ঢাকা, সোমবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

নির্মাতার মানবিক চরিত্রই ভালো চলচ্চিত্রের মেরুদণ্ড: কুরোসাওয়া

শিলু হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-৩০ ৪:১০:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-৩০ ৪:৩০:১৩ পিএম
আকিরা কুরোসাওয়া

 

খুন-সহিংসতা দূরে রেখে চলচ্চিত্রে চুপিচুপি মানুষের গল্প বলে গেছেন তিনি। সেলুলয়েডে সুন্দরকে ধরে দেখিয়েছেন সুনিপুণভাবে। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাকে অতুলনীয় গণ্য করেন। তাঁকে অনুকরণ করা দুঃসাধ্য। তিনি আকিরা কুরোসাওয়া। চলচ্চিত্র দুনিয়ার অনেক নামী নির্মাতা তাঁকে শিক্ষক মানেন। স্পিলবার্গ তাঁকে বলেছেন ‘চলচ্চিত্রের শেক্সপিয়র’।ইরানী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক মানি পেটগার ১৯৯৪ সালের জুনে কুরোসাওয়ার একটি সাক্ষাৎকার নেন। ১৯৯৮ সালে কুরোসাওয়ার মৃত্যুর পর পেটগার তার অফিসিয়াল পেজে ‘প্যারাডাইস ইজ এরাউন্ড হিয়্যার’ শিরোনামে এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেন। মানুষ, দেশ, চলচ্চিত্র ও তার নির্মাণ নিয়ে কুরোসাওয়া কী ভাবতেন চলচ্চিত্রের বাইরে এটি তাঁর একটি স্পষ্ট বয়ান। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন শিলু হোসেন

মানি পেটগার : মিস্টার কুরোসাওয়া, আপনি কীভাবে ইরানী চলচ্চিত্রের সাথে পরিচিত হলেন তা ভেবে আমি সত্যি অবাক!
আকিরা কুরোসাওয়া : আমার প্রথম দেখা চলচ্চিত্রটি ছিল আব্বাস কিরোস্তামির। শাহ শাসকদের সময়ে তেহরান চলচ্চিত্র উৎসবে আমাকে বিচারক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও এটা একটা বিশাল দায়িত্ব বলে জানিয়েছিলাম আমি। বিপ্লবের পর কিরোস্তামির ‘হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস?’ (১৯৯০) দেখি এবং তার এই সুনিপূণ নির্মাণ দেখে আমি বিস্মিত হই। পর্দা একটা বিশাল বর্গক্ষেত্রর মতো, যেখানে যে কেউ জড়ো হয়ে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমি পর্দায় আমার নিজের দেশের সমস্যা তুলে ধরি এবং কিরোস্তামিও তাই করে। অভিনেতারা আমাদের কথাগুলো বলে এবং সেগুলো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। একে অপরের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র ঠিক এই ভূমিকাটাই পালন করে। এটাই চলচ্চিত্রের দায়িত্ব। চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে ভালোবেসে। আমি মনে করি এখনকার তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতারা এটা ভুলে গেছে। এর পরিবর্তে তারা তাদের হিসাব কষে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। যে কারণে এখন আর জাপানি চলচ্চিত্রের তেমন কোনো দর্শক নেই। চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে সততার সঙ্গে মানুষের হৃদয় লক্ষ্য করে। আমার গুরু ইয়াসুজিরো ওজু (জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা) এবং আমাদের সময়ে কোনো নির্মাতা তত্ত্ব ও হিসাব কষে চলচ্চিত্র বানায় নি। এ কারণে জাপানি চলচ্চিত্র তার স্বর্ণালী সময়ে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। তরুণ নির্মাতারা দর্শককে বোকা বানানোর জন্যে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে- এটা ঠিক না। দর্শক যাতে উদ্দীপিত হয় সেকারণে আমরা চলচ্চিত্র বানিয়ে তাদের সামনে পরিবেশন করবো। পরিশেষে, লক্ষ্য থাকবে একটা শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ করার। এটা খুবই সহজ, তাই নয় কি?

মানি পেটগার : আপনার পুরনো চলচ্চিত্রে সব সময়ই মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে একটা উদ্বেগ দেখা যায়। এর মূল ব্যাপারটা আসলে কী?
কুরোসাওয়া : মানবতা নিয়ে জাপানে যখন কথা হয় প্রত্যেকেই তখন জটিল বিষয় ও গল্প নিয়ে ভাবতে থাকে। যাহোক, সৎ উপায়ে একজন সাধারণ মানুষের অনুভূতি পর্দায় অভিক্ষেপণের চেষ্টা করি আমরা, এই যা।

মানি পেটগার : আপনি আমেরিকান চলচ্চিত্রে আগ্রহী ছিলেন।
কুরোসাওয়া : আমেরিকান চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আমি বলতে পারি, অতীতে অনেক ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে। আজকের আমেরিকান চলচ্চিত্র দর্শককে ভুল পরিষেবা প্রদান করছে। প্রায়ই হিংস্রতা আর গাড়ি বিধ্বস্তের দৃশ্য দেখা যায়। এসব দৃশ্য দেখার তৃপ্তি কী? পুরনো আমেরিকান চলচ্চিত্র মানবিক সমস্যা তুলে ধরতো কিন্তু এখন আমেরিকান চলচ্চিত্রেরই অনেক সমস্যা। জুরাসিক পার্ক-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো অসাধারণ এতে সন্দেহ নেই, তবে অতীতে আরো অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হতো। বিপরীতে কিরোস্তামির চলচ্চিত্র খুব সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী। এসব নতুন সায়েন্স-ফিকশন, অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রগুলো ভালো কিন্তু এগুলো আদতে চলচ্চিত্র নয়।

মানি পেটগার : বিনোদন হিসেবে চলচ্চিত্রকে তুলনা করলে তৃতীয় বিশ্বের চলচ্চিত্রগুলো পশ্চিমা দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছে বলে আপনি কী মনে করেন?
কুরোসাওয়া: সভ্যতা মানবতাকে বিষিয়ে তুলেছে। নির্মাতার মানবিক চরিত্র হচ্ছে একটা ভালো চলচ্চিত্রের মেরুদণ্ড। আমরা যদি নিজেদের কাছেই সৎ না থাকতে পারি তাহলে কখনোই একটা ভালো চলচ্চিত্র বানাতে পারবো না। তার মানে এই নয়, একটা দেশ যদি ভালো হয় তাহলে সেখানকার নির্মাতারা অনিবার্যভাবেই ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। যে ব্যক্তি ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সক্ষম সে জানে দর্শকের মনের মধ্য থেকে কীভাবে তার উপায় খুঁজে বের করতে হয়। এই যেমন জন ফোর্ড, জঁ রেনোয়া, জন হাস্টন, ফেদরিকো ফেলিনি, সিডনি লুমেট; আমি এদের প্রত্যেকের সাথে কথা বলেছি। তাদের কাজও ব্যতিক্রমী এবং চরিত্রের দিক দিয়েও তারা আলাদা। তাদের সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করা খুবই সহজ আর যেটার প্রয়োজন খুব বেশি। যেসব ব্যক্তিদের তারা চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলে তাদের কেউই পূর্বনির্ধারিত নয়। তারা খুব স্বাভাবিকভাবে মানুষের সম্পর্কগুলোকে প্রকাশ করে। যে কারণে চলচ্চিত্র মনোমুগ্ধকর হয়। সিডনি লুমেট আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আড্ডা দেওয়ার জন্যে বসলে কখনোই চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করি না। সাধারণত আমরা খুব তুচ্ছ বিষয়, সামাজিক সমস্যা কিংবা আমাদের শখগুলো নিয়ে আলোচনা করি। এ ব্যাপারটাকে খুব উপভোগ করি আমরা। প্রতিবেদকরা সব সময় আমার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন করলে বলি, তেমন কিছুই না। আমরা সাধারণ কথা বলি। একট চলচ্চিত্র তথাকথিত কোনো বক্তৃতা নয়।

মানি পেটগার : আপনি জাপানের মানবতা নিয়ে কিছু বলছিলেন। দয়া করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারবেন কি?
কুরোসাওয়া : আমি রাজনীতি নিয়েও কথা বলতে পারি কিন্তু সাধারণত আমি মানুষ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে এই ধরণ এবং এই ধরণের মানুষের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর তা নেই। সমাজ ক্রমাগত দুর্নীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অতীতে আমাদের প্রাচুর্য বা আরামের কোন উপায় ছিল না কিন্তু মানুষ বাস করতো স্বাভাবিকভাবে। ইদানীং জাপানের গণমাধ্যমে হামেশাই খুন ও সহিংসতার খবর দেখা যায়। আমি যখন ছোট ছিলাম, হত্যাকাণ্ড হতো খুব কম এবং কেউ যদি এটার চেষ্টাও করতো তাহলে চারপাশে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যেতো। আমি শুনেছি আমেরিকাতে এই পরিস্থিতি আরো খারাপ। অতীতে মানুষ খুব ভালো ছিল।

মানি পেটগার : এর কারণ হিসেবে আপনি কী মনে করেন?
কুরোসাওয়া : জাপানের সমাজ খুব দ্রুত গতিতে এগিয়েছে যার প্রক্রিয়াটা খুব অস্বাভাবিক ছিল। দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছে। বেঁচে থাকার জন্যে অনেক সময় ব্যক্তিকে তার ক্ষমতা অতিক্রম করে কাজ করা জরুরি হয়ে পড়ে। যে কারণে মানুষের মধ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে।

মানি পেটগার : এ সবকিছুর মধ্যে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার দায়টা কোথায়?
কুরোসাওয়া : বর্তমানে খুব কমই ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। ইয়াকুজা (জাপানি মাফিয়া) চলচ্চিত্র বা এ রকম আমেরিকান সহিংস চলচ্চিত্রগুলো আশ্চর্যজনকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেখানে শিশুদের উপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেদিক থেকে এটা খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা। আমি কিছুদিন আগে শুনলাম একজন ইংরেজ তরুণ একটা ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছে। সহিংসতা একবার সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠলে এটা শিশুদের মন ও মেধা বিকৃত করে।

মানি পেটগার : তার মানে সহিংসতাকে আপনি ঘৃণার চোখে দেখছেন।
কুরোসাওয়া : হ্যাঁ, সহিংসতাকে আমি ঘৃণা করি। বর্তমানে শিক্ষা দেওয়া ও শিক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিতেই সমস্যা। আর এগুলোই এইসব সহিংসতা উত্থানের কারণ। হাল সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থাটা জাপানে আয়ের একটা উৎস হয়ে উঠেছে মাত্র।  আমি আমার নাতিকে স্কুলে দেওয়ার পক্ষপাতি নই। আজকাল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে একজন দায়িত্ববান শিক্ষক খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। সেখানে তারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যতিক্রমী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হয়। ‘মাদাদাইয়ো’র গল্পে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা সাধারণভাবে স্কুল থেকে যা শেখে, তার থেকে বেশি শেখে শিক্ষকের আচরণ থেকে। এমনকি যখন গ্র্যাজুয়েট হয়ে যায় তখনও শিক্ষকের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ততা তাদের থাকে। একটা বিদ্যালয়ের বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান ও দর্শন। সেখানে আলোচনা ছিল যে, একজন মানুষের আসলে কেমন হওয়া উচিৎ; যা পাঠ্যক্রমের কোন অংশই ছিল না। যুদ্ধের আগে সেনাবাহিনীর লক্ষ্য হিসেবে ‘যুক্তি’ শেখানো হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধের পর সেই ‘যুক্তি’ নিষিদ্ধ করা হয়। এক্ষেত্রে ওই বিষয়টির কোন সমস্যা না, কোন পদ্ধতিতে বিষয়টি শেখানো হচ্ছে সেটাই সমস্যা। এটা একটা মস্ত ভুল। অতীতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের জন্যে বিদ্যালয়গুলো উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিতো কিন্তু এখন ঠিক এর উল্টোটা ঘটে। আজকাল জাপানে কলেজে ভর্তি হওয়াটা খুবই কঠিন। তবে কোন রকমে কলেজে ভর্তি হওয়াটাই যথেষ্ট। এরপর কোন ধরনের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই কয়েক বছরের মধ্যে গ্র্যাজুয়েট। বিপরীতে পশ্চিমে কলেজে ভর্তি হওয়াটা খুব একটা কঠিন না। কিন্তু এর পরিবর্তে সেখানে বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শেখানো হয় এবং কেউ যদি সেটাতে পাশ না করে তাহলে সে গ্র্যাজুয়েট হতে পারবে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় জাপান ভুল পন্থা অবলম্বন করেছে। আমাদের রাজনীতিকরা প্রতিনিয়ত এই ভুল পদক্ষেপের পুনর্বিবেচনা করতে বলে। এটা খুবই দুঃখজনক যে অশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

মানি পেটগার : পারমাণবিক অস্ত্রের উপর আপনি চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। রাশিয়া পতনের পর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকির মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে আপনি কি বিশ্বাস করেন? এই বিষয়ের উপর অন্য কোন চলচ্চিত্র বানাবেন কি?
কুরোসাওয়া : ‘আই লাইভ ইন ফেয়ার’ (১৯৫৫) এবং ‘র‌্যাপসডি ইন অগাস্ট’ (১৯৯১) পারমাণবিক বোমার উপর নির্মিত।  ‘ড্রিমস’ (১৯৯০) চলচ্চিত্রটির একটি পর্বেও এই বিষয়ের উপস্থাপন আছে। পারমাণবিক বোমার ব্যাপারে চিন্তা করা খুবই জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, শক্তি ঘাটতির কারণে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হয় কিন্তু তারা জানে না কীভাবে পারমাণবিক বর্জ্য অপসরাণ করতে হয়। তাই আমরা যে বিপদের মুখোমুখি হবো তা আমি দেখতে পাই। আসলেই যদি শক্তির ঘাটতি থাকে তাহলে আমরা শক্তি সংরক্ষণ করতে পারি। টোকিওর মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এমনভাবে যে, আগামীকাল বলে আর কিছু নেই! এটার প্রয়োজন নেই। আমরা যদি কেবল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দক্ষ কর্মচারী নিতে পারি তাহলে বাতাস কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে নতুন শক্তি উৎপাদন করতে পারবো। আমি মনে করি পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মানি পেটগার : আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে এ ধরনের উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটবে কীভাবে?
কুরোসাওয়া : এটা মানুষ এবং তাদের মানবিক সমস্যা নিয়ে একটা সাধারণ গল্প। আরো গুরুত্বের সাথে সমবেদনা গ্রহণ করা উচিৎ। অতীতে নিজেদের চিন্তা করার আগে মানুষ অপরের চিন্তা করতো। এখন আমরা পিছন ফিরে দেখি, ব্যাপারটা আশীর্বাদের মতো ছিল যদিও সেটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আমি জানি যদি পর্দায় আনা হয় তাহলে এটা বেশ কার্যকর হবে। অতীতে প্রতিবেশীদের মধ্যে উষ্ণ এবং আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। আর এখন দরজার পাশের প্রতিবেশীটা কী করছে তার খোঁজও কেউ রাখে না। আমার প্রতিবেশী একজন দোকানদার এবং কাছাকাছিই তার একটা বেকারি আছে। প্রায়ই আমার জন্যে সে টাটকা রুটি নিয়ে আসে। আমি এখনো মনে করি এ ধরনের বন্ধুত্ব জরুরি।

মানি পেটগার : ‘ড্রিমস’র শেষে স্বর্গকে মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছিল। স্বর্গের গুণাবলী সম্পর্কে আপনি কীভাবে চিন্তা করেছিলেন সে ব্যাপারে একটু ব্যাখ্যা করবেন?
কুরোসাওয়া : এই দৃশ্যের জন্য একটা উপযুক্ত লোকেশন অনেক খুঁজেছিলাম আমরা। জাপানের অনেক নদীর পাশে সিমেন্টের বাঁধ দেওয়া ছিল। সত্যিই খুব খারাপ সময় ছিল আমাদের। অবশেষে বাড়ির পাশেই কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়। আমরা নিজেরাই উয়াইন্ড মিল বানিয়েছিলাম এবং সেগুলো এখনো সেখানে আছে।

মানি পেটগার : বিদেশি সহ-প্রযোজনা এবং বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আপনার কী ধরনের অভিজ্ঞতা আছে?
কুরোসাওয়া : রাশিয়া থেকে একটা প্রস্তাব পেয়েছিলাম আমি। নির্মাণের আগে আমি ‘দার্সু উজালা’ বইটি পড়েছিলাম। তারা ভেবেছিল এটা একটা চমৎকার ধারণা। তারা জানতে চেয়েছিল আমি বইটি সম্পর্কে কীভাবে জানলাম। সুন্দর প্রফুল্লতার সাথে এ গল্পে মানুষের বর্ণনা করা হয়েছে। চলচ্চিত্রায়ণের পর খেয়াল করলাম সাইবেরিয়ার একটি শহরে তারা চলচ্চিত্রের প্রধান দুই চরিত্রের প্রতিচ্ছবি টাঙিয়ে রেখেছে। ঠিক এই সময়ে ভাবলাম, রাশিয়ান ভাষা নিয়ে একটা বড়ো সমস্যা আমাদের হবে। যাহোক কেন্দ্রীয় চরিত্রটি ঠিকঠাক রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন না এবং আমার অবস্থাও একইরকম। যে কারণে আমরা ভালো যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছি। একদিন  একটা মজার ঘটনা ঘটলো। যখন আমি ‘কাট’ বললাম তখন ক্যাপ্টেনের চরিত্র করা অভিনেতাটি দ্রুত এসে আমাকে বললেন, ‘আপনি কি আমার ভাষা বুঝতে পারছেন? ডায়ালগ বলার সময় আমি ভুল করেছি কিন্তু আমি মনে করি না যে কোন বিদেশি এটা ধরতে পারবে।’ আমি বললাম, ‘যা বলেছিলেন তা আমি বুঝতে পারিনি ঠিকই কিন্তু কথা বলার সময় আপনার জড়তা দেখে কিছুটা আঁচ করেছিলাম।’

মানি পেটগার : বন্ধু এবং চলচ্চিত্রকার হিসেবে অঁদ্রে তারাকোভস্কিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
কুরোসাওয়া : খুব চমৎকার মানুষ সে। আমার কাছে সে ছোট ভাইয়ের মতোই প্রিয়। আমি তাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলাম কারণ খুবই দুর্বল ছিল সে। তার মৃত্যুতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton