ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ জুন ২০১৮
Risingbd
ঈদ মোরারক
সর্বশেষ:

সৈয়দ হকের অর্পিত পদাবলি || পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-২৭ ১:৫৬:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-২৭ ২:০৭:৩১ পিএম
সৈয়দ শামসুল হক

একদা এক রাজ্যে থেকে পেরেকবিদ্ধ পদযুগ পর্যন্ত দীর্ঘ কবিতাপরিক্রমা সৈয়দ শামসুল হকের। ‘সব্যসাচী’ বিশেষণজর্জর তাঁকে আমরা ‘কবি-সব্যসাচী’ বলতে অধিক আগ্রহী কারণ কথাশিল্প-নাট্যকৃতি-প্রবন্ধ-ব্যক্তিগত গদ্য-শিশুসাহিত্য-অনুবাদ ইত্যাদি বহুব্যাপ্ত সৃজনকার্যের নেপথ্যশেকড়ে তাঁকে যেন সতত জল দেয় এক শুদ্ধ কবিস্বভাব। তাঁর শিল্প-আত্মা গান গায় কবিতার সুরে।

হৃদয় তো তাঁর কাব্যের অবশ্য-প্রথম উপচার তবে একমাত্রিক হৃৎকমলের ঘ্রাণ তিনি আস্বাদে অভ্যস্ত নন। যেন ঠিক এরই প্রতিভাস তাঁর প্রারম্ভপর্বের কাব্যোচ্চারণে-

‘যে আমাকে ইচ্ছে করেছে,

আমি তার;

আর যে আমাকে করেনি,

আমি তারও।

প্রেম একটা জীবনের মতো, জীবন অনেকের।’

(জীবনের মতো; রচনাকাল-১৯৬০)

হ্যাঁ, প্রেমতো এক ব্যাপ্ত নিবেদন যা সৈয়দ শামসুল হক আবিষ্কার করে ওঠেন ব্যক্তি থেকে ভাষার ভূগোলে। ইতিহাসখ্যাত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনে যে তরুণ কবি সৈয়দ শামসুল হকের দেখা পাই আমরা, সেতো ব্যাপ্ত প্রেমেরই পূজারি-

‘সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি

শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায়

বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল

পৃথিবীর জিজীবিষু আত্মার কাছে। ঘণীভূত জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে

উজ্জ্বল শিখা সেই অমর সংবাদ ঢেউ তুলে দিয়ে গেল।’

এই মণিবন্ধ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগেরও; সে মানুষ যেমন নির্বিশেষ-সাধারণ আবার কখনো কেউ কেউ কবিকল্পনার পটে রঙ-বিশেষে বর্ণিল হয়ে ওঠে; তাদের মধ্যে কেউ শিল্পী, কেউ কবি, কেউ কথাকার, কেউ রাজনীতিক, কেউ নাট্য বা চলচ্চিত্রে নিবেদিত, কেউ মাতৃমূর্তির প্রতীক আবার কেউবা একান্ত ভালোবাসার জন। সৈয়দ শামসুল হক হয়তো উপলক্ষে পড়ে কবিতার কালিতে আধারিত করেছেন কাউকে কাউকে যেমন পশ্চিমে রাজকবিদের করতে হতো একসময়। নববর্ষ-রাজকীয় বিবাহ- সম্রাটের জন্মদিন- জাতীয় উৎসব বা অর্জন উদযাপন-সামরিক বিজয় এমনকি রাজকীয় অন্ত্যোষ্টির মতো রাজকর্তব্যে অনুরুদ্ধ হয়ে রাজকবিদের কবিতা লিখতে হতো। গত ১১ই সেপ্টেম্বরে ২০০১-এ টুইনটাওয়ারে হামলার পর মার্কিন পোয়েট লরিয়েট বিলি কলিন্স মর্কিন যুক্ত কংগ্রেসে The names শীর্ষক কবিতা পাঠ করেন (৬ সেপ্টেম্বর ২০০২) যার অডিও-ভিডিও সর্বত্র প্রচারিত হয়।

আমাদের সৈয়দ শামসুল হক ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানান- স্মৃতিচর্যা করেন বিশাল পটভূমিসমেত। ফলত ‘অনুরোধের পদ্য’ না হয়ে তা বরং কবিতারই অন্যতর মাত্রাকে জাজ্বল্য করে। স্মারককবিতার ক্ষেত্রে পাঠক হিসেবে আমাদের ঘটে অভিনতুন সম্ভোগ। উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সম্বন্ধসূত্রে তাঁর কার্যক্ষেত্র এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাজ-দেশ ও বিশ্বপরিসরেরও সংযুক্তি ঘটে অনায়াসসাচ্ছন্দ্যে। এই যেমন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা যেন বাংলাদেশকেই লিখে চলে আবার অমলেন্দু বিশ্বাসকে নিয়ে রচিত কবিতা প্রথমত নাট্যবিশ্ব এবং শেষত যেন মানুষজীবনের বিস্মৃত প্রেক্ষিতকেই মঞ্চরূপ দান করে।

এইমতো কবিতাবলি সৈয়দ শামসুল হকের বিশাল কবিতা সংগ্রহমালায় বিক্ষিপ্তরূপে বিন্যাসিত, কিছুবা অদ্যাবধি অগ্রন্থিত। বিষয়গতভাবে অভিন্ন ধরনের অর্ধশত কবিতা একত্র-গুচ্ছিত করার ভাবনা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিবিশ্ব এক কবিচোখে কত বিচিত্র ছন্দে-বর্ণে বিভাসিত তার একটি নমুনা নির্মাণ।

সৈয়দ শামসুল হক আদ্যন্ত কবিতায় নিমজ্জিত। তাই দূর ও নিকটকালের, নানান ভাষাদেশের চৌদ্দ কবি-কে তিনি অনুভব করে ওঠেন তার নাক্ষত্রিক বোধে। পুরাপর্বের নারীকবি চন্দ্রাবতী একালের কবির কাব্যে বাঙ্‌ময় হয় কাঁঠালিচাঁপার সুরভিতে-গীতিকার পাঠে আর ব্রহ্মপুত্রের ছলাৎ ছলাৎ অনুষঙ্গে, অতঃপর কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতির বাঁশি ভেঙে দেয় কাব্যরহিত কালের করাল ঘুম। আর দিল্লী-যমুনাপাড়ের মীর্জা আসাদুল্লা খান গালিব সৈয়দ হকের কণ্ঠে যেন চিরকালের অজরামর কবি-আত্মা হয়ে ভর করেন-

‘আমি তো গালিব নই, আত্মার ভিতর আত্মা,

গালিবের আত্মা করে ভর।

কবির ভিতরে কবি, গালিব দাঁড়ান এসে

প্রতি ধ্বংসস্তূপের ভেতর।’

রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্মের অংশী যেমন করে তোলেন কবি তেমনি ভষ্মপ্রায় সময় থেকে বাঙালির পূর্ণিমাপ্রহরে অবতরণের সমার্থক করেন তাঁর নাম। প্রিয় কবিবন্ধু শামসুর রাহমানের সুবর্ণতিথিতে তাঁর সুদীর্ঘ সৃজনজীবন কামনা করেন কারণ কবির জীবনই পারে মানবস্বপ্নের অনুবাদ তরাণ্বিত করতে। শহীদ মিনারের নিচে কবি-সহযোদ্ধা হাসান হাফিজুর রহমান দেবশিশু হয়ে ধরা দেন কবির কাছে, যেন রাষ্ট্রভাষা-যুদ্ধের স্মৃতিতাপে জাগিয়ে তুলতে চান হাসান হাফিজুরের হিমনিদ্রা। অনুজ কবি সিকদার আমিনুল হকের প্রস্থানগামিতা লক্ষ করে আমাদের কবিতার আভাঁগার্দ-অভাব বুঝতে থাকেন আর আবদুল মান্নান সৈয়দের বিদায় তাঁর পরাবাস্তব-মুদ্রাতেই স্বাগত জানান; সম্ভাষণ করেন অনন্তের কবিতারাজ্যে তাঁর যাত্রাবিন্দু।

রাজনৈতিক রণন কখনো শিল্পচ্যুত তারে বাঁধেননি সৈয়দ শামসুল হক তবে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস-আদর্শ কখনো অপ্রকাশ্য থাকেনি বিশেষত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বারবার এসেছেন সৈয়দ হকে। দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবকে নিয়েই সর্বাধিক পাঁচটি কবিতা লিখেছেন তিনি। না, বীরের বেদীমূলে ভক্তের অর্ঘ্য নয় বরং বাংলা ও বাঙালির শুদ্ধ স্বপ্নকল্পনার প্রতীকবিন্দুকে নানা ভঙ্গিমায় উদযাপন করেন তিনি পৃথক পৃথক কবিতায়। মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায় ইতিহাসের সুদীর্ঘ পরিব্রাজনা সম্পন্ন করেন। মুজিবের হাত থেকে নীল নীলিমায় উড্ডীন শাদা পায়রার ডানায় তিনি মুদ্রিত দেখেন মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ছায়ারূপ। কমরেড মনি সিংহ ও মোহাম্মদ ফরহাদকে নিয়ে লিখিত দীর্ঘায়তন এলিজিতে সাম্যের দর্শন, সংগ্রাম ও অঙ্গীকার একাকার হয়ে পাঠককেও অনুভবক্ষম করে বৈষম্যজর্জর সমাজে কতটা দুঃসহবাস মানবের!

নাটক তাঁর এক অনিবার্য ভুবনাংশ। ‘মধুসূদনরূপে অমলেন্দু বিশ্বাসকে দেখে’ নাম্নী অসামান্য কবিতা যেন তার করতলে যুগপৎ কাব্য ও নাট্যের স্বভাবকেও ধারণ করে আছে। এই কবিতার জন্মরহস্য শোনা যাক তাঁরই ভাষ্যে-

‘...বাংলা একাডেমিতে এক সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে অমলেন্দু মধুসূদন নাটকটি এনেছিলেন। আর বাংলা একাডেমির নিচতলার ঘরে বেড়া দিয়ে সাজঘর করা হয়েছে। অমলেন্দু নিজেই নিজের মেকাপ করতে করতে আমার সঙ্গে গল্প করছেন। আমি দেখছি মানুষটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে, অমলেন্দু থেকে মাইকেল হয়ে যাচ্ছে। এটা আমাকে বিদ্যুতের মতো স্পর্শ করে।’

এই অভিজ্ঞতা-কথনের সমান্তরালে পাঠ করি এই সিরিজের কবিতা বিষয়ে কবির বক্তব্যভাষ্য-

‘...যারা রাজকবি হয়, তাদের একটা দায় থাকে। যত বড়ই কবি হন না কেন রাজার আদেশেই লিখতে হবে। আর আমাদের এখানে আমি মনে করি, একজন কবি নিজেই নিজেকে অনুরোধ করেন যে এই রকম একটা ঘটনা, কারও জন্ম, কারও মৃত্যু, কারও চলে যাওয়া, কারও উত্থান, এসব নিয়ে একটা রচনা লেখার।’

(সব্যসাচীর সাহিত্য-সংসার, অন্যদিন ঈদসংখ্যা ২০১৩)

চলচ্চিত্রের মানুষ আলমগীর কবিরের শায়িত মৃতদেহের সম্মুখে কবির অভূত অভিজ্ঞান-

‘তোমার সমস্ত কিছু

চলমান

বহমান

ধাবমান হবে

বিদায় বলব না আমি-

প্রকৃত বন্ধুর নেই প্রকৃত বিদায়।’

হ্যাঁ, এই নশ্বরতায় সীমায়িত মানুষ চলচ্চিত্রপ্রতিম বন্ধুত্বের বর্ণিল পরম্পরাতেইতো বেঁচে থাকে অনন্তজীবন। আর কলেরাশাসিত বর্তমানে বিরল বান্ধব ওয়াহিদুল হককে সনেট- যুগলে স্মরণ করেন যেন তাঁর মাঙ্গলিক সুরের আগুন ছড়িয়ে যায় সবখানে। মাতৃদুধের ঋণ শোধ করতে সুফিয়া কামাল আর নীলিমা ইব্রাহিমকে মনে করে ওঠেন সৈয়দ শামসুল হক। তাঁদের কৃত্য মাতৃভূমির হৃৎ-প্রান্তরে যে অমর পলি সঞ্চার করে ঋণী করে চলে আমাদের আর যেন সন্তানসম দায়বোধে কবি কবিতার অক্ষরে এ দায় শোধ করেন। কথাশিল্পী সমরেশ বসুকে পল্টন-সূত্রাপুর-কলকাতা-ঢাকা- সোমেন চন্দের লাশের দীর্ঘ পটভূমিকায় স্থাপন করে যেন তাঁরই মহার্ঘ্য উপন্যাসের নাম ধরে বলতে চান ‘দেখি নাই ফিরে’।

চিত্রকলা সৈয়দ শামসুল হকের বাসভূমি এবং স্বপ্নভূমিও বটে। রেখা আর রঙের আশ্লেষে-সংশ্লেষে যে শিল্পসমুদ্রের সৃষ্টি হয় তাঁর ফেনিল উদ্ভাসনায় উজ্জ্বল তাঁর কাব্য-মনোলোক। তাঁর গল্প-উপন্যাসে চিত্রকর এসেছে চরিত্র হয়ে, চিত্রকলার বহুভঙ্গিম প্রেক্ষায় নির্মিত হয়েছে ঈর্ষা নাট্যের কায়া আর কবিতায় তাঁর বন্ধু- চিত্রকরেরা তেল কিংবা জলরঙের এক একটি চিত্রকাজের মতোই লাভ করে নিরুপম ভাস্বরতা। ১৯৫৯-এ কাব্যচর্চার প্রারম্ভপর্বে মোহাম্মদ কিবরিয়ার ‘ঘোড়া’ দৃশ্যচরিত্রকে ঘাসের আক্ষরিক আবর্ত থেকে উদ্ধার করে কবির উপচার শব্দের ঘাসে প্রতিতুল্য করেন। কামরুল হাসানের চিত্রপটকে যেন রূপত্তীর্ণ করে তুলেন তুলি- ইজেলের বিস্তারে; বাঙালির স্বপ্নপটে।

মননশিল্পীদের মধ্যে আনিসুজ্জামান এসেছেন বন্ধুতর্পণের আদলে, কবি ও তাঁর অভিন্ন সাহিত্যিক উদ্গমের ইতিহাসকেন্দ্রিত ধারাবর্ণনে। একেবারে ব্যক্তিক হৃদয়ানুভূতির পুষ্পেল-প্রকাশ ঘটেছে আনোয়ারা সৈয়দ হককে উপহৃত অঞ্জলিতে। সদা নিম্নগামী স্নেহ- ভালোবাসার অপত্য অনুভব ধরা আছে আত্মজা বিদিতা সৈয়দ হক-কে উৎসর্গিত কবিতাদ্বয়ে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC