ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

বিরল ও মহত্ত্বর কবি বেলাল চৌধুরী || ওবায়েদ আকাশ

ওবায়েদ আকাশ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৫ ১:২৮:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৩ ৪:৫৩:১৭ পিএম

একমাত্র পড়াশোনা আর গুটেনবার্গ প্রবর্তিত ছাপাখানাই যখন ছিল মৌলিক সম্বল- এই তৃতীয় বিশ্বের  দেশগুলিতে, ঠিক সেই সময়ে কবি বেলাল চৌধুরী বিশ্ব সাহিত্যের নাটাই হাতে উড়িয়ে দেখেছেন তাঁর সাহিত্যপাঠ। আবার মেঘ কিংবা ঝড়ো হাওয়ার প্রস্তুতির আগেই উড়ন্ত ঘুড়িকে নিজের মতো করে বশ মানাতে মানাতে ফিরে এসেছেন আপনালয়ে। সেই থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, আজকের প্রযুক্তির চূড়ান্ত জিজ্ঞাসায়ও কবি বেলাল চৌধুরী আধুনিকতাকে ছাড়িয়ে নিবাস গেড়েছিলেন আরো একধাপ উঁচুতে। তিনি মনে করতেন, পুরো বিশ্ব তো বটেই, নিজ দেশের এক তরুণতর কবিতার পাঠক হওয়াও একজন লেখকের মৌলিকতম কাজ। তিনি নিজে যেমন তা করতেন, তেমনি তরুণতর কবিতাকর্মীর কানে সেই ব্যাখ্যা পৌঁছে দিতে লেখালেখির পাশাপাশি ভালোলাগার জায়গা বলে বেছে নিয়েছিলেন সম্পাদনাকে। আমৃত্যু তাই লেখা আর সম্পাদনা ছিল তাঁর জীবনের পরিপূরক অনুষঙ্গ। আর এসব করতে করতে তাঁর বেদনাজর্জরিত জীবন খুঁজে পেয়েছিলেন এক ডাহুকী স্বভাবের ভেতর। বিষতিক্ত বেদনা আর অপ্রাপ্তিতে ভরা এই জীবনে তিনি প্রতিটি মানুষকেও আবিষ্কার করেন ওই ডাহুকী ভাবনার বিভায়-


মানুষতো ডাহুক নয় অথচ ডাহুকের বেদনার

ভেতরে মানুষ ডুবে যেতে পারে, ডুব দেয়

চিরকাল- এইভাবে মানুষের ডাহুকী ভাবনা

মূত্ররসে যেমন ভেসে যায় মানুষের

স্বভাবের নির্বিবেকী তাবৎ লোনা ও অম্লতা

তেমনি মানুষ ঢেলে দিতে পারে

ঐ ডাহুকী ভাবনার ভেতর মানুষের

যতো বেদনা, বিষতিক্ত সারাৎসার,

ডাহুক ও মানুষ যদিও পরস্পর বেদনার

এপিঠ-ওপিঠ, কিছুটা মানুষের, কিছুটা ডাহুকের

তবু মানুষ তো কখনো ডাহুক নয়

অথচ ডাহুক তার বেদনার সীমা- স্বর্গের কতোদূর,

কতোদূর- একজন মানুষকে নিয়ে যেতে পারে?

            [ মানুষের ডাহুকী ভাবনা, বেলাল চৌধুরী]

 

শিল্পমাত্রই বেদনাজাত। যুগে যুগে বেদনাই মানুষকে শিল্পী করেছে। পৌঁছে দিয়েছে শিল্পের চূড়ান্ত মাত্রায়। শিল্পীজীবনের এক অসামান্য আইডলে দাঁড় করিয়েছে বেলাল চৌধুরীকে। মানুষ ডাহুক নয়, তবু কেন ডাহুকী ভাবনার সাথে মানুষকে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি? কাঁচের বেদনা জাগাতে কেন এই কাঁচকাটা হিরের প্রসঙ্গ উত্থাপন? মানুষ তো ডাহুক ভালোবাসে। যেমন সকলে ভালোবাসে হিরে। কিন্তু যে ডাহুকী স্বভাব মানুষের বেদনার সঙ্গে তুল্য, তা নিশ্চয় মানুষের প্রিয় হতে পারে না। যেমন কাঁচের প্রিয় হতে পারে নি হিরে। তবে কবি বেদনার্ত মানুষের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন ডাহুককে। ডাহুক কেঁদে কেঁদে গলা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে তার বেদনার অবসান ঘটায়; আর মানুষ মূত্র ত্যাগের মতো ঝেড়ে ফেলে তার সকল বেদনা। কিন্তু তা কি কখনো প্রমাণ করতে পেরেছে মানুষ?

হয়তো পেরেছিলেন বেলাল চৌধুরী। আমাদের বর্ষীয়ান কবি। আট দশকের এক তরুণ সাহিত্যপথিক। এতটা বয়সে যৌবনের তারুণ্যকে লালন করা, ধ্যানে জ্ঞানে গ্রহণ করার যে মানস, সেই মানসশক্তি সম্পূর্ণ অটুট দেখা যায় কবি বেলাল চৌধুরীর মধ্যে। এরই ভেতর দিয়ে তাঁর জীবনে এসেছে যৌবনের অশান্ততা যেমন, তেমনি তাঁর ক্যানভাসের জমিন নিরন্তর সেলাই করেছে তাঁর বেদনারা।

কারা সেই বেদনাসমূহ, কারা নিরন্তর প্রাকৃতিক ডাকের মতো তাঁকে জাগিয়ে তুলেছে? এই বেদনা কি লুকিয়ে আছে তারই মধ্যে, মাত্র যৌবনে, যখন তিনি দেশ ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন কোনো অচিন দেশের জাহাজে উঠে? এই কি সেই বেদনা- বাবার জমিদারী ফেলে, এক অভিজাত বংশের রাজপুত্তুরের মুকুট ছুড়ে ফেলে দিয়ে যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন এক অনিশ্চিত যাত্রায়? এই কি সেই বেদনা, যেভাবে মুখে তুলে দেয়া সোনার চামচ পদদলিত করে নাওয়া নেই খাওয়া নেই ঘুম নেই, বেছে নিয়েছিলেন এক জাত বোহেমিয়ান কবির জীবন? কিংবা যখন নিজ দেশ ছেড়ে ভেসে বেরিয়েছেন ভিন দেশি জাহাজে, দিনের পর দিন সমুদ্রে? আবার একদিন ভাসতে ভাসতে জেগে উঠেছিলেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাংলা ভূখণ্ড কলকাতার এক প্রাচীন কবরখানার মাঝে? মাছধরা, কুমিরের চোখের জলের ব্যবসা আর জেল খাটা, সাংবাদিকতা ফেলে ১৯৬৩ সালে কলকাতায় নোঙর ফেলার মধ্যেই কি লুকিয়ে ছিল সেই বেদনা? কিংবা নিজ দেশ ছেড়ে দীর্ঘ একযুগ ভিন দেশে বসবাস করে আবার ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে আসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সেই বেদনা?

আজকের বেলাল চৌধুরীকে এতটুকু বৈষয়িক বিষয়াদির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নিয়ে তাঁর বেদনার পরিমাপ করাকে এক প্রকার অবিচার বলে মনে হয়। কারণ কবি বেলাল চৌধুরীর মতো একজন কবির বেদনার ভুবন এই সব তুচ্ছ বহির্দৃশ্যের মধ্যে লুক্কায়িত থাকতে পারে না। কারণ বেলাল চৌধুরীর বিষয়-বৈভবের কোনো অভাব ছিল না। তিনি বিষয়ের মধ্যে থেকে নিজেকে মজিয়ে সোনারুপার মূল্যে বিকোতে চাননি। বরং তিনি জ্ঞানের মধ্যে ডুবে নিজেকে হারাতে চেয়েছেন। বালুকণা হয়ে ডুবে যেতে চেয়েছেন সামুদ্রিক ঝিনুকের ভেতর। সেখান থেকে মুক্তোদানা হয়ে নিজেকে রাঙাতে চেয়েছেন আজীবন। তাই তাঁর ধ্যানজ্ঞানের সর্বত্র জুড়ে ছিল কবিতা কিংবা আর্ট কিংবা শিল্পকলা। সুতরাং তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেই জীবন, যে জীবনে কষ্ট অপার, যে জীবনের বেদনাকে স্বর্ণালি ফসলে রূপ দেয়া যায়; তিনি সেই কষ্ট সেই বেদনাকে খুঁজে পেয়েছিলেন বোহেমিয়ান জীবনের ভেতর। সত্যিকারের সেই জীবন তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কলকাতায় এবং বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিবেশে।

শৈশব থেকেই গড়ে উঠেছিল দুর্দমনীয় পাঠাভ্যাস। মা ছিলেন কবি; বাবা শিল্প সমঝদার। পারিবারিকভাবেই অভ্যস্ত হয়েছিলেন এই পাঠাভ্যাসে। কারণ বাবা-মায়ের ছিল বইয়ের বিশাল সংগ্রহ। সেখান থেকে পড়তে পড়তে যে স্বপ্নের লেখকদের ভুবন মনের ভেতর গড়ে উঠেছিল; সেই ভুবনের, সেই স্বপ্নের লেখকদের কারো কারো দেখা মিলেছিল কলকাতায়। প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল সখ্য কিংবা বন্ধুতা।

বাংলাদেশের মধ্য পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের কবি বেলাল চৌধুরী সত্তরের দশকের হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নায়কের মুকুট পরে প্রথম শ্রেণির যাত্রীর টিকেট পেয়েছিলেন। যে বেলাল চৌধুরীকে আমরা চিনি, কিংবা আজকের যে বেলাল চৌধুরী সৌম্য শান্ত সুশীল চেহারার ভদ্রলোক; এই সুদর্শন কবির কলকাতার সাহিত্য জীবনটা তিনি তৈরি করে নিয়েছিলেন ঠিক ততটাই অবাধ্যপনা, একরোখা, অশান্তপনার ভেতর দিয়ে। স্পষ্টবাদিতা ও মানবিকতার অনমনীয় চর্চার ভেতর দিয়ে। তখনকার সাড়া জাগানো ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার যে তিনটি সংখ্যা তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা তিনি এমনি এমনি কিন্তু পান নি। তাঁকে তা অর্জন করতে হয়েছিল। বেলাল চৌধুরীর কিছুটা অগ্রজ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে ডেকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নির্ভর করেছিলেন তাঁর ভেতর।

বেলাল চৌধুরীর জীবনযাপন থেকে চিন্তাচেতনা ও লেখালেখি- এর মধ্যে কোনোই পার্থক্য ছিল না। তিনি শুধু বলায় এবং লেখায় নয়, মনেপ্রাণে জীবনাচরণেও বেছে নিয়েছিলেন প্রথাবিরোধিতা, আষ্টেপৃষ্ঠে। আজকে কিন্তু আমাদের সব বাংলাতেই এমন অনেকে আছেন, যারা প্রতিষ্ঠান কিংবা অপ্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা না জেনেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাজার চেষ্টা করেন। কোথায় লিখলে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়া যায় কিংবা কোথায় না লিখলে প্রথাবিরোধী সাজা যায়- শুধু এ জাতীয় ভাবনাগুলোই তাদের ভেতর ঠাঁই করে আছে। কিন্তু বেলাল চৌধুরী শুধু তাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি হয়তো ভাবতেন, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ব্যাপারটাই একটা সামগ্রিক ব্যাপার। তাই তিনি জীবনযাপনেও সেই সামগ্রিকতাকে ধারণ করেছিলেন। বেছে নিয়েছিলেন এক জাত বোহেমিয়ান কবির জীবন। এ কারণে বেলাল চৌধুরী শুধু লেখালেখিতে নয়; অনেক কবি-লেখকের সাহিত্যকর্মেও জুড়ে বসেছেন নায়কের ভূমিকায়। তিনি যেমন প্রচুর কবিতা, প্রবন্ধ, জার্নাল, কথাসাহিত্য লিখেছেন; তেমনি দুই হাতে অনুবাদের কাজও করেছেন সমানতালে। বোর্হেসের মতো লেখকের কঠিন পাঠ্যেরও যে সাবলীল অনুবাদ তিনি করেছেন, তাকে মূলের কাছাকাছি রেখে বিবেচনা করা যায়। সেসময়ে মার্কেজ অনুবাদ করেও বিস্ময় জাগিয়েছেন। এছাড়া তিনি অনুবাদ করেছেন ডিলান টমাস, অক্তাভিও পাজসহ আরো অনেকের সাহিত্যকর্মের।

‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদনা ছাড়াও তিনি ‘সচিত্র সন্ধানী’, ‘পল্লীবার্তা’, ‘ভারত বিচিত্রা’ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন মেধা ও সৃজনশীল মুন্সিয়ানায়। উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁকে দিয়ে কোনো কাজই দীর্ঘদিন ধরে করানো যায়নি। তিনি বারবার তাঁর কাজের জায়গা বদল করে বৈচিত্র্য খুঁজেছেন। তবে সাংবাদিকতা এবং সম্পাদনার মধ্যে হয়তো শেষ আনন্দের সাক্ষাৎ মিলেছিল তাঁর।

বেলাল চৌধুরীর বোহেমিয়ানিজমের আর একটি প্রমাণ তিনি বারবার তাঁর নাম পাল্টে বিভিন্ন ছদ্মনামেও লেখালেখি করেছেন। এই নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সে সময়ের বহুল প্রচারিত পত্রিকায় ‘বল্লাল সেন’ নামে দীর্ঘদিন কলাম লিখেছেন তিনি। এত তথ্যবহুল এবং উপভোগ্য লেখা আজকাল তেমন চোখে পড়ে না। তাঁর শব্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব, শব্দভাণ্ডারের বিস্তৃতি এবং তথ্যের ভাণ্ডার দেখে বিস্মিত হতে হয়। এতটা স্বাদু ও আকর্ষণীয় গদ্য যে কোনো কবির হাত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে, তা বেলাল চৌধুরীও প্রমাণ করেছেন। আবার তিনি ‘ময়ূরবাহন’, ‘সবুক্তগীন’ নামেও অনেক লেখা লিখেছেন বহু জায়গায়। তার ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’ এবং ‘সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে’ নামে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ; ‘পূর্ণ মনিজালে’ কিংবা ‘নবরাগে নব আনন্দে’ নামক গদ্যগ্রন্থের অবিশ্বাস্য সাবলীলতায়, কখনো তাকে একজন দক্ষ কথাসাহিত্যিক বলেও ধরে নেয়া যায়। ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’, ‘চেতনার রঙ চন্দ্রশিলা’য় তিনি সে প্রমাণ দিয়েছেন। এর বাইরে তিনি সম্পাদনা করেছেন অসংখ্য গদ্যগ্রন্থ এবং রচনা করেছেন শিশু-কিশোর সাহিত্য।

এসব কিছু ছাপিয়ে বেলাল চৌধুরী একজন কবি হিসেবেই পরিচিত আমাদের কাছে। তাঁর ১৫/১৬টি কাব্যগ্রন্থে তাঁর কবিজীবনকে বিধৃত করেছেন। লিখেছেন বিচিত্র কবিতা। বেলাল চৌধুরীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতাকে অন্য কারো সঙ্গে মেলানো যায় না। তিনি একটি স্বতন্ত্র ভাষায় কবিতা লিখেছেন। এ কথা স্বীকার করেছেন কবি শামসুর রাহমানও। রাহমান বলেছেন, “তিনি কখনো কবিতার বাঁধা সড়কে হাটেন না, একটু অন্যরকম লিখতে চেষ্টা করেন”... (বেলাল চৌধুরীর ‘জলবিষুবের পূর্ণিমা’ গ্রন্থের ব্লার্ব থেকে)। কিন্তু ষাটের দশকের আরেক বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ এ কথা স্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, “কলকাতায় ষাটের কবিদেরই একান্ত সহবাসী বেলাল, সতীর্থ-পারিবেশিক প্রভাব-যে জীবনে ও সাহিত্যে কী বিপুল ভূমিকা উদযাপন করে, তা আর একবার প্রমাণিত হয় বেলালের কবিতায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, শামশের আনোয়ার, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, তুষার রায়- এঁদের কবিতার সঙ্গে বেলালের কবিতার একটি সামান্য সাযুজ্য ও সাধর্ম্য আছে- তা হচ্ছে গদ্যকেই কবিতা ক’রে তোলা” (করতলে মহাদেশ, শিল্পতরু)।

এক্ষেত্রে এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বেলাল চৌধুরী তাঁর কবিতায় গদ্যকেই বেশি করে ঠাঁই দিয়েছেন যতটা না প্রচলিত ছন্দে। আবার দুই প্রধান কবির দু’রকমের বক্তব্য থেকে আমরা এটাও আন্দাজ করতে পারি যে, বেলাল চৌধুরী সত্যি সত্যি কারো মতো নন, তিনি বেলাল চৌধুরীর মতো। আমরা তাঁর কবিতা থেকে কিছু পঙ্‌ক্তি পাঠকের সামনে পরিবেশন করতে পারি।

১.

বুক ভরে টাটকা সতেজ সবুজ নিশ্বাস নিতে নিতে

গহীন বনের কিনারায় এসে দেখি তাকে,

গৈরিক বসনাবৃত পরম নিবিষ্টচিত্ত একা একা বসে,

কে তিনি, পথিক না পরিব্রাজক?

প্রকট নৈরাজ্যের মাঝে রৌদ্রের দৌরাত্ম্য,

পেছনে দাঁড়িয়ে কৌতূহলভরে ছায়া ফেলে ঘাড়ে

চাক্ষুষ হয়, কী এক আশ্চর্য তৎপরতায় এফোঁড় ওফোঁড়

সেলাই করে চলেছেন অদৃশ্য কোন আচ্ছাদন,

বুকে যেন তার উদভ্রান্ত অস্থির প্রতিবিম্বের ঝিরঝির নড়াচড়া

                              [সেলাই-করা ছায়া]

২.

শিশির জড়ানো তৃণদলে, নাতলি ঘাসের সবুজ অরণ্যে

কুড়িয়ে পেয়েছি টিকিটবিহীন শাদা খাম

রাতদুপুরে তাই ছুটে গেছি বুড়ো দর্জির তাঁতকলে

অনেক যত্নে রঙিন সুতোয় নক্সা বুনে লিখে দিলো

পশমের ঠিকানা, পশম-অন্ত-প্রাণে আমি শুনেছি

হাওয়ায়-হাওয়ায় বাজছে পশমের রণদামামা-

গ্রামোফোনের গানের আড়ালে পশম তুমি কোথায়?

                            [পশম-উৎসবের আমন্ত্রণলিপি]

৩.

আবার প্রহরশেষের রাঙা আলো ভেঙে নামে সন্ধ্যা

চরাচর জেগে ওঠে চন্দ্রকলা, কখনো নিকষ রাত্রি শুধু,

ফের আসে ভোর মনে ভোরের রঙিন শোভা

ঘোর অমাবস্যা জীবনের প্রান্তে, ক্রমশ ভোরের আলস্য

গড়ায় দুপুরে, তোলে হাই আবার দুপুর মরে অপরাহ্ণ

সায়াহ্ন দ্যুতিতে টগবগ করে বুক, যাবতীয় ব্যথা উপশমে

ঝরে ঝরঝর একরাশ যুঁই টাটকা সতেজ

                                 [ভাঙা গড়া]

উদ্ধৃতিগুলো একদিকে যেমন বেলাল চৌধুরীর নিজস্বতা ধারণ করেছে, একই সঙ্গে ষাটের দশকের সামগ্রিক প্রবণতা এখানে ছায়া ফেলেছে। তবে এই প্রবণতা শুধু পশ্চিমবঙ্গের ষাটের প্রবণতা নয়, দুই বাংলারই ষাটের প্রবণতা বলে মনে হয়। ষাটের দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাজাত কবিতাগুলো বাদ দিলে আরও যে একটি বিশুদ্ধ ধারায় কবিরা কবিতা লিখেছেন, বেলাল চৌধুরী সেই ধারারই একজন বিশিষ্ট কবি।

পশ্চিমবঙ্গের হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী। সে আন্দোলনের একঝাঁক খ্যাতিমান কবি-লেখক বোহেমিয়ানিজমের চূড়ান্তে তাদের জীবন বাজিয়ে দেখেছিলেন। তবে পশ্চিমবঙ্গে হাংরি আন্দোলনের যে বিচ্ছিন্নতা, উল্লম্ফন, তেজোদীপ্ততা- তা বেলাল চৌধুরীর কবিতাকে স্পর্শ করেছে সত্য, কিন্তু তুষার রায়, ফাল্গুনী রায় কিংবা শামশের আনোয়ার যেভাবে সেই স্বাতন্ত্র্য বা বৈপরীত্য ধারণ করেছেন, বেলাল চৌধুরীর কবিতায় সেভাবে তা ধরা পড়েনি। এক্ষেত্রে বেলাল চৌধুরীর কবিতার নিজস্বতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এরপর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তাঁর স্বদেশাগমন ও জীবনধারার পরিবর্তনে তাঁর কবিতা আরও একবার বাঁক নিয়েছে। তাঁর কবিতার নিরীক্ষাপ্রবণতা তিনি প্রমাণ করেছেন।

বিগত ছয় দশকের বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি বেলাল চৌধুরীকে জীবনযাপন ও কবিতায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও বিভাময় জীবনের রাজপুত্তুর বললে অত্যুক্তি হয় না। কারণ তিনি শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ আট দশকের জীবনযাপনে যে প্রথাহীনতাকে বেছে নিয়েছেন, তা তাঁর সমসাময়িক অন্য কবিদের বেলায় একই অর্থে ব্যবহার করা যায় না। শৈশব থেকেই একাডেমিক লেখাপড়ায় অমনোযোগিতা, অবাধ্যতা, জীবন বিমুখতা যৌবনের প্রারম্ভেই তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। অভিজাত ও অবস্থাসম্পন্ন ঘরের সন্তান হয়েও তিনি সমুদ্রে মাছ ধরার কাজের মতো প্রান্তিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন বিশের কোঠায় পৌঁছানোর আগেই। কলকাতায় নোঙর করে সমাজ সংসার পরিবার ভুলে দিনের পর দিন বছরের পর বছর কাটিয়েছেন সে সময়ের স্বপ্রতিষ্ঠিত কমলকুমার মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, বিনয় মজুমদার, শামসের আনোয়ার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যরত্নদের সঙ্গে। পেয়েছেন তাঁদের স্নেহ ও বন্ধুত্ব। আর দিনের পর দিন সংসার করেছেন বইয়ের সঙ্গে। বইকে খাট কিংবা তোষক মনে করে ঘুমিয়েছেন রাতের পর রাত। আর সেখান থেকেই নিজেকে আবিষ্কারের নেশায় একদিন শেষ নৌকায় পাল তুলবেন বলে যাত্রা করেছিলেন। সেই অনিশ্চিত পথের যাত্রী কবি বেলাল চৌধুরী-গাঢ়তর অন্ধকারে তুলেছেন সেই শেষ নৌকার পাল। অগণিত পাঠক-শুভাকাঙ্ক্ষীর আকুলিবিকুলি উপেক্ষা করে শুধু রেখে গেলেন এক মহৎ, সৎ আর আদর্শবান এক বিশুদ্ধ চলার পথ। চিরকালের শ্রদ্ধা জানাই তাঁকে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ এপ্রিল ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton