ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ জুন ২০১৮
Risingbd
ঈদ মোরারক
সর্বশেষ:

ইবসেন: বিশ্বনাটকের মহাস্থপতি

মাহবুবা রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৩ ১২:০৯:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২৩ ১২:০৯:১২ পিএম

মাহবুবা রহমান: আজ থেকে ১১২ বছর আগে ইবসেনের প্রয়াণের পরও তিনি যেন আমাদের পাশেই নিত্য ঘোরাফেরা করেন। আমাদের আঙুল দিয়ে দেখান কোন পুতুলের সংসারে আমরা বেঁচে আছি, গণমানুষের শত্রুদের তারই ভাষায় আজও চিহ্নিত করা যায়। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি ‘The strongest man on earth is the one who stands alone’ এখনো বিশ্বের সমস্ত নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যক্তিমানুষের সোচ্চার উচ্চারণ হয়ে ওঠে। ইবসেন জন্মেছিলেন নরওয়ের সমুদ্রতীরবর্তী শিয়েন শহরে ১৮৮২ সালের ২০ মার্চ তখনকার রাজধানী ক্রিস্টিয়ানিয়া; আজকের অসলো, থেকে এই শহরটি একশ মাইল দক্ষিণের ছোট্ট একটি শহরে।

ইবসেন আমাদের কাছে এক নামে পরিচিত ‘আ ডলস হাউস’র নাট্যকার হিসেবে। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘গণশত্রু’ ইবসেনের ততোধিক বিখ্যাত নাটক ‘An Enemy of the People’ থেকে অভিযোজিত। ইবসেন এই দুটি নাটকের মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজে ব্যক্তির ভূমিকাকে চিহ্নিত করেছেন। আর এই ব্যক্তির ভূমিকাকে চিহ্নিত করতে কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যায় যেমন: ব্যক্তি, ব্যক্তির সাথে অন্যদের সম্পর্ক, সম্পর্কের সূত্র, সম্পর্কের সংঘাত, ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ইত্যাদি।

‘অ্যা ডলস হাউস’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্র নোরা। সে যেহেতু বিবাহিত তাই তাকে পারিবারিক প্রচলিত কিছু প্রথার মধ্যে থাকতে হয়। স্বামী তাকে দেখে জৈবিক বাসনা পূরণের মাধ্যম হিসেবে। আবদুল হকের অনুবাদে ইবসেনের ‘অ্যা ডলস হাউস’ নাটকের তৃতীয় অঙ্কে দেখা যায়-

 

‘নোরা: আমার দিকে অমন করে তাকিও না, টরভ্যাল্ড।

হেলমার: আমার প্রিয়তমার দিকে আমি তাকাব না কেন? কেন তাকাব না তার সৌন্দর্যের দিকে, যে সৌন্দর্যের মালিক আমি?

নোরা: (টেবিলের অন্য দিকে গিয়ে) আজ রাত্রে ও ধরনের কথা তুমি আমাকে বলতে পারবে না।

হেলমার: নোরা (পেছনে পেছনে গিয়ে) ট্যারান্টেলা নাচের নেশা এখনো তোমাকে ছেড়ে যায় নি, দেখছি। আর এতে তোমার মোহিনী শক্তি আরো বেড়ে গেছে। শোনো- অতিথিরা এখন চলে যেতে শুরু করেছে। (চাপা স্বরে) এক্ষুণি গোটা বাড়ি নীরব হয়ে যাবে।

নোরা: হ্যাঁ সেই রকমই মনে হচ্ছে।

হেলমার: হ্যাঁ আমার প্রিয়তমা নোরা। এই রকম পার্টিতে তোমার সঙ্গে আমি যখন যাই, তখন তোমাদের সঙ্গে এত কম কথা বলি কেন, তোমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি কেন, আর মাঝে মাঝে তোমার দিকে চোরা চাউনি হানি কেন জান? বলতে পার কেন এমন করি? কারণ তখন আমি মনে মনে কল্পনা করি যেন আমরা গোপনে প্রেমে পড়েছি আমার বউ হবে বলে তুমি গোপন প্রতিশ্রুতি দিয়েছ। আর আমাদের মধ্যে তেমন কোনো ব্যাপার যে আছে তার আভাস কেউ পায় নি।

নোরা : হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি ভালো করেই জানি যে তোমার মন সব সময় আমার কাছেই পড়ে থাকে।

হেলমার: আর যখন আমরা পার্টি থেকে বিদায় নেই, আর তোমার কাঁধের ওপর- তোমার সুন্দর ঘাড়ের ওপর শালটা জড়িয়ে দেই- তখন আমি কল্পনা করি যেন তুমি আমার যুবতী বউ। আমরা এইমাত্র বিয়ের মজলিশ থেকে এসেছি, আমি এই প্রথম তোমাকে আমাদের বাড়িতে আনছি।জীবনে এই প্রথম তোমার সঙ্গে একা থাকার জন্য- আমার লাজুক তরুণী প্রিয়তমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একা থাকার জন্য! আজ সারা সন্ধ্যা তোমাকে ছাড়া আর কিছু আমি কামনা করি নি। ট্যারান্টেলা নাচের মোহময় ভঙ্গিমা আমি যখন দেখছিলাম তখন আমার রক্তে আগুন লেগে গিয়েছিল। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই তোমাকে এত তাড়াতাড়ি নীচে নিয়ে এলাম।

নোরা: সরে যাও- টরভ্যাল্ড! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি পারব না।

হেলমার: সেকি? তুমি ঠাট্টা করছ, আমার কচি নোরা! তুমি পারবে না- তুমি পারবে না? আমি কি তোমার স্বামী নই?’

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সেলিনা হোসেন সম্পাদিত ইবসেনের নাটক ও কবিতা গ্রন্থে তাঁর ‘আ ডলস হাউস’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন: ‘নোরার টারুনটোলা নাচ ও তার সাজসজ্জা তার স্বামীর কামনার উদ্রেক করে। সে নোরাকে অনাঘ্রাত যোনির অবস্থায় প্রথমবারের মতো একান্তে পেতে চায়। নোরা ‘না’ করায় হেলমার তাকে মনে করিয়ে দেয়, ‘আমি কি তোমার স্বামী নই?’

এই পরিস্থিতিতে যে নোরা ‘না’ বলে এই ‘না’ আসলে দীর্ঘদিন ধরে নারীর ওপর পুরুষের অধিকার আরোপের বিরুদ্ধে একটি ‘না’ হয়ে ওঠা। এই ভিতর থেকে করা প্রতিবাদ সমাজ সভ্যতায় নারীর ওপর নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যক্ত হয়েছে। ইবসেনের লক্ষ্য পরিবার ও সমাজকে বিদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় অচলায়তনকে আঘাত করা। এখানে ইবসেন তাঁর ‘দ্রোহী’ সত্তা নিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে উপস্থিত করেন।

প্রথাবিরুদ্ধ মত আদতে নতুন সত্যের অভিমুখী। সামাজিক অচলায়তন যে সত্যকে আড়াল করতে চায় ইবসেন তাকে প্রকাশ করেন। তিনি বেছে নেন নোরা এবং স্টকম্যানদের মতো চরিত্র। যারা সিদ্ধান্ত নেয় সমাজের প্রচলিত নিপীড়নের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একা লড়াই করার। সেই লড়াইয়ে কোনো পরিণতি আছে কিনা সেদিকটি নিয়ে তারা ভাবিত নয়। সামাজিক সম্পর্কগুলোর খাতিরে সত্যকে চাপা দেওয়ার প্রবণতা চিরকালই জাগরুক ছিল। মহাভারতে অর্জুন যখন যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেন তার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, তিনি তার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে কীভাবে অস্ত্র ধরবেন? কিন্তু কৃষ্ণ, তার রথের সারথী, তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন আত্মীয় অনাত্মীয়ের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের। এই ধারাবাহিকতাই পৃথিবীর তাবৎ শিল্প-সাহিত্যকে নৈতিক মানদণ্ডের উপর দাঁড়া করায়। শিল্প হয়ে ওঠে একটি নৈতিক কাজ। এই নৈতিকতা থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিছু গ্রহণ করুক বা না-ই করুক শিল্পী সেই জায়গা থেকে সরে আসতে পারে না। ইবসেনও সরে আসতে পারেন না। শিল্পীর প্রকৃত দায়িত্ব পালনে ইবসেন সত্য, স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে সংগ্রামের আহ্বান জানান।

শেক্সপীয়রের পরে বিশ্বসাহিত্যে ইবসেনের মতো নাট্যকার কমই এসেছেন বলে অনেকে মনে করেন। সুইডিস নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রীন্ডবার্গ  ইবসেনকে তাঁর একইসঙ্গে পূর্বসূরীও হয়ে ওঠার পথে প্রধান বাধা বলে মনে করতেন। শোনা যায়, ইবসেনের ছবি নিজের লেখার টেবিলের ওপর রেখে নতুন নতুন লেখার প্রেরণা পেতেন স্ট্রীন্ডবার্গ। জেমস জয়েসের মতো  যুগন্ধর ঔপন্যাসিক ইবসেনকে বিশেষ ভক্তি করতেন, কিন্তু তাঁর দেশ নরওয়ের বিখ্যাত লেখক ন্যূট হ্যামসুন ইবসেনকে দেখতেন তীব্র সমালোচনার দৃষ্টিতে। এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে ইবসেনের মুখের ওপরেই ন্যূট হ্যামসুন বলেছিলেন, ইবসেনের লেখা তরুণদের আর কোনো কাজে লাগবে না, তাঁর সাহিত্যও হয়ে গেছে একঘেয়ে ও বিবর্ণ। সুতরাং ভালো-মন্দ মিলেই ইবসেন তাঁর সমকাল থেকে চিরকালের দিকে এখনো অগ্রসরায়মান।

১৮৫০ সালে ‘ক্যাটিলিন’ নাটক লেখার ভেতর দিয়ে ইবসেনের নাটক লেখার সূচনা। কিন্তু নাট্যকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে  দীর্ঘ ১২টি বছর। বলতে গেলে ‘ব্র্যান্ড’ (১৮৬৫) নাটকটি ইবসেনকে খ্যাতিমান করে তোলে। পরবর্তীকালে একটির পর একটি নাটক সফলতার মুখ দেখতে থাকে। ‘পিয়ের গিন্ট’ (১৮৬৭), ‘দি লীগ অব ইয়ুথ’ (১৮৬৯), ‘দি পিলারস অব সোসাইটি’ (১৮৭৭), ‘এ ডলস হাউস’ (১৮৭৯), ‘গোস্টস’ (১৮৮১), ‘অ্যান এনিমি অব দি পিপল’ (১৮৮২), ‘দি ওরাইল্ড ডাক’ (১৮৮৪), ‘রোজমার্সাহোম’ (১৮৮৬), ‘দি লেডি ফ্রম দি সী’ (১৮৮৮), ‘হেডা গাবলার’ (১৮৯০), ‘দি মাস্টার বিল্ডার’ (১৮৯২), ‘লিটল আইওলফ’ (১৮৯৪), ‘জন গ্যাব্রিয়েল বর্কম্যান’ (১৮৯৬) এবং ‘হোয়েন উই ডেড এওয়েইকেন’ (১৮৯৯) উল্লেখিত প্রত্যেকটি নাটকই বিশ্বনাট্যের ইতিহাসে একেকটি স্বার্থক নাটক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।

ইবসেন মারা গিয়েছিলেন ১৯০৬ সালের ২৩ মে অসলোতে। ১৯০০ সাল থেকেই ইবসেনের শরীরটা খুব খারাপ যাচ্ছিল, যে কারণে আমরা দেখতে পাই ‘হোয়েন উই  ডেড এওয়েকেইন’র পর ইবসেন আর তেমন কোনো রচনায় হাত দিতে পারেননি। সেই অর্থে বিংশ শতাব্দীর সূচনা হয় ইবসেনের নাটক ছাড়াই। কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শেষ পর্যন্ত যে পঞ্চাশ বছরের সাহিত্য-জীবন ইবসেন পার করেছিলেন সেটি বিশেষভাবে বর্ণাঢ্য। নাট্যকার হিসেবে সূচনালগ্নের কিছু পরে ইবসেনকে স্বেচ্ছানির্বাসনে কাটাতে হয়েছিল ইতালি ও জার্মানিতে। উনিশশ সালের দিকে তাঁর অসুস্থতাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল উন্মাদ রোগ হিসেবে। এ-সময়ে  ইবসেন বর্ণমালা শেখার জন্য তাঁর আশপাশের পরিচিত মানুষ ও বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি সকরুণ অনুরোধ জানাতেন। এই কথাটি আমাদের তাঁর প্রতি করুণা না জাগিয়ে পারে না।

একজন সমাজসচেতন ও প্রতিবাদী নাট্যকার হিসেবে ইবসেন যেমন গণ্য হয়ে থাকেন, ততটাই গণ্য হয়ে ওঠেন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার অন্যতম বিশ্লেষণকারী নাট্যকার হিসেবে। তাঁর শেষ দিকের নাটকগুলোতে মানুষের অন্তর জগতের খোঁজ মেলে। ‘হেডা গাবলার’ নাটককে তো কেউ কেউ বীভৎস গল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। সেই সময়ের ‘ডেইলী টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল এই নাটক পড়লে যেন মনে হয় মর্গে ভ্রমণ করে এলাম। এ নাটক সম্পর্কে মর্গেন ব্লাডেড লিখেছিলেন: ‘Horried miscourage of imagination’। এ নাটক পড়লে মনে হতেই পারে এডগার অ্যালেন পো-র রহস্যময় অন্ধকারাচ্ছন্ন গল্পগুলির কথা আর আধুনিক কালের ‘ন্যয়ার’ চলচ্চিত্রের কথা সেখানে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতেই ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটে বা ভয়ংকর পরিস্থিত না ঘটলেও সবকিছু রহস্যময়তার আবহ পায়। আধুনিক জগতের নানা বিন্যাসের মূলে যে ক্ষমতা কাঠামোর নানান রকম ওলোট পালোট তার সূত্রমুখ ইবসেনের নানান নাটক থেকে আমরা পেতে পারি। এ-কথা বলাই যায় ইবসেন কেবল নাট্যকারই নন, বিশ্বাসাহিত্যের অঙ্গনে ও মানববিদ্যা চর্চার এক মহাস্থপতি।

ইবসেনের যাত্রা বাস্তববাদ থেকে আধুনিকবাদের দিকে। আধুনিকতার প্রধান প্রণোদনগুলি ইবসেনের নাটকের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুটিত হয়েছিল। সে কারণে নাট্যকার হলেও সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে কবিতা উপন্যাস গল্প সবখানে ইবসেনের প্রভাব প্রবল। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নারী-স্বাধীনতা, নাগরিক মানুষের নির্মাণ ও ক্ষয় বুঝতে হলে ইবসেনের নাটক পড়া ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই। ফলে আধুনিক মানুষ আর ইবসেনীয় চেতনাকে আমরা সমার্থক বলে মনে করি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ মে ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC