ঢাকা, শনিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশি ডায়াসপোরা সাহিত্য

মোজাফ্‌ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৬ ৪:১২:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৬ ৪:১২:৫৯ পিএম

|| মোজাফ্‌ফর হোসেন ||

(দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য: বাংলাদেশ পর্বের শেষ অংশ)
ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশি ডায়াসপোরা সাহিত্য ততটা শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমান সময়ে ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশি ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে আলাপ করার পূর্বে আমরা পরবাসে বসে ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করা লেখকদের স্মরণ করতে পারি যারা অবিভক্ত ভারতে বাংলা ভূখণ্ডের মানুষ ছিলেন। শুরু করছি গোবিন্দচন্দ্র দত্তকে দিয়ে। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বন্ধু ছিলেন। লন্ডনে অবস্থানকালে ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘ক্যাপটিভ লেডি’ প্রকাশিত হওয়ার এক বছর আগেই ‘চেরি স্টোন’ নামে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘ব্লাকউড’ ম্যাগাজিনের মতো খ্যাতনামা পত্রিকায় তার সমালোচনাও বের হয়েছিল। তবে বিলেতে ইংরেজি ভাষায় প্রথম বাঙালি লেখক হিসেবে আমরা পাই মির্জা ইতিশামুদ্দিনকে। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ভেতর দিয়ে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকাল শুরু হয়। এর প্রায় দশ বছর পর ১৭৬৫ সালে মির্জা ইতিশামুদ্দিন সম্রাট শাহ আলমের দূত হিসেবে রাজা তৃতীয় জর্জের সাথে দেখা করতে ভারত থেকে লন্ডন যান। ১৭৬৮ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে শিগুরুফ-নামা-ই বিলায়েত বা ‘বিদেশ ভ্রমণের আশ্চর্য গল্প’ শিরোনামে তাঁর ভ্রমণকাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এটিই সম্ভবত কোনো বাঙালির লেখা বিলাতবিষয়ক প্রথম গ্রন্থ। গ্রন্থটি রচিত হয় ফারসিতে পরে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। বইটি ডায়াসপোরা সাহিত্যের অংশ নয়। ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্মরণীয়। একইভাবে স্মরণীয় নাম শেখ দ্বীন মোহাম্মদ। তিনি ইংল্যান্ডে বসে ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন। ১৭৮৩ সালে তিনি ক্যাপ্টেন বেইকারের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের কর্কে আসেন এবং তাঁর আশ্রয়ে প্রবাস জীবন শুরু করেন। ১৭৯৪ সালে আয়ারল্যান্ডের কর্ক থেকে ইংরেজি ভাষায় তাঁর ভ্রমণকাহিনি প্রকাশিত হয়। দ্বীন মোহাম্মদ মুর্শিদাবাদের মানুষ ছিলেন অর্থাৎ বাঙালি হিসেবে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

রামমোহন রায়কেও আমরা স্মরণ করতে পারি। তিনি ইংল্যান্ডে যান ১৮৩১ সালে। ইংল্যান্ডে আসার আগেই ভারতের পাশাপাশি ইংল্যান্ড থেকেও তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে আসার পরে সেটি আরও বেড়ে যায়। রামমোহন রায়ের প্রায় ৩৪টি রচনা ইউরোপ ও আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ড থেকে ২৭টি, আমেরিকা থেকে পাঁচটি, জার্মানি থেকে একটি এবং একটি বই হল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচনাও ডায়াসপোরা সাহিত্যের অংশ হিসেবে আলোচ্য নয়। অনুরূপভাবে আলবার্ট মোহাম্মদের নাম করতে হয়। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, ফটোগ্রাফার, শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারক। বাঙালি লস্কর বাবা এবং ইংরেজ মায়ের সন্তান মোহাম্মদের জন্ম ইস্ট লন্ডনের সোফিয়া স্ট্রিটে ১৮৫৮ সালে। তিনি তাঁর সংগ্রাম-মুখর দারিদ্র্য-জর্জরিত অসহায় জীবনের কাহিনি রেখে গেছেন ইংরেজি ভাষায় লিখিত ‘ফ্রম স্ট্রিট আরব টু পাস্টর’ নামক গ্রন্থে। রাখালদাস হালদার ১৮৬১ সালে আইন পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড যান। এ সময় তিনি যে ডায়েরি লেখেন, পরবর্তীকালে তা ‘দ্য ইংলিশ ডায়েরি অব অ্যান ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট’ নামে প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীকালের বাঙালি লেখকদের ভেতর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, প্রমথ চৌধুরী, অতুলপ্রসাদ সেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদেশে অবস্থানকালে সাহিত্যচর্চা করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৮৪ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড আসেন। তিনি ইংরেজদের জীবনাচরণ সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেন তা তিনি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সেই লেখাগুলোই ‘বিলাতের পত্র’ নামে প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালীন তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় গান লিখতে শুরু করেন। ১৮৮৬ সালে তাঁর ইংরেজি ভাষায় সেই গানগুলো দিয়েই প্রকাশিত হয় ‘দি লিরিকস অব ইন্ডিয়া’। নারীদের ভেতর কৃষ্ণভাবিনী দাসের কথা চলে আসে। মুর্শিদাবাদের মেয়ে কৃষ্ণভাবিনী দেবেন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর দাসকে নিয়ে ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স হয়ে ইংল্যান্ড আসেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন কৃষ্ণভাবিনী তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা-বিষয়ক ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি ১৮৮৫ সালের কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁকেই প্রথম বাঙালি নারী ভ্রমণকাহিনি লেখক হিসেবে মনে করা হয়। এ পর্যায়ে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক হিসেবে যাকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি তিনি হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ব্যর্থ ডায়াসপোরা লেখকও বটে। মধুসূদন ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক হওয়ার স্বপ্ন ও প্রত্যয় নিয়ে কেবল স্বদেশত্যাগ নয়, নিজের ব্যক্তি পরিচয়ও বদলে ফেলেন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিজের পিতৃপ্রদত্ত নাম বদলে রাখেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত; লেখালেখির জন্য ‘টিমোথি পেনপোয়েম’ ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ইংরেজ এবং ফরাসি নারীকে বিয়ে করেন। তাঁর ইংরেজি রচনা ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ সবচেয়ে ব্যর্থ সৃষ্টিকর্মের ভেতর একটি। তবে তিনি ডায়াসপোরা লেখকজীবন থেকে বাংলা সাহিত্য এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন নানাভাবে।
     
আরও কয়েকজন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর আমি সাম্প্রতিক সাহিত্যপর্বে আসবো। উচ্চশিক্ষার জন্য বাঙালি নারীদের মধ্যে প্রথম ইংল্যান্ড যান মানিকগঞ্জের মেয়ে সরোজিনী চট্টোপাধ্যায় (পরবর্তীকালে সরোজিনী নাইডু) ও তাঁর বোন মৃণালিনী চট্টোপাধ্যায়। সরোজিনী বাল্যকাল থেকেই ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর ইংরেজি কবিতা হায়দ্রাবাদের নিজামকে মুগ্ধ করে এবং তিনি তাঁকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বৃত্তিপ্রদান করেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে তিসি ইংল্যান্ড যান। ইংল্যান্ডে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সরোজিনী চট্টোপাধ্যায় ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চাও করেছিলেন। তাঁর সময়ের ইংল্যান্ডের খ্যাতিমান রাজকবি ও সমালোচক আর্থার সায়মন ও অ্যাডমন্ড গসিয়ের সংস্পর্শে আসেন। আর্থার সায়মনের অনুপ্রেরণায় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দি গোল্ডেন দিসহোল্ড’ (১৯০৫) প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে ‘দি বার্ড অব টাইম’ (১৯১২) এবং ‘দি ব্রোকেন উইংস’ কাব্যগ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হলে তিনি ব্যাপকভাবে ইংরেজ ও বাঙালি পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ফিস্ট অব ইয়ুথ’। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয় ‘দি ম্যাজিক ট্রি’, ‘দ্য উইজার্ড মাস্ক’ এবং ‘এ ট্রেজারি অব পোয়েমস’।

১৮৬৯ সালে কবি গোবিন্দ্রচন্দ্র দত্তের স্ত্রী ক্ষেত্রমোহিনী দত্ত সন্তানদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে মেয়ে অরু দত্ত ও তরু দত্তকে নিয়ে কলকাতা থেকে ফ্রান্স ও ইতালি হয়ে ইংল্যান্ড আসেন। অরু দত্ত এবং তরু দত্ত দুজনই ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শিতা লাভ করেন। ইংল্যান্ডে দুজনই ফ্রেঞ্চ কবিতা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। তাঁরা ফরাসি ভাষায়ও একই সঙ্গে কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। দু’বোন ১৮৭৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। অরু দত্ত যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে মারা যান। অরুর মৃত্যুর পর তরু দত্ত অরু দত্তের অনূদিত কবিতার সঙ্গে নিজের অনূদিত কবিতা প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ ভারত এবং দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সংস্করণ বের হয় লন্ডন থেকে। ২১ বছর বয়সে মারা যান তরু দত্ত।  মৃত্যুর আগে তিনি ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় দুটি উপন্যাসও লিখেছিলেন। এর মধ্যে প্রথমটি প্রথম কোনো ভারতীয় মহিলার ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস এবং একই সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসটি কোনো ভারতীয় মহিলার ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস।

ঋষি শ্রী অরবিন্দ ঘোষের ছোট ভাই মনমোহন ঘোষ ছিলেন কবি, শিক্ষাবিদ ও বিপ্লবী। অস্কার ওয়াইল্ড ‘পল মল গেজেট’-এ মনমোহন ঘোষের কবিতার প্রশংসা করে তার গ্রন্থের আলোচনা প্রকাশ করেন। দেশে ফেরার পর তিনি তাঁর ইংল্যান্ডে অধ্যয়নকালীন লেখা গীতি কবিতাগুলো দিয়ে ১৮৯৫ সালে প্রকাশ করেন ‘সংস অব মার্টিলা’, ১৮৯৬ সালে ‘ঊর্বশী’ এবং ১৮৯৯ সালে ‘লাভ অ্যান্ড ডেথ’। ইংল্যান্ডে অবস্থান ও অধ্যয়নকালীন ইংরেজি ভাষায় লেখালেখিতে জড়িত ছিলেন হীরেন্দ্রনাথ  চট্টোপাধ্যায়। পিতৃভূমি ঢাকা হলেও জন্ম বাবার কর্মস্থল হায়দ্রাবাদে। ১৯১৯ সালে বিয়ের পর তিনি লন্ডনে আসেন এবং বড় বোন সরোজিনী নাইডুর বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতায় গাওয়ার স্ট্রিটে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন কাগজে নিয়মিত কবিতা লিখতেন। ১৯২৯ সালে তাঁর ‘ফাইভ প্লেইজ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। বইটি প্রথম ফ্ল্যাপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আলিস ম্যানিল এবং জর্জ রাসেলের প্রশংসাসূচক মন্তব্য ছিল। দেশ ফিরে তিনি স্বদেশি পাঠকদের কাছে কবি, নাট্যকার ও অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

ইংরেজি ভাষায় নাটক, অপেরা এবং চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবে যিনি স্মরণীয় তিনি হলেন সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার পৈলগ্রামনিবাসী হিন্দু জাতীয়বাদী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের ছেলে নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক নীরঞ্জন পাল। চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ে লেখাপড়ার জন্য ১৯০৮ সালে লন্ডন যান। সেখানে স্ক্রিপ্ট রাইটিং বিষয়ে লেখাপড়া করে লন্ডনের থিয়েটার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯১০-এর দশকের শেষের দিকে পাল ‘দ্য লাইট অব ইন্ডিয়া’ ও ‘সিরাজ’ শিরোনামে দুটি নাটক রচনা করেন। নাটক দুটি লন্ডনের মঞ্চে সফল হয়। তাঁর পরবর্তী নাটক ‘দি গডেস’ বিলেতের মঞ্চে একটানা ৬৬ বার মঞ্চস্থ হয়। নাটকে টানা সাফল্যের পর তিনি সেই সময়ের নির্বাক চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয় পড়েন। নাটকে কেদারনাথ দাসগুপ্তের কথাও বলতে হয়। চট্টগ্রামের মানুষ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু কেদারনাথ দাসগুপ্ত ১৯০৭ সালে লিঙ্কন ইন-এ আইন পড়তে লন্ডনে যান। ইংল্যান্ডের নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। ভারতীয় নাট্যকলাকে ইংল্যান্ডে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে গঠন করেন দ্য ইন্ডিয়ান আর্ট অ্যান্ড ড্রামাটিক সোসাইটি। এরপর অক্সফোর্ডে পড়ার সময় হুমায়ূন কবীর ইংরেজি কবিতার বই প্রকাশ করেছিলেন। বইটির নাম ‘ম্যান অ্যান্ড রিভার্স’ (১৯৪৭)।কিশোরগঞ্জের ছেলে নীরদচন্দ্র চৌধুরী বাঙালি ব্রিটিশ লেখক হিসেবে প্রশংসিত। আরেকভাবে সমালোচিতও।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি মেইনস্ট্রিম ডায়াসপোরা সাহিত্যে যার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছে তিনি হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক মনিকা আলী। প্রথম উপন্যাস ‘ব্রিক লেন’র জন্য ম্যান বুকার পুরস্কারে মনোনয়ন পান তিনি। পরে উপন্যাসটি থেকে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। মনিকার পরিবার যখন বাংলাদেশ থেকে লন্ডন চলে যায় তখন তার বয়স মাত্র তিন বছর। বাংলাদেশি বাবা ও ব্রিটিশ মায়ের সন্তান মনিকা বিয়ে করেছেন ব্রিটিশ নাগরিক সাইমন টরেন্সকে। তার জন্য আজ বাংলাদেশি পরিচয়টা বড় কিছু না হলেও তিনি এই পরিচয় ভুলে যাননি। নিজের এক ছেলের নাম যেমন রেখেছেন ফেলিক্স তেমন মেয়েটির নাম রেখেছেন সুমি। ‘ব্রিক লেন’ উপন্যাসেও আমরা দেখি মূল চরিত্র করা হয়েছে নাজনীন নামের এক বাংলাদেশি মেয়েকে। লন্ডনে ব্রিক লেন অঞ্চলে বাংলাদেশি মানুষের জীবনযাপন এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। এরপরেই উচ্চারিত হয় যুক্তরাজ্য প্রবাসী তাহমিমা আনামের নাম। প্রথম উপন্যাস ‘আ গোল্ডেন এজ’-এর জন্য তিনি কমনওয়েলথ সেরা প্রথম বই পুরস্কার পান। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য গুড মুসলিম’ ম্যান এশিয়ান লিটারারি প্রাইজ-এর জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়। ২০১৭ সালে তাহমিমা ‘গার্মেন্টস’ গল্পটির জন্য ও’হেনরি পুরস্কার পান। তাহমিমা আনাম ইংরেজিতে লেখেন, প্রকাশিতও দেশের বাইরে থেকে। কিন্তু তাঁর লেখার বিষয় বাংলাদেশ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের সমসাময়িক বাস্তবতা। জিয়া হায়দার রহমান তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ইন দ্য লাইট অব হোয়াইট উই নো’দিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক হিসেবে আলোচনায় এসেছেন। উপন্যাসটির রিভিউ প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য নিউইয়র্কার’র মতো ইংরেজি সাপ্তাহিকে। আলোচনা করেছেন খ্যাতিমান সাহিত্য সমালোচক জেমস উড। মনিকা আলীর মতো জিয়ার পরিবারও যখন ব্রিটেনে যায় তখন জিয়া ছোট্ট শিশু। তার উপন্যাসেও আমরা বাংলাদেশকে উপজীব্য করে তুলতে দেখি। আরও বিস্তারিতভাবে বললে অভিবাসী জীবনের যন্ত্রণা, হতাশা, পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তঃসারশূন্য অবস্থা, জঙ্গিবাদ এসব অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। খুব অল্পবয়সীদের ভেতর আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক গালিব ইসলাম। গালিব তার প্রথম উপন্যাস ‘ফায়ার ইন দ্য আননেইমঅ্যাবল কান্ট্রি’ দিয়ে কানাডার মেইনস্ট্রিমের সাহিত্যে আলোচনায় আসেন। দেশটির সম্ভাব্য নোবেলজয়ী লেখক মার্গারেট অ্যাটউড উপন্যাসটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গালিব সাত বছর বয়সে বাবা-মার সঙ্গে কানাডায় যান। এর আগে তার পরিবার কিছু সময় নাইজেরিয়াতে ছিল।

সম্প্রতি আমাজন থেকে প্রকাশিত হয়েছে লন্ডন-প্রবাসী বাংলাদেশি ডায়াসপোরা লেখক সালেহা চৌধুরীর ছেলে অজিক চৌধুরীর কিশোর উপন্যাস ‘অ্যা মুসলিম বয়’। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট সত্তর দশকের ব্রিটেন। কাহিনিতে দেখা যায়, ১১ বছর বয়সী বাংলাদেশি কিশোর শান্তির পরিবার আরো উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে চলে যায় লন্ডন। ব্রিটিশ সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় শান্তির। নানাভাবে বর্ণবৈষম্যের শিকার হয় সে। স্কুলে তার সঙ্গে পরিচিতি ও বন্ধুত্ব ঘটে তারই মতো চারজন ভিন্ন সংস্কৃতির ছেলের সঙ্গে। তারা কেউই স্কুলের কড়া নিয়ম-কানুন মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে তাদের পরিবার শক্তভাবে চায় ছেলে স্কুলে ভালো ফল করে দ্রুত জায়গা করে নিক নতুন দেশে। একদিকে ব্রিটিশ লাইফস্টাইল, অন্যদিকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়- দুয়ের মাঝখানে একজন বাংলাদেশি কিশোরের বেড়ে ওঠার গল্প নিয়ে এগিয়ে গেছে ‘অ্যা মুসলিম বয়’ উপন্যাসটি। অজিক চৌধুরী উপন্যাসটি নিজের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছেন।
 
সিডেরা জাকস নামে এক বাংলাদেশি-ব্রিটিশ লেখক লিখেছেন ‘দি সেভেনথ রিয়েলিটি’ শীর্ষক সায়েন্স ফিকশন। নিজের মুসলিম নাম পরিবর্তন এবং বাংলাদেশি পরিচয় গ্রন্থে অন্তর্ভুক্তি না করার কারণ জানতে চাইলে লেখক আমাকে বলেন, সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন বাংলাদেশি মুসলমান কোনো লেখক, এটা ইউরোপ-আমেরিকার পাঠক গ্রহণ করতে চাইবে না। মার্কেটিংয়ের কথা ভেবে তিনি স্বদেশি পরিচয়ে বইটি বের করতে চাননি। অর্থাৎ ডায়াসপোরা লেখকদের যে সংকট সেটি এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন নাম পরিবর্তন করে। সম্প্রতি হারপারকলিন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশি কানাডীয় লেখক আরিফ আনোয়ারের প্রথম উপন্যাস ‘দি স্ট্রম’। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনকে কেন্দ্র করে উপন্যাসে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস উঠে এসেছে। উপন্যাসে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক শাহরিয়ারের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তাকে ফিরে আসতে হবে। সে মেয়ে আনাকে তার জীবন কাহিনি বলে। আরিফ আনোয়ারে বাড়ি চট্টগ্রাম। স্ত্রী সান্ড্রা লিয়নের সঙ্গে বাস করছেন কানাডায়। সম্প্রতি আমার হাতে এসেছে ব্রিটিশ বাংলাদেশি লেখক নাদিরা কবির বার্বের ছোটগল্প সংকলন ‘ট্রুথ ওর ডেয়ার’। এই সংকলনের বেশ কয়েকটি গল্পে ডায়াসপোরা সাহিত্যের উপকরণ আছে। এছাড়াও কানাডা প্রবাসী নিয়ামত ইমামের উপন্যাস ‘দি ব্ল্যাক কোট’ পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে। নতুন প্রজন্মের আরেকজন অ্যাওয়ার্ড-প্রাপ্ত খ্যাতিমান লেখক-সাংবাদিক তাম হোসেন। পাঁচটি ভাষায় সমানভাবে দক্ষ তামের পৈতৃক নিবাস সিলেট, বেড়ে ওঠা পূর্ব লন্ডনে। বিদেশে থেকে ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছেন খাদেমুল ইসলাম, আদিব খান, মাহমুদ রহমান, ফারাহ গুজনভি, ইড হাসান, ফায়েজা হাসানাত, রাবিনা খান, কেয়া আবদুল্লাহ, শেলি সিলাস, রেখা ওয়াহিদ, শাহিদা রহমান, শবনম নাদিয়া, মারিয়া চৌধুরী, সাদ হোসেন, রাহাদ আবীর এবং ইখতিসাদ আহমেদসহ আরো অনেকে।

ঋণস্বীকার:
গোলাম মুরশিদ
হাসান ফেরদৌস
ফারুক আহমদ

পরবর্তী পর্ব: দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য: ভারত পর্ব

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton