ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

হেমিংওয়ের ছোটগল্প: এক পাঠকের লেখক

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-২১ ৭:৩৬:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-২৯ ১:৫১:৩৭ পিএম

সে তার শোবার ঘরের টেবিলে বসেছিলো, ভাঁজ করা খবরের কাগজটা তার সামনে খুলে রেখেছে যেন জানালার বাইরের তুষারপাত আর ছাদের ওপর তার গলে যাওয়া দেখতে না হয়। সে এই চিঠিটা লিখেছে, স্থিরভাবে লিখেছে, যাতে কোনো কাটাকাটি বা পুনর্লিখনের প্রয়োজন না হয়।

 

রোয়ানোকে, ভার্জিনিয়া,

ফেব্রুয়ারি ৬, ১৯৩৩

প্রিয় ডাক্তার বাবু,

আমি সবিনয়ে লিখছি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের আশায়- আমার একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং জানি না ঠিক কাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করবো, আমার বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করার সাহসও নেই, আর তাই আমি আপনার কথা ভেবেছি আর একমাত্র কারণ হলো, আপনার সঙ্গে আমার দেখা না হলেও চলবে। আমি তো আপনার উপর আস্থাও রাখতে পারি। এখন পরিস্থিতিটা বলি, আমি ১৯২৯ সালে আমেরিকান সেনাবিভাগের একজনকে বিয়ে করি আর সেই বছরই তাকে চীনের সাংহাইতে পাঠানো হয়। সে ওখানে তিন বছর থাকে; আর বাড়ি ফিরে আসে। কয়েকমাস আগে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়- আর সে তার মায়ের বাড়ি আরকানসাসের হেলেনাতে ফিরে যায়। সে আমাকে বাড়ি যেতে চিঠি লেখে- আমি যাই আর আমি দেখতে পাই সে কিছু ইঞ্জেকশন নিচ্ছে। আমি স্বভাবতই জিজ্ঞেস করি আর জানতে পারি যে তার চিকিৎসা চলছে। আমি জানি না কীভাবে সে শব্দটি উচ্চারণ করবো, এটা অনেকটা ‘সিফিলাস’ ধরনের কোনো শব্দ- আপনি কি জানেন আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি? এখন আমাকে বলুন আমার পক্ষে কি তার সঙ্গে আবার থাকা নিরাপদ হবে? আমি অবশ্য সে চীন থেকে ফিরে আসার পর তার সাথে অন্তরঙ্গ হইনি। সে আমাকে নিশ্চিত করেছে যে, ডাক্তারের চিকিৎসা শেষ হয়ে গেলেই সে সুস্থ হয়ে যাবে। আপনার কি মনে হয় এটা ঠিক? আমি প্রায়শই আমার বাবাকে বলতে শুনেছি- একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে কারো জন্য মরে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো প্রত্যাশা। আমি আমার বাবাকে বিশ্বাস করি কিন্তু আমার স্বামীকেই বেশি বিশ্বাস করতে চাই। দয়া করে, অনুগ্রহ করে আমাকে বলে দিন কী করা উচিত আমার। আমার একটা কন্যার জন্ম হয়েছে যখন ওর বাবা চীনে ছিলো- আপনাকে ধন্যবাদ এবং আপনার পরামর্শের উপর পূর্ণ আস্থা রাখছি আমি।

আর তারপর তার নাম, স্বাক্ষর দেয়া আছে।

 

হয়তো তিনি আমাকে বলতে পারবেন কোনটা করা ঠিক হবে, সে নিজেকেই বোঝালো। হয়তো সে আমাকে বলতে পারবে। ছবিতে, খবরের কাগজে তার ছবি তেমনই দেখায় যেমনটা সে জানে। তাকে স্মার্ট আর ঠিকঠাক দেখায়। প্রতিদিন সে কাউকে না কাউকে বলে কী করা উচিত। তাকে জানতে হয় সব। আমি তাই করতে চাই যা সঠিক। যদিও অনেক দিন হয়ে গেছে। এ এক দীর্ঘ সময়। আর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। যিশু আমার, অনেক দিন পার হয়ে গেলো। তাকে যেতে হবে যেখানেই তারা তাকে পাঠাক না কেন, আমি জানি, কিন্তু আমি জানি না এজন্য সে কীই-বা পাবে? ওহ, আমি খ্রিস্টের কাছে প্রার্থনা করি তার যেন এটা পেতে না হয়। আমার কিছু যায় আসে না এটা পাওয়ার জন্য সে যাই করুক না কেন! কিন্তু আমি খ্রিস্টের কাছে প্রত্যাশা করি, সে যেন কখনোই এই জিনিস না পায়। এতে মনে হয় যেন তার এটা পেতে হবে না। আমি জানি না কী করবো? আমি খ্রিস্টের কাছে প্রার্থনা করি তার যেন কোনো রকম অসুখই না হয়। আমি জানি না, কেনই বা তাকে রোগ-শোক পেতে হবে।

 

অনুবাদকের টীকা: ১৯৩৩ সালে হেমিংওয়ের ছোটগল্পের বই ‘উইনার টেইক নাথিং’ (বিজয়ী কিছুই নেয় না) এর তৃতীয় গল্প। এই বইতে আটটি গল্প আছে যার ছয়টিই পূর্বে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত। নতুন দুটি গল্পের একটি হলো ‘ওয়ান রিডার রাইটার্স’। আকারে খুব ছোট্ট এই গল্প। অণুগল্পও বলা যায়। আমরা জানি, হেমিংওয়ের রচনা শৈলীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিমিতিবোধ ও মিতব্যয়িতা- এ গল্পে তা উপস্থিত। এই গল্পটি মাত্র তিনটি অনুচ্ছেদে রচিত। কিন্তু প্রতিটি অনুচ্ছেদই ভিন্ন, অন্তত প্রকাশের ধরণে। এতো ছোট আকারের গল্পের মধ্যে এমন ওস্তাদি হেমিংওয়ের মধ্যেই দেখতে পাই। একটু ব্যাখ্যা না দিলে এই গল্পটি বুঝতে হয়তো অসুবিধা হতে পারে। তাই সামান্য টীকা, অনুবাদকের তরফ থেকে।

 

প্রথম অনুচ্ছেদেই দেখতেই পাই, এক নারী খবরের কাগজ সামনে নিয়ে লিখছেন। এতে তিনি ইঙ্গিত দিয়ে দেন, নারীটি একই সঙ্গে লেখক ও পাঠক। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ একটি চিঠি। যে চিঠি মগ্ন হয়ে নারীটি লিখছেন। যৌন রোগে আক্রান্ত তার স্বামীর সঙ্গে তিনি আর মিলিত হবেন কি না এই নিয়ে ডাক্তারের কাছে লেখা এই চিঠি। তৃতীয় অংশটি মূলত অনেক বেশি চিন্তাশীল, গভীর ভঙ্গীর। এই ছোট্ট অনুচ্ছেদে নারীটির ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এই তিনটি অনুচ্ছেদে হেমিংওয়ে কোনো রকম যোগসূত্র ছাড়াই পাঠককে নিয়ে যান। পুরো গল্পের কোনো চরিত্রের নাম নেই, স্থানের নাম থাকলেও। নিঃসন্দেহে ঘটনা-চরিত্রের পরিষ্কার বর্ণণা দিয়ে লেখা প্রচলিত ছোটগল্পের বয়ানের থেকে ‘ওয়ান রিডার রাইটার্স’ একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ‘ছবিতে, খবরের কাগজে তার ছবি তেমনি দেখায় যেমনটা সে জানে’- এই লাইন থেকে এটা বোঝা যায়, চিঠির লেখিকা, ডাক্তারের ঠিকানা ও খোঁজখবরটি খবরের কাগজ থেকে পেয়েই তাকে চিঠিটা লিখছেন। গল্পের শেষ অংশে দেখি পত্রলেখিকা, বর্ণনাকারী চাইছেন, প্রার্থনা করছেন, যেন এই রোগ তার স্বামীর না হয়।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC