাজারো মায়ের প্রতীক। ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ সেলিনা হোসেনের উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সেইসঙ্গে আমাদের বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। উল্লেখ্য আখতারুজ্জামানের পরিচালনায় এই উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ণও হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নীল দংশন’ ‘নিষিদ্ধ লোবান’ মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে তৈরি হয়েছে নাসির উদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্র। কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ ‘খেলাঘর’ মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিন্ন ধারার দুটি কাজ। মাহমুদুল হক বাংলা সাহিত্যে ভাষাভঙ্গি ও চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে নতুন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই অসাধারণ ঔপন্যাসিক ও গল্পকারের যথার্থ মূল্যায়ন আজও হয়নি।  এর মধ্যে ‘খেলাঘর’ চলচ্চিত্র রূপ দিয়েছেন মোরশেদুল ইসলাম। শওকত আলীর ‘যাত্রা’, রশীদ হায়দারের ‘অন্ধ কথামালা’ ‘খাঁচা’, আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, আল মাহমুদের ‘উপমহাদেশ’, শামসুর রাহমানের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’, আবুবকর সিদ্দিকের ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরার সূর্য’, আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘দেয়াল’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘ঘেরাও’ ‘কালো ঘোড়া’ ‘পরাধীনতা’, মন্টু খানের ‘হায়নার খাঁচায় অদম্য জীবন’ একাত্তরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে অনবদ্যভাবে।

একাত্তর পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ স্বয়ং একটি জীবন্ত অধ্যায়। মাত্র ৭৭ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে ১৯৭০ সালে হুমায়ূন আহমেদ-এর যাত্রা শুরু। প্রথম উপন্যাস দিয়েই তিনি চমকে দিয়েছিলেন আহমেদ ছফা, আহমেদ শরীফ, শামসুর রাহমানের মতো বিদগ্ধজনদের। আর সাধারণ মানুষ প্রথম থেকে শেষ উপন্যাস পর্যন্ত তার প্রতিটি লেখা গ্রহণ করেছে পরম আদরে আর উৎসাহে। আমাদের অনেক প্রধান লেখকের মতো হুমায়ূন আহমেদও মুক্তিযুদ্ধের চাক্ষুস সাক্ষী। এই রক্তাক্ত, অশ্রুময় দিনগুলি তিনি কীভাবে পার করেছেন তার অনেকটা বর্ণনাই আত্মজীবনী ও স্মৃতিচারণমূলক বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বয়সে তরুণ। যুদ্ধের সূচনাকালেই তার পিতা নিহত হন হানাদার বাহিনীর হাতে। যুদ্ধের পুরো সময় পরিবারকে বাঁচাতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। যুদ্ধের পুরোটা আঁচ তার এবং তার পরিবারের মধ্যে ভয়াবহভাবেই লেগেছিলো। মুক্তিযুদ্ধ নানা রূপে আর বৈচিত্রে হুমায়ূন আহমেদের গল্প উপন্যাসে ঠাঁই পেয়েছে। আহমেদ মওলা তার ‘গল্পকথার যাদুকর হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস’ প্রবন্ধে বলেন: ‘নানাভাবে নানা মাত্রিকতায় তিনি আলো ফেলেছেন মুক্তিযুদ্ধের উপর। তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক হৃদয়বিদারক, মর্মন্তুদ, বিষাদময় ঘটনা। টুকরো টুকরো মৃত্যুর কথা, হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের অশ্রুভেজা কাহিনি তিনি লিখেছেন। ‘নন্দিনী’ ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ ‘শীত’ ‘জনক’-এর মতো গল্প যেমন আছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন ছয়টি স্মরণীয় উপন্যাস। এগুলো হচ্ছে ‘সূর্যের দিন’ (১৯৮৬), ‘নির্বাসন’ (১৯৮৩), ‘শ্যামল ছায়া’ (১৯৮৫), ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ (২০০৫)। এ ছয়টি উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ ছয়টি দৃষ্টি কোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অনুসন্ধানের প্রয়াস পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপ্লাবী বর্ণনা তাঁর উপন্যাসকে হৃদয়স্পর্শী করেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিকট থেকে দেখার যে অভিজ্ঞতা, হুমায়ূন আহমেদ সেই অভিজ্ঞতাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়েছেন।’

‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র’-এর প্রসঙ্গ কথায় হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন: ‘‘মুক্তিযুদ্ধকে আমি দেখেছি যুবকের চোখে এবং দেখেছি খুব কাছ থেকে। জীবন এবং মৃত্যুকে এত ঘনিষ্ঠভাবে কখনো দেখব ভাবিনি। কত বিচিত্র আবেগ, কত বিচিত্র অনুভূতি! অথচ লেখায় আসছে না। যেন মুক্তিযুদ্ধ আমার আড়ালেই ঘটে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আমার প্রথম লেখাটি লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের চার বছর পর। নাম ‘শ্যামল ছায়া’। একটি ছোট ছোট গল্প যা পরে ‘শ্যামল ছায়া’ নামে একটি উপন্যাস লিখি। একদল মুক্তিযোদ্ধা একটা থানা আক্রমণ করতে যাচ্ছে এই হলো উপন্যাসের বিষয়। এক রাতের কাহিনি।’’

এই লেখকের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্রতে মোট আটটি উপন্যাস আছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ‘শ্যামল ছায়া’ তার প্রথম উপন্যাস। তবে ইমদাদুল হক মিলনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাসনকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তার প্রথম উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রাসঙ্গিকতার প্রয়োজনেই তাদের কথোপকথনের দীর্ঘ উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি:

‘ইমদাদুল হক মিলন : আপনার যে বইগুলো বেরোল তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসও রয়েছে। আমার ধারণা, আপনার প্রথম মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হচ্ছে ‘নির্বাসন’। হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ।  

ইমদাদুল হক মিলন : 'নির্বাসন'-এর নামটা উল্লেখ করছি এ জন্য যে 'নির্বাসন' মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ঠিকই, এটি এক অর্থে একটি প্রেমের উপন্যাসও।

হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ।

ইমদাদুল হক মিলন : এরপর আপনি কতগুলো গল্প লিখলেন 'জলিল সাহেবের পিটিশন' 'ফেরা' 'সৌরভ'; মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প লিখলেন। তারপর 'আগুনের পরশমণি' লিখলেন। 'শ্যামল ছায়া' আর 'অনীল বাগচীর একদিন' লিখলেন। মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটা চেষ্টা আপনি করলেন। এই যে মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেন, সেখানে মূল সুরটা কী কাজ করল? একজন লেখক হিসেবে আপনি কী বলতে চাইলেন লেখার মধ্যে?

হুমায়ূন আহমেদ : জটিল প্রশ্ন হয়ে গেল না?

ইমদাদুল হক মিলন : প্রশ্নটি যদি জটিল হয়ে থাকে, তাহলে বলি, আপনার মুক্তিযুদ্ধের লেখাগুলোতে, ধরুন আপনার একটি গল্পের কথা বলি, 'জলিল সাহেবের পিটিশন'- এই গল্পটার কথা তো আপনার মনে আছে? এই গল্পটার বক্তব্যটাই আপনি বলেন যে, আপনি আসলে এই লোকটার মধ্য দিয়ে কী কথাটি বলার চেষ্টা করেছেন। কিংবা 'শ্যামল ছায়া'র অন্তর্নিহিত বক্তব্যটা কী? মানে লেখকের ব্যাখ্যাটা আমাদের জানা দরকার।

হুমায়ূন আহমেদ : মিলন, আমার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস 'শ্যামল ছায়া' যখন লিখেছি, সে সময় একদল মুক্তিযোদ্ধা, যারা যুদ্ধ করছে, তাদের প্রচণ্ড ভালোবাসা দেশের জন্য এবং দেশের জন্য যে কোনো সময় তারা তাদের জীবন বিসর্জন দিতে তৈরি- তাদের সেই ডেডিকেশন, সেটাই আমি আনতে চেয়েছি।

'সৌরভ'-এ আমি লিখেছি একদল মানুষের কথা, যারা যুদ্ধে যেতে পারেনি। একজন খোঁড়া লোক, সে কিন্তু ঘরে বসা- যুদ্ধে যেতে পারছে না। তারপরও তার সমস্ত মন, সমস্ত ইন্দ্রিয়, সমস্ত শরীর কিন্তু পড়ে আছে যুদ্ধের ময়দানে। সে মানসিকভাবে একজন যোদ্ধা। একদল যারা সরাসরি যোদ্ধা, আরেক দলও যোদ্ধা, যারা মানসিকভাবে যুদ্ধ করছে। 'অনীল বাগচীর একদিন'-এ ধরার চেষ্টা করেছি হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থাটা। 'আগুনের পরশমণি' উপন্যাসে বলার চেষ্টা করেছি ঢাকায় যখন গেরিলা অপারেশন শুরু হলো, ওই যে একদল ছেলে, যাদের মাথার ভেতরে চে গুয়েভারা; এদের কাছে দেশের চেয়েও হয়তো বড় হচ্ছে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা। দেখো আমরা কী করছি। দেশপ্রেম অবশ্যই আছে। কিন্তু ওই জিনিসটিও আছে। এটাই বলতে চেয়েছিলাম 'আগুনের পরশমণি'তে। আর সব কিছু মিলে পরে লেখার চেষ্টা করলাম আমার 'জোছনা ও জননীর গল্প'।

ইমদাদুল হক মিলন : 'জোছনা ও জননীর গল্প' ছাড়াও '১৯৭১' নামেও খুব ভালো একটা লেখা আছে আপনার। এই লেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। আর আপনার লেখার একটা মূল সুর হচ্ছে, সর্বত্রই মানুষের প্রতি আপনার একটা অন্য রকমের মূল্যায়ন থাকে, মানুষের প্রতি এক রকম মমত্ববোধ থাকে। আপনি খারাপ দিকটা দেখাতে চাননি। প্রথম দিকের লেখাগুলোতে চানইনি। মধ্য পর্যায়ের লেখাগুলোতেও চাননি। আপনার কাছে সব মানুষ একটি পর্যায়ে এসে মহৎ হয় যাচ্ছে - মানুষকে আপনি একটি মহত্বের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেন। সে জিনিসটা আপনার মুক্তিযুদ্ধের কোনো কোনো লেখার ক্ষেত্রে আমরা খেয়াল করেছি। যেকোনো দেশদ্রোহী, সেই সময় আমরা যাদের রাজাকার বলতাম, শান্তিবাহিনীর লোক বলতাম, তাদের প্রতিও আপনি মমত্ব দেখিয়েছেন। এটার কারণটা কী?

হুমায়ূন আহমেদ : মানুষের দুটি দিক আছে। অন্ধকার দিকও আছে, আলোকিত দিকও আছে। মানুষের আলোকিত দিক নিয়ে কাজ করার একটা আনন্দ আছে। আলোর স্পর্শটা শরীরের দিক থেকে বোঝা যায়। মানুষের অন্ধকার দিক নিয়ে কেউ যখন কাজ করে, সে ওই অন্ধকার দিকের স্পর্শটা শরীরে কিন্তু অনুভব করে। আমি মনে হয় এই স্পর্শ এড়ানোর জন্যই বেশির ভাগ সময় আলোকিত অংশ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমার নিজের ভেতরেই তো অন্ধকার আছে, বাড়তি অন্ধকার স্পর্শ করব কেন? বরং আলো স্পর্শ করি, অন্ধকারটা কমাই। এটি একটি কারণ হতে পারে।’

এই সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদের জবানীতেই তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের একটা সামগ্রিক চিত্র পাই। এমন কিন্তু বলাই যায় আলোকসন্ধানী এই লেখকের লেখায় আমাদের সবচেয়ে আলো-আঁধারি সময়, আমাদের সবচেয়ে বেদনা ও অহংকারের সময় একাত্তরের দিনগুলো ওঠে এসেছে ভিন্ন মাত্রায়। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

‘গ্রাম ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে যে শহরটির খোঁজ পাওয়া যায়- তা রাজধানী ঢাকা শহর। তার মুক্তিযুদ্ধের দুটি উপন্যাস অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের পরিপার্শ্ব ঘিরে রচিত। ‘সৌরভ’ ও ‘আগুনের পরশমণি’। এই উপন্যাস দুটিকে এক বিচারে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড বলা যায়। কারণ, সৌরভের কাহিনি যে সময়কে ঘিরে ঐ সময়টা ১৯৭১-এর এপ্রিলের শেষ অথবা মে মাস ধরা যেতে পারে। মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি সৈনিকরা তখন চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় যুদ্ধ করছে এ ধরনের একটা গুজব কম-বেশি ছড়িয়ে আছে। তবে শহরে তখনও মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি ঘটেনি। যুদ্ধ নিয়ে একটা দোলাচলও এসে গেছে এক ধরনের মধ্যবিত্ত মানুষের মনে। আবার দালালদের নিয়ে তথাকথিত শান্তি বাহিনী গঠিত হচ্ছে। পীর ফকিরদের কেরামতি বেড়ে যাচ্ছে। চাকুরেরা অফিসে যাতায়ত শুরু করেছে অনেকে, যদিও তারা ভয়ে ম্রিয়মাণ। অপরদিকে ‘আগুনের পরশমণি’ এই হিসাবে এর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধারা তখন কেবল ফিরতে শুরু করেছে ঢাকাতে। ঘটনার কুশীলব হয়ত পাল্টে গেছে। কিন্তু  কুশীলব যারাই হোক না কেন, মূলত এই কুশীলবদের আশ্রয় করে এ দুটি উপন্যাসের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে অবরুদ্ধ ঢাকা নগরী।’

স্বদেশ রায়ের এই আলোচনার সাথে একমত হয়েই বলা যায়, ‘সৌরভ’-এর পরবর্তী ঘটনার সূত্র ধরেই ‘আগুনের পরশমণি’র বিস্তার। সৌরভে যাদের দেখি তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। সাধারণ নগরবাসী আকস্মিক প্রশিক্ষিত হানাদার বাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত, হতবিহ্বল। কেউ রাজাকার হচ্ছে, কেউ মুক্তি বাহিনীতে যাচ্ছে, কেউ শহর ছেড়ে পালাচ্ছে, কেউ এখনও শহরের পরিস্থিতি ভালো ভেবে রয়ে যাচ্ছে। ‘আগুনের পরশমণি’-তে এসে দেখি একদল তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা শহরে পাল্টা হামলার জন্য তৈরি। তারা প্রশিক্ষিত, শান্ত, স্থির, বুদ্ধিমান এবং সিদ্ধান্তে অটল। তাদের সহায়তা করছে সাধারণ নগরবাসী। ‘আগুনের পরশমণি’-তে হুমায়ূন আহমেদ অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে বর্ণনা দেন এভাবে: ‘জুলাই মাসের ছ তারিখ। বুধবার। উশিশ শ একাত্তর সন। একটি ভয়াবহ বছর। পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর কঠিন মুঠির ভেতরে একটি অসহায় শহর। চারিদিকে সীমাহীন অন্ধকার। সীমাহীন ক্লান্তি। দীর্ঘ দিবস এবং দীর্ঘ রজনী।’

যে মতিন সাহেব আলমকে তার বাসায় ঠাঁই দিয়েছেন তিনিও কিন্তু সাধারণ ভীতু মানুষ। রাস্তায় খোলা ট্রাকে করে অল্পবয়সী যুবকদের হাত বেঁধে নিয়ে যেতে দেখে তিনি আর অফিসে যান না। খামাখা ইদ্রিসের পানের দোকানে ঘুরঘুর করেন। ‘পান খাওয়ার তার দরকার ছিল না। এ সময়ে সবাই অদরকারি কাজগুলো করে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলে। ভয় কাটানোর জন্যেই করে। ভয় তবু কাটে না। যতদিন যায় ততই তা বাড়তে থাকে।’ অবরুদ্ধ সাধারণ নাগরিকের মনোবিশ্লেষণ লক্ষ্য করি এই অংশে। অন্যদিকে গেরিলা বাহিনীর দল যখন আক্রমণে যায় তখন তাদের মনোদৈহিক অবস্থার পরিচয় দিতেও হুমায়ূন আহমেদ দক্ষতার পরিচয় দেন। ‘সবাই হেসে উঠল। গৌরাঙ্গও হাসল। পরিবেশ হালকা করার একটা সচেতন প্রচেষ্টা। সবার ভাবভঙ্গি এ-রকম যেন বেড়াতে যাচ্ছে। আলগা একটা ফুর্তির ভাব। কিন্তু বাতাসে উত্তেজনা। রক্তে কিছু একটা নাচছে। প্রচুর পরিমাণে এন্ড্রোলিন চলে এসেছে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে। সবার নিঃশ্বাস ভারি। চোখের মণি তীক্ষ্ম।’ এ যেন শিকারে যাওয়ার বর্ণনা।

‘আলম, সাদেক, নাজমুল, গৌরাঙ্গরা মিলিটারি পুলিশের মুখোমুখি হয়। তারা প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করছে। ‘আলম জানালা দিয়ে মুখ বের হাত ইশারা করে ওদের ডাকল। মিলিটারি পুলিশের দলটি ক্রুব্ধ ও অবাক হয়ে দৃশ্যটি দেখল। হাত ইশারা করে ওদের ডাকার স্পর্ধা এখনও কারো আছে তা তাদের কল্পনাতেও নেই। একজন এগিয়ে আসছে, অন্য তিন জন দাঁড়িয়ে আছে।

আলম নামল খুব সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তার পেছনে নামল সাদেক। সাদেকের মুখ ভর্তি হাসি।

এরা বুঝতে পাল না এই ছেলে দুটি ভয়াবহ অস্ত্র নিয়ে নেমেছে। এদের স্নায়ু ইস্পাতের মতো।’

এই ইস্পাত কঠিন গেরিলা দলের সবাই কিন্তু সাধারণ তরুণ। এ দেশের শান্তিপ্রিয় বাঙালির প্রতিচ্ছবি তারা। আলমকে দেখে মতিন সাহেবও অবাক হয়েছিলেন। ‘বদিউল আলম গেট ধরে দাঁড়িয়েছে। সে শহরে ঢুকেছে সাত জনের একটি ছোট্ট দল নিয়ে। শহরে গেরিলা অপারেশন চালানোর দায়িত্ব তার। ছেলেটি রোগা। চশমায় ঢাকা বড় বড় চোখ। গায়ে হালকা নীল রঙের হাওয়াই শার্ট। সে একটি রুমাল বের করে কপাল মুছে দ্বিতীয়বার ডাকল, মতিন সাহেব। মতিন সাহেব।

মতিন সাহেব দরজা খুলে বের হলেন। দীর্ঘ সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটির দিকে। এ তো নিতান্তই বাচ্চা ছেলে। এরই কি আসার কথা?’

মুক্তিযোদ্ধা আলম ঢাকায় মতিন সাহেবের বাড়িতে ঠাঁই নেয় একটি বড় অপারেশনের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে।  ঢাকায় তার নিজের বাড়ি থাকলে সে সেখানে যায় না, এমনকি মায়ের সাথেও দেখা করে না। যুদ্ধ নিয়ে সে কোন গল্প করে না, রেডিওতে যুদ্ধের সংবাদ শুনতে চায় না। সে শুয়ে বসেই দিন কাটায়। এক সপ্তাহের জন্য আলম এলেও মতিন সাহেবের স্ত্রী সুরমা ব্যাপারটি ভালো চোখে দেখে না। তার দুই মেয়ে রাত্রি ও অপলাকে নিয়ে তিনি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ছেলেটিকে তার ভালো লেগে যায়। ক্রমশই সুরমা বদিউল আলমের ভেতরের অসাধারণ তরুণটিকে আবিষ্কার করতে থাকে। একটি সফল অপারেশনের পর আলম গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ আলমের সুস্থতা নিয়ে তিনি চিন্তিত হন। শুধু তাই নয় মেয়েকে বলেন: ‘দেশ স্বাধীন হয়ে যাবার পর আমি আলমের মার কাছে গিয়ে বলব চরম দুঃসময়ে আমরা আপনার ছেলের কাছে ছিলাম। তার ওপর আমাদের দাবি আছে। এই ছেলেটিকে আপনি আমায় দিয়ে দিন।’

‘রাত্রি ফিসফিস করে বলল, জোনাকিগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না কেন মা?

জোনাকি দেখা যাচ্ছে না কারণ ভোর হচ্ছে। আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। গাছে গাছে পাখ-পাখালি ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। জোনাকিদের এখন আর প্রয়োজন নেই।’ আশার বাণী দিয়েই এই উপন্যাস সমাপ্ত হয়।

‘১৯৭১’ উপন্যাসে আমরা দেখি বন্দুকের নলের সামনে নিশ্চিত মৃত্যুতেও রফিক নির্বিকার, বরং মেজর এজাজ রফিকের দৃঢ়তায় ভীত। ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাসে আশফাককে তীব্র যন্ত্রণা সইতে দেখি। তার আঙুলগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তীব্র ব্যথায় সে কাতরাচ্ছে তবু সঙ্গীদের খোঁজ সে দেয় না। তাকে ছেড়ে দেয়ার গ্যারান্টি দেয়া হলে সে তাতে রাজী হয় না। মেজরের সামনে নিজেকে সে কুকুর, বিড়ালের নয়, মানুষের বাচ্চা বলে দাবি করে। অনুরোধ করে তাকে মেরে ফেলার, কিন্তু কষ্ট যেন না দেয়া হয়। ‘মেজর রাকিব দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটির যাতবতীয় যন্ত্রণার অবসান করবার জন্যে তার ইচ্ছা করছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। খবর বের করতেই হবে। এটা একটা মাকড়সার জাল। একটা সুতা পাওয়া গেছে। জালটিও পাওয়া যাবে। যেতেই হবে। মানুষ আসলে একটি দুর্বল প্রাণী। মেজর রাকিব আশফাকের আরও দুটি আঙুল ভেঙে ফেলার হুকুম দিয়ে নিজের ঘরে এসে বসল।’ কিন্তু তারপরও আশফাক কিছুই বলে না। পাক আর্মির মেজর রাকিব বাঙালি তরুণ আশফাককে দুর্বল ভেবেছিলো। কিন্তু ভয়াবহ অত্যাচারেও আশফাক কিছুই বলে না। সে বারবার বলে, ‘আমি কিছু বলব না।’ শেষ পর্যন্ত ‘১৯৭১’-এর মেজর এজাজের মতো ‘আগুনের পরশমণি’র মেজর রাকিবও পরাজিত হয় দৃঢ়চেতা বাঙালি যুবকের সামনে। ‘দুজন দীর্ঘ সময় দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। মেজর রাকিব বেল টিপে কাকে যেন ডাকল। শীতল গলায় আশফাককে মেরে ফেলবার নির্দেশ দিল। আশফাক বিড়বিড় করে বলল, স্যার যাই। স্লামালিকুম।’ আশফাক মৃত্যুকে বরণ করে নেয়, কিন্তু পরাজয় নয়।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel