ঢাকা, সোমবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৬ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মৃত কপোতাক্ষ ও মাইকেলের অমৃত ভাস্কর্যের পাশে

পলিয়ার ওয়াহিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৮ ৫:৩১:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৮ ৫:৩৫:৪৭ পিএম

পলিয়ার ওয়াহিদ: দিনটা ছিল আগুনের মতো ধারালো। গাছের পাতায় ছিল না কোনো দোলা। একটুও ছায়া ছিল না দিনের শরীরে আঁকা। তবু আমরা বায়না ধরেছিলাম। ঈদের দিনে কোথাও যাবো। চারদিকে আতরের ঘ্রাণ। বালুমিশ্রিত বাদাম ভাজার শব্দ। করমচার সবুজ ফল পেকে কালো! রেকর্ড পরিমাণ তাপ। এসব মাথায় রেখেই উঠেছি আনন্দ রথে। যেতে হবে ‘মধু কবির বাড়ি’। বেকার দিনে ঈদের মুখে ছিল না হাসি। তবু কেমনে যেন চারপাশ ভরিয়ে তুলল তারা। মিম, শারমিন আর সূরাইয়া। মোট চারজনে সেই গনগনে রাস্তায় নেমে পড়েছিলাম। যেন কোনো দূর্গ আক্রমণ করতে যাচ্ছি। হারতে আমরা শিখিনি। যদিও জেতার কোনো রেকর্ড নাই!

আমি কয়েক বার গিয়েছি কবির বাড়ি। তবে সেটা এক যুগেরও আগে। তাই আমার আগ্রহ আর ওদের উত্তেজনা মিলেমিশে একাকার হলো। একটা ঢেউ উঠলো পথে। সেটা যেন অবাধ্য ইচ্ছের ঢেউ! থামাতে পারবে না কেউ। আমরা মাড়িয়ে যাচ্ছিলাম খেঁজুর গাছের ছায়ায় সারি, তালগাছের একাকী দাঁড়ানোর ভঙ্গি, মোচার উপর নাক বাঁকানো শবরিকলার কাঁদি, নারকেল ফলানো ছোট ছোট কোমর বাঁকানো গাছ। পাকা আমে ঝুলে থাকা টকটকে গাছ। আতার ডালে তোতাপাখির অদর্শন। রসালো কাঁঠালে ভরা বাগানের পর বাগান। টুনটুনির মাথার ঝুঁটির মতো সুপারির ছোট্ট ছোট্ট মাথাওয়ালা বায়সা গ্রাম।  তারপর মানচিত্রে জাম-জামরুলে ভরা পেটমোটা অজগর সাদৃশ্য শ্রীরামপুর গ্রাম। যেন তা ছিল একটা আগুনের নদী। যার জলে আমাদের গা-পা পুড়ে যাচ্ছে। মাটির রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে আমরা বাগদা-মজিদপুরের পাকা রাস্তার মুখে হাজির হলাম। যেন গুহায় ছয়মাস আশ্রমে থাকার পর তীব্র গরমে বেরিয়ে পড়েছে কোনো ক্ষুধার্ত সাপ! তার পেটে থেকে উগরে দেওয়া খাদ্যকণার মতো দুর্বল আমরা। ঘেমে ঘেমে নতুন আতর মাখানো পোশাক আর নারী সঙ্গীদের কোমল কসমেটিক পরানো মুখের দিকে অবশিষ্ট কোনো মায়া নেই, নেই আকর্ষণ!



তে-মাথায় পৌঁছানোর পর শারমিন অদূরে টিউবয়েল আবিষ্কার করে হিমালয় আবিষ্কারের আনন্দে ফেটে পড়ে! আমি দেখতে পাই, একটা টিপকলের মুখে ঠোঁট লাগিয়ে একটি মেয়েপাখি পান করছে সকল ক্লান্তির রস। বৃষ্টির অপেক্ষা করতে করতে আমরা কদম গাছের ছায়ায় দাঁড়াই। হতাশা বাড়তে থাকে। কারণ রাস্তায় তেমন গাড়ির দেখা নেই। খাঁ খাঁ করছে যদ্দুর চোখ যায় সড়কের পিঠ। যা দু’একটা যাচ্ছে তা পুরোটাই ভরানো পেটে-পিঠে। মীম আমাকে বলছিলো, চলেন আরো একটু হেঁটে হেঁটে সামনে বাড়াই পা। দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি? তার কথার সমূহ সব যুক্তি সূরাইয়া কষ্টিপাথরে তুলে বলল, তাই যুতসই।

ধানকাটা নাড়ার হলুদ ক্ষেত, পাট ক্ষেতের সবুজ বাহার, নিরিবিলি বড় পুকুরের থকথকে জলে নিজেদের ছায়া হারাতে হারাতে আমার আলাদীনের চেরাগের মতো একটা অটো পেয়ে গেলাম। যথারীতি কেউ খরগোশের মতো লাফিয়ে, কেউ চামচিকার মতো উড়ে, কেউ ডলফিনের মতো নেচে উঠে গেলাম। গাড়ি ছুটে চলেছে হু হু করে। তার সাথে সাথে যেন ছুটে চলেছে রেইনট্রি গাছের শাখা, ডুমুর গাছের পাতা কিংবা জলপাই গাছের টক স্বাদ। আর মাঝে মাঝে হইহুল্লোড় করছে ছেলেমেয়ে। যাদেও হাসির শব্দে আমাদের গোমড়া মুখেও ছড়িয়ে পড়ছে বোয়াল মাছের মতো চ্যাপ্টা হাসি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পর আমরা পৌঁছলাম মধুসূদনের নাড়ি-পোতা কপোতাক্ষে মোড়ানো সাগরদাঁড়ি গ্রামে। দূর থেকেই সেই জমিদারি ভাবটা এখনো অক্ষুন্ন। রাজনারায়ণ নেই, নেই সেই জমিদারি। কিন্তু তার অভিজাত স্বভাবটা যেন চিৎকার করে বলছে- মধু এ বাড়ির চৌকাঠ আর মাড়াস না! মৌমাছির মতো গুনগুন করতে করতে আমরা মেইন ফটকে পৌঁছে গেলাম। পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি অনেক। মেইন ফলকে ঢোকার আগেই যে সড়কে ছিল মাইকেলের আবক্ষ মূর্তি তা আর সেখানে নেই। ভেতরে প্রবেশের জন্য টিকিট কাউন্টারে গেলে তারা জানায়, ভেতরের  ঘরগুলো আজ খোলা হবে না। মনটা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু চলেই যখন গেছি ঢুকে পড়লাম।



মেইন ফটক দিয়ে ঢুকে বড় পুকুরের পাড়ে বড় বড় অক্ষরে সান বাঁধানো সেই অমীয় বাণী। ‘দাঁড়াও, পথিক-বর জন্ম যদি তব/বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে’। পুকুরের ঠান্ডা নরম জলে শুয়ে আছে লাল শাপলার পাতা আর চোখ ফোটা ছোট ছোট ফুল। আমরা ডালিয়াফুলের সাজানো পথ দিয়ে ডানে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে আরেকটি ছোট আবক্ষ মূর্তি চোখে পড়ে। যার নিচে সেই মহান বাণী। এরপর যে ঘরে মধুসূদনের জন্ম হয়। সেই ঘরটির চারিপাশ একবার প্রদক্ষিণ করি আমরা। পূজার ঘরটিও সযত্নে রাখা। যে স্কুলে প্রাথমিক লেখাপড়া করেছিল মধু সেই স্কুল ঘরও আছে। আছে আরো বেশ কিছু পুরনো হলুদ রঙের বিষণ্ন প্রাসাদ। দ্বার খোলা না থাকাই দেখতে পারিনি তা। গারদ খানার গেটের মতো বড় বড় তালা ঝুলে আছে ছুটির দিনও! গরমে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত আমরা বিশ্রাম করছিলাম বারবার। প্রচুর গাছ-গাছালি আর বড়পুকুরের মাছ-মাছালির সাথে সখ্য শেষে বেরিয়ে পড়েছিলাম দ্বিতীয় অংশের ভ্রমণে। যেখানে মধুসূদন লাইব্রেরী। বড় মাঠের একপাশে ইয়া বড় ইটে গাঁথানো স্টেজ। সেখানে প্রতিবছর মেলার সময় সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামগুলো অনুষ্ঠিত হয়। পুতুল নাচ আর বিদেশী পর্যটকরা বসান নানান জিনিসের পসরা। সেই স্কুল মাঠ, আম বাগান, কালিমন্দির। সব পড়ে আছে। কোথাও যেন মধু নেই! অযত্নে কোথাও কোথাও মাকড়সা বুনেছে জাল! সে কারণে কি মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে অমৃত ভাস্কর্যের মধু?



তা না হলে সেই গোলাপ বাগান কই? কই সেই নানান ফুলে ফোটা বাগানের পর বাগান। কেন তা জেলখানার মতো নিষ্প্রাণ। ফুল বাগানে কেন ঘাসের জঙ্গল। ঈদের ছুটিতে হাজার গরম ও রোদ উপেক্ষা করে দর্শনার্থীর মুখরতা ছিল নজর কাড়া। সেটা ছাড়া সব যেন ঘুমিয়ে আছে। একটা অবহেলা যেন লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোথাও! এই অবহেলার জন্য দায়ী কে? কেন ঈদের দিনে বা ছুটির দিনে মধু কবির ঘরে তালা? কে নেবে এই দায়? মধুর ভেতরের ঘরগুলো দর্শনার্থীর জন্য খোলা হলো না। ফলে সেই দুলর্ভ সম্পদের স্মৃতি থেকে বঞ্চিত হলো নতুন প্রজন্ম! কেন মন্দিরে পূজা দিতে এসে ফিরে গেল অসংখ্য ভক্ত? এগুলোর উত্তর দেবে কে?  ময়লামুখে আমিও তাই কান্না কান্না ছলে চলে যাই নদীর পাড়ে। অনন্ত সে তো আছে। কিন্তু এ কি! এ যে মরা খাল! যদিও হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ হয়েছে নদীর যৌবন ফেরাতে। কিন্তু তার নামমাত্র খুড়াখুড়ি ছাড়া উন্নতি হয়নি কিছুই। মধু কবির সেই বজরা ঘাটে ঠিকই দেখা পেলাম একটা বজরার। কিন্তু তার ছইতোলা নৌকায় নেই কোনো মায়া। ভাড়ায় খাটে না। কোথায় যেন চলে গেল। কাটফাটা রোদে একটা কাঠের নৌকা ছুঁয়ে আছে কপোতাক্ষের তুলতুলে শরীর। বাঁ পাশের যে গোল বিশ্রামাগার ও ছাউনিগুলো পরম উষ্ণতা ছড়াবে বলে ভেবেছিলাম সেখানে ময়লা। বসার পাকা বাঁধানো চেয়ারে ধুলো জমে আছে!  নতুন ইয়া বড় কবির যে ভাস্কর্য তার অবস্থাও বেগতিক। তাতে নামফলক বসানোর প্রতিযোগিতায় নষ্ট হয়েছে ভাস্কর্যের শোভা। কোথাও কোনো যত্ন নেই। কিন্তু তদারকির একটা কড়া গন্ধ ফাঁকির ফুটো দিয়ে বের হয়ে তটস্থ করে রেখেছে সবাইকে। এখানে এসে তাই প্রাণ পাওয়া গেল না। উন্নতি আসলে দেখানো বা দৃশ্যমান কোনো বিষয় নয়। সেটা অদৃশ্য। ফলে উন্নতিকে দৃশ্যমান করতে গিয়েই সবখানে এই ভুলটা করে ফেলছেন আমাদের দায়িত্বশীল কর্তারা। এ বিষয়ে যারা অভিজ্ঞ তাদের মতামত নিয়ে কাজ করতে পারেন মধু কবির জমিদার বাড়ির কর্তারা।



যেখানে গোলাপের বাগান ছিল। সেটা অরক্ষিত। বাদার দখলে পুরো বাগান। একটিও গোলাপ নেই। নেই ক্ষণকাল বসে প্রেমিকার চোখে চোখ রাখার নীরবতা। ঝাঁ ঝাঁ করছে দুপুর। মাথার উপর কিয়ামতের মতো টকটক করছে সূর্য। মনটা ক্রমেই রুক্ষ ও রুগ্ন হয়ে পড়লো। সঙ্গীরা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লো পথের পাশেই। নদীর ঘাটে তাই বেশিক্ষণ থাকা গেল না। জলও যেন আগুনের সৎ বোন! সূর্যের গাঢ় রেখা জলের উপর পরে অন্ধ করে দিচ্ছে চোখ। ফটাফট কিছু সেলফি আর কৃত্রিম হাসি সঞ্চয় করি ঘামধরা স্মৃতির রুমালে। ফেরার সময় মাইকেলের অমৃত সেই ভাস্কর্য যেন আমাকে ডেকে বলছিল- ‘পলিয়ার সারা জীবন ছুটে ছুটে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে কার বলো ভালো লাগে? তার চেয়ে আমাকে তুমি নিয়ে যাও।’ আমি যেন তার কথা শুনছিলাম। মলিন হাসি উপহার দিয়ে বলেছিলাম, ‘তুমি যে কি, তা তুমি জানো না মধু।’ তিনি আমাকে তার কালো কের্টের পকেট থেকে একটা রঙীন কলম উপহার দিয়ে বললেন, ‘স্বপনই মধুর বাকী সব ছেলেখেলা আর ব্যর্থ মানুষের হাসি। আনন্দই আসল কর্ম জগতে।’




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton