ঢাকা, শনিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ : পরিসংখ্যানতত্ত্বের স্বর্ণযুগের স্রষ্টা

তপন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৩ ৫:৪১:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৬ ৪:২৩:০৬ পিএম
প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ

|| তপন চক্রবর্তী ||

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য, কবির এক সময়ের আপ্ত সহকারী, বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী ছাত্র, প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রখ্যাত প্রফেসর, ইন্ডিয়ান স্টাস্টিক্যাল ইনস্টিটিউশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ‘সংখ্যা’ সাময়িকীর প্রকাশক- সম্পাদক, প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের জন্মের একশ পঁচিশতম বছরে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের খণ্ডকালীন প্রফেসর, প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের স্থায়ী প্রফেসর ও স্বাধীন ভারতের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরের বাসিন্দা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পিতামহ গুরুচরণ মহলানবিশ কলকাতায় আসেন এবং একটি ওষুধের দোকান দেন। গুরুচরণ সমাজের প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আদর্শ অনুসরণে বিধবা বিবাহ করেন। রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে গুরুচরণ মহলানবিশের গভীর সখ্য ছিল। উভয়ে মিলে ব্রাহ্মসমাজ প্রবর্তন করেন। ব্রাহ্মসমাজের প্রথম অফিস গুরুচরণের ২১০ নাম্বার কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটের বাসভবন। গুরুচরণ সমিতির কেষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গুরুচরণের জ্যেষ্ঠ ছেলে সুবোধচন্দ্র মহলানবিশ স্বনামধন্য শিক্ষক ছিলেন। তিনি লন্ডনের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওলজিতে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি এডিনবার্গ রয়্যাল সোসাইটির সদস্য পদও লাভ করেন। তিান কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওলজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ব্রিটিশ রাজত্বে লন্ডনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পদে বসতে পেরেছিলেন। পরে তিনি ভারতে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিওলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই বিভাগে প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে সদস্য পদ লাভ করেন। গুরুচরণের কনিষ্ঠ সন্তান প্রবোধচন্দ্র মহিলনবিশও কর্নওয়ালিশের বাসায় জন্মেছিলেন। মহিলানবিশ পরিবার পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে থাকায় প্রশান্তচন্দ্র বহু মনীষীর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের পিতা প্রবোধচন্দ্র ও মাতা নিরোধবাসিনী। ১৮৯১ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নিরোধবাসিনী নন্দলাল সরকারের কন্যা। নিরোধবাসিনীর ভাই বিখ্যাত ডা. স্যার নীল রতন সরকার। যাঁর নামে কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। নন্দলাল সরকারও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। ১৮৯৩ সালের ২৯ জুন প্রশান্তচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকালে ব্রাহ্মদের পরিচালিত স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯০৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১০ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও  ১৯১২ সালে বিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯১৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার লক্ষ্যে লন্ডন গমন করেন।

ছোটবেলা থেকে প্রশান্তচন্দ্র যুক্তিবাদী ছিলেন। তিনি যে কোনো বিষয়কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। সেই সঙ্গে তিনি পরিশীলিত মনন ও নির্মল সংস্কৃতির চর্চা করতেন। যে কারণে তিনি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। প্রশান্তচন্দ্র যখন লন্ডন পৌঁছান তখন গ্রীষ্মকাল। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় আরো পরে দেখে তিনি ক্যাম্ব্রিজ যান। ক্যাম্ব্রিজ থেকে ফেরার সময় তিনি ট্রেন ফেল করে এক বন্ধুর বাসায় রাত কাটান। সেখানে তিনি কিংস কলেজের এক ছাত্রের সঙ্গে পরিচিত হন। সেই ছাত্রের কাছে কিংস কলেজের  সম্পর্কে সম্যক অবহিত হন এবং কিংস কলেজে ভর্তি হওয়ার সংকল্প পোষণ করেন। তিনি কিংস কলেজ দেখে অভিভূত হন এবং সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় বসেন। তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি আর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি।

কিংস কলেজ থেকেই ১৯১৩ সালে প্রবেশিকা পাশ করেন। এই কলেজেই ১৯১৪ সালে তিনি অংকে পার্ট ওয়ানে ট্রাইপস পাশ করেন। এরপর তিনি পাঠ পরিবর্তন করে প্রকৃতি বিজ্ঞানের ট্রাইপস-এ ভর্তি হন। প্রকৃতি বিজ্ঞানে ১৯১৫ সালে পার্ট টু-তে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেন। এই সময় কিংস কলেজ তাঁকে সিনিয়র স্কলারশিপ প্রদান করে। ক্যামব্রিজে থাকাকালে তাঁর সঙ্গে মহান প্রতিভাধর অঙ্কশাস্ত্রবিদ শ্রীনিবাস রামানুজমের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

প্রকৃতিবিজ্ঞানের ট্রাইপস মহলানবিশ পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন এবং ক্যাভেনডিস ল্যাবোরেটরিতে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেন। তিনি ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে গবেষণা প্রকল্প শুরুর পূর্বে তিনি স্বল্পদিনের জন্য অবকাশ যাপন করেন। তাঁর কাকা প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিওলজির প্রফেসর সুবোধচন্দ্র মহলানবিশ প্রশান্তচন্দ্রকে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে পরিচিত করান। অধ্যক্ষ সেই সময়ে তাঁর কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শূন্য পদের বিপরীতে স্বল্প মেয়াদে অধ্যাপনার জন্য পাত্র খুঁজছিলেন। তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র প্রফেসর তখন যুদ্ধের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মহলানবিশ সম্মত হন। তবে তাঁর ইচ্ছা স্বল্পমেয়াদি অধ্যাপনা শেষে তিনি ক্যামব্রিজ ফিরে প্রারব্ধ গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করবেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজে এতো নিবিষ্ট হলেন যে, তিনি ক্যাম্ব্রিজে ফেরার পরিকল্পনা বর্জন করেন। পরিকল্পনা ত্যাগের পেছনে অবশ্য অন্য কারণও ছিল।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উদ্দেশ্য গিয়ে আকস্মিক ট্রেন ফেল করার কারণে যেমন তিনি কিংস কলেজের প্রতি আকর্ষিত হন, তেমনি পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপনা করতে গিয়ে তিনি স্টাটিকটিস বা পরিসংখ্যানতত্ত্ব বা সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি হঠাৎ আকর্ষণ বোধ করেন। প্রশান্তচন্দ্র দেশে ফেরার জন্য জাহাজের অপেক্ষায় ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধের সময় সঙ্গত কারণে কিছুই ঠিকঠাকমতো চলছিল না। এই অবসরে প্রশান্তচন্দ্র কিংস কলেজের গ্রন্থাগারে সময় কাটাতেন। গ্রন্থাগারে তিনি কয়েক ভল্যুম ‘বায়োমেট্রিকা’ দেখতে পান এবং সেইগুলো আগ্রহ সহকারে পাঠ করেন। বায়োমেট্রিকার সম্পাদকের নাম কার্ল পার্সন। তিনি সঙ্গে করে ‘বায়োমেট্রিকা’র ভল্যুমগুলোর পুরো সেট নিয়ে এসেছিলেন। জাহাজে বসে তিনি নিবিষ্ট চিত্তে বায়োমেট্রিকা পাঠ করেন। কলকাতায় আসার পরও অধ্যাপনার ফাঁকে তাঁর অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন। তিনি পরিসংখ্যানতত্ত্বকে বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র একটি শাখা বলে গণ্য করেন। এই বিজ্ঞান পরিমাপ নির্ধারণ ও অন্যান্য বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বিদ্যাকে ব্যাপক কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তিনি উপলব্ধি করেন। তাঁর এই বিদ্যা প্রয়োগের জন্য তিনি ক্ষেত্রের অনুসন্ধানে থাকেন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি আবহবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানে সমস্যা সমাধানের অনন্য সুযোগ লাভ করেন।  তিনি এই সব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই ঘটনা তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরিসংখ্যানতত্ত্বের প্রতি আগ্রহ তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপনা থেকে বিচ্যুত করেনি। প্রেসিডেন্সি কলেজ ১৯২২ সালে তাঁকে প্রফেসর পদে বৃত করেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপনায় আরো ত্রিশ বছর রত থাকেন। এই সময়ের মধ্যে পরিসংখ্যানতত্ত্বে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেন এবং ভারতে বিজ্ঞানের এই শাখার অভূতপূর্ব বিকাশসাধন করেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারের এক অংশে পরিসংখ্যানতত্ত্ব গবেষণার ব্যবস্থা করেন। এটিই ছিল ভবিষ্যতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব স্টাটিকসের সূতিকাগার।

প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ১৯২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ  হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের কন্যা নির্মলা কুমারীকে বিয়ে করেন। নির্মলা কুমারীর পরিবারও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে দুই ব্রাহ্ম পরিবারের মধ্যে অনৈক্য ছিল। যে কারণে প্রশান্তচন্দ্রের পিতা সুবোধচন্দ্র মহলানবিশ বিয়েতে সায় দেননি। তাঁর অমতে মামা স্যার ডাঃ নীলরতন সরকারের উপস্থিতিতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। পূর্বে উল্লেখ করেছি, প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র সংখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমে আবহবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের সুযোগ পেয়েছিলেন ও এসবের উপর গবেষণা করছিলেন। এর সঙ্গে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করার অনুরোধ পেয়েছিলেন। তিনি ১৯২০ সালে ভারতের নাগপুরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর বিজ্ঞানীকে কলকাতার নানাভাবে মিশ্রিত জনগোষ্ঠীর উপর সমীক্ষা চালিয়ে স্বতন্ত্র সংখ্যা নিরূপণের অনুরোধ জানান। প্রশান্তচন্দ্র সমীক্ষা করে  Anthropological observations on the Anglo-Indians of Calcutta I Analysis of male stature (১৯২২). গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এই গবেষণা পত্র দেখে ভারতের ডাইরেক্টর জেনারেল অব মেটিরিওলজি আবহবিজ্ঞানের কিছু সমস্যা সমাধানে মহলানবিশকে অনুরোধ করেছিলেন। বিজ্ঞানী এই বিষয়ে গবেষণা করেন এবং তিনটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। গবেষণাপত্র তিনটির শিরোনাম হলো : On the seat of activity in the upper air (1923); On errors of observation and upper air relationships (১৯২৩);and Correlation of upper air variables  (১৯২৩)। এই সকল MathSciNet -এ (আমেরিকার ম্যাথমেথিক্যাল সোসাইটির মুখপত্র। সোসাইটি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে তাদের প্রকাশিত মুখপত্রে ১৯৪০ সাল থেকে অঙ্কশাস্ত্রের উপর প্রকাশিত গবেষণাপত্র ও উপাত্ত সংগৃহীত হয়)। মুখপত্রে প্রকাশিত ১৪৪ টি গবেষণাপত্রের মধ্যে মহলানবিশের গবেষণাপত্রগুলো অধিকতরো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় এবং মুখপত্রে এইসবের উপর সমৃদ্ধ আলোচনা প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের  আবিষ্কৃত পরিসংখ্যান পদ্ধতি মহলানবিস ডিসট্যান্স (Mahalanobis distance ev D2 statistic) নামে পরিচিত। এটি একটি জটিল গাণিতিক প্রক্রিয়া যা সাধারণের বোধগম্য নয়। তিনি এই সময়ে অর্থাৎ ১৯২৩ সালে Statistical note on the significant character of local variation in proportion of dextral and sinistral shells in samples of the snail শিরোনামের একটি বিখ্যাত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এর আগে তিনি ২০০ শ’র বেশি গবেষণাপত্র রচনা করেছেন এবং তা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সাময়িকিতে প্রকাশিত হয়েছে। এই সকল গবেষণাপত্রে কৃষি থেকে ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের চা-পানের অভ্যাসসহ বহু বিষয় স্থান পেয়েছিল।

গবেষণাপত্র প্রকাশ ছাড়া প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’র প্রতিষ্ঠা এবং কার্ল পার্সনের অনুকরণে ‘সংখ্যা’ সাময়িকী প্রকাশ। বলেছিলাম প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র  প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারের এক কোণে পরিসংখ্যানতত্ত্ব গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরো কয়জন এই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁদের মধ্যে এস. এস. বোস, জে. এম. সেনগুপ্ত, রাজ চন্দ্র বোস (ভারতীয় বংশোদ্ভূত অঙ্কশাস্ত্র ও পরিসংখ্যানবিদ), সমরেন্দ্র নাথ রায় (ভারতীয়- –আমেরিকান অঙ্কশাস্ত্রবিদ ও ফলিত পরিসংখ্যানবিদ), কে. আর. নায়ার, রঘুরাজ বাহাদুর, গোপীনাথ কল্যাণপুর (ভারতীয়-আমেরিকান অঙ্ক ও পরিসংখ্যানবিদ এবং ইন্ডিয়ান স্টাস্টিকল ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক), ডি. বি. লাহিড়ী, সি. আর. রাও (ভারতীয়-আমেরিকান অঙ্ক ও পরিসংখ্যানবিদ) ছিলেন। তবে এই সব অনানুষ্ঠানিকভাবেই চলছিল। পরে ১৯৩১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর প্রমথনাথ ব্যানার্জী, ফলিত অঙ্কশাস্ত্র বিভাগের প্রফেসর নিখিল রঞ্জন সেন ও ভারতীয় শিল্পপতি রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি প্রমুখ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব স্টাটিসটিকস’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তখনকার মতো তা প্রফেসর মহলানবিসের কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, মহলানবিশই মূলত ১৯২০-১৯৩০ সাল পর্যন্ত অসামান্য শ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন।  সোসাইটি রেজিস্ট্রেশনের ৩১ নম্বর ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯৩২ সালের ২৮ এপ্রিল তারিখে নিবন্ধিত করা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর প্রফেসর মহলানবিশ এর পরিচালক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ইনস্টিটিউটে লোকশক্তি নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। যেমন ১৯৩২ সালে তিনি আর. সি. বোসকে পার্ট-টাইম চাকরি করার অনুরোধ জানান। শর্ত ছিল, সারা বছর প্রতি শনিবারে এবং গ্রীষ্মে ও পূজার ছুটিতে তিনি পুরো সময় কাজ করবেন। তাঁর কিছুদিন পর সমরেন্দ্র নাথ রায়কেও পার্ট-টাইম চাকুরিতে নিয়োগ করা হয়। মহলানবিশ মি. বোসকে পড়ার জন্য গবেষণাপত্রের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। তিনি গবেষণাপত্র পাঠ করেন এবং তা প্রয়োগ করে বিশ্বমানের পরিসংখ্যানবিদে পরিণত হয়েছিলেন। ইন্সিটিটিউটে প্রথমে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সি. আর. রাও এখানে এক বছর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর তিনি গবেষণা করেন এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট এর নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তরিত হলে তিনি ১৯৪৩ সালে এর টেকনিক্যাল শিক্ষানবিশ হিসেবে নিযুক্তি পান। পরে তিনি বিশ্ববিশ্রুত পরিসংখ্যানতত্ত্ববিদে পরিণত হন। ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার ইনস্টিটিউটকে বড় অনুদান প্রদান করেন। অনুদানের অর্থ দিয়ে ইনস্টিটিউটের নিজস্ব ভবন ও সাজ-সরঞ্জাম এবং প্রফেসর, সহকারী প্রফেসর নিয়োগের পরামর্শ দেন। এই অনুদান অনুমোদনের পেছনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আপ্ত সহায়ক শ্রীপিতাম্বরের ভূমিকা ছিল।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের নেতৃত্বে ইনস্টিটিউটের কর্মপরিধি প্রসারিত হয়। ১৯৫০ সালে ২০৩ নম্বর বি. টি. রোডে চার একর জায়গা কেনা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভবন নির্মাণের কাজও শুরু হয়। ব্রিটেনের পরিসংখ্যানতত্ত্ববিদ ও বংশগতিবিজ্ঞানী স্যার আর. এ. ফিশার ১৯৫১ সালে প্রধান ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করেন। গবেষণা ও প্রশিক্ষণের কাজও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এখানে স্থানান্তর করা হয়। ভারত সরকার ১৯৫৯ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অ্যাক্ট বিল পাশ করেন। অ্যাক্ট ইনস্টিটিউটকে পরিসংখ্যানতত্ত্ব, অঙ্কশাস্ত্র, অর্থনীতি ও কম্প্যুটার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি দানের ক্ষমতা দেয়। এ ছাড়া পরিসংখ্যাতত্ত্ব সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও প্রবর্তন করতে পারবে বলে জানায়। এই ইনস্টিটিউট থেকে মহলানবিসের সম্পাদনায় ১৯৩৩ সালে ‘সংখ্যা’ সাময়িকীর প্রকাশ শুরু হয়েছিল। এটি পরিসংখ্যানতত্ত্বের উপর আন্তর্জাতিক মানের সাময়িকির মর্যাদা অর্জন করে। প্রফেসর বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশের একটা নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নানা পদে কর্মরত ছিলেন। তখন তরুণ অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ মোতাহার হোসেনের মধ্যে প্রতিভার দ্যুতি লক্ষ্য করেন। তিনি তাঁকে ভালোবাসতেন। সত্যেনাথ বসু বিদেশ যাওয়ার আগে ১৯২২ সালে কাজী মোতাহার হোসেনকে নিয়ে কলকাতায় যান এবং মহলানবিশের হাতে গছিয়ে দিয়ে আসেন। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ও তাঁর স্ত্রী নির্মলকুমারী মেতাহার হোসেনকে খুব স্নেহের চোখে দেখতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। মোতাহার হোসেন তাঁদের বাবা-মা ডাকতেন। প্রশান্তচন্দ্র অত্যন্ত যত্ন সহকারে মোতাহার হোসেনকে বিশেষ পরিসংখ্যানতত্ত্ববিদ হিসেবে গড়ে তুলেন। মোতাহার হেসেন পরিসংখ্যাতত্ত্বে ডিপ্লোমা পাশ করে ঢাকা ফিরে আসেন। পরিসংখ্যানতত্ত্বে গবেষণার জন্য বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সুপারিশে ও বিজ্ঞানী রোনাল্ড ফিশারের অনুমোদনে মেতাহার হোসেন কে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদত্ত হয়। তাঁর উদ্ভাবিত পরিসংখ্যান পদ্ধতির শিরোনাম ‘হোসেন চেইন রুল’ নামে বিখ্যাত। কাজী ড. মোতাহার হোসেন পূর্ববঙ্গে ১৯৫০ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যাতত্ত্ব বিভগের পত্তন ঘটান। প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ তাঁর গবেষণার জন্য বহু পুরষ্কার অর্জন করেন। তাঁর ছাত্র ও সহকর্মী সি. আর রাও লিখেছিলেন, ‘ভারতের সর্বজনবিদিত প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, কলকাতায় তাঁর উদরের অপারেশনের তিন সপ্তাহ পরে  ১৯৭২ সালের ২৮ জুন প্রয়াত হন। ২৯ জুন ছিল তাঁর জন্মদিন। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি গবেষণায় রত ছিলেন। তখনও তিনি ইনস্টিটিউটের সাম্মানিক সম্পাদক ও পরিচালক এবং ভারত সরকারের পরিসংখ্যানতত্ত্ব বিষয়ক সাম্মানিক উপদেষ্টা। বিশ শতকের সূচনালগ্নে মহলানবিশ যুগের শুরু এবং বিশ শতকের সাতের দশকে সেই যুগের অবসান হলো। পরিসংখ্যানতত্ত্বে ভারতের এই স্বর্ণযুগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্মরণে রাখবে। এই সময়ে মানবকল্যাণে নবতর প্রযুক্তিবিজ্ঞানের বিকাশ ও সফল প্রয়োগ ঘটেছিল।’

২০০৬ সালে ভারত সরকার বিজ্ঞানী প্রফেসর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের জন্মদিন ২৯ জুনে জাতীয় পরিসংখ্যানতত্ত্ব দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton